এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ক্ষমতার আগাম বিনিয়োগ ২০০৬ এর পর বাংলার রাজনীতিতে ঝুঁকি ও লোভ ও নৈতিক পতনের দর্শন অয়ন মুখোপাধ্যায়।

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ৯৫ বার পঠিত
  • ক্ষমতার আগাম বিনিয়োগ: ২০০৬-এর পর বাংলার রাজনীতিতে ঝুঁকি, লোভ ও নৈতিক পতনের দর্শন
     
     
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
     
    কিছু সময় রাজনীতির ইতিহাস কে বোঝা যায় সংখ্যায়। যেমন—২৩৫। ২০০৬ সালে এই সংখ্যা টাই ছিল বাংলার রাজনীতির আপাত নিশ্চয়তার প্রতীক। ২৩৫টি আসন নিয়ে বামফ্রন্টের ক্ষমতা তখন প্রায় অচলায়তনের মতো—নড়ানো যাবে না, ভাঙা যাবে না, অন্তত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়—এমনটাই ধরে নিয়েছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। অথচ ঠিক সেই সময় থেকেই রাজ নীতির মাঠে দেখা যাচ্ছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য—যা সংখ্যার অঙ্ক মানছিল না, যুক্তির সাধারণ ব্যাখ্যাও মানছিল না।
     
     
    আমি দেখেছিলাম বহু মানুষকে—যাঁরা কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ প্রতিষ্ঠিত পেশায়, কেউ আবার বাম রাজনীতির ছায়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ছিলেন—হঠাৎ করেই নিজেদের ক্যারিয়ার, সামাজিক অবস্থান, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাজি রেখে নেমে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেস কে ক্ষমতায় আনার সংগ্রামে। প্রশ্নটা তখন থেকেই মাথায় ঘুরছিল: যে ক্ষমতা আপাত দৃষ্টিতে ধরাছোঁয়ার বাইরে, তার জন্য এত বড় ঝুঁকি কেন?
     
     
    এই প্রশ্নের উত্তর আবেগে নেই, আছে দর্শনে। রাজনীতি কখনও কেবল আদর্শের খেলা নয়; রাজনীতি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য লাভের মানচিত্রও এঁকে দেয়। ক্ষমতার পালাবদল মানে শুধু সরকার বদল নয়—এটি সম্পদের পুনর্বণ্টন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বদল এবং সুযোগের নতুন দরজা খোলা।
     
     
    বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি হয়ে ছিল। দুর্নীতি ছিল, কিন্তু তা ছিল কাঠামোবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত এবং অনেকাংশে দলীয় শৃঙ্খলার ভেতরে বাঁধা। হঠাৎ করে বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তোলার রাস্তা সেখানে খুব চওড়া ছিল না। ফলে যারা দ্রুত ধনী হওয়ার রাজনীতি তে বিশ্বাসী, তাদের কাছে এই ব্যবস্থা ছিল ধীর, ক্লান্তিকর এবং সীমাবদ্ধ।
     
     
    তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি ঠিক তার বিপরীত। এটি ছিল আন্দোলননির্ভর, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং আনুগত্য-ভিত্তিক।আদর্শের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে ছিল কে কতটা ঝুঁকি নিতে পারে’। এই ধরনের রাজনীতিতে এক নতুন সামাজিক শ্রেণি জন্ম নেয় রাজনৈতিক বিনিয়োগকারী শ্রেণি। যারা জানে, ক্ষমতা বদলালে পুরোনো নিয়ম ভাঙবে, নতুন নিয়ম পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগেই ফাঁকফোকর তৈরি হবে, আর সেই ফাঁক দিয়েই দ্রুত পুঁজি সঞ্চয় সম্ভব।
     
     
    চিটফান্ড, কয়লা, গরু পাচার কিংবা চাকরি চুরির মতো ঘটনাগুলো তাই কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এগুলো একটি বিশেষ রাজনৈতিক অর্থনীতির স্বাভাবিক পরিণতি। যেখানে রাষ্ট্র নীরব দর্শক, প্রশাসন দলীয় আনুগত্যে বন্দি এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতি নিজেই লুটের সুরক্ষা দেয়—সেখানে দুর্নীতি আর বিচ্যুতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে পদ্ধতি।
     
     
    ২০০৬ থেকে ২০১১—এই সময়টা ছিল শুধুই বিরোধী আন্দোলনের সময় নয়; এটি ছিল ভবিষ্যতের বখরা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিকাল। কে কতটা আক্রমণাত্মক, কে কতটা অনুগত, কে কতটা ঝুঁকি নিতে পারবে—এইসবের ভিত্তিতেই তৈরি হচ্ছিল অদৃশ্য অংশীদারি ত্বের তালিকা। দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় instrumental rationality—যেখানে নৈতিকতা নয়, সম্ভাব্য ফলই সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি।
     
     
    এইখানেই রাজনীতির আদর্শিক মৃত্যু ঘটে। রাজনীতি আর সমাজ বদলের প্রকল্প থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। কেউ দেয় সময়, কেউ দেয় সংগঠন, কেউ দেয় হিংসা, কেউ দেয় মুখ—আর প্রত্যেকে প্রত্যাশা করে ক্ষমতা এলে তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট রিটার্ন মিলবে। এই রিটার্ন কখনও কমিশন, কখনও চাকরি, কখনও প্রশাসনিক সুরক্ষা, কখনও বা সরাসরি কালো টাকার ভাগ।
     
     
    সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো—এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের নৈতিক বোধও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। যখন দেখা যায় ঝুঁকি নেওয়াই পুরস্কৃত হচ্ছে, তখন সততা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, আর সুবিধাবাদ বাস্তব বুদ্ধি মত্তার স্বীকৃতি পায়। রাজনীতি তখন আর ন্যায়ের ভাষায় কথা বলে না—কথা বলে হিসাবের ভাষায়।
     
     
    আজ পিছন ফিরে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়—২০০৬ সালের পর যারা নিজেদের ক্যারিয়ার বাজি রেখেছিল, তাদের অনেকেই তা করেনি কোনও মহৎ আদর্শের জন্য। তারা করেছিল একটি সম্ভাবনার জন্য—যেখানে ক্ষমতার বদলের সঙ্গে সঙ্গে লুটের নতুন দরজা খুলবে, এবং সেই দরজার চাবি থাকবে আগে ভাগে ঝাঁপিয়ে পড়া সৈনিকদের হাতে।
     
     
    এটি কেবল কোনও এক দলের সমালোচনা নয়। এটি গণতন্ত্রের এক গভীর সংকটের দলিল—যেখানে রাজনীতি আর নৈতিক সংগ্রাম নয়, বরং আগাম বিনিয়োগের বাজার। আর সেই বাজারে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সাধারণ মানুষের—যার ভোট কেবল ক্ষমতার হাত বদলের মাধ্যম, কিন্তু জীবনের শর্ত বদলায় না।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন