এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •  অনুগল্প আলোর কর্মচারী অয়ন মুখোপাধ্যায়

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ৫৮ বার পঠিত
  • অনুগল্প: আলোর কর্মচারী
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
     
    কুমির মোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান সনৎ ঘোষ। লাইব্রেরিতে বইয়ের অভাব ছিল না—অভাব ছিল পাঠকের। ছাত্রছাত্রীদের কাছে লাইব্রেরি মানে ছিল বন্ধ দরজার একটি ঘর, যেখানে ধুলো জমা বই গুলো নীরবে পড়ে থাকে। কখন ও আবার সেই ঘরটাই হয়ে উঠত রিহার্সাল রুম।
     
     
     
    কিন্তু সনৎ ঘোষ বিশ্বাস করতেন—লাইব্রেরি যদি আলো না ছড়ায়, তবে তার অস্তিত্বের মানেই বা কী?প্রতি দিন তিনি বইগুলো ধুলো ঝেড়ে যত্ন করে সাজিয়ে রাখতেন। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন একটি করে বই হাতে নিয়ে দাঁড়াতেন লাইব্রেরির দরজার সামনে। যে ছাত্রছাত্রীকে দেখতেন, তাকেই বলতেন—“আজ এই গল্পটা পড়ে দেখবে? ভালো লাগবেই।”শুরু তে কেউ পাত্তা দিত না। কিন্তু সনৎ ঘোষ হাল ছাড়েননি।
     
     
    একদিন তিনি স্কুলের এক প্রবল বদমাইশ ছাত্রকে থামালেন—যে ক্লাসে প্রায়ই হৈচৈ করে। সনৎ ঘোষ তার হাতে একটি বই তুলে দিলেন— ‘টম সয়্যার ও হাকল বেরি ফিনের দুঃ সাহসিক অভিযান’। মৃদু হেসে বললেন,“তুমি তো খুব দুষ্টুমি করো। টম আর হাকলবেরিও তোমার মতোই। কিন্তু দেখো, তাদের দুষ্টুমিই কীভাবে তাদের আলাদা করে তোলে।”
     
     
    ছেলেটি অবাক হয়ে বইটা পড়ল। পরদিন এসে বলল,“স্যার, ওই ছেলেটার মতো আমি-ও পারি।”
     
     
    তারপর থেকে ছেলেটি ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে উঠল।ক্রমে সনৎ ঘোষের হাত ধরে একে একে সব ছাত্রছাত্রীই বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করল। তিনি ক্লাসে ক্লাসে গল্প পড়াতেন—যেন একেকটা ছোট “গল্পের আসর”। সবাই মিলে বসে গল্প পড়ত, তারপর চলত আলোচনা। ধীরে ধীরে লাইব্রেরি হয়ে উঠল স্কুলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত জায়গা।
     
     
    এই বদলটা সকলের চোখে ভালো লাগলেও, অয়ন মাস্টারের চোখে পড়েছিল অন্যভাবে। তাঁর ক্লাসে ছাত্র কমছে, লাইব্রেরিতে ভিড় বাড়ছে—এই হিসেবটা তিনি চুপচাপ মিলিয়ে নিচ্ছিলেন। স্টাফরুমে বসে তিনি প্রায়ই বলতেন,“এসব গল্প-টল্প দিয়ে পড়াশোনা হয় নাকি?”
     
     
    সনৎ বাবুর এইসব কাজকর্ম নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে খুব একটা কিছু বলতেন না, কিন্তু সুযোগ পেলেই নিয়ম, সময়সূচি আর ‘সিলেবাসের চাপ’-এর কথা তুলে লাইব্রেরির এই বাড়তি উন্মাদনাকে ছোট করে দেখাতেন। এই নীরব চাপের কারণেই সনৎ বাবু অয়ন মাস্টারকে একে বারেই সহ্য করতে পারতেন না।
     
    একদিন কুমির মোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিস্ময়ে লক্ষ করলেন—যেখানে একসময় লাইব্রেরি ঘর প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকত, সেখানে এখন ভিড় উপচে পড়ছে। তিনি বললেন,“সনৎবাবু, আপনিই আমাদের স্কুলের সত্যিকারের আলো। আপনি শুধু বই সামলান না, আপনি আমাদের ছেলে মেয়েদের মনও গড়ে দেন।”
     
    প্রধান শিক্ষকের কথার শেষে ঘরে এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। ঠিক তখনই প্রশান্ত স্যার, অতনু স্যার আর সুজা স্যার হালকা করে খাঁক করে হাসলেন। সেই হাসিতে প্রশংসা ছিল না, ছিল হিসেব।
     
    লাইব্রেরির আলো জানালা পেরিয়ে করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল—কিন্তু স্টাফরুমের এক কোণে তখনও আলো পৌঁছতে পারেনি।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন