সামিরুল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ লেখাঃ
লেখাটি একটু দীর্ঘ। একটু সময় করে সকলকে পড়ার জন্য বিনীত অনুরোধ রইলো.........
কিসের Logical Discrepancy? কিসের যাচাই পর্ব? যাদের নাম ডিলিট করা হচ্ছে তারা কারা? খোঁজ নিয়ে দেখুন, তারা জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গরীব মানুষ। গরীব মুসলমান, রাজবংশী, মতুয়া, আদিবাসী থেকে শুরু করে যারাই পিছিয়ে পড়া মানুষ তাদের একমাত্র অধিকার কেড়ে নেওয়ার খেলা। এটা নাগরিক অধিকার হরণের চক্রান্ত। হ্যাঁ বলতে পারেন এই তালিকায় নাম রয়েছে সবচেয়ে বেশি মহিলা আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের। কেন? সেই প্রশ্নের পিছনেও রয়েছে বিজেপির রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আজ মালদার ঘটনা নিয়ে বড় বড় কথা বলা হচ্ছে। এজেন্সি লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একবার ওই বিক্ষোভরত মানুষগুলোর সাথে কথা বলেছেন কেউ? দেখুন তো তারা কি বিদেশি? রোহিঙ্গা? একেবারেই না। হলফ করে বলতে পারি দিল্লির জমিদারদের চেয়ে তারা অনেক আদি বাসিন্দা, অনেক বেশি ভারতীয়।
বাংলার সাধারণ মানুষের নাম কেটে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব হওয়ার দিন আজ এসে গেছে। কোনো হিংসা নয়, গণতান্ত্রিকভাবে আমাদের লড়তে হবে।
আজ বাংলার মাটি থেকে এক ভয়ংকর শব্দ বারবার ভেসে আসছে— “Logical Discrepancy”।
কাগজে-কলমে এই শব্দটা দেখতে খুব ভদ্র, খুব প্রশাসনিক, খুব প্রযুক্তিগত। কিন্তু বাস্তবে এর মানে কী?
এর মানে—
একজন গরিব মানুষের নাম মুছে দেওয়া। একজন বৃদ্ধ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া।
একজন মেয়ের বিয়ের পর পদবী বদলানোকে অপরাধ বানানো। একটি পরিবারের ইতিহাস, পরিচয়, সম্মান, নাগরিকত্ব—সব কিছুকে সন্দেহের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।
এই “Logical Discrepancy”-র ভেতরে সবচেয়ে বেশি আছে Illogicality। অর্থাৎ, যা যুক্তির নামে করা হচ্ছে, তার ভেতরেই যুক্তির চরম অভাব।
*ঘটনা – ১*
দুলারী থেকে দুলী, তারপর ডিলিট
বাবা-মা খুব ভালোবেসে মেয়ের নাম রেখেছিলেন দুলারী মুর্মু (নাম পরিবর্তিত)। বাবার নাম ফুলু মুর্মু।
ছোটবেলা থেকে বাড়িতে সবাই তাকে ডাকত দুলী বলে। সেই সময় গ্রামে ভোটার তালিকার কাজ চলছিল। ভোট-বাবুরা এলেন নাম তুলতে।
প্রশ্ন করলেন— “আরে, ওই ফুলুর বেটির নাম কী বটে?”। লাজুক, উঠতি বয়সের এক কিশোরী মাথা নিচু করে বলেছিল— “দুলী বটে…”
ভোট-কাকু খাতায় লিখে নিলেন— “দুলী মুর্মু”
সেদিন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই সামান্য কথার ব্যবধান একদিন তার নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র হয়ে উঠবে।
সময়ের সঙ্গে দুলারীর বিয়ে হল। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে “দুলী” নামটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সরকারি কাগজপত্রে, আধার কার্ডে, ব্যাংকে, হাসপাতালে— তার নাম হয়ে গেল দুলারী মুর্মু।
আজ হঠাৎ করে প্রশাসন বলছে— তার নাম “মেলে না”।
তার নাম “Logical Discrepancy”।
তার নাম ডিলিট।
একটা প্রশ্ন— দোষটা কার? দুলারীর?
