এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • দিলদার নগর ১৬

    Aditi Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ৪৯ বার পঠিত
  • ভাসিয়ে  তোকে শুকনো পাতার  মতো  ---
    ভাবিস বুঝি ---
    আমরা সবাই থাকবো আগের মতো? 
     
    পুব দিকে সূর্য উঠেছে,  কিন্তু এখনো তেমন করে নিজেকে জাহির করেনি। কমলালেবু রং থেকে সবে মাত্র কাঁসা রং ধরতে শুরু করেছে। সে আলোটিও নিজেকে এখনো বেঁধে রেখেছে গাছপালা আর বাড়ি ঘরের ছাদগুলির মাথায়। সে রং এখনো তরল হয়ে ছড়িয়ে যাওয়ার সময় পায়নি। তাই আকাশের রাতের কালো থেকে সকালের সদ্য সদ্য নীল রংটির অর্জনে তার ভূমিকা থাকলেও সে রং এর সাথে নিজেকে আরও মিশিয়ে দিয়ে তাকে ফ্যাকাশে করে তুলতে সে পারেনি।  আকাশের তীব্ৰ নীল, আর কাঁচা ঘন রোদটির মধ্যে যেন একটা সংঘাত চলছে এখন! সদ্য ঘুমভাঙা কেউ হঠাৎ বাইরে এলে সেই লড়াই তার চোখটি ধাঁধিয়ে দেয়! তবে তাকে তার মুখোমুখি হবার অবস্থানে থাকতে হবে। ছাদে বা অন্তত দোতলা বাড়ির জানালা কি বারান্দায়। কেননা, রাস্তা, মাঠঘাট, গলি এখনো ছায়ার ঘোমটার আড়ালে আড়মোড়া  ভাঙছে মাত্র! 
     
    জাদুমনির চোখ ধাঁধিয়ে  গেছে ঘুম চোখে বাইরে এসে দাঁড়াতেই। কারণ  জাদুমনিদের শোবার ঘর দোতলায়। আড়াই তলা বললেই বুঝি ভালো হয়। গলির সদর দরজা, সাইকেল রাখার চলন ঘর পেরিয়ে যে ছোট্ট খোলা উঠোন--- তার একপাশে ঘুপচি রান্নাঘরটি লুকিয়ে। আর তার সামনে খোলা জরাজীর্ণ ঢাকা বারান্দাটির উপর যে ছাদ, সেই ছাদ থেকে আবার কয়েক সিঁড়ি উঠে তবেই শোবার ঘর। পর পর তিনটি, একটার মধ্যে দিয়ে আরেকটার দরজা ----বড়ো বড়ো জানলা, লোহার শিক আর কাঠের খড়খড়ি। শীতের হুহু বাতাস, গরমের দুপুরের হাহা লু বাতাস, সন্ধ্যের শিরশির ফিস ফিস বাতাস ---কোনো কিছু থেকেই জাদুমনিরা বঞ্চিত হয়না! পুব দিকে সূয্যি ওঠাও তারা দেখতে পায় বড়  রাস্তার পেছনে নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে।
     
     দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাথায় খোলা আকাশ। নিচের খোলা ছাদ থেকে খোলা সিঁড়িটি যেন সগ্গের সিঁড়ির মত শূন্যে ভেসে আছে! সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা ছোট্ট বিশ্রাম, প্রথম  ঘরের দরজাটি সেখানেই। সে ঘরের একটি জানালা আবার দক্ষিণ দিকে  উঠে আসা সিঁড়িটির  দিকেই তাকিয়ে আছে!  কিন্তু  সে এতো উঁচুতে যে , সিঁড়ির মানুষ তাকে ছুঁতে পারেনা। তাই সে জানলার নাম: 'কেশবতী রাজকন্যার জানলা'। জাদুমনিরা ছাদে ওঠেনা , তারা ছাদে নামে।
     
     কলঘর রান্নাঘর ছাড়া নিচে রওয়া শোয়ার কোনো জায়গা নেই। ঘুপচি রান্নাঘরেই ঠাকুমার গোপাল আর তোলা উনুনের রান্না। বারান্দায় দেওয়ালের ধার ঘেঁষে দুটি মাটির উনুন ,আর একটি ছোট্ট উনুন একটা পুরোনো লোহার কড়াই এর উপর। লুচি ভাজার বা  রাতের  টুকটাক এর। জাদু উনুন সাজাতে , ধরাতে পারে। বানিয়ে দিতেও পারে বললে।এসব কাজ তার বেশি ভালো লাগে। রাস্তার কল থেকে জল আনতে সে ছোট্ট একটি বালতি কিনেছে। সেখানে গেলেই সবাই তাকে আদর করে ভরে দেয় সে বালতি।সেটি অবশ্য তার না পসন্দ! বাকিদের মত সেও ঠেলাঠেলি রাগারাগি করতে চায় একটু। সে রোমাঞ্চ থেকে বঞ্চিত হয়ে মন খারাপ করে।
     
    তবে তাদের বাড়িতেও রোমাঞ্চ কম নেই!  কলঘর,রান্নাঘর আর সিঁড়ির মধ্যখানে লুকিয়ে থাকা তাদের কুঁয়োটাই তো কি গা ছমছমে! কেউ বুঝতেই পারেনা সেটা কোথায়!সিঁড়ির ডান দিকে ঝুঁকলে তাকে দেখা যায়, কিন্তু পাশে গিয়ে জল তোলার কোনো উপায় ই নেই। সেখানে কেবল  ঝাঁপিয়ে পড়া যায়! ওঠা যায়না।তারপর, সে সিঁড়ি দিয়ে রান্নাঘর ও বারান্দার নীচু, টালি নড়বড়ে ছাদে উঠেই সামনে আবার শোবার ঘরে ওঠার ঝুলন্ত সিঁড়ির খাঁজে রান্নাঘরের চারকোনা চিমনি। সে জায়গা সদাই ছায়াময়। রাতে নাকি নীল রং এর  ন্যাড়া মানুষের মাথা ঝোলে সেখানে, তার একটি চোখ সাদা!মুকুটমনি তার ছবিও দেখিয়েছিল জাদুকে,একটা বই এর উপরে ।সেটা আবার হাসছিলো! তাই রাতবিরেতে খুব সমস্যা! কোনোক্রমে ভুতুড়ে নিচের তলায় কাজটি সেরে ও সোজা দৌড় মারে সিঁড়ি বেয়ে!নিচটা যেন  তাড়া  করে আসে পেছনে। আবার ছাদে উঠেও সামনেই সেই মুন্ডুঝোলা খাঁজ! চোখ বন্ধ করে তাই বাঁয়ে মোচড় দিয়ে সগ্গের  সিঁড়িতে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে কতবার! আবার দিনে দুপুরে দরজার বেল শুনে নেমে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে যখন ফিরে উঠছে,হঠাৎ ই ছাদের  ওপাশ থেকে অট্টহাস্য ! আঁতকে উঠে দেখে মুকুটমনি দাঁড়িয়ে আছে ছাদে! বেলটি বাজিয়েই পাইপ বেয়ে সে উঠে এসেছে ছাদে! জাদুমনি কেঁদেকেটে মারতে যায়, ফুলের টব থেকে খামচে মাটি তুলে ছুঁড়ে মারে তাকে, ঠাকুমাকে নালিশ করতে ছোটে উপরে।
     
     শোবার ঘরের মাথার উপর পেল্লাই উঁচু ছাদের সিঁড়ি মামনিদের বাড়ির ভিতর দিয়ে। আসলে এই পুরো বাড়িটাই ওদের, বড়ো রাস্তাছোঁয়া পুব দিকটিতে  যাদুমনিরা থাকে। তারপর পেছনে পর পর ওদের নানান শরিকের নানান অংশ। জাদুমনিরা সিঁড়ির উপরের ছোট্ট দাঁড়ানোর জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে  কার্নিশে এ ভর করে পশ্চিমে ঝুঁকে মামনিকে, তার ভাই বঙ্কুকে ডাকে। ওরা উঠোনে দাঁড়িয়ে মুখ উপরে তুলে সাড়া দেয়। ওদের দিকের একটা সিঁড়ি আবার উঠে এসেছে ওদের ই লম্বা খোলা ছাদে। সে ছাদটি আবার এদিকে এসে পড়েছে। ওই ছাদ পেরিয়ে দিয়ে ওরা এদিকে গল্প করতে, ঠাকুর ভাসান আর মিছিল দেখতে আসে। আসলে জাদুমনিদের অংশের রান্নাঘরের নীচু ছাদটি গিয়ে পড়েছে রাস্তার উপর কাটাকাপড়ের দোকানের ছাদে। সে ছাদে দাঁড়ালে সারাদিন--- সারা সন্ধ্যে কেটে যায়। জাদুমনিরাই এ ছাদ বেশী কাজে লাগায়। খোলা আকাশের নীচে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই ওরা সামনের রাস্তায় মা গুপ্তমনি স্টোর্স এর  শাড়িগুলির মধ্যে থেকে মনে মনে পছন্দ করে ফেলতে পারে এটা ওটা,  কাগজ ঘর এর গুল্লুকে হাঁক মেরে খোঁজ নেয় দিস্তা খাতার দাম কিংবা  পাশেই ল্যাম্প হাউসে  বসে থাকা ওরই দাদাকে আবদার করে জিরো  পাওয়ার বাল্ব পাঠিয়ে দেওয়ার। সে দাদা সবসময় ধবধবে সাদা লম্বা শার্ট আর পাজামা পরে থাকে।  দাদা মুকুটমনি তাই তাকে কখনো 'টিউব লাইট', কখনো 'টিনোপল' বলে উল্লেখ করে। জাদুমনি সেই সাদা পোশাকের কোনো ব্যতিক্রম কোনোদিন দেখেনি বলে 'কনস্টান্টিনোপল'  বলে ডাকতেই ভালোবাসে। সামনে অবশ্য বোবা হয়ে থাকে।
     
    জাদু এখন খানিক সময় চুপ করে বসে থাকবে সিঁড়িতে। তারপর মা এসে তাড়া  লাগাবে। ও ধীরে সুস্থে উঠবে তখন না হয়। এখন ও হাঁ করে আকাশ দেখবে। জাদুর এখন ইস্কুল নেই।সামনে পরীক্ষা। তিনটি পরীক্ষা হয় বছরে ওদের।তার উপর গড়ে নম্বর দেওয়া হয়।একটি হয়ে গেছে কাঁচা আম আর  কাজুফলের গন্ধ মাখা এপ্রিলে। তখন মর্নিং ইস্কুল চলে। একটি  এই সামনে,  বর্ষা শেষে শরতের দোরগোড়ায়, আরেকটি হবে সেই নভেম্বর এর মাঝ থেকে।বেলা মরে আসা শুকনো মন খারাপের পরীক্ষা-বাতাস বইতে থাকে ভাই ফোঁটার বিকেল থেকেই! তবে সবচেয়ে ভয়ের এই মাঝের পরীক্ষা। পুরো সিলেবাসই প্রায় পরীক্ষায় থাকে, এদিকে এই সময়ের নানান ঝামেলা! বৃষ্টি আর জ্বর জারিতে ইস্কুল কামাই । মাথাতেও পুরোটা ঢুকে ওঠেনা তখনো। জাদু তাই বেশ চাপে। গত পরীক্ষায় অঙ্ক ডুবিয়েছে। এবার পাসমার্কের একটু বেশি না তুলে রাখলে পরে গড়ে চাপ আছে। 
     
    জাদুর চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ হলো এ কদিন, প্রায় এক সপ্তাহ ,দিলদার নগর রোদের মুখ দেখেনি। বৃষ্টিতে সে জেরবার।কপিশা তার কুল ছাপিয়ে পাশের উঁচু ঢাল বেয়ে উঠে এসেছে প্রায় সেন্ট জন্স এর হাসপাতাল পর্যন্ত। জলের ঢেউ আর ঘূর্ণি তে ডুবে গেছে বাঁশের সাঁকোটি  --- যা দিয়ে এপার ওপার করে মানুষ পায়ে হেঁটে। এখন জলের দিকে তাকাতে ভয়ই হয়। আজ রোদ উঠতেই একটা উৎসবের আমেজ।জাদু জানে আজ দুগ্গা ছাতু উঠবে। ইস্কুলের রাস্তার দুপাশে সার দিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি ছাতু নিয়ে বসে যাবে মানুষ । ইস্কুল থেকে দিদিমনিরাও ছুটবে ছাতু কিনতে।দেরি করলে বন্ধ বা আধখোলাগুলি শেষ হয়ে যাবে।পুরো ছাতার মত খুলে গেলে ছাতু আর বেশিক্ষণ ভালো থাকেনা। আজ দিলদারে ছাতু উৎসব।টানা বৃষ্টির পর কখন রোদ উঠবে অপেক্ষায় থাকে মানুষ,জঙ্গলের লাল মাটিও। তারপর সূর্যের যেদিন দেখা মেলে, চিলিবিলি রোদ খেলা করতে থাকে আকাশে, গাছ গাছালিতে, মাটির বুকে, মাটি তখন আনন্দে,গর্বে ফুলে ফেঁপে ওঠে,আর তার কোলে জন্ম দেয় তুষারকণাদের!   খুব তাড়াতাড়িই তারা ঠ্যাং এর উপর ভর করে মাথায় সূর্য টুপি পরে সূর্যকে ছুঁতে চায়!  দিলদারের মানুষ আজ সকাল থেকেই জানে আজ সেই দিন। কাল দুপুর থেকেই মেঘে ফাটল ধরতে শুরু করেছিল। আজ মাও ছাতু আনবে নিশ্চই! পেঁয়াজ আলু দিয়ে ভাজা করে মা।আসলে এতো কম হয়ে যায় রাঁধার পর, যে একটু অন্য জিনিস দিয়ে বাড়াতেই হয়। ঠাকুমা পেঁয়াজ দেয়না।আলু আর অন্য সবজি দিয়ে রাঁধে।  সেটিও বেশ লাগে। ঠাকুমার সব রান্নাই তার ভালো লাগে। মার্চ এপ্রিলে খেজুর গুড় থাকেনা, চিনির পায়েসে তিনি গোটা কয় মহুয়া ফল দেন। ভুর ভুর করে সুগন্ধ। 
     
    জাদু কিছুতেই বেশিক্ষণ  ঘরে থাকতে পারেনা। কখন মা ইস্কুলে বেরোবে সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে! মায়ের ইস্কুলেই সে পড়ে। সে আরেক বাড়তি চাপ। একই অপরাধে দুই বার শাস্তি পায়।ইস্কুলে এবং বাড়িতে ফিরে। ও জানে মা বেরোনোর এক মিনিটের মধ্যেই  একটা ভরাট আত্মবিশ্বাসী গলা গলির দরজায় এসে ডাকবে---"জাদুউউউউ"! সে গলা  দোতলার ঘর থেকেও শোনা যাবে। তাও সে ছাদে নেমে দাঁড়ায়। ফ্রকের তলায় সে ইস্কুলের খেলার ক্লাসের মোটা শর্টস পরে নিয়েছে কালো রঙের।কোমরে আর দুই পায়ের শুরুতে ইলাস্টিক দেওয়া। এতে ফ্রকের ঘেরটা বেশ ভাল করে গুঁজে নিয়ে খেলা যায়,সাইকেলে ওঠা যায়।  নিচে করেদের দোকান থেকেই কেনা। সবাই ওখানেই খোঁজ করে। তাদের ছেলে বাপি দোকানে বসে, মোটাসোটা,বড় সড়ো চেহারা তার, কিন্তু আধো আধো কথা বলে। এই শর্টস গুলিকে ও বলে "ডাঙ এ ইলাত্তিক দিওয়া প্যান্ত"! এটা শুনবার আর শোনাবার জন্যই ওরা দল বেঁধে বার বার দোকানে গিয়ে ঐ শর্টস এর খোঁজ করে! মুকুটমনি একদিন দেখে ফেলেছিলো ওদের কারবার।সেদিন থেকে ওদের আড্ডার লোকজনও ঐ বাপি করকে  "ডাঙ এ ইলাত্তিক" বলে ডাকতে শুরু করে!
     
    মা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই জাদুর শ্যামের বাঁশি বাজে। দুদ্দাড় করে নিচে নেমে আসে।ঠাকুমা জিগ্যেস করেন, " কই যাও?" সে আঙ্গুল তুলে দেখায় --বুল্টি..সাইকেল। ঠাকুমা হেসে ফেলেন। বলেন," বেশি দেরি কইরোনা"। 
     
    বুল্টি টানটান করে পুরো চুলটাকে মাথার উপর তুলে খোঁপা করে নিয়েছে।ওর পরনে ঢোলা প্যান্ট আর হাফ শার্ট। স্কার্টও পরে সে হাফ শার্টের সাথে।এই শার্ট আর স্কার্ট এর একটি সেট আসলে ওর পুরোনো রং চটা ইস্কুলের পোশাক। একটু ছোট হয় এখন,তাও চলে যায়।ও আর ইস্কুল যায়না অনেকদিন। বড়ো একটা সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, ওটার উপরেই  তাকে দেখা যায় বেশিরভাগ সময়! মুকুটমনি ওকে নাম দিয়েছে 'হান্টারওয়ালি'! 
     
    জাদু আজ হাফ প্যাটেল করবেনা, বুল্টি ওকে সিটেই চাপায়,তারপর চেঁচাতে থাকে ---"কোমর সোজাআ, সামনে তাকা, হাত বাঁকছে কেনোওও?  জাদুর সাইকেলের সিটের নিচের রিং দুটো শক্ত করে ধরে রেখে সে ছুটতে থাকে সাথে সাথে। এক সময় জাদু বাঁ দিকে হেলে পড়ে আর বুল্টি জাপ্টে ধরে রক্ষা করে তাকে আছাড় খাওয়া থেকে! তাও সব সময় আটকাতে পারেনা।এই এবড়ো খেবড়ো গলিতে এমনিই সাইকেল চালানো মুশকিল।বৃহস্পতিবার বড় রাস্তায় দোকানপাট সব বন্ধ থাকে। ওখানে একটু সুবিধা হয়।
     
    বুল্টিদের বাড়িতে যেতে জাদুর খুব ভালো লাগে। মা, দাদা, যে যার মতো বেরিয়ে গেলে বাড়িটা ফাঁকা লাগে।ঠাকুমাও সে সময় কাজে ব্যস্ত । জাদুর ইস্কুল থাকেনা ---যেমন পরীক্ষার আগে বা পরে---কিন্তু মাকে যেতে হয়। এই সময় বেলা এগারোটা বারোটার সময়টা ও ওদের বাড়ি যায়। ওদের পাঁচ বোনের বড় দুটির বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে বুল্টির দুই দিদি, বুল্টি,ওর মা বাবা আর ভাইটি। দুই দিদি গান গায় ভালো, টুকটাক হাতে পিকো,ফলস বসানোর কাজ করে, একটি শাড়ির ব্যবসাও ধরেছে। বুল্টি এসব কিছুই করেনা। সে বাজার করে,রেশন তোলে,আরো কত কি কাজ করে! কিছু ফাইফরমাসও খেটে দেয় পাড়ার কাকীজেঠীদের তার দাপটের সাইকেলটি দাপিয়ে। সে বড় রাস্তার টাইম কল থেকে হই হই করে জলও ধরে সকালে বিকেলে ---বড় বড় লোহার আর প্লাস্টিকের বালতিতে।অন্যায্য ভাবে লাইন ভাঙা পুরুষকেও সে রেয়াত করেনা। ওকে ভয় ও পায় সবাই। সামনে কিছু বলতে পারেনা, আড়ালে কটূক্তি করে। ওর দুই দিদিও এ কাজে তার পাশে দাঁড়ায়। মালভূমির ঢালের  দেশে জল বড় স্পর্শকাতর বিষয়।
     
     জাদুদের বাড়িতেও ওরা জল নিতে আসে ঘোর গ্রীষ্মে। ওদের কুঁয়োতে জল নেমে যায় আগেই। বুল্টির মাও আসেন তখন, ঠাকুমার সাথে গপ্পো হয়। জাদুদের লুকিয়ে থাকা জাদু কুঁয়ো তেমন তাড়াতাড়ি শুকোয়না, রোদ কম পড়ে বলে হয়তো। তাই টিউবওয়েলে জল উঠে আসে বেশ। তবে এক সময় সে কলও ঘড় ঘড় করতে থাকে। তখন সকালে মিউনিসিপ্যালিটি আর রাতে  একটু দূরের মঠের ডিপ টিউবওয়েলই ভরসা। সূর্য ঢলে এলে সেখানে ভিড় জমে বৌ ঝি কাচ্চা বাচ্চার।আঁধার ঘনায়, বাতাস ঠান্ডা হয়। মঠের কীর্তন শুরু হয়।হাসনুহানা আর কামিনী ফুলের গন্ধ ছড়াতে থাকে। নিচু গলায় হাসিঠাট্টা গল্প চলতে থাকে এ জলের ঘাটে। তবে, সবচেয়ে নিশ্চিন্তের আর আরামের যা , তা হলো মাটির গভীর থেকে উঠে আসা জলের শব্দ, তার ধাতব গন্ধ আর শীতল স্পর্শটি! 
     
    দুপুরের ঠিক আগে, বুল্টিদের বাড়ি রওনা হয় সে। সবার ছোট ভাইটি তখন ইস্কুলে হয়তো। দিদিদের বন্ধুরা আসে। তাদের কেউ কেউ ছেলে ,তাই পাড়ায় দু একজন উঁকি ঝুঁকি  দেয়। বুল্টির মা সবসময় ফিটফাট,হাসিখুশি। এই সময় তিনিও আড্ডায় যোগ দেন।খুব হই হল্লা হয়। বিকেলে তিনি গা ধুয়ে, ফরসা কাপড় আর টুকটুকে লাল সিঁদুরের টিপ পরে রোয়াকে বসে থাকেন আর ও পথে যে যায় তাকেই ডেকে কথা বলেন, নানান প্রশ্ন করেন। বুল্টির বাবা নাকি মুহুরী ছিলেন কোর্টের। পাকানো চেহারা তাঁর,কথা বলেননা তেমন। এক পাশে সরে থাকেন আর টুকটাক ঘরের এটাসেটা সারানো আর সরানোর কাজ করে যান। ওদের বাড়িতে জাদুর খুব সমাদর। জাদু গুছিয়ে গল্প করে,ওরা মন দিয়ে শোনে।কেউ ছোট বলে উড়িয়ে দেয়না।
     
     বুল্টিদের বাড়িটি জাদুদের মতোই খুব পুরোনো, তবে একতলা আর  বেশি রং চটা। সেই জন্যেই হয়তো বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড়, আলনার কাপড় সব কিছুই রং চটা লাগে। একটু কম কমও যেন সব কিছু। তবে জাদু রং এর ক্যালেন্ডারে বা সেলুনের ম্যাগজিনে যে বড়লোকদের বাড়ির ছবি দেখে, সেখানে জাদুদের পুরোনো বাড়িও তো হেরে ভূত! বাড়ি হলেই তো ঘরের আরাম হয়না! জেঠিমা ওর মুখ মুছিয়ে দিয়েছিলেন যে ফ্যাকাসে গামছাটা দিয়ে -- তাতে ও রোদ আর সাবানের গন্ধ পেয়েছিল।
     
    বাড়িটি নিষ্প্রভ হলেও বুল্টিদের বোনেদের চেহারাগুলি ভারী লাবণ্যমাখা । বুল্টি মাঝে মাঝে শাড়ি পরে মায়ের সাথে পুজো দিতে বা হেথাহোথা যায়। তখন ও কালো ব্লাউজ আর কমলা রং এর এক রঙা শাড়ি পরে---ফুরফুরে সিন্থেটিক।গলায় কালো কারে কাঁচের ছোট্ট লকেট ঝোলে ,কালো,লাল, বা হলুদ। হার্ট শেপ এর। জাদু জানে ওগুলি এক টাকা করে দাম। ছটা পাঁচ টাকা। বুল্টির কালো সাপের মতো দুটো লম্বা বিনুনি বুকের উপর দিয়ে ফেলা থাকে। ও কেমন নরম করে কথা বলে তখন! সানগ্লাসও লাগায় কখনো। জাদু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। জাদু মুকুটমনিকে তাই একদিন রেগেমেগে বলেছিলো --"বুল্টি হান্টারওয়ালি নয়, নীতু সিং!"  মুকুটমণি আর কিছু বলেনি দেখে ও আবার অবাকও হয়েছিল।খুব বিজয়ী লেগেছিলো নিজেকে।বুল্টিকে খুব ছোট বেলায় ও 'বুই' বলে ডাকতো। তারপর আর 'দিদি' বলা হয়ে ওঠেনি। লজ্জাও করে এখন। আর হবেনা!
     
    বুল্টিদের বাড়ি যাওয়া বা বুল্টির সাথে জাদুর এই দোস্তি নিয়ে বুল্টির মা খুব একটা যে খুশি নন তা তাঁর  হাবে ভাবেই প্রকাশ পায়। আসলে তিনি শান্ত মানুষ, শান্তি ভালোবাসেন। নানা লোকে নানা কথা বলে। জাদু যে মাঝে মাঝে চিনি, বিস্কুট ,চায়ের গুঁড়ো দুধ সরায়, তা তাঁর  নজরে এসেছে। আলু পেঁয়াজের ঝুড়িতেও তিনি হিসেবের গরমিল দেখেছেন। সেটা বাড়ছে আসতে আসতে!   জাদুর এসব কান্ড নতুন নয় তাঁর  কাছে। তাঁর  রোদে মেলা শাড়ি জামিলা খেপিকে দিয়ে এসেছিল। বকাবকি করতে বলেছিলো :ও শুধু ছোট্ট শায়া আর ব্লাউজ পরে মা নাচ্ছিলো!  সে শাড়ি তিনি জামিলার গায়ে একদিন ই দেখেছিলেন,পরে আবার যে কে সেই!  অসহায় কে সাহায্য করা তাঁরও মজ্জায়, কিন্তু দুনিয়াদারির বাজারে ঘা খেতে খেতে তিনিও আজ ঘরপোড়া গরু! খালি ভয় পান।অথচ বছর ষোলোর বুল্টির জীবনরসে উজল, বেপরোয়া ভাবটিকে মনে মনে ভালো না বেসেও পারেননা। নিজের মধ্যেই রেখে দেন সব কিছু। জাদুর বাবাকে বলে কোনো লাভ নেই। তিনি বাড়ি আসেন ছুটিতে,হুল্লোড় করে চলে যান।জাদুর নামে কিছু বললে হাহা করে হাসেন। ক্লাস সিক্সের জাদু তাঁর  কাছে শিশুমাত্র। শাশুড়ির কাছে কথাটা পাড়া যায় কিনা ভাবেন।
     
    বাবার আগমন জাদুর কাছে কেবল এই কারণে আকর্ষণীয় নয় যে বাড়িতে তখন বড় বড় মাছ আসে,বা এনাদিয়ার তন্দুরি রুটি মাংস খাওয়া হয়। আসলে বাবার সাথে লেজুড় হয়ে ও সারা দিলদার চষে বেড়ানোর সুযোগ পায়। আগে যখন ও ছোট ছিলো তখন দাদার সাইকেলের রডে একটা ছোট্ট সিট লাগানো হয়েছিল ওর বসার জন্য। এখন ওরা হেঁটেই ঘুরে বেড়ায়।ব্যাংক,পোস্ট অফিসের নানা কাজ সারে বাবা, চেনা মানুষ সব ,মজলিস হয় ছোটখাটো,চা আসে,জাদুর  জন্য বিস্কুট বা লজেন্স। আসলে ও গপ্প গেলে। শুধু বাবার মাছের বাজারের  চায়ের মজলিশে যেতে চায়না।তবে তারপরই গৌরের চায়ের দোকানের মজলিশে ও গিয়ে বসে বরাদ্দ সাদা মাখন টোস্টটি নিয়ে। বিকেল বেলায় মা ফেরার আগে ওখানেই সে আবার ছোটে ছোট্ট কেটলি নিয়ে চা আনতে। গৌরকে ওর মহিষাসুরের  মত দেখতে লাগলেও ভারী ভালোবাসে তাকে। মিহি গলায় নরম সুরে কথা বলে। মুকুটমণি বলে 'গৌর পিসি'। সে পিসি কাকা যাই হোক, ভারী যত্ন নিয়ে সে এক অ্যালুমিনিয়ম মগ থেকে আরেকটিতে ঢেলে ঢেলে চায়ে স্বাদ আনে। জাদুর ধৈর্য় থাকেনা, সে পা  ঠোকে  আর বলে "ও কাকু হলো তোমার?" গৌর তার আদুরে নাকি স্বরে আশ্বস্ত করে "দাঁড়াও কুঁকু, আর এট্টু কানি"। মাঝে মাঝে জাদু রাস্তা লোকজন দেখতে দেখতেও পা ঠোকে আর একই প্রশ্ন করে, যদিও ওর তেমন অধৈর্য তখন লাগছেনা। গৌরের ঐ কথা সারাদিন মা ছাড়া তাকে আদরের মাতৃওম দেয় বুঝি!
     
    পরীক্ষা এসে যাওয়ায় সাইকেল আর পুরো শেখা হয়ে ওঠেনি জাদুর। সেটা পুষিয়ে দিলো একেবারে ডিসেম্বরে সব পরীক্ষা খতম করে। বুল্টির সাইকেলের উপর অনেক ঝড় বইলো। রবিবার মুকুটমনির সাইকেলের উপরও। বাঁচোয়া,অন্য দিন সে কলেজে আর নানা ধান্দায় থাকে। তেইশে জানুয়ারি জাদু বুল্টির সাইকেল নিয়ে দশ মাইল দৌড় দেখতে গেল জেলখানার মাঠে। বাড়িতে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলো নতুন সাইকেলের জন্য। কিন্তু তার এখনও ঢের দেরি! 
     
    দিন গড়ায়। জাদু এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে ওঠে। বুল্টির জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়না। বুল্টির এক দিদির প্রেমিক পাবলিক সার্ভিসে চাকরি পায়, তাদের বিয়ে হয়ে যায় ছোটমোটো মিষ্টিমুখ আর রেজিস্ট্রির মধ্য দিয়ে। জাদু টেনে উঠে যায় আর মুকুটমনি কলেজ পাশ করে চাকরির পরীক্ষা দিতে থাকে। বুল্টির সাথে জাদুর এখন তেমন ঘোরাঘুরি হয়না। পড়তে যেতে আসতে হয়তো একটু দাঁড়ায় তাদের বাড়ির সামনে, বুল্টির মা একই রকম রোয়াকে বসে হাসিমুখে গল্প করতে চান। টেস্ট পরীক্ষার পর জাদু স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি করে নিজেকে। শীতের ছোটো দিন আর দীর্ঘ রাত বুঝি পরিবর্তনের প্রতীক্ষার। মাধ্যমিক আসে উষ্ণ হাওয়ায় ভর করে,তারপর একদিন হঠাৎই যেন একরাশ শূন্যতা ছুঁড়ে দিয়ে শেষ হয়ে যায়। জাদুদের কি করি কি করি অবস্থা হয়। কোনো কোর্সএ ভর্তি হতে পরামর্শ দেয় অনেকে। বুল্টির বাড়ি যায় ও তবে তাকেও ছুটতে হয়,ব্যস্ত থাকতে হয় টিঁকে  থাকার নানান আয়োজনে।  
     
    জাদুকে এবার একটি সাইকেল কিনে দেওয়া হয়। বাইশ ইঞ্চি সবুজ রঙের লেডিজ । জবরদস্ত সে সাইকেল। ওদের ইস্কুলে একাদশ শ্রেণী নেই। যেতে হবে সেই শহরের উত্তরে উঁচু ঢাল বেয়ে ব্যাপটিস্ট মিশনে--- যদি সুযোগ পায়। দিলদার নগর কলেজ বা গোপগৃহের নিচে মেয়েদের কলেজে এখনই তাকে পাঠাতে চায়না বাড়ির লোক। ইস্কুলই ভালো সামনের দুটি বছর। কাজেই বড়সড়  মজবুত সাইকেল না হলে প্যাডেল মেরে প্রাণ যাবে মেয়ের! ফিনফিনে মেয়ে তাই নিজেকেই মানিয়ে নিতে থাকে সাইকেলের সাথে। প্যাডেলে চাপ দিয়ে একটু ইঙ্গিত করলেই পক্ষীরাজ উড়তে থাকে, নিজেকে তার পিঠে কেবল আটকে রাখাই তার কাজ, যাতে নিজেই না উড়ে যায়! 
     
    নতুন সাইকেল কিনেই বুল্টিকে দেখাতে ছুটেছিলো জাদু। বুল্টির চোখমুখ উজল হয়ে উঠেছিল। সেই লেডিজ সাইকেলে উঠে সে এক চক্কর মেরে এলো। গ্রীষ্ম সন্ধ্যার বাতাস ছেড়েছিল, লোকের বাড়ি শাঁখ বাজছিলো,অনেক দূর থেকে সেই মাসুম সিনেমাটার গান ভেসে আসছিল---"দো নয়না কাহানী ....থোড়া সা বাদল, থোড়া সা পানি"।   সেদিন ওখানে অনেক্ষণ  গল্প করেছিল ওরা। বুল্টি বলছিলো একটা ছোটমোটো চায়ের দোকান খুলবে ,পরে লস্যি আর থামস আপ আনবে । টাকা এখন তো বেশি নেই। দোকান ঘরের সেলামি বা ভাড়া জোটানো মুশকিল। তাই ভাবছে ওদের বাইরের ঘরের বাঁ দিকে যে বাড়তি দরজাটা বন্ধই রাখতে হয়, ওদিকে ই পার্টিশন দিয়ে এখন চালাবে। সেজদি -জাম্বু কিছু টাকা দেবে বলেছে।  ছোড়দিও হাতে হাতে সাহায্য  করবে। জাদু বেজায় পুলকিত হয়ে ওঠে। চোখের সামনে বুল্টির দোকান দেখতে পায়!  সাজাতে থাকে সে দোকান মনে মনে। টিনের বইয়ের ৱ্যাক টা দিয়ে দেবে ঠিক করে ফেলে। ওর একটা কাঠের বই রাখার সেলফ এর শখ। বাড়ির কিছু ভালো কৌটোর কথা মনে করতে থাকে। হরলিক্সএর শিশিগুলো, ডালডার কৌটোগুলো, গুঁড়ো দুধের টিন--- আজই আলাদা করবে, যদি না মা সবগুলো ভরিয়ে রাখে! দাদাকে বলে একটু  টুনি আলোর ব্যবস্থাও করবে। এর মধ্যে ওদিক থেকে মুকুটমনিকে আসতে দেখে ওরা চুপ করে যায়। বুল্টি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মুকুটমনির চলে যাওয়ার পথেই চোখ রেখে বলতে থাকে, " কিন্তু, বাবা আর ভাই এর খুব আপত্তি! ভাইটির আজকাল খুব বুলি ফুটেছে! অশান্তি করে। "
     
    জাদুদের ইস্কুলের সাইকেল দল এখন স্পীডে নদীর মাটির ব্রিজের উপর দিয়ে ছুটে গিয়ে এক্কেবারে আড়াআড়ি পাকা বাস ব্রিজের নিচে গিয়ে থামে, তারপর হাতে করে সাইকেল ঠেলে সটান উঠে পড়ে সেখানে , ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে চলে যায়। জেলখানার মাঠেও আড্ডা মারে সন্ধ্যা ঘন হওয়া অবধি। নতুন কিছু বন্ধুও এসে জোটে। এমনই এক সন্ধ্যা গড়ানো আড্ডা  খতম করে জাদু বাড়ি ফেরে একদিন। স্নান করে।ছাদে নেমে বাবার পাশে বসে মাদুরে। পিসি এসেছিলো।মা ঠাকুমা ও ছিল। গল্প গুজব চলছিলো। হটাৎই তীব্র মেয়েলি চিৎকার আর হই চই!  কিছু মানুষ দৌড়ে যায় গলি দিয়ে।বুল্টিদের বাড়ির দিকে।ওরাও ছুটে যায়। বুল্টি নাকি কুঁয়োতে ঝাঁপ দিয়েছে।গায়ে আগুন লাগিয়েছিল তার আগে, যন্ত্রনা সহ্য করতে পারেনি!
     
    ঠাকুমা টেনে ঘরে নিয়ে আসে জাদুকে। তারপর ছুটোছুটি--- হাসপাতাল। মুকুটমনিদের ফিরতে ফিরতে ভোর হয়। খুব আলোচনা ও গুঞ্জন চলে পাড়ায়। দু একটি মধ্যবয়সী পুরুষ বুল্টির শরীরের অবস্থা জানার চেয়ে থেকে ঘটনার কারণ নিয়ে আঁশটে কৌতূহল প্রকাশ করে তাড়া খায়। তিন দিনের দিন ভোরে বুল্টি মারা যায়। তবে দেহ পেতে বেলা গড়ায় নানা কারণে।পাড়ায় আর নিয়ে আসা হয়নি।সোজা পদ্মাবতীর ঘাটেই সে চলে যায়। মুকুটমনিরা যখন ফিরল তখন রাত ঘনিয়েছে।
     
    ক দিন ধরে বুল্টিদের বাড়িটা ভূতের মত নিঝুম হয়ে পড়ে রইলো।পুলিশ ঘুরে গেল দুবার। নানান কানাঘুষোও চলতে লাগলো। জাদু মায়া মেমসাব  নামে একটা সিনেমা দেখবে পরে।একটা মৃত্যু --- তার কারণ---কত রকম ভাবে গল্পের বিষয়, নির্মাণের বিষয়, কল্পনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে! তার কোনটা যে ঠিক,কোনটা বেঠিক---- কে ঠিক করে দেবে? যে মরে যায় ,কেবল তার কাছেই হয়তো ঠিক উত্তরটা থাকে! সত্যিই থাকে কি? আবার হয়তো, সেই মুহূর্তে মরে যাওয়ার একটাই কারণ এতো তীব্র হয়ে ওঠে যে, মরে না যাওয়ার ---বেঁচে থাকার ----একেবারে চোখের সামনে থাকা কারণগুলিও ঝাপসা হয়ে যায়!
     
    ওদের বাড়িটা  যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আগের ছন্দটিকে জোর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে গেল বেশ কয়েক মাস। তারপর বছর ঘুরলে  প্রায় নিঃশব্দেই ছোড়দির  দিলদারের আশেপাশের  কোনো এক গাঁয়ে বিয়ে হয়ে গেল। সেই বছরের হেমন্তেই বুল্টির মাও বিনা নোটিসে এক রাতে বিদায় নিলেন। ভাইটি বিরহীলালের দোকানে কাজে ঢুকলো। ঘরের চরিত্র,গলির চরিত্র,শহরের চরিত্র পাল্টাতে থাকে এ ভাবেই।
     
    জাদুর এটাই শেষ বছর ইস্কুলের। সে আনমনা হয়ে যায় আজকাল খুব। এই ইস্কুল থেকে রেলগাড়ির হুইশল ,ঝম ঝম আওয়াজ শোনা যায়। লেভেল ক্রসিং পেরোয় সে রেলগাড়ি! ওর মনে হয় চলে যাই ---চলে যাই ---ঐ রেলগাড়ি চড়ে--- দিলদার ছেড়ে---সব পিছুটান ছেড়ে!  
    সেই দিনটি এক বছর পর এসেই যায়। সে মহানাগরিক হবার সুযোগ পায়। কলকাতার কলেজে ভর্তি হয় সে জেদ করেই। এরই মাঝে ,ওর টেস্ট পরীক্ষার ঠিক পর পরই মুকুটমনি এক কুয়াশামাখা হিম রাতে সবাইকে পেন্নাম ঠুকে রওনা হয় ধানবাদ।রেলে চাকরি পেয়েছে সে। ঠাকুমা তার বাঁ হাতের কড়ি আঙ্গুল কামড়ে সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দেন, থুতনি ধরে চুমু খান। মা তাঁর  নিরাসক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকেন ছেলের চলে যাওয়ার পথটির দিকে তাকিয়ে।বাবা বার বার গলা ঝাড়েন, জোরে জোরে কথা বলেন এটা সেটা। অবসরের সময় এগিয়ে এসেছে তাঁর , ছুটিগুলি নিয়ে নিচ্ছেন, যেদিন কর্মক্ষেত্রে ফেরার কথা, অনেকসময়েই সে দিন রয়ে যান। মায়ের রগের দুপাশের চুলগুলি অনেকটাই সাদা হয়ে আসছে।ঠাকুমাকে আর রাঁধতে দেননা। সকালে স্নান করে তোলা উনুনে তাঁর  রান্নাটিই এখন মূল রান্না।পরে গ্যাসের উনুনে মাছ করেন। এদিকে মাটির উনুনের পাট উঠেছে। জাদুও এখন গ্যাসে মাছ ভেজে ফেলতে পারে। টুকটাক রান্নাও করে। বাবা অবসরের পর নানান রোমাঞ্চকর পরিকল্পনার কথা বলতে থাকেন। একটি বাগানওয়ালা বাড়িরও পরিকল্পনা আছে তাঁর । শহরের বাইরের দিকে কপিশার কোল ঘেঁষে দু কাঠা জায়গা কিনেছিলেন কত বছর আগে। জাদু তখন খুব ছোট্ট। মনে আছে সূর্য অস্ত যাওয়ার আলোয় উঁচুনিচু  সেই লাল মাটিতে যেন আগুন ধরেছিল। ঝোপঝাড় আর লজ্জাবতী লতায় সে জায়গা এখন ঢেকে আছে। কিছুদিন আগে ওদিকে গিয়েছিল বন্ধুদের সাথে।তবে নিজেদের জায়গা ঠিক কোনখানটিতে বুঝে উঠতে পারেনি।
     
    জুলাই মাসের রোদবৃষ্টি মাখা এক ঝোড়ো হাওয়ার দিন জাদু রওনা দেয় ---একাই। এর আগে বেশ কয়েকবার বাবার সাথে গিয়ে ও পরীক্ষা, ভর্তি আর হোস্টেলের ব্যবস্থা করে এসেছে। মোটামুটি চেনা হয়ে গেছে ঐ পথটা, বাসগুলিও। বাকিটা এখন আস্তে আস্তে হবে। আগের দিন রাতে ও ঠাকুমার কাছে শুয়েছিলো।  মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বললেন , "তাইলে তুমিও চললা?"  একটা নিঃশ্বাস ফেলে হটাৎ ই আপন মনে বললেন " ক্যান যে মরলো ! আর দুইডা দিন রওন যাইতোনা?"
     
    জাদুর ঘুম আসেনা। সে বুল্টির অস্তিত্বের গন্ধ পায় সে রাতে। বড়ো চেনা, বড়ো ভরসার সে গন্ধ! হালকা পাউডার আর ঘামের গন্ধে মেশামাশি সে গন্ধ তরুণ্যের, পরিশ্রমের আর বুঝি সব উজাড় করে দেওয়া কোনো বোকামোর!  তার বুকের ধুকপুকুনির আওয়াজটিও জাদুর কানে বাজতে থাকে।তাকে সাইকেল শুদ্ধু ধরে ছুটতে ছুটতে ---দু হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে পড়তে না দেওয়ার জেদে ---সে শব্দ তো বেড়েই চলতো! তাকে অপরাজেয় মনে হত জাদুর। কিন্তু, সে ধুকপুকুনি থেমে যাওয়া,হেরে যাওয়া,পুড়ে ছোট্ট এতটুকু হয়ে যাওয়া বুল্টির ছবি তার ভয় ধরায়! জাদু হেরে যেতে চায়না অমন ভাবে!
     
     স্টেশনে বাবাই এসেছিলেন শুধু। গাড়ি ছাড়লো, তিনি পিছিয়ে যেতে লাগলেন। দিলদারের বাড়িঘর, গাছপালা, পেল্লাই  জলের ট্যাংকটি,গির্জার চূড়াটি ঘুরে ঘুরে ছিটকে যেতে থাকলো পিছনে। কপিশার ব্রিজের উপর ওঠার আগে রেলগাড়ি হুইশল দেয়। কেমন যেন ভাঙা ভাঙা ধরা ধরা গলায় ---কুউউউউ....! 
    জাদুকে কেউ কি পিছন থেকে ডাকলো? "জাদুউউউউউউউউ"........বলে?
     
     
     
     
     
     
     
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ৪৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c1f:77b8:915:9b04:c4b0:***:*** | ৩১ আগস্ট ২০২৫ ২২:২৭733802
  • কী যে অদ্ভুত ভালো লেখা, কী ভাবে বলবো ভেবে পাইনা! অপূর্ব! এই সিরিজ কবে বই হয়ে বেরোবে সেই অপেক্ষায় আছি।
  • Ranjan Roy | ৩১ আগস্ট ২০২৫ ২২:৪১733804
  • আনপুটডাউনেবল!!!
    আচ্ছন্ন করে দেয়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে প্রতিক্রিয়া দিন