এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • সিঙ্গুর যৌথ ধ্বংসের রাজনীতি ও শিল্প ভন্ডামির পুনরাবৃত্তি অয়ন মুখোপাধ্যায়

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • সিঙ্গুর: যৌথ ধ্বংসের রাজনীতি ও শিল্প-ভণ্ডামির পুনরাবৃত্তি
     
     অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
    সিঙ্গুর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সিঙ্গুর কোনও দুর্ঘটনাও নয়। সিঙ্গুর হলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক মডেল—যেখানে শিল্প ধ্বংসকে আন্দোলনের নামে বৈধ করা হয়, আর সেই ধ্বংসকেই পরে ভোটের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানে ভুল ছিল না, ছিল হিসেব। এখানে আবেগ ছিল না, ছিল কৌশল। এখানে কৃষক ছিল প্রতীক, শিল্প ছিল বলি, আর ক্ষমতা ছিল একমাত্র লক্ষ্য।
     
    ২০০৬ থেকে ২০০৮—টাটা ন্যানো কারখানা সিঙ্গুরে আসার কথা ছিল। সেটা কেবল একটি গাড়ির কারখানা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত ছিল হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান, একটি শিল্প-পরিবেশ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের “শিল্প-বিমুখ” ধারণায় একটি বড় ফাটল। সেই সম্ভাবনাই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এবং এই ধ্বংসের দায় কোনও একক দলের নয়। তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, নকশাল–SUCI ধারা এবং তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সমাজ—এই চার শক্তির সম্মিলিত সুবিধাবাদই সিঙ্গুরকে শেষ করেছে।
     
    তৃণমূল কংগ্রেস সিঙ্গুরকে ব্যবহার করেছিল ক্ষমতা দখলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। তারা জানত, ন্যানো কারখানা হলে বামফ্রন্ট সরকারের ‘উন্নয়ন’ বয়ান শক্ত হবে, সেই বয়ান ভাঙতেই হবে। তাই তৈরি করা হলো একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব—শিল্প বনাম কৃষি। এই দ্বন্দ্ব আদতে ছিল না। শিল্প মানেই কৃষির শত্রু—এই সরলীকরণ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। যে জমির বড় অংশে ক্ষতিপূরণ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে বহু কৃষক কাজ পেতে রাজি ছিলেন, সেই জটিল বাস্তবতা ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হলো। আন্দোলনের উত্তাপে যুক্তি পুড়িয়ে দেওয়া হলো। তৃণমূল জানত, আবেগ যত বাড়বে, প্রশ্ন তত কমবে। শেষ পর্যন্ত কারখানা গেল, চাকরি গেল, সম্ভাবনা গেল—কিন্তু রাজনীতি জিতল।
     
    এই ধ্বংসের সময় বিজেপি ও মমতার সাথে ছিল। বিজেপি জানত, বাংলায় শিল্প ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক হতাশা বাড়বে, আর সেই হতাশার উপর দাঁড়িয়েই ধর্মের রাজনীতি ঢোকানো সহজ হবে। তাই তারা তখন শিল্প বাঁচাতে কোনও জাতীয় স্তরের চাপ তৈরি করেনি, কোনও স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। অপেক্ষা করেছে। আজ সেই বিজেপিই, মোদি থেকে সুকান্ত মজুমদার পর্যন্ত, বাংলায় দাঁড়িয়ে শিল্পের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এই ভণ্ডামির কোনও সীমা নেই। যখন সিঙ্গুরে শিল্প ভাঙছিল, তখন এই শিল্পপ্রেম কোথায় ছিল? তখন কেন রাজ্য বা কেন্দ্রীয় নীতি, যেমন Ease of Doing Business, ব্যবহার করে বিনিয়োগ এবং শিল্প বাঁচানো হলো না? সেই সময় Ease of Doing Business ধারণা যদিও কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় স্তরে সংজ্ঞায়িত ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত ছিল না, আর বিশেষ করে সিঙ্গুরের জন্য কার্যকর কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আজ শিল্পের কথা বলা মানে সিঙ্গুরের ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা। এটা শিল্পপ্রেম নয়, এটা রাজনৈতিক প্রবেশ দ্বারের কৌশল।
     
    এই পুরো পর্বের সবচেয়ে নোংরা ভূমিকা পালন করেছে নকশাল ধারা, SUCI এবং একদল তথা কথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী। এরা শিল্পকে কোনওদিনই সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায়নি। এদের কাছে পুঁজি মানেই শত্রু, কার খানা মানেই শোষণ, কর্ম সংস্থান মানেই আপস। কৃষকের নামে এরা শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছে। মাঠে আন্দোলন করেছে, মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছে, কলামে নৈতিকতার বুলি কেটেছে। কিন্তু একবারও প্রশ্ন করেনি—এই রাজ্যে শিল্প না হলে শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা কী করবে? চাকরি না থাকলে কৃষকের সন্তান কোথায় যাবে? শুধু নৈতিক উচ্চাসন থেকে বক্তৃতা দিয়ে সমাজ চলে না। এই বুদ্ধিজীবীরা কোনওদিন দায় নেয় না, কারণ তাদের সন্তানেরা চাকরি পায়, সিঙ্গুরের ছেলেমেয়েরা পায় না।
     
    সিঙ্গুর ভাঙেনি একা তৃণমূলের আন্দোলনে, ভাঙেনি একা নকশাল দের চরমপন্থায়, ভাঙেনি একা বিজেপির নীরবতায়। সিঙ্গুর ভেঙেছে এই সব শক্তির যৌথ স্বার্থে। তৃণমূল চেয়েছে ক্ষমতা, নকশাল–SUCI চেয়েছে মতাদর্শিক তৃপ্তি, বিজেপি চেয়েছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক জমি। শিল্প ছিল কেবল বলি। পরে সুপ্রিম কোর্ট ভূমি অধিগ্রহণকে অবৈধ বলেছে, রাজ্য সরকারকে টাটা মোটরসকে শত শত কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে—কিন্তু কোনও রাজনৈতিক শক্তি তাদের ভূমিকার জন্য অনুশোচনা করেনি। কারণ ক্ষতিপূরণ গেছে করদাতার পকেট থেকে, রাজনীতির নয়।
     
    আজ আবার সেই একই নাটক শুরু হয়েছে। নতুন সংলাপ, পুরোনো চক্রান্ত। আজ আবার সিঙ্গুর টানা হচ্ছে বক্তৃতায়, আজ আবার বিনিয়োগের গল্প, শিল্পের স্বপ্ন। কিন্তু কেউ বলছে না—সিঙ্গুরের পর কতটা শিল্প এল? কত চাকরি তৈরি হলো? বেকার শিক্ষিত যুব সমাজের জন্য কী বাস্তব পরিকল্পনা নেওয়া হলো? উত্তর শূন্য। শুধু সংলাপ বদলেছে, কৌশল বদলায়নি।
    সিঙ্গুরের মানুষের কাছে এবং পশ্চিমবঙ্গের বেকার শিক্ষিত যুবসমাজের কাছে তাই একটাই অনুরোধ—যারা একসঙ্গে শিল্প ধ্বংস করেছে, তাদের আলাদা আলাদা মুখোশে বিশ্বাস করবেন না। আবেগ নয়, হিসেব চান। স্লোগান নয়, পরিকল্পনা চান। কারণ এই রাজনীতি প্রশ্নকে ভয় পায়। আর সিঙ্গুর সেই প্রশ্নের নাম—এই রাজনীতি আমাদের কী দিয়েছে, আর কী কেড়ে নিয়েছে। এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। আর তাই এই প্রশ্নটাই তুলতে হবে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন