এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নগর উখড়া

    Aditi Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • গোধূলি গগনের মেঘ যখন তারাদের ঢাকিয়াছিল,

    তখন সেই একরঙা, নিবিড় মেঘখন্ডখানির নিচে তিনি বোটখানি তীরে বাঁধিয়া, আলো নিভাইয়া দিয়া সম্মুখে জনপদখানির চলমান রূপটি উপভোগ করিতে থাকিলেন। পথে কর্মময় নারী পুরুষ, মন্দিরের আরতিধ্বনি, একে একে দীপ জ্বলিয়া উঠিতেছে বাড়িগুলিতে --- আহা, সাধারণের, চলমানের কি অসাধারণ চিরায়ত রূপখানি! এই পুলক বুঝি অনন্তের সাথে হঠাৎই দেখা হওয়ার। তিনি তাঁর পত্রে লিখিলেন: কত লোক, কত ইচ্ছা, কত কাজ, কত শত গৃহ, গৃহের মধ্যে সেই জীবন রহস্য, সংঘাত --- জীবনের এই বৃহৎ প্রবাহ কোথাকার কোন পথ দিয়ে যে হৃদয়ের মধ্যে পথ পায় --- শুধু যেন ধ্বনি আমরা শুনিতে পাই, ভাষায় তা অব্যক্ত। তিনি ঠাকুর, তাই বুঝি প্রায়শই শুনিতে পাইতেন। শুনিতে হইলে কান পাতিতে হয়। সেই বিদ্যাই তিনি আমাদের শিখাইতে চাহিয়াছেন বারংবার। তাই বুঝি তাঁহার করুণাপথ আমাদের লইয়া যাইতে চায় সেই অনুভবের আশ্রমদ্বারে।

    শতবর্ষ পার করিয়া আরো তিনটি দশক কালের পথ চলিয়া পাবনার সে ঘাটখানি কি আজও সে অনন্তের ধ্বনি তুলিতে পারে? ঘাটটি কি রহিয়াছে এখনো? কত নরকই তো নামিয়া আসিল সাধারণের কর্মমুখরিত সে জীবনে --- এই বাংলায়, এই দেশে, সারা পৃথিবীতেই! আমার তো পাবনা যাওয়া হয় নাই। যাইলেও, কোন ঘাটটি --- তাহাও বুঝি আজ আর কেহ বলিয়া দিবে না। তবু, সে জীবন তো থামিয়া থাকে নাই!

    এই পারে, কাঁটাতারের পশ্চিমে, এখন, এই মধ্যমাঘের পড়ন্ত অপরাহ্নখানি অনন্ত নীল আকাশের নিচে পড়িয়া রহিয়াছে সরিষা আর অবুঝ সবুজ ধান্য চারাগুলির হলুদে সবুজে মাখামাখি শাড়িখানি বিছাইয়া। দুই পার্শ্বে সরিয়ে যাইতেছে সুপারি, সুবাবুল এর ফাঁকে প্রাচীরহীন, মুক্ত অঙ্গন ছোট ছোট কুটির গুলি। কিছু পাকা কোঠা বাড়ী, কিছু টিনের। বেশ ঢিলাঢালা আয়েশী ভাবখানি যেন। পূর্ণিমা সামনে, কীর্তনের আওয়াজ কানে আসে। আসতে আসতে বাড়ী ঘর, দোকান পাট অধিক হইতে থাকে, আমরা পৌঁছে যাই গঞ্জ নগর উখড়া। গ্রামটি গঞ্জ হইয়া উঠলেও এ কোনো হালের জায়গা নয়। কতদিন ধরে এ যমুনাবতী বসতি কত ইতিহাস বহন করিয়া চলিয়াছে! মোগলকে হটাইয়া ব্রিটিশ আসিল, দেশটি দুই ভাগ করিয়া দিয়া তাহারা চলিয়া গেল, আমরা মরিলাম হানাহানি করিয়া। কতক বর্ষ পরে আবারও লড়াই লাগিলো গৃহের পার্শ্বে পুব দিকে! নগর উখড়া পথ করিয়া দিলো ওপারের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের!

    এখন লালচে সোনালী কাঁচ পোকার রংএ সীমন্তটি রাঙ্গাইয়া সে যেন নিজ গৃহস্থালির নানাবিধ কার্য সারিয়া লইতেছে সন্ধ্যা প্রদীপটি জ্বালিবার পূর্বে। মস্ত মাঠের পারে সূর্য দীঘল ইস্কুল বাড়িতে ছুটির ঘণ্টা বাজিল। বয়ঃসন্ধির কি বিচিত্র রূপ,আহা! গৃহে ফিরিতেছে তারা, কল কাকলিতে, হাসিতে হাসিতে!তাহাদের সে গৃহগুলি, সেথা, তাহাদের জন্মের পূর্ব হইতে বহিয়া চলা জীবন, এই মুহূর্তে তাহাদের প্রতীক্ষায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তাহাদের কচি হৃদয়গুলির মধ্যে অঙ্কিত হইয়া যাইতেছে এই পড়ন্ত বিকালখানি --- ভুলিয়া গিয়াও তাহারা যাহা ভুলিবে না, রাঙ্গা সন্ধ্যার মেঘের মত জীবনের এই বর্তমান মিলাইয়া যাইলেও!

    হাটখানি বসিয়াছে আজ। মাছ, সবজি, মনোহারী, আরো কত কি! একতলা দুইতলা হলুদ রঙ্গা, সাদা রঙ্গা সাদামাঠা বাড়িগুলি সরিয়া সরিয়া যাইতেছে দুই পার্শ্বে। মাঝখান দিয়া প্রশস্ত রাস্তাখানি --- সম্মুখে অনেকদূর দৃষ্টি চলিয়া যায়, আকাশে সে পথ যেন মেশে। কোনো আকাশচুম্বিতে ধাক্কা খায়নাতো! ডান পার্শ্বে এক শাখা পথ --- তাহার দোকানপাট লইয়া। সাইকেল চালাইয়া সে পথে কেউ চলিয়া গেল, খুব যেন তাড়া তাহার। পৃষ্ঠখানি দেখিলাম মুখখানি দেখিলাম নাতো! কোনোদিন দেখিবনা? দেখিবনা সে পথের শেষ? দোকান বাজার শেষে সে পথ কি বসে গিয়ে ছায়া ঢাকা দীঘিটির পারে? হিজল, বট,তমালের নীল ছায়া দেয় বুঝি তারে আশ্রয়? কেউ বুঝি দেখে তারে,গোপনে,জানালার পাশে বসি করতলে রাখি মাথা?দেখিবোনা, জানিবনা, কোনোদিন আর? কেনো এই হাহাকার? এই বুঝি মায়া? গঞ্জের,শহরের নামলেখা বাসগুলি পথে। কেহ বুঝি ফিরিয়া আসিতেছে গৃহে আজ, কেহ বুঝি ছাড়িয়া যাইতেছে নীড়, কেহ বুঝি নিতান্তই পথিক, আমরা যেমন। নগর উখড়া উদাসীন। মায়ার ছাপ তিলকটি কপালে আঁকিয়া দিয়া সে পার্শ্বে সরিয়া দাঁড়ায়।

    গঞ্জটি পিছনে ফেলিয়া আমরা আবারও ধরিব সরিষা - সবুজধান্য পথখানি।সম্মুখে হাতছানি দেয় আরো কোনো গঞ্জ বা নগর, তাহারও রহিয়াছে নিজ গল্পমালা। সম্মুখে, পশ্চাতে, কীর্তনে শরণাগত প্রেমিকের নাভিমূল হইতে উঠিয়া আসিতে থাকে অশ্রুঝরা দীর্ঘশ্বাস --- "রাধে. এ..এ.."! বুকের ভিতরখানি মোচড় দেয়। পরক্ষণেই বুঝি বা হৃৎপিণ্ড লম্ফ দিয়া উঠে স্পর্ধিত শূদ্রের ডঙ্কা নিনাদে! তাহাদের বৃন্দাবন ইহা স্বীকৃত! নমিত নহে, বন্দিত তাহারা হেথা। বজ্রযান, পদাবলী, তসবী-র এ ত্রিবেণী সঙ্গম --- আহা , সাধারণ চর্যাপদ স্মৃতি!

    ইহারও কিছু পরে আধুনিক মসৃণ রাজপথখানি আর তাহাদের তোয়াক্কা করিবেনা! দ্রুততার সাথে মিতালী তাহার। তাই ইতস্তত বিচিত্র জীবনের স্বাদগুলি ঢাকা পড়িয়া যাইবে ক্রমাগত সম্মুখে ছুটিয়া আসিতে থাকা কংক্রিটের উড়ন্ত সেতুগুলির নিম্নে।স্থান নামগুলি শুধুই সভয়ে দুই পার্শ্বে সরিয়া সরিয়া পথ করিয়া দিবে ব্যস্ততাকে। এই পথে মহার্ঘ্য সুরালয় বেশি, মেঠো সুর বুঝি কিছু কম। তবু পথিকের হৃদি মাঝে বাজিতে থাকিবে অনন্তের সে অব্যক্ত আনন্দধ্বনি।

    সে এ মানব জীবনের স্বল্প স্থায়িত্বের কথা ভাবিয়া বিষাদে ডুবিয়া যাইবে। পর্বতমালা বা সিন্ধু দেখিবার সংগ্রামে ছুটিতে ছুটিতে কতটুকু সময় আর সে ব্যয় করিতে পারে এই বাংলার,এই ভারতবর্ষের,এই পৃথিবীর অজস্র শিশির বিন্দুবৎ এই অনন্ত সাধারণের শোভা উপভোগ করিতে, তাহার অনন্ত নাদটি হৃদয় দিয়া শুনিতে! এই কথা ভাবিতে ভাবিতে নিজের অসহায়ত্ব আর অনন্তের স্বাদ উভয়ের দ্বৈরথে তাহার মনে এক বিচিত্র ভাবের সঞ্চার হইবে। সে কাহাকেও বুঝি বলিতে পারিবেনা। রাতের অন্ধকারে দিনটির সমাধির মতন তাহার অনুভূতিও তাহার ভিতরেই হারাইয়া যাইবে। কবে আর কখন আবার তাহারা ভাসিয়া উঠিবে সে নিজেও কি তাহা জানে? আর কি ফিরিবে সে এই ঘাটে? এই আমিটিরে লইয়া?
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kakali Bandyopadhyay | 113.2.***.*** | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৪738225
  • আমরা  আছি  সেই  অনুভূতিগুলোর শরিক  হওয়ার  জন্যে ।..লিখেই  দেখুন  না ..
  • | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪৪738229
  • নাহ এই মুহূর্তটি গত হইলে তাহা কালের খাতায় অতীতরূপেই প্রতিভাত হয়। এই 'আমি' আর মুহূর্তপূর্বের 'আমি' কদাপি এক নহে। অপিচ তাহাদের মধ্যে এক সুক্ষ্ম অলক্ষ্য তার রহিয়া যায়। কখনো তাহা কে জানে কিসের ছোঁয়ায়  একসুরে বাজিয়ে উঠে। কখন বাজিবে তাহা ক্ষুদ্র মনুষ্যকূল পূর্বে অনুমান করিতে পারে না। আর পারে না বলিয়াই সে সুর এত অপরূপ, প্রায় অপার্থিব বলা যায় তাহাকে। 
  • kk | 172.58.***.*** | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৫১738240
  • পড়তে পড়তে চোখের সামনে স্পষ্ট ছবি ফুটে ফুটে উঠছিলো। তারপর সেগুলো মনের মধ্যে নেমে গেলো।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন