এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ধুমা 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ মে ২০২৬ | ৬৬ বার পঠিত
  • সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে নাকি সে কখনো দাঁড়ায় নি আমি নিশ্চিত নই কারণ আমার ঘড়িতে সময় নেই ঘড়ির কাঁটা দুটো একে অপরকে অতিক্রম করেছে বারবার তৈরি করেছে অসংখ্য ছেদ আমি সেই ছেদগুলোর ভিতর হাঁটছি এক ছেদ থেকে আরেক ছেদে পা ফেলছি আর প্রতিবার দেখছি একই দৃশ্য ভিন্ন ক্রমে ভিন্ন সাজে যেন কেউ একটি ছবির টুকরো গুলিয়ে দিয়েছে আমি সেই টুকরো জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করছি অথচ জোড়া লাগাতে চাইছি না আমি কেবল টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি উদাসীন চোখে

    আমার বাম হাতের তালুতে পানের দাগটি ছিল ছিল মানে একসময় ছিল এখন নেই এখন আমার তালু ফাঁকা আমি দাগটির স্মৃতি খুঁজি কোন ক্রমে দাগটি ফিরে আসে প্রথম ক্রমে দাগটি লাল ছিল দ্বিতীয় ক্রমে দাগটি কালো হয়েছিল তৃতীয় ক্রমে দাগটি নীল হয়েছিল চতুর্থ ক্রমে দাগটি সবুজ হয়েছিল পঞ্চম ক্রমে দাগটি হলুদ হয়েছিল ষষ্ঠ ক্রমে দাগটি কমলা হয়েছিল সপ্তম ক্রমে দাগটি বেগুনি হয়েছিল অষ্টম ক্রমে দাগটি সাদা হয়েছিল নবম ক্রমে দাগটি অদৃশ্য হয়েছিল এই নয়টি ক্রম মোটেই সাজানো নয় তারা এলোমেলো আমি কখনো লাল দেখি কখনো অদৃশ্য কখনো সরাসরি বেগুনি কোনো কালানুক্রম নেই কোনো আদি অন্ত নেই আছে শুধু দাগটি ঝলক দেয় আর মুছে যায় আর ঝলক দেয়

    আমি এখন সেই মুহূর্তে আছি যখন আমি প্রথম তাকে দেখেছিলাম তা নয় আমি এখন সেই মুহূর্তের পাঁচ বছর আগে আছি অথবা পাঁচ বছর পরে অথবা সেই মুহূর্তটিই নেই আমি একটি শিশু হয়ে বসে আছি মায়ের কোলে মা আমাকে গল্প শোনাচ্ছেন সেই গল্পের মধ্যে আমি সেই পুরুষটিকে দেখতে পাচ্ছি যে একদিন আমার দিকে তাকাবে অথচ আমার মায়ের গল্পের সেই পুরুষটি তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তার চুল অপরূপ তার চোখ অপরূপ অথচ গল্পের পুরুষটির চুল কালো নয় সাদা নয় ধূসর আমি সেই ধূসর চুল হাতড়াই শিশুহাতে শিশু আমি তখনো জানি না ভালোবাসা কী জানি না অপেক্ষা কী আমি কেবল গল্প শুনি আর ভাবি এই গল্পের আমি কোথায়

    সে হাঁটছে এক রাস্তায় রাস্তাটি হস্তিনাপুরের অথবা রাস্তাটি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের আমি দুটি দৃশ্য একসাথে দেখি একদিকে ধুলো ওড়া পথ অশ্বথ গাছ অন্যদিকে কংক্রিটের ফুটপাথ ম্যাকডোনাল্ডের বোর্ড আমি তাকে দুটো রাস্তায় একসাথে দেখি তার পায়ের গতি একই তার মুখের ভাব একই সে যেন সময়ের দুই প্রান্তে একসাথে হাঁটছে আর আমি সেই দুই প্রান্তের মাঝখানে উড়ে বেড়াচ্ছি একটি প্রজাপতির মতো যে জানে না কোন ফুলে বসবে

    আমি একবার ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানে লুকিয়ে থাকা এখন ভাবি ভালোবাসা মানে বিক্ষিপ্ত থাকা সব জায়গায় সব সময়ে সব স্মৃতিতে একটু একটু করে ছড়িয়ে থাকা যেন কেউ একটি বালতি জল ফেলে দিয়েছে মরুভূমিতে সেই জল মাটির নিচে চলে গেছে গাছের শিকড়ে পৌঁছে গেছে পাতার অগ্রভাগে আর আমি সেই পাতার ডগায় শিশির হয়ে জ্বলছি ক্ষণিকের জন্য তারপর বাষ্প হয়ে উঠে যাচ্ছি আকাশে

    আমার স্বামীরা পাঁচ জন তারা এখন এই ঘরে নেই অন্য ঘরে আছে তারা সেই অন্য ঘর থেকে আমাকে ডাকছে আমি তাদের কণ্ঠ শুনতে পাই কিন্তু উত্তর দিই না উত্তর দেওয়ার ক্রমটি আমি হারিয়ে ফেলেছি কোন ক্রমে উত্তর দিতে হয় কোন ক্রমে চুপ থাকতে হয় আমি সেই ক্রমগুলোর তালিকা তৈরি করেছি এক টুকরো কাগজে কাগজটি উড়ে গেছে জানালা দিয়ে আমি সেই উড়ে যাওয়া কাগজের পেছনে ছুটতে চাইনি চাইলে ছুটতে পারতাম কিন্তু চাইনি আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি কাগজটি মিশে গেছে মেঘের সাথে

    আমি একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভিতর ঢুকেছি বাড়িটির প্রতিটি ঘরে একটি করে সময় বাস করে এক ঘরে আমার শৈশবের সকাল আরেক ঘরে আমার যৌবনের রাত আরেক ঘরে আমার বার্ধক্যের দুপুর আমি সেই ঘরগুলোতে ঢুকি পালা করে কোন পালা সঠিক কোন পালা ভুল আমি জানি না আমি শুধু ঘুরে বেড়াই ঘরের ভিতর দরজা খুলি বন্ধ করি আয়নায় নিজেকে দেখি আয়নায় বয়স বদলায় কখনো আমি যুবতী কখনো আমি বৃদ্ধা কখনো আমি শিশু আমি সেই তিনটে বয়সকে একসাথে রাখার চেষ্টা করি তারা মিশতে চায় না তারা পরস্পরকে দেখে অবাক হয় শিশু আমাকে জিজ্ঞেস করে তুমি বুড়ি কেন যুবতী আমাকে জিজ্ঞেস করে তুমি কাঁদছ কেন বৃদ্ধা আমাকে জিজ্ঞেস করে তুমি এখনো বাঁচো কেন আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিই না চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি

    সে এসে দাঁড়ায় এই পরিত্যক্ত বাড়ির বারান্দায় তার চোখে বৃষ্টির মতো কিছু নেই তার চুলে বাতাস নেই সে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে স্থির যেন সে কখনো এখান থেকে নড়বে না আমি তাকে এগিয়ে আসতে দেখি আবার পিছিয়ে যেতে দেখি একইসাথে সময়ের দুটো দিক আমি এগোনো আর পিছোনো একসাথে উপভোগ করি তার নড়াচড়ার ভিডিও চালাই মনে মনে স্লো মোশনে ফাস্ট মোশনে রিওয়াইন্ডে সে আমার হাতে একটি চিঠি দিতে চায় চিঠিটি কোন ক্রমে এলো ক্রমিক নম্বরটি ঝাপসা আমি চিঠিটি নেই চিঠিটি হাতে নেই হাতে থাকে শুধু শূন্যতা

    আমি এখন হাঁটছি এক ফুটপাথে ফুটপাথের ইটগুলো এলোমেলো ইটের গায়ে লেখা তারিখ উনিশ শ একাত্তর দুই হাজার তেইশ চৌদ্দ শ পঁয়ষট্টি আমি সেই তারিখগুলো পায়ের তলায় অনুভব করি প্রতিটি তারিখ ভিন্ন সময়ে আমাকে ফেলে দেয় আমি এক পা ফেলি দেখি আমি জন্মেছি অমাবস্যার রাতে আরেক পা ফেলি দেখি আমি মরে যাচ্ছি স্বর্গের সোপানে হেঁটে হেঁটে আরেক পা ফেলি দেখি আমি মাঝপথে ঝুলছি সময়ের করিডোরে

    আমি একটি কফি শপে বসে আছি কফি শপের দেয়ালে ঘড়ি আছে ঘড়িটির কাঁটা নয়টায় দাঁড়িয়ে নয়টায় থেমে আছে ঘড়িটি এখানে নয় বছর ধরে থেমে আছে ওয়েটার এসে বলে স্যার ম্যাডাম কী নেবেন আমি বলি সময় এক কাপ সময় ওয়েটার হাসে আমি ভাবি এই হাসিটা কোন ক্রমে এলো হাসির ক্রমিক নম্বর খুঁজে পাই না কারণ হাসির সময় কখনো ধরা যায় না

    আমার পানের দাগটি ফিরে এসেছে আমার কপালে কেন কপালে জানি না দাগটি এখন আট রকমের রঙের নয়টি নয়টি রঙের নয় রঙ দেখে আমি অবাক হই না আমি দাগটির দিকে তাকাই দাগটি ঘুরতে থাকে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকায় আমি সেই কুণ্ডলী মানসিক ভাবে খুলতে থাকি এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় নয়তম খোলাটি খোলা যায় না কেননা নয়ম খোলাটি আসলে এক ফাঁদ আমি সেই ফাঁদে পা দিই না সরে যাই

    আমি ভাবছি এই অধ্যায়টির ক্রম কী এই অধ্যায়টি কি নয় নাকি নয় থেকে আগে নাকি নয় থেকে পরে আমি কখনো জানবো না আমি কেবল লিখে যাচ্ছি লাইন উল্টো করে সোজা করে ভাঙা করে গুছিয়ে সময়ের বাক্সটি সামনে রেখে তার ভিতর হাত ঢুকিয়ে বের করছি এলোমেলো স্মৃতি যেন লটারির টিকিট যেন তাসের গোছা যেন পোকার ডানা সব মিশে আছে আমি সেই মিশেল থেকে বাছি একটি দৃশ্য দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায় দুটি ভিন্ন সময়ের ছবি একই ফ্রেমে আমি সেই ফ্রেমটি ঝুলিয়ে দিই দেওয়ালে

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন