এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • চমস্কি এখন কেস স্টাডি

    SHANKAR BHATTACHARYA লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৪ বার পঠিত
  • আর্টিকল #: 34240
    বিজ্ঞানী, নৈতিকতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা: চমস্কি বিতর্ক
     
    ভূমিকা
     
    বিজ্ঞান ব্যক্তিগত অনুভূতি বা সুবিধাজনক নীরবতার ঊর্ধ্বে—এটাই আধুনিক জ্ঞানচর্চার মৌলিক নীতি। বিশেষত যখন কোনো বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয়ই মানবমন, অবচেতন কাঠামো ও নৈতিক বিচার, তখন তাঁর নিজের আচরণও বিশ্লেষণের বাইরে থাকতে পারে না। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করা নয়; লক্ষ্য হলো বুদ্ধিজীবীর নৈতিক দায়, আত্মপ্রবঞ্চনার কৌশল এবং ক্ষমতার নিকটবর্তী হলে জ্ঞানচর্চায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়—তার উন্মোচন। এই আলোচনায় নোয়াম চমস্কি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
     
    চমস্কির তাত্ত্বিক অবস্থান
     
    চমস্কি ভাষাবিজ্ঞানকে মানবমনের কেন্দ্রে স্থাপন করেন। তাঁর রূপান্তরমূলক উৎপাদনশীল ব্যাকরণ ও সার্বজনীন ব্যাকরণের ধারণা মানুষের সহজাত মানসিক কাঠামোর কথা বলে। এই যুক্তিবাদী অবস্থান অনুযায়ী ভাষা, চিন্তা ও বিচার কেবল সামাজিক অভিজ্ঞতার ফল নয়; এগুলো অবচেতন কাঠামোর প্রকাশ। এই তত্ত্বের অন্তর্নিহিত দাবি হলো—মানব আচরণ, এমনকি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও, বিশ্লেষণযোগ্য।
     
    বিতর্কিত প্রেক্ষাপট
     
    এই প্রবন্ধের প্রেক্ষাপট বিমূর্ত নয়। জেফরি এপস্টিন—যিনি নাবালক যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দণ্ডিত ও বহুলভাবে অভিযুক্ত—তার সঙ্গে নামী শিল্পপতি, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক নিয়ে তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এই তালিকায় নোয়াম চমস্কির নাম উঠে আসায় বিতর্ক তৈরি হয়। এখানে প্রশ্ন অপরাধে প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার নয়; প্রশ্নটি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। যিনি আজীবন ক্ষমতা, সহিংসতা ও এলিটদের দায় নিয়ে লিখেছেন, তিনি কীভাবে এমন সম্পর্ককে ‘ব্যক্তিগত’ বলে বিচ্ছিন্ন করেন—এই প্রশ্নই আলোচনার কেন্দ্রে।
     
    ব্যক্তিগত বনাম বৈজ্ঞানিক—ভ্রান্ত বিভাজন
     
    বিজ্ঞান ‘ব্যক্তিগত’ অজুহাত মানে না। বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রেও না। চমস্কির নিজের তত্ত্ব অনুযায়ী ব্যক্তিগত আচরণ বিশ্লেষণের বাইরে নয়। অথচ বিতর্কিত প্রেক্ষাপটে ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে নীরবতা বা বিচ্ছিন্নতার ভাষা ব্যবহার করা তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই বিভাজনটি বৈজ্ঞানিক নয়; এটি সুবিধাজনক।
     
    নৈতিক ব্লাইন্ড স্পট ও আত্মপ্রবঞ্চনা
     
    ক্ষমতার ক্ষেত্রে সন্দেহ করাই বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব—এ কথা চমস্কি নিজেই শিখিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, এই সন্দেহ সবচেয়ে আগে ভোঁতা হয় বুদ্ধিজীবীদের নিজেদের ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিনের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব আত্মবিশ্বাসকে অহংয়ে রূপ দিতে পারে; তখন ব্যক্তি নিজেকে সাধারণ নৈতিক বিচারের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। অবচেতন স্তরে সুবিধা, সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মরক্ষামূলক যুক্তি নৈতিক প্রশ্নকে চাপা দেয়। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা না বলেও সত্যকে অস্পষ্ট করে তোলাই আত্মপ্রবঞ্চনা।
     
    অবচেতন, যৌনতা ও নীরবতা: গবেষণার প্রশ্ন
     
    মানবমনের অবচেতন স্তরে যৌনতা একটি শক্তিশালী প্রণোদক—এ কথা মনোবিজ্ঞান ও মনোদর্শনে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রশ্নটি অভিযোগের নয়; প্রশ্নটি গবেষণাযোগ্য অনুমানের। গুরুতর যৌন অপরাধের তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও কেন কেউ অপরাধীর সান্নিধ্যে যায় বা নীরব থাকে? অবচেতন আকর্ষণ, ক্ষমতার মোহ এবং আত্মরক্ষামূলক যুক্তির সমন্বয় কি নৈতিক বিচারকে স্থগিত করে? নীরবতা এখানে নিরপেক্ষ নয়; এটি নিজেই একটি তথ্য।
     
    গবেষণার মূল্য বনাম নৈতিক দায়
     
    চমস্কির ভাষাবৈজ্ঞানিক অবদান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এটি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাত্ত্বিক গুরুত্ব নৈতিক জবাবদিহি বাতিল করে না। প্রশ্নহীন শ্রদ্ধা জ্ঞানচর্চার শত্রু। সমাজ যদি ‘মহান কাজ’-এর দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে প্রশ্নমুক্ত করে, তবে প্রতারণার সংস্কৃতি লালিত হয়।
     
    প্রতারণার উন্মোচন ও প্রতিরোধ
     
    এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য ব্যক্তিকে বাতিল করা নয়। উদ্দেশ্য হলো—(১) বুদ্ধিজীবীর নৈতিক দায় স্মরণ করানো, (২) ‘ব্যক্তিগত’ অজুহাতের আড়ালে আত্মপ্রবঞ্চনার কৌশল উন্মোচন, (৩) ক্ষমতার নিকটবর্তী হলে জ্ঞানচর্চায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়, তা চিহ্নিত করা। প্রতিরোধ শুরু হয় প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে।
     
    চমস্কি এখন কেস স্টাডি
     
    এই আলোচনার স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হলো—নোয়াম চমস্কি এখন একটি কেস স্টাডি। এটি কোনো অপরাধ-অভিযোগ নয়; এটি একটি পদ্ধতিগত দাবি। মানবমন নিয়ে যে তত্ত্ব তিনি দাঁড় করিয়েছেন, সেই তত্ত্বের আলোতেই তাঁর নীরবতা ও সিদ্ধান্ত পড়তে হবে। অবচেতন প্রণোদনা, ক্ষমতার সান্নিধ্য, সামাজিক সুবিধা ও আত্মরক্ষামূলক যুক্তি—এই উপাদানগুলোর সমন্বয় কীভাবে নৈতিক বিচারকে স্থগিত করে, তা বোঝার জন্য এই কেস স্টাডি জরুরি।
     
    চমস্কির ক্ষেত্রটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি নিজেই অবচেতন কাঠামো নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে তাঁর নীরবতা তত্ত্ব ও আচরণের ফাঁককে উন্মোচিত করে। এই ফাঁক দেখানোই এই প্রবন্ধের লক্ষ্য—ব্যক্তিকে বাতিল করার জন্য নয়, বরং বুদ্ধিজীবী শ্রেণির আত্মপ্রবঞ্চনা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার জন্য। কোনো নামই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়—বিশেষত তারা, যারা আমাদের প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন।
     
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে প্রতিক্রিয়া দিন