

ছবি: রমিত
জানুয়ারির নদী – রিও দে ঝানেইরো
জানুয়ারির নদী?
মাসটা না হয় জানুয়ারি কিন্তু নদী কই? কেউ কোথাও নদী দেখলেন? দেখেননি, কারণ এটি গুল্প। ফেক নিউজ।
সমুদ্র বিজয়ী অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস, স্প্যানিশে ক্রিস্তোবাল কলোনের ভারত যাত্রার নেভিগেশনাল ম্যাপকে অবহেলা করে আটত্রিশ বছর বয়েসি পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা পুব মুখে পাল তুলে আফ্রিকা ঘুরে ১৪৯৮ সালের মে মাসে কোঝিকোডের জামোরিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যখন লিসবন ফিরলেন জনতা ধন্য ধন্য করলে। পাশের দেশ স্পেন সে সাফল্য মেনে নিতে নারাজ। স্বয়ং কলম্বাস বললেন আমিই সে, সোহহং। আমি ভারতে পৌঁছেছি, স্পেনের পতাকা উড়িয়েছি ভারতের উপকূলে, হাইতি বাহামাস জামাইকা ত্রিনিদাদে। আমৃত্যু কলম্বাস বিশ্বাস করেছেন তিনিই সঠিক।
ভুল দেশে পৌঁছে কলম্বাস ভারতীয়দের যে কি সর্বনাশ করে গেছেন তার পরিচয় পেলাম ইজারলোনে জার্মান শেখার ক্লাসে ভর্তি হয়ে। সবে হাতে খড়ি, মুখে জার্মান। নিজেদের পরিচয় দেবার পালা; শিক্ষিকা ব্রিগিটে বুঝিয়ে দিয়েছেন দেশের নামের সঙ্গে er জুড়ে জাতীয়তা জাহির করা যায়। আমার পাশের স্টিভেন অস্ট্রেলিয়ার ছেলে; সে দাঁড়িয়ে বললে ইখ বিন অস্ত্রালিয়ার, পাউলো ইতালিয়ান, সে ইতালিয়ানার। আমি ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছি ভারতকে জার্মানে বলে ইনডিয়েন (Indien); সগর্বে বললাম, ইখ বিন ইনডিয়েনার! ব্রিগিটে হেসে বললেন, এই লজিকটা আপনার দেশের ক্ষেত্রে খাটে না, জার্মান ভাষায় এটি একটি ব্যতিক্রম (আইনে আউসনামে)। কলম্বাসের কারণে উত্তর আমেরিকার আদি মানুষদের নাম ইনডিয়ানার! আপনি ইনডার।
দেশ মানুষ নদ নদী সাগরের নাম ছিল সেখানকার মানুষের নিজেদের ভাষায়; সে সব বদলে দিয়ে নতুন নামে ডাকার বাহাদুরি কেবল ইউরোপিয়ানদের। আধার বা র্যাশন কার্ড ছাড়াই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার এক দঙ্গল মানুষকে ভারতীয় ঘোষিত করে গেছেন কলম্বাস। এই নকলি ভারতীয়রা যাতে ঘুসপেতিয়া রূপে আমাদের দেশে ভবিষ্যতে আস্তানা না গাড়তে পারেন তাই কি ভাগ্যে এঁদের নামের আগে লাল /রেড লেখা হল।
এইরূপ ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত ভ্রান্তির উদাহরণ ইতিহাসে অনেক যেমন রিও ডে ঝানেইরো।
কলম্বাসের ‘ভারত আবিষ্কারের ‘ অব্যবহিত পরেই, ১৪৯৪ সালে তরদেসিয়াসের চুক্তি অনুযায়ী স্থির হয়েছিল স্পেন ও পর্তুগাল তাদের খুঁজে পাওয়া পৃথিবীর যে কোন ভূখণ্ড ভাগ করে নেবে (ডাচ ইংরেজ ফরাসি তখনো ডিঙ্গি বাইছে)। মাতা কুন্তির মতন স্বয়ং পোপ তাঁর আশীর্বাদ জানিয়ে বলেছেন আপোসে ঝগড়া ঝাঁটি না করে যে সব নতুন দেশে তারা পৌঁছুবে সেগুলি স্পেন পর্তুগাল যেন ভাগাভাগি করে নেয়। তবে একটা শর্ত - তাঁরা যেন সেই সব বর্বরদের কানে খ্রিস্টের বাণী পৌঁছে দেন। এতাবৎ লদ্ধ এবং ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত সম্পত্তির বাঁটোয়ারা শুরু; লিসবন থেকে সিধে দক্ষিণে আফ্রিকার কাপ ভারদ দ্বীপপুঞ্জ(পর্তুগাল সেখানে পৌঁছে গেছে) বরাবর একটা কাল্পনিক লাইন টানা হলো, তার পশ্চিমটা পাবে স্পেন, পুবটা পর্তুগাল। সেই মুহূর্তে ইউরোপিয়ানরা জানতেন না আরও দক্ষিণে আছে এক বিশাল মহাদেশ।
কলম্বাস আজকের ক্যারিবিয়ান পৌঁছে তাকে ভারত এবং পূর্ব এশিয়া বলেছিলেন। তার নিচে কোন ইউরোপিয়ান তখনো যায়নি। পর্তুগালের রাজা বললেন এটা তো সম্পত্তি ভাগের দলিলে পড়েনি তবে সেদিকে যেতে বাধা নেই। সেই মতো নাও (পর্তুগিজে নাউ মানে জাহাজ!) বেয়ে পেদ্রো কাবরাল একটি তটরেখার সম্মুখীন হলেন, ভাবলেন এটি আরেকটি দ্বীপ, এলেম নতুন দেশে, নাম দিলেন ইলিয়া দে ভেরা ক্রুজ (সত্য ক্রুশের দ্বীপ)। ২২শে এপ্রিল ১৫০০। দিয়েগো সাঁও প্রথম ইউরোপিয়ান যিনি বিশ বছর আগে কঙ্গো নদীর মোহনায় বিষুব রেখা পেরিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবেশ করেছিলেন– পর্তুগিজ জাহাজ আবার অতিক্রম করলো সেই রেখা, আরেক দুনিয়ায়। ১৫০২ সালের পয়লা জানুয়ারি গাসপার দে লেমোসের অধিনায়কত্বে একটি জাহাজ এসে পৌঁছুল গুয়ানাবারা উপসাগরে, যার আকার দেখে পর্তুগিজরা মনে করেছিলেন এটি কোন বিশাল নদীর মোহানা। মাসের নামে সে কল্পিত নদীর নাম দিলেন রিও দে ঝানেইরো, জানুয়ারির নদী। সেখানে কোন নদী সাগরে মেলেনি। তবু ভুল নামটাই টিকে গেলো। বহু ব্যবহারে নামের কাটছাঁট হলে জানুয়ারি বাদ পড়ল। যা কখনই ছিল না, তারই নামে পরিচিত আজ সেই ঘাট - রিও, নদী!
গাসপার দে লেমোসের জাহাজে আরেকজন অভিযাত্রী ছিলেন, কলম্বাসের মতন তিনিও ইতালিয়ান, আমেরিগো ভেসপুচি। টানা দীর্ঘ তট দেখে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে এ কোন দ্বীপ নয়, কলম্বাসের এশিয়া তো নয়ই – বরং এযাবৎ অনাবিষ্কৃত, আরেক ভূখণ্ড, চতুর্থ মহাদেশ। নতুন পৃথিবী। আমেরিগো ভেসপুচি ইউরোপে ফিরেই একটি মানচিত্র সম্বলিত ‘মুন্দুস নোভুস’ নামের যে প্যাম্ফলেটটি প্রকাশ করেন, সেটি সে আমলের প্রথম বেস্ট সেলার, তার হাজার কপি বিক্রিত হয় ছ মাসের মধ্যে। বছর তিনেক বাদে ফরাসি অনুবাদে লোরেন প্রদেশের সানকট ডিডেল শহরের লাইব্রেরিতে সেটি পড়েন দুই জার্মান ম্যাপমেকার মাথিয়াস রিংমান এবং মারটিন ভালডজেম্যুলার। তাঁদের যৌথ প্রয়াসে এই নতুন পৃথিবীর ম্যাপ সহ যে বইটি লেখা ও ছাপা হয় তার নাম কসমোগ্রাফিয়ে ইন্ট্রদুকশিও (অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু কসমোগ্রাফি)। প্রারম্ভে মারটিন ভালডজেম্যুলার লেখেন
আমার মনে হয় না এই নতুন পৃথিবী যদি মহান অভিযাত্রী আমেরিগোর নাম বহন করে তাতে কেউ আপত্তি করতে পারেন। তবে তার নাম হোক আমেরিগে, আমেরিগোর ভূমি অথবা আমেরিকা।
বাকিটা ইতিহাস। সেই নাম রয়ে গেল।
