এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে কে পথে, আর কে লুকিয়ে খুঁজে নিন আপনি

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ৪১ বার পঠিত
  • নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে কে পথে, আর কে লুকিয়ে খুঁজে নিন আপনি
    অয়ন মুখোপাধ্যায়

    বাংলাদেশের শ্রমিক দিপু দাসকে যেভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে, অপমান করে, শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে — তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটি ভয়াবহ ভাবে স্পষ্ট সংখ্যালঘু শ্রমিকের জীবন এখানে সস্তা, আর ধর্মীয় উন্মাদনার সামনে মানবতা পরাজিত। এই হত্যা কাণ্ডের পর তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো — এই বর্বরতার বিরুদ্ধে কে দাঁড়াল, আর কে দাঁড়াল না?

    পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র  সংগঠিতভাবে, গোটা রাজ্যজুড়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে সিপিআইএম। মিছিল হয়েছে, ধর্না হয়েছে, বিবৃতি এসেছে, তোলা হয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির প্রশ্ন। কিন্তু একই সঙ্গে চোখে পড়েছে এক গভীর, অস্বস্তিকর শূন্যতা। যারা সারাক্ষণ “হিন্দু বিপন্ন”, “হিন্দুদের রক্ষা” বলে গলা ফাটায় — সেই বিজেপি ও আরএসএস কোথায়? আর যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, সেই তৃণমূল কংগ্রেসই বা কোথায়?

    এই নীরবতা কোনও কাকতালীয় নয়। এই নীরবতা রাজনৈতিক চরিত্রের নগ্ন, নির্লজ্জ প্রকাশ।বিজেপি ও আর এস এস যে আদৌ হিন্দুদের দরদী নয়, তা বহুবার প্রমাণিত। তারা হিন্দুকে চায় ভোটব্যাংক হিসেবে—মানুষ হিসেবে নয়। বিশেষ করে যদি সেই হিন্দু গরিব হয়, শ্রমিক হয়, আর সীমান্তের ওপারে থাকে। দিপু দাস যদি কেবল “মুসলিম বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার” উপযোগী এক প্রতীক হতেন, তাহলে বিজেপির প্রচারযন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠত। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠে যায় শ্রমিক শ্রেণির নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, ধর্মীয় মৌলবাদের রাজনৈতিক চরিত্র যা বিজেপির রাজনীতির জন্য অস্বস্তিকর। তাই তারা নিশ্চুপ।

    আরএসএসের নীরবতা আরও গভীর ও বিপজ্জনক। কারণ তারা নিজেদের “হিন্দু সমাজ”-এর নৈতিক অভিভাবক বলে দাবি করে। অথচ যখন একজন হিন্দু শ্রমিককে ধর্মের নামে হত্যা করা হয়, তখন তাদের কণ্ঠে নেই শোক, নেই ক্রোধ, নেই ন্যূনতম নৈতিক প্রতিক্রিয়া। কেন? কারণ এই হত্যা কাণ্ড হিন্দুত্বের সুবিধাজনক আখ্যান ভেঙে দেয়। এখানে হিন্দু হত্যাকারী নয়, নিহত। খুনি কোনও “অপর” নয়, বরং রাষ্ট্র ও মৌলবাদের যৌথ উৎপাদন । এই সত্য স্বীকার করলে তাদের রাজনীতির ভিত কেঁপে ওঠে।

    তৃণমূল কংগ্রেসের নীরবতাও আলাদা করে চিহ্নিত করার দাবি রাখে। ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতিতে তারা এমন এক আপসের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলা দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্ন তুললে ধর্মীয় তোষণের মুখোশ খুলে পড়বে—এই আশঙ্কাতেই তাদের মুখ বন্ধ। এখানে মানবাধিকার গৌণ, ভোটের অঙ্কই মুখ্য।

    এই প্রেক্ষাপটে সিপিআইএমের অবস্থান তাই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা এই হত্যাকাণ্ডকে কেবল ধর্মীয় আবেগের চোখে দেখেনি; দেখেছে শ্রমিক নিপীড়নের ধারাবাহিকতা হিসেবে, দেখেছে মৌল বাদের রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে। তারা বুঝেছে — আজ দিপু দাস, কাল অন্য কেউ। আজ বাংলাদেশে, কাল ভারতে। মৌলবাদ সীমান্ত মানে না, আর পুঁজির স্বার্থে রাষ্ট্র প্রায়শই নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়ায়।

    বামপন্থীরা রাস্তায় নেমেছে কারণ তাদের রাজনীতি পরিচয়ভিত্তিক নয়, শ্রেণিভিত্তিক। তারা জানে—ধর্মের নামে যে হত্যাগুলো হয়, তার শিকার শেষ পর্যন্ত গরিব মানুষই। তাই এই প্রতিবাদ কোনও নির্বাচনী কৌশল নয়; এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধ তার প্রকাশ।

    আজ যারা চুপ করে আছে, তারা ইতিহাসে অভিযুক্ত হবে। কারণ নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়—নীরবতা মানে সহযোগিতা। দিপু দাসের রক্ত শুধু খুনিদের হাতেই নেই; আছে সেই সব রাজনৈতিক শক্তির হাতেও, যারা চোখ বন্ধ করে থেকেছে 

    প্রশ্নটা তাই আর কে হিন্দুর দরদী তা নিয়ে নয় প্রশ্নটা হলো কে মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, আর কে ক্ষমতার পক্ষে। এই প্রশ্নের উত্তর রাজপথে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ইতিহাস মনে রাখবে — কে পথে ছিল, আর কে লুকিয়ে ছিল।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন