ক্ষমতার আগাম বিনিয়োগ: ২০০৬-এর পর বাংলার রাজনীতিতে ঝুঁকি, লোভ ও নৈতিক পতনের দর্শন
অয়ন মুখোপাধ্যায়
কিছু সময় রাজনীতির ইতিহাস কে বোঝা যায় সংখ্যায়। যেমন—২৩৫। ২০০৬ সালে এই সংখ্যা টাই ছিল বাংলার রাজনীতির আপাত নিশ্চয়তার প্রতীক। ২৩৫টি আসন নিয়ে বামফ্রন্টের ক্ষমতা তখন প্রায় অচলায়তনের মতো—নড়ানো যাবে না, ভাঙা যাবে না, অন্তত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়—এমনটাই ধরে নিয়েছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। অথচ ঠিক সেই সময় থেকেই রাজ নীতির মাঠে দেখা যাচ্ছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য—যা সংখ্যার অঙ্ক মানছিল না, যুক্তির সাধারণ ব্যাখ্যাও মানছিল না।
আমি দেখেছিলাম বহু মানুষকে—যাঁরা কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ প্রতিষ্ঠিত পেশায়, কেউ আবার বাম রাজনীতির ছায়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ছিলেন—হঠাৎ করেই নিজেদের ক্যারিয়ার, সামাজিক অবস্থান, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাজি রেখে নেমে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেস কে ক্ষমতায় আনার সংগ্রামে। প্রশ্নটা তখন থেকেই মাথায় ঘুরছিল: যে ক্ষমতা আপাত দৃষ্টিতে ধরাছোঁয়ার বাইরে, তার জন্য এত বড় ঝুঁকি কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর আবেগে নেই, আছে দর্শনে। রাজনীতি কখনও কেবল আদর্শের খেলা নয়; রাজনীতি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য লাভের মানচিত্রও এঁকে দেয়। ক্ষমতার পালাবদল মানে শুধু সরকার বদল নয়—এটি সম্পদের পুনর্বণ্টন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বদল এবং সুযোগের নতুন দরজা খোলা।
বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি হয়ে ছিল। দুর্নীতি ছিল, কিন্তু তা ছিল কাঠামোবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত এবং অনেকাংশে দলীয় শৃঙ্খলার ভেতরে বাঁধা। হঠাৎ করে বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তোলার রাস্তা সেখানে খুব চওড়া ছিল না। ফলে যারা দ্রুত ধনী হওয়ার রাজনীতি তে বিশ্বাসী, তাদের কাছে এই ব্যবস্থা ছিল ধীর, ক্লান্তিকর এবং সীমাবদ্ধ।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি ঠিক তার বিপরীত। এটি ছিল আন্দোলননির্ভর, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং আনুগত্য-ভিত্তিক।আদর্শের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে ছিল কে কতটা ঝুঁকি নিতে পারে’। এই ধরনের রাজনীতিতে এক নতুন সামাজিক শ্রেণি জন্ম নেয় রাজনৈতিক বিনিয়োগকারী শ্রেণি। যারা জানে, ক্ষমতা বদলালে পুরোনো নিয়ম ভাঙবে, নতুন নিয়ম পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগেই ফাঁকফোকর তৈরি হবে, আর সেই ফাঁক দিয়েই দ্রুত পুঁজি সঞ্চয় সম্ভব।
চিটফান্ড, কয়লা, গরু পাচার কিংবা চাকরি চুরির মতো ঘটনাগুলো তাই কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এগুলো একটি বিশেষ রাজনৈতিক অর্থনীতির স্বাভাবিক পরিণতি। যেখানে রাষ্ট্র নীরব দর্শক, প্রশাসন দলীয় আনুগত্যে বন্দি এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতি নিজেই লুটের সুরক্ষা দেয়—সেখানে দুর্নীতি আর বিচ্যুতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে পদ্ধতি।
২০০৬ থেকে ২০১১—এই সময়টা ছিল শুধুই বিরোধী আন্দোলনের সময় নয়; এটি ছিল ভবিষ্যতের বখরা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিকাল। কে কতটা আক্রমণাত্মক, কে কতটা অনুগত, কে কতটা ঝুঁকি নিতে পারবে—এইসবের ভিত্তিতেই তৈরি হচ্ছিল অদৃশ্য অংশীদারি ত্বের তালিকা। দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় instrumental rationality—যেখানে নৈতিকতা নয়, সম্ভাব্য ফলই সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি।
এইখানেই রাজনীতির আদর্শিক মৃত্যু ঘটে। রাজনীতি আর সমাজ বদলের প্রকল্প থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। কেউ দেয় সময়, কেউ দেয় সংগঠন, কেউ দেয় হিংসা, কেউ দেয় মুখ—আর প্রত্যেকে প্রত্যাশা করে ক্ষমতা এলে তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট রিটার্ন মিলবে। এই রিটার্ন কখনও কমিশন, কখনও চাকরি, কখনও প্রশাসনিক সুরক্ষা, কখনও বা সরাসরি কালো টাকার ভাগ।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো—এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের নৈতিক বোধও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। যখন দেখা যায় ঝুঁকি নেওয়াই পুরস্কৃত হচ্ছে, তখন সততা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, আর সুবিধাবাদ বাস্তব বুদ্ধি মত্তার স্বীকৃতি পায়। রাজনীতি তখন আর ন্যায়ের ভাষায় কথা বলে না—কথা বলে হিসাবের ভাষায়।
আজ পিছন ফিরে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়—২০০৬ সালের পর যারা নিজেদের ক্যারিয়ার বাজি রেখেছিল, তাদের অনেকেই তা করেনি কোনও মহৎ আদর্শের জন্য। তারা করেছিল একটি সম্ভাবনার জন্য—যেখানে ক্ষমতার বদলের সঙ্গে সঙ্গে লুটের নতুন দরজা খুলবে, এবং সেই দরজার চাবি থাকবে আগে ভাগে ঝাঁপিয়ে পড়া সৈনিকদের হাতে।
এটি কেবল কোনও এক দলের সমালোচনা নয়। এটি গণতন্ত্রের এক গভীর সংকটের দলিল—যেখানে রাজনীতি আর নৈতিক সংগ্রাম নয়, বরং আগাম বিনিয়োগের বাজার। আর সেই বাজারে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সাধারণ মানুষের—যার ভোট কেবল ক্ষমতার হাত বদলের মাধ্যম, কিন্তু জীবনের শর্ত বদলায় না।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।