ভারত ভেবে আজকের ক্যারিবিয়ানের কিছু বন্দর, দ্বীপের নাম দিয়ে গিয়েছিলেন কলম্বাস – যেমন ইস্পানিওলা (ছোট স্পেন, আজকের কিউবা/ ডমিনিকান রিপাবলিক), আন্তিগা(প্রাচীন), সান সালভাদোর (সন্ত পরিত্রাতা), ত্রিনিদাদ (ট্রিনিটি)। যে দেশে তাঁর কোন জাহাজ কোনদিন নোঙ্গর ফেলেনি সেই আমেরিকায় ওহাইওর রাজধানী সহ উনিশটি রাজ্যে কলম্বাস নামের অন্তত চল্লিশটি শহর, গঞ্জ আছে।
আমেরিকা বাদে, কানাডার উত্তরে এলসমেয়ার দ্বীপ হতে আর্জেন্টিনার দক্ষিণে তিয়েরা দেল ফুয়েগো অবধি বিশাল ভূখণ্ডে, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকায়, কলম্বাসের নামাঙ্কিত একটিও শহর বন্দর গ্রাম খুঁজে পাওয়া যায় না। আছে কলাম্বাসের ফিমেল ডেরিভেটিভ এক দেশ, কলোম্বিয়া এবং কানাডার রাজ্য ব্রিটিশ কলাম্বিয়া।
সুন্দরি গাছের নাম থেকে সুন্দরবন। উপকূল জুড়ে লালচে কাঠের গাছের (পর্তুগিজে পাউ ব্রাজিল) সমারোহ দেখে নাবিকরা দেশটার নাম দিলেন ব্রাজিল।
মারাকানা, ২০১৪
ফুটবলে উন্মত্ত ব্রাজিল, বিশ্ব

সোজাসুজি ফ্লাইট নেই বলে লন্ডন থেকে পশ্চিম আফ্রিকা যেতে যেথায় প্লেন বদল করতে হতো সেই বিভীষিকাময় বিমান বন্দরের নাম শারল দ্য গল - এ গেট সে গেট, স্যাটেলাইট, সিঁড়ি, ট্রেন পেরিয়ে যতক্ষণে সঠিক দুয়োরে হাজির হয়েছি তার আগেই আবিদজান দুয়ালা ডাকারের পাখি উড়ে গেছে। পরিচিত অপরিচিত মানুষকে অযাচিতভাবেই বলেছি, শারল দ্য গল এয়ারপোর্টে প্লেন বদল করার চিন্তাটাও বিষবৎ পরিত্যাজ্য। এ ব্যাপারে প্যারিসের যে একটি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী আছে সেটা জানলাম মাদ্রিদের বাদাখোসে ব্রিটিশ এয়ারের প্লেন থেকে নেমে আইবেরিয়ার রিওগামী বাহনটি ধরতে গিয়ে। মারফির পয়লা আইন মোতাবেক (ইফ সামথিং ক্যান গো রং, ইট উইল) হাতে সময় কম থাকলে আপনার কানেকটিং ফ্লাইটের গেটটি হবে বিমান বন্দরের একেবারে বিপরীত প্রান্তে, কোন অজ্ঞাত কারণে চলন্ত সিঁড়ি থাকবে না সে পথে। এখানেও তার ব্যত্যয় হল না। দুর্বল হাঁটুর কারণে একশ, পাঁচশ মিটার দৌড়ের প্রশ্নই ওঠে না; তার চেয়েও বিপদজনক প্লেন ধরতে ধাবিত জনতার আগ্রাসী এবং রূঢ় আচরণ। জানি আজ সবাই সাউ পাউলো বা রিও যাবে, তাই এমন ঠেলাঠেলি! কয়েকটি ডাচ যুবক আমার বিভ্রান্তি দেখে বললে, জাস্ট জয়েন অ্যান্ড ফলো আস। গড়পড়তা ডাচেদের দৈর্ঘ্য সাড়ে ছ ফুট। তারা আমাকে ঘিরে এবং আশেপাশের জনতাকে কনুইয়ের ধাক্কা দিয়ে তাদের হিসেবে হাঁটতে, আমার হিসেবে ছুটতে থাকে। সমগ্র নেদারল্যান্ডকে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের আসনে যখন বসেছি, প্লেন ছাড়তে মিনিট দশেক বাকি। স্থির করলাম প্যারিসের পরে এবার মাদ্রিদের নাম লেখা থাকবে আমার রেড বুকে- পথি মাদ্রিদ বাদাখোস বিবর্জিতা।
জার্মানি ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপের সময়ে আমাদের পিতা পুত্রের ভ্রমণসূচি স্থির করার কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল আমার। ইতিমধ্যে বার দুয়েক দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে এসেছে ইন্দ্রনীল, আমাকে বললে টিকিট তুমি কাটো। বাকি ব্যবস্থার ভার আমার। রিওতে সুবিখ্যাত কোপাকাবানা বিচের পাশে কোনো এক তেরেজিনিয়া পরিবারে আমাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা সে আগে ভাগেই ঠিক করে রাখবে; তবে এই রিওর পথে কি একবার বুয়েনোস আইরেসে কটা দিন কাটিয়ে যেতে পারে? তার কলেজের এক বান্ধবী সেখান থাকে। আপত্তি করিনি, তবে বলে রেখেছি এয়ারপোর্টে আসতে হবে না কিন্তু আমার আবির্ভাবের দিনে ইন্দ্রনীল যেন সেই এপার্টমেন্টের সামনে উপস্থিত থাকে।
গালেয়াও জবিম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট গুয়ানাবারা বে’র ওপরে, শহর থেকে দূরে। তাই সুগার লোফ পাহাড় বা যীশুর মূর্তি চোখে পড়ল না বিকেলের আলোয়, তবে জুটল এক স্বচ্ছন্দ ইংরেজি বলা মুখর ড্রাইভার। তিনি জানালেন বিশ্বকাপ যার ঘরেই যাক না কেন, গত জুন মাসেই দিনে চোদ্দ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে তিনি ছ মাসের আয় করে ফেলেছেন।
আমাদের অস্থায়ী ঠিকানা: ফামিলি তেরেজিনিয়া ফাথ, এপার্টমেন্ট নম্বর ৯০৪, রুয়া বারাতা রিবেরো ৪৫০। ইন্দ্রনীল ফুটপাথে দাঁড়িয়েছিল। ভগ্নদূতের মতো বললে চার্জার ভুলে গেছিলাম তবে দোকান খুঁজে পেয়েছি, তারা আপাতত ফোন চার্জ করে দিয়েছে। একটা কিনেও ফেলেছি। এবার তোমার ব্যাগ ফ্ল্যাটে তুলে ফেলি।
জুলাই মাস, দক্ষিণ গোলার্ধে এখন শীত। দিব্যি আরামদায়ক বিকেল, মোটামুটি বিশ বাইশ ডিগ্রি হবে। ইন্দ্রনীল বললে রাতে একটু ঠাণ্ডা পড়বে তবে তোমার আমার কাছে সেটা কোন শীত নয়। চার বছর আগে জোহানেসবার্গে আমরা খেলা দেখেছি, সেটাও দক্ষিণ গোলার্ধ, রাতে ঠাণ্ডা ছিল।
এবার একটা কাজ বাকি – বিচের ওপরে একটা হোটেলে গিয়ে ব্যারি নামক ব্যক্তির কাছে থেকে চারই জুলাই জার্মানি বনাম ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট তুলতে হবে। গমগম করছে কোপাকাবানা, সুখী জনতার ভিড়, চার কিলোমিটার টানা চলে সেই বিচ, আর এমুড়ো থেকে ওমুড়ো অবধি রবার্ট বুরলে মার্কসের সাদা কালোয় ঢেউ খেলানো মোজাইকটি; একেই কি বলে আইকনিক? তিনি কেবল ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার ছিলেন না। রবার্ট বুরলে মার্কস ব্রাজিলে টেক্সটাইল, জুয়েলারি, বাগান, থিয়েটার, পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন সর্বত্র তাঁর হাতের ছোঁয়া রেখে গেছেন; তাঁর নামে অন্তত পঞ্চাশটি প্লান্টের নাম আছে। তাঁর সম্বন্ধে সামান্য জেনে একটি অহেতুক অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল জেগেছে যার উত্তর এ অবধি পাইনি। রবার্টের মা ক্যাথলিক ফরাসিনি, বাবা ভিলহেলম জন্মসূত্রে ইহুদি, তিনি বড়ো হয়েছিলেন লুকসেমবুরগ সীমান্তে ট্রিয়ার শহরে; হ্যাঁ সেই ট্রিয়ার, কার্ল মার্কসের জন্মস্থান। এঁদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল কি? জানা যায়নি। তবে ক্যাপিটালিজমের প্লেগ্রাউনড কোপাকাবানা বিচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মার্কসের নাম!
টিকিট পকেটস্থ করে ইন্দ্রনীলের সঙ্গে কোপাকাবানার একটি বারে বসে মনে হল জীবন যেন এই রকম! আকছার আমরা এমনি একত্র বসি। চট করে এতো দূর দেশের এই শহরকে কেমন যেন আপন মনে হলো, যেমনটা আর কোথাও যেন হয়নি।
ব্রাজিলের প্রাণ ফুটবলে সমর্পিত, তাদের ফুটবলের, স্টাইলের ফ্যান আজ দুনিয়া জুড়ে। কিন্তু তারা মানে ব্রিটেন তাদের খেলাটা শিখিয়েছে। ইংরেজ যে ক্রিকেটের সঙ্গে ফুটবল কেবল নিজেদের কলোনিতে রপ্তানি করেছে তা নয়, স্পেন পর্তুগালের মত দেশেও ব্রিটিশ একটি চামড়ার বল ও তার রুল বুক সঙ্গে নিয়ে গেছে। যেমন ব্রাজিল। আজ আমাদের কারো মনে থাকার কথা নয় যে মাত্র উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৯৪) এ দেশে কেউ ফুটবল খেলে না দেখে টম ডোনোহু নামের এক স্কটিশ পরিযায়ী শ্রমিক তাঁর দেশ থেকে রিওতে একটি ফুটবল নিয়ে আসেন অন্য ব্রিটিশ শ্রমিকদের সঙ্গে খেলার জন্য; প্রায় সমকালে চার্লস মিলার ফুটবল, বুট এবং এয়ার পাম্প আমদানি করেন। ১৯০২ সালে মিলার সাউ পাউলোয় শুরু করলেন প্রথম ফুটবল ক্লাব ও লিগ। এ দেশ তাঁকে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পিতার আখ্যা দিয়েছে।।
এ ব্যাপারে আমাদের কলকাতা অনেকটাই এগিয়ে। ইংরেজ সৈন্যের দোয়ায় ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবের জন্ম ১৮৭২ সালে। ফড়েপুকুরের মোহনবাগান ভিলায় মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাবের (পরে অ্যাথলেটিক ক্লাব) স্থাপনা হয়েছে ১৮৮৯ সালে। কলকাতা লিগ শুরু হয়েছে ১৮৯৮ সালে। শত্রুপক্ষের ইতিহাসের বিষয়ে কিছু জানি না তাই মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম।
১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে ফুটবলের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি যুদ্ধের কারণে; পরের আসর বসার কথা ১৯৫০ সালে। বিধ্বস্ত ইউরোপের সব দেশেরই ট্যাঁকে টান পড়েছে - এমন সময়ে ব্রাজিল জানালে তারা আয়োজন করতে রাজি। এতো দূর দেশে খেলতে যেতে অনেক দেশেরই আপত্তি। যুদ্ধের পরে জার্মান ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে (বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের একমাত্র অনুপস্থিতি); জাপান সদস্য চাঁদা অবধি দিতে অক্ষম। এমতাবস্থায় পনেরোটি অনুমোদিত দেশ; সেই মত লিগ শিডিউল তৈরি।
এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে ভারত (তখন গ্লোবাল র্যাঙ্কিং ১৯, আজ ১৪২) কেন অংশ নেয়নি তার অনেক কারণ দেখানো হয়েছে – অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন বলেন অর্থের অভাব (ফিফা খরচা দিতে রাজি ছিল) ১৯৪৮ সালের অলিম্পিকে ভারতীয় দল খালি পায়ে খেলেছিল, সেটা বিশ্বকাপে অনুমোদিত হবে না (এমন কোন শর্ত আরোপ করা হয়নি), খেলার স্ট্যান্ডার্ড খুব খারাপ, বিদেশে গিয়ে গোহারা হারবে (মাত্র দু বছর আগে ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করে নগ্ন পদের ভারতীয় টিম ২-১ গোলে হারে, দুটি পেনাল্টির অপচয় করে)।
শৈলেন মান্না বলেছিলেন, না যাবার সিদ্ধান্ত নাকি এ আই এফ এফের ছিল না, দেশের কাছে ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ নয়, অলিম্পিকের স্থান আগে। সে যাই হোক ভারত আজ অবধি বিশ্বকাপে আর পৌঁছুতে পারেনি।
দেড় লক্ষ মানুষের ছোট্ট দেশ কুরাসাও আমেরিকা যাবে আগামী বছরের বিশ্বকাপ খেলতে।
রিওর ব্যস্ততা থেকে খানিকটা দূরে পশ্চিম দিকে তৈরি হলো বিশাল গোলাকৃতি মারাকানা স্টেডিয়াম। বাল্যকাল থেকে তার কত গল্প শুনেছি এক লাখি স্টেডিয়াম, সে আমাদের কল্পনার বাইরে; মোহনবাগান মাঠে তখন বিশ হাজার ধরে কিনা সন্দেহ, যুবভারতী অনেক দূরে। মারাকানায় বসে অবাক হতে হয়েছিল, যেন একটি প্রকাণ্ড গোল থালা, চারিদিকে ব্যাপ্ত, বিস্তৃত। একেবারে শেষের দিকে গ্যালারির মানুষ বসে আছেন ফুটবলের পিচ থেকে মাইল খানেক দূরে, কতোটা দেখতে পাচ্ছেন কে জানে। এটাই ছিল সে আমলের নির্মাণ শৈলী, যেমন কলকাতার পুরনো রঞ্জি স্টেডিয়াম। আজকে তাদের আকার বুল রিঙের মতো, দর্শকের আসন নিচু থেকে ক্রমশ উঁচুতে উঠে যায়; যে কোন আসনে বসেই মূল অ্যাকশনের আঁচ পাওয়া যায়। ২০০৬ সালের ওয়ার্ল্ড কাপে জার্মানির গেলসেনকিরখেন এবং ডর্টমুনডে সেই ধরনের স্টেডিয়াম প্রথম দেখেছি।

মারাকানা স্টেডিয়ামে খেলা চলছে
তবে মারাকানা ব্রাজিলের পক্ষে একান্ত অপয়া। অশুভ।
১৯৫০ সালের ওয়ার্ল্ড কাপ নক আউট প্রথায় নয়, খেলা হয়েছিল লিগ হিসেবে। চারটি করে দল প্রতি গ্রুপে (ভারত যোগ না দেওয়ায় তিন নম্বর গ্রুপে তিনটি টিম- সুইডেন ইতালি প্যারাগুয়ে; চার নম্বর গ্রুপে খরচার ভয়ে ফ্রান্স বেলজিয়াম যোগ না দেওয়ায় দুটি মাত্র টিম, বলিভিয়া, উরুগুয়ে) চারটে গ্রুপের বিজয়ী টিম খেলবে পরস্পরের বিরুদ্ধে, রাউনড রবিন প্রথায়; যারা সে গ্রুপ জিতবে সে দেশ হবে বিশ্ব বিজয়ী।
শেষ ম্যাচ ব্রাজিল বনাম উরুগুয়ে; ব্রাজিলের চার পয়েন্ট, উরুগুয়ের পকেটে তিন। ম্যাচ ড্র হলেও ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন। রবিবার, ১৬ জুলাই ১৯৫০ সরকারি হিসেবে ১৭৩,০০০ হাজার বেসরকারি হিসেবে দু লক্ষ লোক হাজির ছিলেন মাঠে, অটুট বিশ্বরেকর্ড। ফ্রিয়াসার গোলে ব্রাজিল এগিয়ে, দ্বিতীয়ার্ধে শিয়াফিনোর গোল; ১-১, চ্যাম্পিয়ন হতে এগারো মিনিট বাকি; ঘড়িতে বিকেল ৪.৩৫। গোল কিপারের মুহূর্তের ভ্রান্তিতে গিঝার গোল; ব্রাজিল ১-উরুগুয়ে ২।

১৯৫০ সালের মারাকানা
সাঁও পাওলোর ফুটবল মিউজিয়ামে দেখেছি একটি তিন মিনিটের ভিডিও, সেটি বারবার চলতে থাকে। উরুগুয়ের গোলটি হওয়া মাত্র মারাকানার প্রায় দু লক্ষ মানুষ একসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যান। সেই নীরবতা স্বর্ণময় নয়, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এর নাম মারাকানাজো, মারাকানার চোট। উরুগুয়ের হিরো আলসিদেস গিঝা গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, দুনিয়াতে মাত্র তিনজন পেরেছেন মারাকানার দু লক্ষ লোককে নীরব করে দিতে; পোপ দ্বিতীয় জন পল, ফ্রাংক সিনাত্রা আর আমি।
এই আকস্মিকতার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার জনক, তিরিশ বছর যাবত প্রেসিডেন্ট জুল রিমে (Jules Rimet, যার নামে কাপের নাম) বিজয়ী ব্রাজিলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় যে স্পিচ লিখে এনেছিলেন, সেটি পড়া হল না, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের হাতে কাপ তুলে দেওয়া হয়নি। বিজয়ী দলের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর জন্য যে ব্যান্ড স্টেজে ছিল, খেলা শেষ হওয়া মাত্র তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। কোন ব্যান্ড বাজেনি, উরুগুয়ের পতাকা রিওর আকাশে ওঠেনি।
সারা ব্রাজিল এই হারের জন্য দায়ী করেছিল গোলকিপার মোয়াসির বারবোসাকে -তিনি তৎক্ষণাৎ টিম থেকে চিরতরে নির্বাসিত। শুধু আপন দেশের জার্সি যে আর কখনো পরেননি তাই নয়, এই হারের পরে ব্রাজিল দল তাদের চিরাচরিত সাদা জার্সি বাতিল ক’রে গায়ে দিল আজকে আমাদের খুব চেনা হলদে সবুজ শার্ট। একে সেই পরাজয়ের গ্লানি তায় বারবোসা আবার কৃষ্ণবর্ণ মানুষ -রাস্তায় ঘাটে মানুষ থুথু ফেলেছে, অপমানের শেষ রাখেনি। পঞ্চাশ বছর বাদে ভগ্ন হৃদয় বারবোসা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি একা খেলিনি, মাঠে আরও দশ জন ছিল। দ্বিতীয় গোলের পরে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। ব্রাজিলের আইনে কঠিনতম অপরাধের শাস্তি তিরিশ বছরের কারাদণ্ড, আমার সাজা পঞ্চাশ বছরেও ফুরোয়নি।

নি:সঙ্গ বারবোসা
ভগ্নহৃদয় বারবোসা মারাকানা চোটের ষাট বছর বাদে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
বারবোসার ক্ষমা নেই; তিনি ব্রাজিলের চিরন্তন ভিলেন। কিন্তু সেদিন যিনি শেষ গোলটি করে ব্রাজিলকে অনন্ত শোকের সাগরে ভাসিয়েছিলেন, সেই আলসিদেস গিঝাকে ব্রাজিল ফিরিয়ে এনেছিল মারাকানা স্টেডিয়ামে; ২০০৯ সালের ২৯শে ডিসেম্বর – পেলে, ইউসেবিও এবং ফ্রান্তস বেকেনবাউয়ারের পাশে গিঝার পায়ের ছাপ গাঁথা হল হলিউডের মতন, মারাকানার ওয়াক অফ ফেমে। দৈবের কি বিচিত্র লীলা, গিঝা ৮৮ বছর বয়েসে যখন চলে গেলেন সে দিনটা ছিল ১৬ জুলাই, ২০১৫, প্রায় ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে মারাকানাজোর আরেক অ্যানিভারসারির দিনে।
রিও থেকে পাঁচশ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে ত্রেস কোরাসোয়েস শহরে রেডিওতে ব্রাজিলের হেরে যাওয়ার খবর শুনে ডনদিনিও নাসিমেনতু নামের এক মধ্যবয়সী ফুটবলার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে দশ বছরের বালক এডসন বললে, বাবা কেঁদো না। বড়ো হয়ে আমি ব্রাজিলকে এনে দেবো কোপা দে মুনদো।
আট বছর বাদে, ২৯শে জুন, ১৯৫৮ – স্টকহলমের সোলনা স্টেডিয়ামে সুইডেনকে ৫-২ গোলে হারানোর পরে সেই ছেলেটি দু হাতে তুলে ধরে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ।
তাঁর নাম এডসন আরাঞ্চ দো নাসিমেনতু।
পেলে।
সেই মারাকানায় ওয়ার্ল্ড কাপের কোয়ার্টার ফাইনালের খেলা দেখতে যাচ্ছি। এই ম্যাচে ব্রাজিল থাকলে মাঠের উন্মাদনা কোন লেভেলে পৌঁছুত অনুমান করে নিতে অসুবিধে হয় না, তবে স্থান মাহাত্ম্যের কারণেই আমাদের পিতাপুত্রের রোমাঞ্চ অকল্পনীয়। আমার সঙ্গে ইন্দ্রনীল প্রথম খেলা দেখেছে আট বছর বয়েসে, গোলডারস গ্রিনের অদূরে হেনডন এফ সি বনাম কিংস্টোনিয়ান, তার দশ বছরের জন্মদিনে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ড বনাম চিলে তারপর আর্সেনাল, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড কাপ। কিন্তু এ সবার থেকে আলাদা। কোন খেলা কার খেলা সে প্রশ্ন পরে! এ খেলা মারাকানায়। এক সময়ে চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করলাম- সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল জানি, কিন্তু নক্ষত্রের তলে এখনো দেখে আবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন?
খেলা শুরুর অনেক আগেই মাঠের উত্তেজনা উন্মাদনার ভাগ নেবার জন্য কোপাকাবানা থেকে ট্যাক্সি নিয়ে স্টেডিয়ামের সামনের ওভার ব্রিজের কাছে নেমে মারাকানা দেখে সুনীলদার লাইন ধার করে ছেলেকে বললাম, বাবা, দ্যাখ তাহলে একদিন আমরাও, এইখানে!


মারাকানার ওভার ব্রিজে
স্টেডিয়ামের প্রবেশপথ পুলিশ মোটামুটি সিল করে দিয়েছে, টিকিট না থাকলে পাঁচশ গজের মধ্যে ঢোকা অসম্ভব। গেটের সামনে জার্মান ও ফরাসি পতাকা নিয়ে বহু পদাতিক হাজির। অনেকের গায়ে সে পতাকা জড়ানো, যাতে চিনে নিতে কারো ভুল না হয়। ফরাসিরা উঁচু আওয়াজে একটাই পংক্তি শোনাচ্ছে, আলে লে ব্লয়; জার্মানের উত্তর, ওলে ওলে ওলে (কথাটা স্প্যানিশ কিন্তু নিজের ভাষায় তেমন জুতসই কিছু না পেয়ে জার্মান ‘ওলে’ বলে তার আপন জাতীয়তার পরিচয় দেয়)। দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছি, হঠাৎ ইন্দ্রনীল আমার পাশ থেকে অদৃশ্য। এই ভিড়ে কোনদিকে যাই? কাগজের গ্লাসে ব্রহ্মা বিয়ার নিয়ে সে হাজির হল তেমনই আকস্মিকভাবে, বললে ঐ রুয়া রেবেলোটা হচ্ছে বর্ডার, মানে ম্যাজিনো বা জিগফ্রিড লাইন। এপাশে জার্মান ওপাশে ফ্রেঞ্চ। পুলিশ রাস্তা পার হতে দিচ্ছে না। তাই তাকে রুয়া মেনেজেস ঘুরে ব্রহ্মালয়ে যেতে হয়েছে।

স্টেডিয়ামে ইন্দ্রনীল
আমাদের মতন কিছু নিরপেক্ষ জনতা তাদের নিরাপদ দূরত্ব থেকে এই উত্তেজনার আঁচ উপভোগ করছে। চির শত্রু জার্মান ও ফরাসি ফ্যানেরা তাদের ঝাণ্ডা নিয়ে রাস্তার এপারে পারে দাঁড়িয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে শাপ শাপান্ত করে, ব্রহ্মা বিয়ারের বোতল হাতে হাতে চলে যায় যুযুধান বাহিনীর মুঠোয়। এক সময়ে জার্মান বাহিনী পতাকা উঁচিয়ে রাস্তা পার হতেই প্রমাদ গুনলাম; সমবেত পুলিশ পাহারা রীতিমত সন্ত্রস্ত। এবার কি? সম্মুখ সমর? ব্যাটল অফ দি সম! ভেরদুন! হোলড ইউর কালেকটিভ ব্রেথ।

দুই শত্রু পাশাপাশি

দুই পতাকা একসঙ্গে
সকলের সব আশংকা দূর হল ক্ষণিকের মধ্যে দুই আলাদা দেশের জনতা তাদের আপন বুলি আওড়াতে আওড়াতে থাকে, একেবারে মুখোমুখি! এবার কি হাতাহাতি? না! দুই দল দুই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে গলাগলি করে একবার বলে আলে লে ব্লয়, একবার ওলে ওলে!
বিভেদের আগুন জ্বালাতে একটি স্ফুলিঙ্গ যথেষ্ট। আজ মনে হল নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের, সকল বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে হয়তো এই এক ফুটবল পেরেছে মানুষকে মানুষেরই কাছে আনতে। *
খেলাটা ছিল একেবারে অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স; তেরো মিনিটের মাথায় মাথিয়াস হুমেলের গোলে জার্মান সেমি ফাইনালে ওঠে – তাদের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল যারা সেদিন সন্ধ্যে বেলা উত্তরের শহর ফরতালেজায় কলম্বিয়াকে ২-১ গোলে হারাবে।

পিতা পুত্র মারাকানায়
পরের দিন ৫ জুলাই আরও দুটি কোয়ার্টার ফাইনাল -সালভাদোরে আর্জেন্টিনা বনাম বেলজিয়াম এবং রাজধানী ব্রাজিলিয়াতে নেদারল্যান্ডস বনাম কোষ্টা রিকা। সে দুটি ম্যাচ আমরা দেখব কোপাকাবানা বালুকাবেলায় প্রকাণ্ড টেলিভিশন পরদায়, ব্রহ্মাকে হাতের গ্লাসে ধরে।এই দুই ম্যাচের বিজয়ী দল সেমি ফাইনাল খেলবে সাঁও পাওলোতে, আমাদের টিকিট কাটা আছে।
পুনশ্চ:
*কিছুক্ষণ পর্যায়ে এর উল্লেখ আছে। মারাকানার গল্পে তার খানিক পুনরাবৃত্তি অনিবার্য, তবু পাঠকের কাছে মার্জনা চাই।
(ক্রমশ)