এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  প্রবন্ধ

  •  রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, বেসামরিক বাহিনী ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা: একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ৮২ বার পঠিত
  • ইউনাইটেড স্টেটসের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এবং নাৎসি জার্মানির উত্থানপর্বের বেসরকারি সেনাবাহিনীগুলির (যেমন এসএ, এসএস-এর প্রাথমিক পর্যায়) মধ্যকার তুলনা শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানেরই নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার একটি গভীরতর পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই বিশ্লেষণে আমরা দেখব কীভাবে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি, আইনের আড়ালে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে; এবং কীভাবে "জাতীয় নিরাপত্তা" বা "জাতীয় পুনরুত্থান"-এর নামে গোষ্ঠীবিশেষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো একটি রাষ্ট্রের মূলনীতিকে বিকৃত করে।

     প্রাতিষ্ঠানিক উৎপত্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
    ICE তৈরি হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর অধীনে, একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে: অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে "সুরক্ষা"-র সঙ্গে যুক্ত করা। এটি পূর্ববর্তী, তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী সংস্থাগুলিকে একত্রিত করে একটি বিশাল ও অপারেশনালি স্বাধীন বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তর ছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া, যেখানে ভয় ও অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে একটি নজিরবিহীন ক্ষমতাপ্রদত্ত বাহিনী গঠন করা হয়েছিল।

    অন্যদিকে, নাৎসি পার্টির স্টর্মট্রুপার (এসএ) বা পরে নিরাপত্তা বাহিনী (এসএস)-এর প্রাথমিক দলগুলো ছিল বেসরকারি, আধা-সামরিক সংগঠন, যেগুলো ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রের অস্থির ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় শক্তিশালী হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাস্তায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করা, সহিংসতা ও ভীতি তৈরি করা, এবং একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দখলের পথ প্রস্তুত করা। এদেরকে আইনগত বৈধতা দেওয়া হয়েছিল জরুরি অবস্থা ও "জাতীয় সমাজবাদী বিপ্লব"-এর নামে।

    এখানে প্রথম সাদৃশ্যটি লক্ষ্যণীয়: একটি সংকটকে ব্যবহার করে নতুন ও বিস্তৃত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বাহিনী তৈরি। উভয় ক্ষেত্রেই, একটি গভীর সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট (সন্ত্রাসী হামলা/যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক ধস)কে ব্যবহার করে জনমনে ভয় সৃষ্টি করা হয়, এবং সেই ভয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি বাহিনী গঠন করা হয়, যার উপর নিয়মিত আইন ও নিয়ন্ত্রণের সাধারণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি প্রযোজ্য হয় না।

     আদর্শিক ভিত্তি ও "শত্রু" সৃষ্টি
    ICE-এর কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে "অবৈধ অভিবাসন" ধারণাটি। কিন্তু তার কার্যক্রম প্রায়শই বিস্তৃত হয়ে সকল অভিবাসী, এমনকি আইনগত মর্যাদাধারী ব্যক্তিদেরও আচ্ছন্ন করে। এর কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে—বিশেষত ল্যাটিন আমেরিকান, মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে—সন্দেহের চোখে দেখার সংস্কৃতি তৈরি করে। এখানে আদর্শিক কাঠামোটি হলো "জাতীয়তাবাদী সুরক্ষাবাদ", যেখানে একটি সীমিত ও সংকীর্ণ জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাকে রক্ষা করার নামে মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা যায়।

    নাৎসি বাহিনীগুলির আদর্শিক ভিত্তি ছিল "জাতীয় সমাজবাদ"। তাদের শত্রু ছিল বহুমুখী: ইহুদি, কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, জিপসি, সমকামী, এবং যে কেউ "জার্মান জাতির শুদ্ধতা ও শক্তি"-র বিরোধী বলে গণ্য হতো। এসএ-এর মতো বাহিনীগুলি এই "শত্রু"-দের চিহ্নিত করতে, হয়রানি করতে ও সহিংসতা চালাতে সরাসরি ভূমিকা রাখত।

    দ্বিতীয় গুরুতর সাদৃশ্যটি হলো একটি মানবগোষ্ঠীকে "রাষ্ট্রের শত্রু" বা "অস্তিত্বের হুমকি" হিসেবে গঠন করা। ICE-এর ক্ষেত্রে এটি "অপরাধী অভিবাসী", "গ্যাং মেম্বার" বা "সন্ত্রাসী"-এর বিস্তৃত ও অস্পষ্ট সংজ্ঞার মাধ্যমে ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত গোটা একটি জাতি-গোষ্ঠীকে অপরাধী মনে করার মনোভাবকে উৎসাহিত করে। নাৎসি বাহিনীর ক্ষেত্রে এটি ছিল সরাসরি জৈবিক ও জাতিগত ঘৃণার উপর ভিত্তি করে। উভয় ক্ষেত্রেই, এই "অন্যান্য"-করণের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে বৈধতা দেয়।

     আইনের অপব্যবহার ও বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা
    ICE-এর অপারেশনগুলি প্রায়শই আইনের একটি ধূসর অঞ্চলে । অত্যন্ত বিতর্কিত পরিবার বিভাজন নীতি, বিচারিক ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার, অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোর ভয়াবহ পরিবেশ, এবং কার্যত অসীম আটকের ক্ষমতা—এই সবই আইনের ফাঁক-ফোকর ও বিশেষ আইনি ধারার (যেমন "এনফোর্সড ডিপোর্টেশন") মাধ্যমে সম্ভব হয়। এটি একটি সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে অভিবাসীদের মৌলিক অধিকার—যেমন যথাযথ আইনি প্রতিনিধিত্ব, দ্রুত বিচার, মানবিক আচরণ—সহজেই ক্ষুণ্ণ হয়।

    নাৎসি বেসরকারি বাহিনীগুলিও প্রথমদিকে আইনের বাইরে কাজ করলেও দ্রুতই রাষ্ট্রীয় মদতে আইনি অনুমোদন পায়। তারা বিনা বিচারে আটক, নির্যাতন, জবরদস্তিমূলক শ্রম ও হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। এসএস বাহিনীটি তো পরবর্তীতে সম্পূর্ণরূপে আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে রাষ্ট্রের ভিতরে একটি "রাষ্ট্র" হয়ে ওঠে।

    তৃতীয় সাদৃশ্য: রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক আইন ও বিচারব্যবস্থাকে এড়িয়ে বা বিকৃত করে একটি সমান্তরাল শাসনযন্ত্র তৈরি, যা বিশেষ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করে। উভয় ক্ষেত্রেই, লক্ষ্যগোষ্ঠীকে "অবৈধ" বা "অমানুষ" হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে তাদের প্রতি মানবিক ও আইনি সুবিধার অধিকারকে খর্ব করা হয়।

     রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও গণতন্ত্রের ক্ষয়
    ICE-এর কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি আধুনিক রূপ। শারীরিক বলপ্রয়োগ, আকস্মিক রেইড, বাধ্যতামূলক বের করা, এবং আটক অবস্থায় মৃত্যু—এই সবই একটি নিষ্ঠুর ও অমানবিক নীতির প্রতিফলন। এই সহিংসতা শুধু শারীরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও: একটি সম্প্রদায়কে স্থায়ী ভয়ের মধ্যে রাখা, পরিবারগুলিকে বিচ্ছিন্ন করা, এবং সামাজিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলা।

    নাৎসি বাহিনীগুলির সহিংসতা ছিল প্রকাশ্য, গণহত্যার দিকে পরিচালিত একটি ক্রমবর্ধমান সিঁড়ি। তবে শুরুটা হয়েছিল অবৈধ গ্রেপ্তার, গণপিটুনি ও প্রাথমিক আটককেন্দ্র দিয়ে। সহিংসতার এই "স্বাভাবিকীকরণ"-ই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করতে সাহায্য করেছিল।

    চতুর্থ সাদৃশ্য: রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও নিষ্ঠুরতার স্বাভাবিকীকরণ। ICE-এর কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদিত, যা দেখিয়ে দেয় যে গণতান্ত্রিক দেশেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা একটি অনুমোদিত নীতি হিসেবে কাজ করতে পারে, যদি তা "আইনশৃঙ্খলা" বা "সীমানা রক্ষা"-র অজুহাতে চালানো হয়।

     গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অবসান
    ICE কার্যত কারও কাছে জবাবদিহি করে না। এর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়া অকার্যকর, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই দুর্বল, এবং বিচার বিভাগীয় তদারকি সীমিত। এটি একটি "স্ট্রাকচারাল ইম্পিউনিটি"-র (কাঠামোগত দায়মুক্তি) পরিবেশ তৈরি করেছে।

    নাৎসি বাহিনীগুলির ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বলতে শুধু পার্টি ও হিটলারের কাছে জবাবদিহি করা ছাড়া আর কিছু ছিল না। তারা রাষ্ট্রীয় আইন ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে চলে যায়।

    পঞ্চম সাদৃশ্য: দায়মুক্তির সংস্কৃতি। যখন একটি বাহিনী আইন নিজের হাতে নেয় এবং তাকে জবাবদিহি করার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়, তখন মানবাধিকার লঙ্ঘন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

     ইতিহাসের পাঠ ও সতর্কবার্তা
    ICE এবং নাৎসি জার্মানির বেসরকারি সেনাবাহিনীর মধ্যকার সরাসরি সমতুল্যতা তৈরি করা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের জটিলতাকে অস্বীকার করা হবে। নাৎসি জার্মানি একটি ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ছিল শিল্পায়িত গণহত্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে সক্রিয় নাগরিক সমাজ, মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন বিচার বিভাগ বিদ্যমান।

    তবুও, তুলনাটির মূল উদ্দেশ্য হলো গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা ও কর্তৃত্ববাদী প্রক্রিয়াগুলির সতর্কতা দেওয়া। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কীভাবে:

    ১. সংকটকে ব্যবহার করে জনগণকে ভীত করা এবং সেই ভীতির সুযোগ নিয়ে নজিরবিহীন ক্ষমতার বাহিনী তৈরি করা যায়।
    ২. "আমরা বনাম তারা" এর রাজনীতি চালিয়ে একটি মানবগোষ্ঠীকে শত্রু ও অমানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যা তাদের প্রতি নিপীড়নকে বৈধতা দেয়।
    ৩. আইনের শাসনকে দুর্বল করে বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সমান্তরাল ও নিম্নমানের বিচার ব্যবস্থা চালু করা যায়।
    ৪. রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সেই সহিংসতার জন্য দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়।

    ICE-এর অস্তিত্ব ও কার্যক্রম প্রশ্ন করে যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কতটুকু নিপীড়নমূলক ক্ষমতা গ্রহণযোগ্য? এটি আমাদেরকে ইতিহাস থেকে শিখতে বলে যে, মানবাধিকার লঙ্ঘন সর্বদাই একটি ছোট থেকে শুরু হয়, একটি "ব্যতিক্রমী" অবস্থা হিসেবে চালু হয়, এবং ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। তাই, ICE-এর মতো সংস্থাগুলির উপর কঠোর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং গণতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য শর্ত। নইলে, যে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র কর্তৃত্ববাদে রূপান্তরিত হয়, তার প্রথম ধাপগুলি আমরা আবারও প্রত্যক্ষ করতে বাধ্য হব।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২১746550
  •  রাষ্ট্রীয় শক্তি, আধাসামরিক সংগঠন ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের প্রবণতা: ভারতের প্রেক্ষাপটে
    গণতন্ত্র থেকে কর্তৃত্ববাদ
    আধুনিক ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, একদলীয় প্রভাব বিস্তার এবং ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)র হাত ধরে ভারত কীভাবে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের দিকে এগোচ্ছে, তা বোঝার জন্য আমাদেরকে দেখতে হবে কীভাবে একটি আধাসামরিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শিকড় গাড়ে এবং কীভাবে নির্বাচিত সরকারের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ব্যবহার করেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষয়।

     আরএসএস: একটি রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক বাহিনীর উত্থান
    ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস শুরু থেকেই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও তার কাঠামো ও আদর্শে রয়েছে সুস্পষ্ট সামরিক বৈশিষ্ট্য। এর দৈনিক শাখা সমাবেশ, ইউনিফর্ম, শৃঙ্খলা, কর্তৃত্বপরায়ণ নেতৃত্ব কাঠামো এবং 'হিন্দুত্ব'এর আদর্শিক প্রশিক্ষণ একে একটি বেসামরিক বাহিনীতে পরিণত করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণ; কিন্তু ধীরে ধীরে এটি ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করতে থাকে। আরএসএসএর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

    ১. সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও অনুগত্য: কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য।
    ২. সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা: শিক্ষা, শ্রম, মহিলা, ছাত্র সংগঠন (বিদ্যা ভারতী, ভারতীয় মজদুর সংঘ, স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ ইত্যাদি)।
    ৩. হিন্দুত্বের আদর্শিক একচেটিয়াত্ব: ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্য।

    উদাহরণ: ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় আরএসএস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক কর্মসূচির অংশ, যেখানে আদালতের নির্দেশ ও আইনকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল।

     বিজেপি: রাজনৈতিক ক্ষমতায় আরএসএসের হাতিয়ার
    ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজেপি ধীরে ধীরে আরএসএসের রাজনৈতিক শাখায় পরিণত হয়। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির অভূতপূর্ব বিজয় শুধু একটি দলের জয় নয়, বরং আরএসএসের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও আদর্শিক hegemonyএর জয়। বিজেপি সরকারের নীতিনির্ধারণে আরএসএসের সরাসরি প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ:

     নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), ২০১৯: এটি বিশেষ ধর্মের (হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান) অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দেয়, কিন্তু মুসলমানদের বাদ দেয়। এটি ধর্মভিত্তিক নাগরিকত্বের ধারণাকে উৎসাহিত করে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরোধী।

     অনুপ্রবেশকারী শনাক্তকরণ ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি): আসামে এনআরসি বাস্তবায়নের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ (বেশিরভাগই দরিদ্র ও মুসলিম) "ডকুমেন্টেশন" এর অভাবে নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

     জম্মুকাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ (ধারা 370): ২০১৯ সালে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় জম্মুকাশ্মীরকে বিভক্ত করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করা হয়। এটি করা হয়েছিল ব্যাপক সেনা উপস্থিতি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নেতৃত্বকে গৃহবন্দী রাখার মধ্য দিয়ে, যা গণতান্ত্রিক ও যৌথ আলোচনার ধারণাকে ক্ষুণ্ণ করে।

     কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের কৌশল
    আরএসএস ও বিজেপির সম্মিলিত প্রয়াসে ভারতীয় গণতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী রূপান্তরের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কৌশল দেখা যায়:

    ১. প্রতিষ্ঠান দখল ও দুর্বলকরণ:
     বিচার বিভাগ: উচ্চপদে সমর্থক নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বিলম্ব, এবং সরকারের পক্ষে রায়ের প্রবণতা বৃদ্ধির অভিযোগ।
     নির্বাচন কমিশন: নির্দলীয়তা নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচনের সময়সূচি ও নিয়ম প্রণয়নে সরকারের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ।
     মাধ্যম: রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সম্প্রচারকারী প্রসার ভারতীকে সরকারি প্রচারণার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার, এবং বেসরকারি মিডিয়ার উপর অলিখিত চাপ সৃষ্টি।
     শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান: ভারতীয় ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন, বিজেপি ও আরএসএসঅনুগত ব্যক্তিদের প্রধান নিয়োগ।

    ২. "অন্যান্য" সৃষ্টি ও ঘৃণা ছড়ানো:
     মুসলিম ও খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে: "লাভ জিহাদ", "ল্যান্ড জিহাদ", "ফোর্সড কনভার্সন"এর মতো বিভ্রান্তিমূলক অভিযোগের রাজনৈতিক ব্যবহার। উদাহরণ: উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদমন্দির বিতর্ক জিইয়ে রাখা, পথসভায় বিষোদগার।
     বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন: দলিত, আদিবাসী, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, কর্মী ও শিল্পীদের হয়রানি ও গ্রেপ্তার। উদাহরণ: ভীমা কোরেগাঁও সহিংসতা মামলায় বৌদ্ধিকদের গ্রেপ্তার, স্ট্যান স্বামী ও অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘ কারাবাস।

    ৩. আইনের অপব্যবহার ও নাগরিক অধিকার খর্ব:
     আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহার: ইউএপিএ (অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন), এনএসএ (জাতীয় সুরক্ষা আইন)এর মত কঠোর আইন ব্যবহার করে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন।
     সাইবার নজরদারি ও গোপনীয়তা লঙ্ঘন: পেগাসাস স্পাইওয়্যার কেলেঙ্কারি বিরোধী নেতা, সাংবাদিক ও কর্মীদের টার্গেট করার অভিযোগ।
     এনজিও নিয়ন্ত্রণ: বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন (এফসিআরএ) ব্যবহার করে মানবাধিকার ও সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর তহবিল বন্ধ করা।

    ৪. গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ধ্বংস:
     সংসদীয় কার্যক্রম দুর্বলকরণ: ধান্ধা বিল পাস, কমিটি আলোচনা এড়ানো, বিরোধী দলকে প্রান্তিক করা।
     নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব: রাজনৈতিক অর্থায়নে একচেটিয়া আধিপত্য, সরকারি সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার।
     স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন কাঠামো দুর্বল করা: রাজ্য সরকারগুলোর উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি।

     কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের লক্ষণ হিসেবে সমাজের সামরিকীকরণ
    আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবী মডেল এবং বিজেপির রাজনৈতিক ক্ষমতার সমন্বয়ে ভারতীয় সমাজে একটি অনানুষ্ঠানিক সামরিকীকরণ ঘটছে:

     নাগরিকপুলিশ মিশ্রণ:[১]
     ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রচার: জাতীয়তাবাদকে হিন্দুত্বের সঙ্গে জড়িত করা, যার অর্থ "ভারতীয়" হওয়ার মানে "হিন্দু" হওয়া। যারা এই সংজ্ঞায় পড়েন না, তারা "দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক"।
     ইতিহাস পুনর্লিখন: বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি জাতীয় অনুষ্ঠানে আরএসএসের আদর্শের উপস্থাপন।

    গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
    আরএসএস ও বিজেপির ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: কীভাবে একটি আনুষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর দিকে এগোতে পারে? উত্তরটি প্রতিষ্ঠানগুলোর ধীরগতিতে দখল, আইনের অপব্যবহার, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, এবং "আমরা বনাম তারা" রাজনীতির মধ্যে নিহিত।

    বর্তমান ভারত দেখায় যে কর্তৃত্ববাদ কেবল সেনা অভ্যুত্থান বা একদলীয় শাসনের মধ্য দিয়ে আসে না। এটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেও আসতে পারে, যা ধাপে ধাপে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে, বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করে। এটি একটি "ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি" বা নির্বাচনী একনায়কতন্ত্রের মডেল।

    ভারতের সংবিধান, তার নাগরিক সমাজ, তার বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার এবং তার বিচার বিভাগ এখনও প্রতিরোধের শক্তি হিসেবে রয়েছে। কিন্তু আরএসএসবিজেপির প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সহনশীলতা, নাগরিকদের সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কেবল ভারতের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    [১]        নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদের অর্ধসামরিক ভূমিকা: পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার প্রেক্ষাপট  
    ভারতের কিছু রাজ্যে, বিশেষত সীমান্তবর্তী বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)এর স্বেচ্ছাসেবকদের প্রায়শই আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সম্মতি বা মৌন সমর্থনে "অর্ধসামরিক" বা "সহায়ক" ভূমিকায় দেখা যায়। এই প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেখানে দীর্ঘদিনের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আধিপত্যের পর বিজেপি ও আরএসএসের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।

     পশ্চিমবঙ্গ: রাজনৈতিক সংঘাতের মাঠে আরএসএসের ভূমিকা
    পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের বামফ্রন্ট ও পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিজেপির উত্থানের সাথে সাথে আরএসএসের সাংগঠনিক ভিত্তি প্রসারিত হয়। এখানে আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকরা নিম্নলিখিত ভূমিকায় সক্রিয়:

    ১. স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দাগিরি: তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্যযুক্ত গ্রামীণ এলাকায় আরএসএস কর্মীরা প্রায়ই "সামাজিক কাজের" আবরণে স্থানীয় রাজনৈতিক গতিবিধি, বিরোধী দলের কর্মসূচি, এবং সম্ভাব্য "অপরাধমূলক" কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্য প্রায়ই স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশ বাহিনীর নির্দিষ্ট সহানুভূতিশীল অংশের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

    ২. নির্বাচনী প্রচারণার 'সুরক্ষা বাহিনী': রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচনের সময় আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদেরকে প্রায়ই বিজেপির প্রচারকারীদের "সুরক্ষা" প্রদানের জন্য মোতায়েন করা হয়, বিশেষত সেইসব এলাকায় যেখানে দলীয় কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়। তারা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে কাজ করে, যা একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করে।

    ৩. সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া: ধর্মীয় উৎসব বা সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় আরএসএস নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এবং অনেকক্ষেত্রেই পুলিশ বা প্রশাসনের চেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করে, যা প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

    উদাহরণ: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় (বর্ধমান, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর) আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদেরকে "বুট ক্যাম্প" বা প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করতে দেখা গিয়েছিল, যেখানে তারা শারীরিক কসরত, দলবদ্ধভাবে চলাফেরা এবং "আত্মরক্ষার" কৌশল শেখানো হয়েছিল। বিরোধী দলগুলি অভিযোগ করেছিল যে এই ক্যাম্পগুলি নির্বাচনী হিংসার প্রস্তুতির অংশ।

     ত্রিপুরা: ক্ষমতায়নে আরএসএসের সরাসরি ভূমিকা
    ত্রিপুরায় বিজেপির ক্ষমতায়ন (২০১৮) আরএসএসের সংগঠনিক শক্তির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দীর্ঘদিনের বামফ্রন্ট শাসনের পর হঠাৎ করেই বিজেপির বিজয়ের পেছনে আরএসএসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

    ১. সমান্তরাল প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক: বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই আরএসএস ত্রিপুরায় একটি ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তারা স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য শিবির, শিক্ষা কেন্দ্র, এবং সামাজিক সেবার কাজের মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জন করে। এই নেটওয়ার্ক পরে সরাসরি নির্বাচনী যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।

    ২. পুলিশ ও প্রশাসনের সাথে অর্ধসরকারি সমন্বয়: ক্ষমতায় আসার পর ত্রিপুরায় আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদেরকে প্রায়ই পুলিশি কার্যক্রমে "সহায়তা" করতে দেখা গেছে, বিশেষত আদিবাসী এলাকায় বা বিরোধী দলের সমাবেশের সময়। তাদের উপস্থিতি প্রায়ই বিরোধী কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের জন্ম দিয়েছে।

    ৩. সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রসার: ত্রিপুরার আদিবাসী ও অআদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক বিভাজনকে আরএসএস তার "হিন্দুত্ব" জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে জয় করার চেষ্টা করেছে। তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয় উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক আয়োজনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ধারণা ছড়ানোর চেষ্টা করে।

     কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনে এই ভূমিকার তাৎপর্য
    এই অনুশীলনগুলি একটি বৃহত্তর কর্তৃত্ববাদী রূপান্তরের লক্ষণ:

     রাষ্ট্রের একচেটিয়া ক্ষমতার ক্ষয়: যখন একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী আনুষ্ঠানিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা পালন করে, তখন রাষ্ট্রের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের একচেটিয়া অধিকার দুর্বল হয়। এটি সমান্তরাল ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি করে।
     আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান: এই স্বেচ্ছাসেবকরা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক ইউনিফর্ম বা আইনি ক্ষমতা ছাড়াই কাজ করেন, যা তাদেরকে দায়মুক্তি দেয়। তাদের কার্যক্রম প্রায়ই বিচারিক তদন্ত বা জননজরদারির বাইরে থাকে।
     নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততা: আরএসএসের এই ভূমিকা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিকও। তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রবেশ করে, যা তাদেরকে প্রথাগত নিরাপত্তা বাহিনীর চেয়ে বেশি সূক্ষ্ম ও ব্যাপক নজরদারি ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা দেয়।

    পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার উদাহরণগুলি দেখায় যে কীভাবে একটি আদর্শভিত্তিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে যুক্ত হয়ে কর্তৃত্ববাদী প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এটি একটি বিপজ্জনক প্রান্ত, যেখানে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, এবং অর্ধসামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর মধ্যে সীমা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এর ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়, সংখ্যালঘু ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন হয়, এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমন্বিত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এই সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামোগুলিকে স্বীকার করা এবং তাদেরকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের আওতায় আনা।
     
  • albert banerjee | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২৬746551
  • জবাবের অপেক্ষায় থাকলাম .
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন