অনুগল্প: আলোর কর্মচারীঅয়ন মুখোপাধ্যায়
কুমির মোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান সনৎ ঘোষ। লাইব্রেরিতে বইয়ের অভাব ছিল না—অভাব ছিল পাঠকের। ছাত্রছাত্রীদের কাছে লাইব্রেরি মানে ছিল বন্ধ দরজার একটি ঘর, যেখানে ধুলো জমা বই গুলো নীরবে পড়ে থাকে। কখন ও আবার সেই ঘরটাই হয়ে উঠত রিহার্সাল রুম।
কিন্তু সনৎ ঘোষ বিশ্বাস করতেন—লাইব্রেরি যদি আলো না ছড়ায়, তবে তার অস্তিত্বের মানেই বা কী?প্রতি দিন তিনি বইগুলো ধুলো ঝেড়ে যত্ন করে সাজিয়ে রাখতেন। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন একটি করে বই হাতে নিয়ে দাঁড়াতেন লাইব্রেরির দরজার সামনে। যে ছাত্রছাত্রীকে দেখতেন, তাকেই বলতেন—“আজ এই গল্পটা পড়ে দেখবে? ভালো লাগবেই।”শুরু তে কেউ পাত্তা দিত না। কিন্তু সনৎ ঘোষ হাল ছাড়েননি।
একদিন তিনি স্কুলের এক প্রবল বদমাইশ ছাত্রকে থামালেন—যে ক্লাসে প্রায়ই হৈচৈ করে। সনৎ ঘোষ তার হাতে একটি বই তুলে দিলেন— ‘টম সয়্যার ও হাকল বেরি ফিনের দুঃ সাহসিক অভিযান’। মৃদু হেসে বললেন,“তুমি তো খুব দুষ্টুমি করো। টম আর হাকলবেরিও তোমার মতোই। কিন্তু দেখো, তাদের দুষ্টুমিই কীভাবে তাদের আলাদা করে তোলে।”
ছেলেটি অবাক হয়ে বইটা পড়ল। পরদিন এসে বলল,“স্যার, ওই ছেলেটার মতো আমি-ও পারি।”
তারপর থেকে ছেলেটি ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে উঠল।ক্রমে সনৎ ঘোষের হাত ধরে একে একে সব ছাত্রছাত্রীই বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করল। তিনি ক্লাসে ক্লাসে গল্প পড়াতেন—যেন একেকটা ছোট “গল্পের আসর”। সবাই মিলে বসে গল্প পড়ত, তারপর চলত আলোচনা। ধীরে ধীরে লাইব্রেরি হয়ে উঠল স্কুলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত জায়গা।
এই বদলটা সকলের চোখে ভালো লাগলেও, অয়ন মাস্টারের চোখে পড়েছিল অন্যভাবে। তাঁর ক্লাসে ছাত্র কমছে, লাইব্রেরিতে ভিড় বাড়ছে—এই হিসেবটা তিনি চুপচাপ মিলিয়ে নিচ্ছিলেন। স্টাফরুমে বসে তিনি প্রায়ই বলতেন,“এসব গল্প-টল্প দিয়ে পড়াশোনা হয় নাকি?”
সনৎ বাবুর এইসব কাজকর্ম নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে খুব একটা কিছু বলতেন না, কিন্তু সুযোগ পেলেই নিয়ম, সময়সূচি আর ‘সিলেবাসের চাপ’-এর কথা তুলে লাইব্রেরির এই বাড়তি উন্মাদনাকে ছোট করে দেখাতেন। এই নীরব চাপের কারণেই সনৎ বাবু অয়ন মাস্টারকে একে বারেই সহ্য করতে পারতেন না।
একদিন কুমির মোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিস্ময়ে লক্ষ করলেন—যেখানে একসময় লাইব্রেরি ঘর প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকত, সেখানে এখন ভিড় উপচে পড়ছে। তিনি বললেন,“সনৎবাবু, আপনিই আমাদের স্কুলের সত্যিকারের আলো। আপনি শুধু বই সামলান না, আপনি আমাদের ছেলে মেয়েদের মনও গড়ে দেন।”
প্রধান শিক্ষকের কথার শেষে ঘরে এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। ঠিক তখনই প্রশান্ত স্যার, অতনু স্যার আর সুজা স্যার হালকা করে খাঁক করে হাসলেন। সেই হাসিতে প্রশংসা ছিল না, ছিল হিসেব।
লাইব্রেরির আলো জানালা পেরিয়ে করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল—কিন্তু স্টাফরুমের এক কোণে তখনও আলো পৌঁছতে পারেনি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।