নাকি সেই ব্যবস্থার, যেখানে গ্রামের উচ্চারণ, ডাকনাম, অশিক্ষা, সামাজিক বাস্তবতা—কিছুই বোঝার চেষ্টা করা হয় না?
এটাই কি যুক্তি?
“Logical Discrepancy”
ঘটনা – ২
আমিনা খাতুন (নাম পরিবর্তিত)। বিয়ের আগে তার নাম ছিল এটাই।
স্কুলে, পাড়ায়, ভোটার তালিকায়, হয়তো কোথাও “খাতুন”, কোথাও “খাতুনা”, কোথাও “আমিনা”।
বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে গিয়ে সে হয়ে গেল আমিনা বিবি। এটাই বাংলার বাস্তবতা। এটাই গ্রামের বাস্তবতা। এটাই বহু পরিবারের স্বাভাবিক সামাজিক রীতি। একজন মেয়ের নাম, পদবী, পরিচয়ের ভাষা—বিয়ের পর বদলায়।
“তোমার জীবনের বাস্তবতা আমাদের ডেটাবেসের সঙ্গে মেলেনি। তাই তোমার অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে।”
তার নাম ডিলিট।
নেপথ্যে আবার সেই একই শব্দ—
Logical Discrepancy।
প্রশ্ন হচ্ছে—
বাংলার হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ নারীর জীবনে বিয়ের পর নাম বা পদবীর পরিবর্তন হয়েছে।
তাহলে কি তাদের সবাইকে সন্দেহভাজন করা হবে?
তাহলে কি নারী হওয়ার সামাজিক বাস্তবতাকেই অপরাধ বানানো হবে?
ঘটনা – ৩
রবিচাঁদ ঠাকুর (নাম পরিবর্তিত) বহু বছর আগে এদেশে এসেছিলেন।
পরিবার গড়েছেন। এখানেই বসতি, এখানেই জীবন, এখানেই সন্তান-সন্ততি। নাম ছিল। নথি ছিল। পরিচয় ছিল। রাষ্ট্রের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বীকৃত মানুষ। আজ হঠাৎ করে তাঁর নামও বাদ।
কেন?
উত্তর—
Logical Discrepancy।
এ যেন এক জাদুকরী শব্দ।
যার আড়ালে সব অন্যায় ঢেকে দেওয়া যায়।
যার আড়ালে প্রশ্ন বন্ধ করা যায়।
যার আড়ালে মানুষের জীবনকে কেবল “ডেটা mismatch” বলে খারিজ করে দেওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: এই “Logical Discrepancy” আসলে কতটা Logical?
এই প্রশ্নটাই আজ কেউ তুলছে না। আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই—
• যার বাবার নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আছে, তার ছেলে বা মেয়ের নাম আজ ডিলিটেড— সে ট্রাইব্যুনালে যাবে কেন? কেন তাকে এই হয়রানির শিকার হতে হবে। মনে আছে এই নির্বাচন কমিশন বলেছিল যে ২০০২ সালের নিজের অথবা বাবা মায়ের নাম থাকলে চিন্তা নেই!
• যে মানুষটির নিজের নাম ২০০২ সাল থেকেই ভোটার তালিকায় আছে, আজ তাঁর নাম ডিলিট হলো কী করে? তিনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন কেন?
• যে মানুষটির পাসপোর্ট আছে, বহু বছর ধরে সরকারি স্বীকৃত পরিচয় আছে, তাঁর নাম হঠাৎ ডিলিট হলো কী করে? তিনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন কেন?
• যে মানুষটি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের সার্টিফিকেট দিয়েছে, স্কুল-কলেজের নথি দিয়েছে, তার নাম ডিলিট হলো কেন?
• যাকে শুনানির নোটিসই দেওয়া হয়নি, তাকে হিয়ারিং-এ ডাকা হয়নি, তার নাম ডিলিট হলো কী করে?
• যার বাবা-মায়ের নাম accepted, কিন্তু ছেলে-মেয়ের নাম “ডিলিট”— এটা কীভাবে সম্ভব?
• এক পরিবারের ৬ ভাইবোনের মধ্যে ২ জনের নাম উঠেছে, ৪ জনের নাম ওঠেনি, উল্টে ডিলিট— এ কেমন প্রক্রিয়া? এ কেমন যুক্তি?
• বিয়ের পর হাজার হাজার মেয়ের পদবী বদলেছে— তাই কি তাদের গণহারে নাম কেটে দেওয়া হবে?
• ৮০-৯০ বছরের এক বৃদ্ধ মানুষ, যিনি গত ৪০-৫০ বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, যিনি হয়তো লেখাপড়া জানেন না, নামের বানানে সামান্য এদিক-ওদিক হয়েছে বলে আজ তাঁর নাম ডিলিট? তিনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে?
কোর্ট, কমিশন, মিডিয়া?
এমন হাজার হাজার প্রশ্ন আছে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে?
• কোন কোর্ট?
• কোন কমিশন আধিকারিক?
• কোন নির্বাচন কর্তৃপক্ষ?
• কোন সংবাদমাধ্যম?
• কোন রাজনৈতিক নেতা?
আমরা কি দেখেছি এই প্রশ্নগুলো সুপ্রিম কোর্টে জোরের সঙ্গে তোলা হচ্ছে?
আমরা কি দেখেছি টেলিভিশন স্টুডিওতে এই ভুক্তভোগীদের ডেকে বসানো হচ্ছে?
আমরা কি দেখেছি জাতীয় মিডিয়া এই ৬০ লক্ষ মানুষের কান্না নিয়ে রাতভর চিৎকার করছে?
*"না।"*
যে মিডিয়া তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও স্টুডিওতে “ডিবেট” বসায়, যারা একটি ঘটনার জন্য ভুক্তভোগীর চৌদ্দ গুষ্ঠিকে টেনে আনে, তারা এই ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে একজনকেও সামনে আনছে না। কেন?
কারণ এদের কান্না “টিআরপির জন্য সুবিধাজনক” নয়।
এদের হাহাকার “স্টুডিও-ফ্রেন্ডলি” নয়।
এদের জীবন ক্ষমতার রাজনীতির কাছে নগণ্য।
"ট্রাইব্যুনাল যাবে কেন সাধারণ মানুষ?"
সবচেয়ে নির্মম প্রশ্ন এটা।
আজ একজন খেটে খাওয়া মানুষ, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ, যার সারা দিন রোজগার না হলে বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না, তাকে বলা হচ্ছে—
“তোমার নাম ডিলিট হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে যাও।”
হ্যাঁ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বলেছেন দলীয় কর্মীরা সাহায্য করবে যেতে। গরীব মানুষকে টাকা খরচ করতে হবে না।
কিন্তু—
এই ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার জন্য মানুষের যে দিনের পর দিন রোজগার বন্ধ হবে, সেই বিষয়টা কমিশন বা কোর্ট ভাববে না?
• সুন্দরবন, উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, মুর্শিদাবাদ, মালদা, কোচবিহার, দার্জিলিং— সেখানকার গরিব মানুষ কলকাতায় এসে পড়ে থাকবেন?
• অসুস্থ বৃদ্ধা মা, নিরক্ষর কৃষক, গৃহবধূ, আদিবাসী শ্রমিক, সংখ্যালঘু পরিবার— এরা কি কোর্ট-কাচারির ভাষা বোঝেন?
তাহলে এই “প্রক্রিয়া” আসলে কী?
এটা ন্যায়বিচারের পথ?
নাকি হয়রানির ফাঁদ?
এটা নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়—এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত।
এই বিপুল মাত্রার নাম বাদ, এই অদ্ভুত “Logical Discrepancy”,
এই বাছাই করা নীরবতা— এসব কিছুই নিছক কাগজের ভুল নয়।
এটা একটি গভীর রাজনৈতিক প্রকল্প।
আজ আরএসএস-এর ১০০ বছর পূর্তি।
তাদের বহুদিনের স্বপ্ন— বাংলাকে ভাঙো, বাংলাকে বিভক্ত করো, বাংলার সামাজিক সংহতিকে ধ্বংস করো।
আজ অবস্থা এমন তৈরি করেছে যে এজেন্সির অত্যাচার তো আছেই, সংসদে মুখে তালা দেওয়ার চেষ্টা করতেও কসুর করে না বিজেপি।
কিন্তু তারা ভুলে গেছে—
বাংলা উত্তর প্রদেশ নয়। বাংলা বিহার নয়।
বাংলার সমাজকে সহজে ঘৃণা, ছোঁয়াছুঁয়ি, জাতপাত, ধর্মবিদ্বেষের পরীক্ষাগার বানানো যায় না।
বাংলার মাটি একদিকে মায়াময়, অন্যদিকে পাহাড়ের মতো শক্ত।
এই বাংলায় যেমন লালন আছেন, তেমনই আছেন ক্ষুদিরাম, সুভাষ, মাস্টারদা, মাতঙ্গিনী, নজরুল।
এই বাংলার মানুষ জানে— একবার সাম্প্রদায়িক আগুনে হৃদয় পুড়লে তার দাগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকে। তাই বাংলার মানুষ হিন্দু-মুসলমানের নামে, জাতের নামে, খাওয়াদাওয়ার নামে, ভাষার নামে— সহজে ভাঙে না।
সেই কারণেই বাংলা ঘৃণার রাজনীতির জন্য উর্বর জমি নয়।
তাই শুরু হয়েছে নতুন চক্রান্ত
বাংলার মানুষকে সরাসরি হারানো যাচ্ছে না। তাই শুরু হয়েছে ডেটার নামে আক্রমণ।
প্রশাসনের নামে বাছাই করা হয়রানি। ভোটার তালিকার নামে নাগরিক বাছাই।
প্রথম ধাপে বসানো হলো অমেরুদণ্ডী প্রতিষ্ঠান। তারপর একের পর এক “প্রযুক্তিগত” শব্দ ছুড়ে দেওয়া হলো— Discrepancy, Mismatch, Verification, Objection, Deletion।
শুনতে খুব আধুনিক। আসলে এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অধিকার হরণ।
মহিলা, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, গরিব, রাজবংশী , মতুয়া— সবার বিরুদ্ধে এই আঘাত
সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে তাদের উপর—
• যারা গরিব
• যারা নিরক্ষর
• যারা গ্রামবাংলার মানুষ
• যারা আদিবাসী
• যারা সংখ্যালঘু
• যারা কাগজপত্রের ভাষা বোঝেন না
• যারা প্রশাসনিক দালালচক্রের সামনে অসহায়
কারণ এদের বিরুদ্ধে যা-খুশি করা সহজ বলে মনে করা হয়।
ভাবা হয়—
• মিডিয়া চুপ থাকবে
• পুলিশ চুপ করাবে
• আদালতে প্রশ্ন কম উঠবে
• সমাজের একাংশ তালি দেবে
• আর রাজনৈতিক লাভের অঙ্ক মেলানো যাবে
এই কারণেই আজ Logical Discrepancy শুধু একটি প্রশাসনিক শব্দ নয়।
এটা হয়ে উঠেছে বাছাই করা নিপীড়নের নতুন নাম।
তবুও আমাদের হেরে গেলে চলবে না । আমাদের এই লড়াই জিততে হবে। হিংসা নয়, বদলে সিস্টেমের মাধ্যমেই করতে হবে সমস্যার সমাধান। যাদের নাম ডিলিট হয়েছে, তাদের সবাইকে অনুরোধ করব, আসুন আমরা ট্রাইব্যুনালে যায়। ওখানে গিয়ে জানাতেই হবে যে তোমরা ঠিক কাজ করছ না। আমি , আপনি সবাই ভারতীয়। আমাদের দেশ। কয়েকজন হিংস্র বাংলা বিরোধীদের বাপের দেশ নয়।
সামিরুল ইসলাম