এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  প্রবন্ধ

  • ওরামানুষবোঝেনামায়াকভস্কিবোঝে

    c
    প্রবন্ধ | ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ৭৯ বার পঠিত
  • “ওরা মানুষ বোঝে না, মায়াকভস্কি বোঝে” এই বাক্যটি পশ্চিমবঙ্গের CPI(M)-এর বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ, প্রায় নির্মম অভিযোগ। এটি শুধু রসিকতা নয়; এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ। এখানে “মায়াকভস্কি” কোনও কবিমাত্র নন, তিনি প্রতীক। বিপ্লবের উচ্চকিত ভাষা, বিমূর্ত আদর্শ, আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার থেকে বিচ্ছিন্ন এক বুদ্ধিবৃত্তিক গর্বের প্রতীক।

    CPI(M)-এর রাজনীতিতে বহুদিন ধরে একটি সমস্যা স্পষ্ট ছিল: মানুষকে শোনা নয়, মানুষকে শিক্ষিত করার দম্ভ। কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনের জটিলতা, দ্বিধা, সংস্কার, আকাঙ্ক্ষা বোঝার বদলে দল বেশি আগ্রহী ছিল সঠিক তত্ত্ব শেখাতে। যেন মানুষের অভিজ্ঞতা ভুল, আর পার্টি টেক্সটই শেষ সত্য। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছিল শ্রেণিকক্ষের লেকচার, যেখানে জনগণ ছাত্র, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার সীমিত।

    মায়াকভস্কিকে বোঝা খারাপ নয়। বিপ্লবী সাহিত্য, শিল্প, চিন্তা রাজনৈতিক কল্পনাকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন কবিতা বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। যখন জমির অধিকার, কাজের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে মানুষের আবেগকে “পেটি বুর্জোয়া” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন দল আদর্শ রক্ষা করে, কিন্তু জনসমর্থন হারায়।

    এই উক্তির সবচেয়ে ধারালো দিক হল তার নৈতিক অভিযোগ। এটি বলে, CPI(M) মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়েছে, কিন্তু নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় আঁকড়ে ধরেছে। ফলাফল অনিবার্য: মানুষ অন্যত্র গেছে, কারণ তারা চেয়েছে বোঝাপড়া, নির্দেশনা নয়।

    রাজনীতি যদি মানুষের হয়, তবে মানুষকেই আগে বুঝতে হয়। মায়াকভস্কি পরে আসতে পারেন। না হলে কবিতা থাকবে, কিন্তু পাঠক থাকবে না।

    এটি শুধু সাংস্কৃতিক এলিটিজমের অভিযোগ নয়, এটি ক্ষমতার ভাষার সমালোচনা। CPI(M) দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে এমন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছিল যা নিজের কাছেই স্পষ্ট, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমশ দুর্বোধ্য। সেই ভাষায় ছিল উদ্ধৃতি, রেফারেন্স, তত্ত্ব, কিন্তু ছিল না সংশয়, ছিল না আত্মসমালোচনার ভঙ্গি।

    মানুষ কখনও নিখাদ শ্রেণি-সত্তা নয়। সে একই সঙ্গে শ্রমিক ও পিতা, কৃষক ও ভক্ত, বেকার যুবক ও স্বপ্নদ্রষ্টা। CPI(M)-এর রাজনীতি এই বহুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। ধর্ম মানেই প্রতিক্রিয়াশীলতা, আবেগ মানেই ভ্রান্ত চেতনা, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানেই শ্রেণিচ্যুতি। এর ফলে দল এমন এক “সঠিক মানুষ”-এর কল্পনা তৈরি করেছিল, যিনি বাস্তবে খুব কমই অস্তিত্বশীল। বাস্তব মানুষ সেই ছাঁচে না ঢুকলেই সে হয়ে উঠত রাজনৈতিকভাবে অবিশ্বস্ত।

    মায়াকভস্কি এখানে তাই বিপ্লবের রোমান্টিকতা ও কঠোরতার যুগল প্রতীক। তাঁর কবিতার বজ্রনিনাদ পার্টির মঞ্চে ভালো শোনায়, কিন্তু পঞ্চায়েত অফিসে, পার্টি ক্যাডারের আচরণে, পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাতের বাস্তবতায় সেই ভাষা ফাঁপা লাগে। মানুষ দেখে এক কথা বলা হচ্ছে কবিতায়, আরেক কথা ঘটছে জীবনে। এই দ্বৈততা বিশ্বাস ভাঙে।

    আরও গভীর সমস্যা ছিল প্রতিনিধিত্বের। CPI(M) মানুষের হয়ে কথা বলত, কিন্তু ক্রমে মানুষের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। আন্দোলন রুটিন হয়ে গিয়েছিল, সিদ্ধান্ত উপর থেকে নেমে আসত, আর ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে চিহ্নিত করা হত। যে কেউ প্রশ্ন তুললেই তাকে “শত্রু শ্রেণির এজেন্ট” বলা সহজ ছিল। এতে দল সুরক্ষিত বোধ করত, কিন্তু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত।

    এই উক্তি শেষ পর্যন্ত একটি সতর্কবার্তা। বাম রাজনীতি যদি মানুষের ভাষা হারায়, যদি সে মানুষের অসংলগ্নতা, ভয়, স্বার্থপরতা, এমনকি ভুলকেও বুঝতে না শেখে, তবে সে শুধু পাঠ্যসূচিতে বেঁচে থাকবে। মায়াকভস্কি পড়া হবে, উদ্ধৃত হবে, কিন্তু রাজনীতি আর সমাজকে স্পর্শ করবে না।

    বিপ্লব কবিতায় শুরু হতে পারে, কিন্তু টিকে থাকে মানুষের জীবনে। সেই জীবনকে না বুঝলে, সবচেয়ে সুন্দর কবিতাও শেষ পর্যন্ত একাকী হয়ে পড়ে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2a02:26f7:d6c0:6805:0:4000::***:*** | ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২১746560
  • সে যাই হোক, এবারের ইলেকশানে সিপিএমকেই ভোট দিন। তিনোরা তো বছর পনেরো চুরিডাকাতি করলো, এবার সিপিএমের পালা। 
  • :|: | 2607:fb90:bda5:d685:d899:1e7b:1472:***:*** | ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৪746561
  • না। চৌতিরিশ বছর হোক আগে, তারপর ভাবা যাবে। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন