এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জ্যোতি বসু একজন কমিউনিস্ট যিনি বিপ্লব করলেন না

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ৭০ বার পঠিত
  • জ্যোতি বসু: একজন কমিউনিস্ট যিনি বিপ্লব করলেন না
    অয়ন মুখোপাধ্যায়

    এই লেখায় জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক অনুশীলনকে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে রেখে বোঝার চেষ্টা করেছি জ্যোতি বসু একজন কমিউনিস্ট, যিনি বিপ্লব করলেন না তারই তাত্বিক অনুসন্ধান। প্রশ্নটা ব্যক্তিগত কৌতূহল থেকে আসেনি; এসেছে ইতিহাসের ভেতর থেকেই—একজন কমিউনিস্ট হয়েও তিনি কেন বিপ্লবের পথে হাঁটলেন না। সংসদীয় রাজনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব, ভূমিসংস্কার, নকশাল আন্দোলন ও শিল্পায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আলোকে সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে।

    ১. ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক কাঠামো

    ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালে শুরু থেকেই একটি মৌলিক দ্বিধা চোখে পড়ে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ভাঙার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার পর সংসদীয় রাষ্ট্রের ভেতরে কাজ করার বাস্তবতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েন কখনো মেটেনি। ১৯৪৭-এর পর রাষ্ট্র আর উপনিবেশিক রইল না, কিন্তু শ্রেণিচরিত্রও পুরোপুরি বদলাল না।

    ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ দেখিয়েছিলেন, ভারতীয় রাষ্ট্র ‘আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক’ হলেও তার মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিসর রয়েছে। এই বিশ্লেষণই সিপিআই(এম)-এর সংসদীয় পথের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে। জ্যোতি বসুর রাজনীতিকে এই ধারার বাইরে রেখে বোঝা কঠিন।

    ২. সংসদীয় পথ: কৌশল থেকে অবস্থান

    লেনিন রাষ্ট্রকে দেখেছিলেন শ্রেণিশাসনের যন্ত্র হিসেবে—যাকে ভেঙে ফেলাই বিপ্লবের শর্ত। কিন্তু ভারতীয় বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ভাঙার প্রশ্নটি কখনোই বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়নি। ১৯৬৭ এবং বিশেষত ১৯৭৭-এর নির্বাচনী সাফল্যের পর সংসদীয় পথ কৌশল থেকে কার্যত অবস্থানে রূপ নেয়।

    জ্যোতি বসুর প্রশাসনিক ভাষা, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সমঝোতামূলক রাজনৈতিক আচরণ এই রূপান্তরের স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবেই ধরা পড়ে। রাষ্ট্র এখানে শত্রু নয়, বরং সীমিতভাবে ব্যবহারযোগ্য একটি কাঠামো।

    ৩. ভূমিসংস্কার: বিপ্লব নয়, কাঠামোগত সংশোধন

    অপারেশন বর্গা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। ভাগচাষিদের আইনি নিরাপত্তা বাড়ে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বাড়ে। কিন্তু গবেষণা দেখায়, জমির মালিকানার মৌলিক কাঠামো এতে ভাঙেনি।

    এই পর্যায়ে জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি সংঘর্ষের পথে না গিয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের পথ বেছে নেন। ফলে এটি বিপ্লবী রূপান্তর না হয়ে একটি সীমিত, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী, কাঠামোগত সংশোধন হিসেবে কাজ করে।

    ৪. নকশাল আন্দোলন ও সহিংসতার প্রশ্ন

    নকশাল আন্দোলনের সময় জ্যোতি বসুর অবস্থান বোঝা জরুরি। সশস্ত্র লাইনকে তিনি রাজনৈতিক ভুল এবং সামাজিকভাবে বিপজ্জনক বলে মনে করেছিলেন। ১৯৭৭-এর পর বামফ্রন্ট সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় দমননীতির ধারাবাহিকতা এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

    এই দমন শুধুই আইনশৃঙ্খলার বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে সংসদীয় বামপন্থার নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। এতে বোঝা যায়, বিপ্লব তাঁর কাছে নৈতিক অনিবার্যতা নয়, বরং একটি ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক বিকল্প।

    ৫. শিল্পায়ন ও পুঁজি: দ্বিধার রাজনীতি

    জ্যোতি বসু শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তাকে তাত্ত্বিকভাবে অস্বীকার করেননি। বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকারে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি ও দলীয় কাঠামো তাঁকে বড় পুঁজির সঙ্গে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে দেয়নি।

    গ্রামসির ভাষায় যাকে ‘passive revolution’ বলা যায়—রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে ধীরে পরিবর্তনের চেষ্টা—এই পথেই তিনি এগোচ্ছিলেন। তবে সেই রূপান্তর শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

    ৬. কেন বিপ্লব হলো না

    এই সব অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত মিলিয়ে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—ভারতীয় সমাজ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত, এমন বিশ্বাস জ্যোতি বাবুর ছিল না; দলীয় শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ও জ্যোতি বাবুর মধ্যে দেখা যায়নি; রাষ্ট্র ভাঙার চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকেই তিনি বাস্তবসম্মত ভেবেছিলেন; এবং সংসদীয় সাফল্য তার কাছে একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।

    এগুলোকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরং এগুলো ভারতীয় কমিউনিজমের কাঠামোগত সীমার দিকেই ইঙ্গিত করে।

    উপসংহার: সাফল্য, প্রাসঙ্গিকতা ও দীর্ঘ ছায়া

    জ্যোতি বসু বিপ্লব করলেন না—এই সত্যের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন সীমাবদ্ধ হয়ে যায় না। বরং তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই, যে তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের ভেতরে ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

    ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছিল। এটি বিপ্লবী ছিল না, কিন্তু রূপান্তরমূলক ছিল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সংযত আচরণ, ব্যক্তিপূজার অনুপস্থিতি এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা—এই দিকগুলো আজকের রাজনীতিতে বিরল।

    আজ যখন রাজনীতি দ্রুত মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, তখন জ্যোতি বসুর অভিজ্ঞতা একটি সতর্ক পাঠ হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রের পরিসর বজায় রেখে সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি কতদূর এগোতে পারে—এই প্রশ্নের আংশিক উত্তর তাঁর রাজনীতিতে পাওয়া যায়।

    জ্যোতি বসু তাই শুধু অতীতের কোনো মুখ্যমন্ত্রী নন। তিনি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক পরীক্ষার নাম—যার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, দুটোই এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

    শেষ বিচারে মনে হয়—তিনি বিপ্লব করেননি, কিন্তু রাজনীতিকে ভেঙে পড়তে দেননি।এই সংযত স্থায়িত্বই হয়তো তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—যা সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজও ভাবতে বাধ্য।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:b522:3428:cedd:***:*** | ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:২০737964
  • জ্যোতি বসু কি কমোডে হাগতেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেলে বোঝা যাবে কেন জ্যোতি বসু একজন কমিউনিস্ট, যিনি বিপ্লব করলেন না। 
  • ar | .***.*** | ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৪737969
  • আহা, ১৯৮৯ সালটা বাদ দিয়ে গেলেন??
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন