এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • প্রতিবিম্বের মুখোমুখি যুদ্ধ

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত
  • যুদ্ধ। যুদ্ধের শুরু। আগেই যুদ্ধ। রক্ত ঝরার আগে, তীর উড়ানোর আগে, শঙ্খধ্বনির আগে। এটি একটি নিঃশব্দ বিস্ফোরণ, যা ঘটে ভিতরে, হাড়ের মজ্জায়, হৃৎপিণ্ডের গহীনে। এটি শুরু হয় যখন আমি প্রথম তাকে দেখি। না, দেখি না, পর্যবেক্ষণ করি। দূর থেকে, এক প্রান্তরে, সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে, তাকে ঘিরে আলো একটি করোলা তৈরি করেছে, একটি স্বর্ণিম রেখান্তর, যেন সে নিজেই আলোর উৎস, একটি মানবাকৃতির সূর্য।

    সে দাঁড়িয়ে আছে। সহজভাবে, অনায়াসে, যেন পৃথিবী তার পায়ের নিচে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। তার কাঁধ চওড়া, কিন্তু কোমর সরু, একটি ধনুকের মতো নমনীয়তা আছে শরীরে। তার চুল কালো, ঘন, যা হালকা বাতাসে নড়ে, কিন্তু অগোছালো হয় না, শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে, যেন প্রতিটি কেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানে তার স্থান। তার মুখ... তার মুখ আমি কখনো সম্পূর্ণভাবে দেখিনি, কারণ তা দেখার জন্য সরাসরি তাকাতে হয়, আর আমি সরাসরি তাকাতে পারি না। আমি কেবল পাশ থেকে, কোণ থেকে, প্রতিবিম্বে দেখি। একটি প্রাসাদ-প্রকোষ্ঠের পালিশ করা ব্রোঞ্জের দরজায়, একটি নদীর জলে, একটি ঢালের উজ্জ্বল পৃষ্ঠে। সে সুন্দর। এটি একটি সত্য, যা বেদনার মতো তীক্ষ্ণ, কারণ এটি আমার নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করে। আমি সুন্দর নই। আমি উজ্জ্বল, হ্যাঁ, সূর্যের উজ্জ্বলতা, যা চোখ ধাঁধাঁনো, কিন্তু সুন্দর নয়। সৌন্দর্য একটি ভারসাম্য, একটি সাদৃশ্য, যা প্রকৃতি দেয় কিছু ভাগ্যবানকে। আমাকে প্রকৃতি দিয়েছে কেবল তাপ, এবং কান যা স্বর্ণের মতো জ্বলে, কিন্তু মুখ যা কঠিন, কৌণিক, একটি পাহাড়ের শিলার মতো যা কখনো মসৃণ হয়নি বাতাস বা জলে।

    সে কথা বলে। তার কণ্ঠস্বর গভীর, মধুর, কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ। যখন সে কথা বলে, অন্যরা নিঃশব্দ হয়ে যায়, শুধু শোনে। তারা শোনে না শব্দ, তারা শোনে সঙ্গীত, একটি আশ্বাস যে সবকিছু ঠিক আছে, বিশ্ব তার জায়গায় আছে, কারণ সে আছে। আমি কথা বলি, আমার কণ্ঠস্বর কর্কশ, ধাতব, একটি খোলা তলোয়ারের মতো। লোকজন শোনে, কিন্তু শ্রদ্ধায় নয়, ভয়ে, কিংবা কৌতূহলে। তারা আমার দিকে তাকায় যেভাবে তাকায় একটি অদ্ভুত পশুর দিকে, যে কথা বলতে পারে, কিন্তু তার থাবা এখনও রক্তাক্ত।

    প্রথম মুখোমুখি। এটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, একটি উদ্যানে। ফুল ফুটেছে, গন্ধ ভেসে আসছে, মধু ও মাটির গন্ধ। সে হাঁটছে, তার সঙ্গে অন্যান্যরাও, তারা হাসছে, হালকা কথা বলছে। আমি দূরে, একটি গাছের ছায়ায়, দাঁড়িয়ে। সে আমাকে দেখতে পায়। না, দেখতে পায় না, অনুভব করে। সে তার মুখ ঘুরিয়ে, তার চোখ আমার চোখের সাথে মিলিত হয়। সময় থেমে যায়। ফুলের গন্ধ মিলিয়ে যায়, পাখির ডাক স্তব্ধ হয়। শুধু থাকে সেই দৃষ্টি, যা প্রশ্ন করে না, যা বিস্মিত হয় না, যা কেবল গ্রহণ করে, মূল্যায়ন করে, শ্রেণীবদ্ধ করে। তার চোখে আমি কী দেখি? প্রতিদ্বন্দ্বী? হুমকি? না, কিছুই না। আমি একটি বস্তু, একটি বাধা নয়, একটি উপাদান, যা হয়তো একদিন ব্যবহারযোগ্য হবে, এখন নয়। সে তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, কথা বলতে থাকে, যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু আমার জন্য, সবকিছু ঘটেছে। আমি আক্রান্ত হয়েছি, একটি দৃষ্টির আঘাতে, যা রক্তপাত করে না, কিন্তু গভীরে পৌঁছে, একটি বিষ ঢেলে দেয়, যা ধীরে ধীরে কাজ করে।

    সে চলে যায়। আমি আমার স্থানে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার হাত মুঠোবদ্ধ। আমি আমার নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করি। এটি ব্যর্থ হয়। আমার হৃদয় একটি পাখির মতো, যা খাঁচায় আঘাত করে, পালক ছড়ায়, রক্তাক্ত হয়।

    দ্বিতীয় মুখোমুখি। এবার একটি প্রতিযোগিতায়। তীরন্দাজি। সে দাঁড়িয়েছে এক প্রান্তে, আমি অন্যপ্রান্তে। আমাদের মধ্যে দূরত্ব, কিন্তু দূরত্ব একটি ছলনা, আমরা আসলে একই স্থানে, একই লক্ষ্যের সামনে। সে তার ধনুক তোলে, অতি সহজে, যেন এটি একটি তুলির খোঁচা, একটি কবিতা লেখার মুহূর্ত। সে টানে, ছাড়ে। তীর যায়, বাতাসকে চিরে, একটি সূক্ষ্ম শব্দ করে, তারপর লক্ষ্যে আঘাত করে, ঠিক মাঝখানে। করতালি ওঠে, উচ্ছ্বাস। সে হাসে, একটি নম্র হাসি, যেন এটি কিছুই না, কেবল একটি খেলা।

    এখন আমার পালা। আমি আমার ধনুক তুলি। এটি ভারী, আজ কেন এত ভারী? আমার হাত কাঁপে না, কিন্তু আমার মন কাঁপে। আমি শুধু তার দিকে তাকাই না, আমি অনুভব করি তার দৃষ্টি আমার উপর, একটি হালকা স্পর্শের মতো, যা জ্বালা সৃষ্টি করে। আমি টানি। আমি ছাড়ি। তীর যায়, কিন্তু তার গতিপথ নিখুঁত নয়, একটু বাঁকা, এটি লক্ষ্যের ঠিক বাইরে আঘাত করে। নিঃশব্দতা। তারপর মৃদু করতালি, শিষ্টাচারের করতালি, যা ব্যর্থতার জন্য। আমি আমার ধনুক নামাই। আমি তাকাই না। আমি জানি সে হাসছে না, সে হয়তো করুণা করছে, যা আরও মারাত্মক।

    তৃতীয় মুখোমুখি। একটি সভায়। সে সিংহাসনের পাশে বসে, একজন উপদেষ্টা, একজন যুবরাজ। আমি দূরে, প্রান্তে, একজন সৈনিক, একজন অতিথি। সে বক্তৃতা দিচ্ছে, যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে, ন্যায় সম্পর্কে, ধর্ম সম্পর্কে। তার কথা বুদ্ধিদীপ্ত, সুসংহত, প্রতিটি যুক্তি একটি ইটের মতো, যা দিয়ে সে একটি অট্টালিকা নির্মাণ করে। লোকজন মুগ্ধ। তারা মাথা নড়ায়, সম্মত হয়, তাদের চোখে শ্রদ্ধা। আমি শুনি। আমি বুঝি সে ভুল। না, ভুল না, অসম্পূর্ণ। সে যা বলে, তা তত্ত্ব, বই থেকে নেয়া, গুরুদের কাছ থেকে শোনা। কিন্তু আমি জানি বাস্তবতা। আমি জানি রক্তের স্বাদ, ভয়ের গন্ধ, ধূলির কাঠিন্য। আমি কথা বলতে চাই। আমি বলতে চাই: তুমি কি কখনো ক্ষুধার্ত থেকেছ? তুমি কি কখনো অপমানিত হয়েছ? তুমি কি কখনো নিজের নাম জিজ্ঞাসা করেছ?

    কিন্তু আমি কথা বলি না। কারণ আমি জানি, যদি বলি, তারা শুনবে না। তারা শুনবে শুধু আমার কর্কশ কণ্ঠস্বর, দেখবে আমার উজ্জ্বল কান, মনে করবে আমি অহংকারী, ঈর্ষান্বিত। তাই আমি চুপ করে থাকি। আমি আমার তলোয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরি, যতক্ষণ না আমার আঙুলে ব্যথা হয়।

    তারপর সভা শেষ হয়। সে উঠে দাঁড়ায়, বেরিয়ে যায়, তার চারপাশে লোকজন, তারা তাকে ঘিরে রাখে, প্রশ্ন করে, প্রশংসা করে। আমি একা বসে থাকি, শূন্য কক্ষে, যেখানে এখন মোমবাতির আলো নাচছে, ছায়াগুলো দৈত্যাকার। আমি উঠি। আমি বেরিয়ে যাই, চাঁদের আলোয়, যা শীতল, নিষ্ঠুর।

    আমি নদীর ধারে যাই। এটাই আমার অভ্যাস, আমার পালানোর পথ। জলের দিকে তাকাই। আমার প্রতিবিম্ব দেখি, কিন্তু আজ, প্রতিবিম্ব তার মুখ দেখায়। না, দেখায় না, আমি কল্পনা করি। আমি কল্পনা করি জল তার মুখ, তার চোখ, তার হাসি। আমি একটি পাথর তুলে, প্রতিবিম্বে ছুঁড়ি। এটি ভেঙে যায়, তারপর আবার জোড়া লাগে, আবার আমার মুখ দেখায়, এবার আরও বিকৃত, কাঁদছে।

    "তোমাকে তাকে মোকাবেলা করতে হবে," একটি কণ্ঠস্বর বলে। সারথি। সে এখানে, একটি গাছের নিচে, দাঁড়িয়ে, তার চেহারা অন্ধকারে ঢাকা। "তোমাকে প্রমাণ করতে হবে তুমি তার সমান।"

    "আমি তার সমান," আমি বলি, কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর দুর্বল। "আমি তাকে হারাতে পারি। যুদ্ধে, আমি নিশ্চিত।"

    "কিন্তু যুদ্ধই কি একমাত্র পরীক্ষা?" সারথি জিজ্ঞাসা করে, এগিয়ে আসে, চাঁদের আলো তার মুখের অর্ধেক আলোকিত করে, অর্ধেক অন্ধকারে রাখে। "সে যে ক্ষেত্রে জিতেছে, সেখানে কি তুমি জিততে পারবে? সভায়? মানুষের হৃদয়ে? ন্যায়ের বিতর্কে? সে সব ক্ষেত্রে সে রাজা। তুমি কেবল যোদ্ধা।"

    "তাহলে আমি কী করব?" আমি জিজ্ঞাসা করি, আমার কণ্ঠে আহাজারি।

    "তুমি যা হও, তা সম্পূর্ণভাবে হও," সারথি বলে। "তুমি যোদ্ধা হও, তাহলে মহান যোদ্ধা হও। এত মহান যে লোকেরা ভুলে যাবে তার বক্তৃতা, তার সুন্দর মুখ, তার রাজকীয় রক্ত। তারা শুধু মনে রাখবে তোমার বীরত্ব, তোমার দক্ষতা, তোমার দান। তুমি দানবীর হও। সবকিছু দাও, যতক্ষণ না তুমি নিঃশ্ব হয়ে যাও, এবং তখন, খালি হাতে, তুমি তার চেয়ে মহান হবে। কারণ সে কখনো দেবে না, সে কেবল নেবে, কারণ তার আছে। কিন্তু তুমি দেবে, কারণ তোমার কিছুই নেই। এবং এই দানই তোমাকে অনন্ত করে তুলবে।"

    "কিন্তু সে তো সব পেয়েছে," আমি বলি, হতাশায়। "সে জন্ম থেকেই পেয়েছে। আমি কী দিতে পারি যা তার নেই?"

    "তুমি দিতে পারো ত্যাগ," সারথি বলে। "সে কখনো ত্যাগ করে না, কারণ তার ত্যাগ করার কিছু নেই। সবই তার। কিন্তু তুমি, তোমার যা আছে, তা-ই দাও। তোমার কবচ, তোমার কুণ্ডল, তোমার জীবন। এবং যখন তুমি দেবে, তখন তুমি মুক্ত হবে। আর সে, তার সম্পদে বন্দী থাকবে।"

    আমি বুঝতে পারি না। ত্যাগ কীভাবে বিজয় হতে পারে? দান কীভাবে জয় হতে পারে? এটি যুক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু সারথির কথায় একটি গভীর সত্য আছে, যা যুক্তির ঊর্ধ্বে, একটি কঠিন সত্য, যা পাথরের মতো, যা হজম করা কঠিন।

    "সে আমার শত্রু?" আমি জিজ্ঞাসা করি।

    "শত্রু?" সারথি হাসে, একটি ছোট, শুষ্ক হাসি। "শত্রুত্ব একটি সম্পর্ক, যা স্বীকার করে যে দুজন সমান। সে কি তোমাকে শত্রু বলে মনে করে? না, সে তোমাকে মনে করে একটি বিঘ্ন, একটি অপ্রয়োজনীয়তা, যা একদিন দূর করা হবে। তুমি তার জন্য শত্রু হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ নও।"

    আমার বুকের ভিতর কিছুটা ভেঙে পড়ে। এটি সত্য। আমি তার শত্রু নই, কারণ শত্রুত্বের জন্য সম্মান প্রয়োজন। সে আমাকে সম্মান করে না। সে আমাকে উপেক্ষা করে। এবং উপেক্ষা সবচেয়ে বড় অপমান, সবচেয়ে গভীর ক্ষত।

    "তাহলে আমি কীভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করব?" আমি জিজ্ঞাসা করি, একটি শিশুর মতো যার মনোযোগ চাই।

    "তুমি করবে," সারথি বলে। "যুদ্ধে। যখন তুমি তার সামনে দাঁড়াবে, তোমার ধনুক তোলা, তোমার রথ থামানো। তখন সে তোমাকে দেখবে। তখন সে জানবে তুমি কে। হয়তো তখন খুব দেরি হয়ে যাবে। হয়তো তখন তুমি মরবে। কিন্তু অন্তত সে জানবে।"

    "মৃত্যুই কি একমাত্র উত্তর?" আমি জিজ্ঞাসা করি, আমার কণ্ঠস্বর ফিসফিসে।

    "মৃত্যু কখনো উত্তর নয়," সারথি বলে। "মৃত্যু শুধু একটি বিরতি, একটি বিরামচিহ্ন, একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো, যা বাকিটা অসমাপ্ত রেখে যায়। উত্তর থাকে জীবিতদের জন্য, যারা ব্যাখ্যা করে। তুমি কি চাও সে তোমার মৃত্যু ব্যাখ্যা করুক? নাকি তোমার জীবন?"

    আমি চুপ করে থাকি। আমি জানি না। আমি শুধু জানি আমি ক্লান্ত, এই প্রতিযোগিতায়, এই অনুভূতিতে যে আমি সবসময় পিছিয়ে আছি, এমন একটি দৌড়ে যেখানে আমি শুরু করেছি অনেক পরে, এবং তার পরেও আমাকে বোঝা বহন করতে হচ্ছে, একটি স্বর্ণের বোঝা, একটি অপমানের বোঝা।

    "আমি বিশ্রাম চাই," আমি বলি।

    "বিশ্রাম আসবে," সারথি বলে। "কিন্তু এখন নয়। এখন তুমি প্রস্তুতি নাও। কারণ সময় আসছে। এবং যখন আসবে, তুমি তার মুখোমুখি হবে। এবং তখন, তুমি একটি পছন্দ করবে: তুমি কি তাকে বলবে তুমি কে? নাকি তুমি শুধু যুদ্ধ করবে, একটি নামহীন যোদ্ধা হিসেবে? একটি ছায়া, যে আলোর সাথে লড়াই করে, কিন্তু কখনো আলো হয় না?"

    সারথি চলে যায়, অন্ধকারে মিলিয়ে। আমি একা থাকি, চাঁদের আলোয়, নদীর ধারে। আমি আমার কবচ স্পর্শ করি। এটি ঠাণ্ডা। আমি আমার কান স্পর্শ করি। তারা গরম, যেন লজ্জায় জ্বলছে।

    আমি ফিরে যাই। আমার কক্ষে, আমি আমার অস্ত্রগুলি পরিষ্কার করি। আমি আমার তলোয়ার ঘষি, যতক্ষণ না আমি তার মধ্যে আমার প্রতিবিম্ব দেখতে পাই, একটি বিকৃত মুখ, একটি ক্লান্ত মুখ। আমি আমার ধনুকের ছিলা পরীক্ষা করি, এটি শক্ত, প্রস্তুত। আমি আমার রথের চাকার কথা মনে করি, তাদের  তাদের গতি।

    আমি ঘুমাতে যাই। আমি স্বপ্ন দেখি। আমি স্বপ্ন দেখি একটি মাঠ, যেখানে আমরা দুজন লড়াই করছি, কিন্তু আমাদের কোনও অস্ত্র নেই, আমরা শুধু দাঁড়িয়ে আছি, মুখোমুখি, এবং সে জিজ্ঞাসা করছে, "তুমি কে?" এবং আমি উত্তর দিতে পারছি না, আমার গলা থেকে শব্দ বের হয় না, শুধু একটি কর্কশ শব্দ। সে হাসে, তারপর ঘুরে যায়, চলে যায়, এবং আমি পিছনে পড়ে থাকি, একটি মূর্তির মতো, পাথরের, যা ক্রমশ ধূলিতে পরিণত হচ্ছে, বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।

    আমি জেগে উঠি, ঘর্মাক্ত। ভোর হয়নি। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। আকাশে তারা এখনও জ্বলজ্বল করছে। তারা কি জানে? তারা কি দেখেছে আমাদের? তারা কি দেখেছে তার জয়, আমার পরাজয়, যেটা এখনও ঘটেনি, কিন্তু যেটা অবশ্যম্ভাবী?

    আমি উঠে দাঁড়াই। আমি বেরিয়ে যাই, ঘোড়া নিয়ে, মাঠে, যেখানে কেউ নেই, শুধু ঘাস, যা শিশিরে ভেজা, এবং দূরের পাহাড়, যা এখনও অন্ধকার। আমি দৌড়াই। আমি আমার ঘোড়াকে দৌড়াতে দিই, যত দ্রুত সম্ভব, বাতাসকে কেটে, যেন আমি পলায়ন করছি, কিন্তু আমি জানি আমি পলায়ন করছি না, আমি দৌড়চ্ছি একটি বৃত্তে, যা আমাকে আবার সেই জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে আছে, যেখানে আমি আছি, যেখানে আমরা মুখোমুখি হব।

    সূর্য ওঠে। প্রথম রশ্মি পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করে, সোনালি করে। আমি থামি। আমি নিঃশ্বাস নিই। বাতাস ঠাণ্ডা, তাজা। এটি আমাকে সচেতন করে। আমি ফিরে যাই।

    দিন যায়। আমি অনুশীলন করি। আমি আরও কঠিন, আরও নিখুঁত হই। আমি লক্ষ্য ভাঙি, তলোয়ার চালাই, রথ চালাই। অন্যরা আমার দিকে তাকায়, তারা বলে, "সে অদম্য।" কিন্তু আমি জানি এটি সত্য নয়। আমি খুবই দমনযোগ্য। একটি দৃষ্টি, একটি প্রশ্ন, একটি হাসি আমাকে দমন করতে পারে।

    একদিন,খবর আসে। যুদ্ধ আসছে। একটি মহান যুদ্ধ, যা সবকিছু নির্ধারণ করবে। সবাই প্রস্তুত। আমি আমার মিত্রের কাছে যাই। সে তার তাবুতে, মানচিত্র দেখছে, পরিকল্পনা করছে। সে আমার দিকে তাকায়, হাসে, বলে, "তুমি থাকবে আমার পাশে, হ্যাঁ? আমরা জিতব।" আমি মাথা নাড়ি। আমি বলি, "হ্যাঁ।" কিন্তু আমার হৃদয়ে, আমি জানি না। আমি জানি না আমি কার পক্ষে।

    আমি বেরিয়ে আসি। আমি দেখি সে, প্রতিদ্বন্দ্বী, সে তার ভাইদের সাথে, তাদের চেহারা গম্ভীর, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি ঐক্য আছে, একটি বন্ধন, যা শব্দের প্রয়োজন করে না। তারা একে অপরের দিকে তাকায়, তারা বোঝে। আমার কেউ নেই। আমার আছে শুধু আমার মিত্র, যে আমাকে ব্যবহার করে, এবং সারথি, যে আমাকে প্রলোভন দেখায়।

    আমি আমার তাবুতে ফিরে যাই। আমি আমার কবচ খুলি। আমি তাকে দেখি, স্বর্ণের, জ্বলজ্বলে। আমি মনে করি গুরুর কথা: দান করো, এবং মহান হও। আমি মনে করি সারথির কথা: দান করো, এবং মুক্ত হও। আমি কবচটি ধরি। এটি ভারী। এটি আমার জীবন। আমি কি এটি দান করব? কাকে? কখন?

    কিছুক্ষণ পরে, একজন ব্রাহ্মণ আসে। সে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত। সে ভিক্ষা চায়। সে আমার দিকে তাকায়, তার চোখে একটি চাহনি, একটি আকাঙ্ক্ষা, একটি প্রয়োজন। আমি আমার কবচের দিকে তাকাই। আমি আমার প্রতিজ্ঞার কথা মনে করি: আমি যা পাব, তা দান করব। আমি যা আমাকে জিজ্ঞাসা করব, তা দান করব। ব্রাহ্মণ কিছু বলে না। সে শুধু তাকিয়ে থাকে।

    আমি জানি এটি একটি পরীক্ষা। এটি সারথির পাঠানো পরীক্ষা। বা হয়তো ভাগ্যের। আমি আমার কবচ খুলি। আমি ব্রাহ্মণের হাতে দিই। এটি আমার শরীর থেকে আলাদা হয়, একটি শব্দ করে, যেন একটি অঙ্গ কাটা পড়ল। আমার বুক হালকা হয়, কিন্তু একটি শূন্যতা অনুভব করে, একটি ঠাণ্ডা বাতাস যা সরাসরি হৃদয়ে প্রবেশ করে। ব্রাহ্মণ কবচ নেয়, কোনো কথা না বলে, চলে যায়। সে ফিরে তাকায় না।

    আমি আমার তাবুতে বসে থাকি। আমার বুক খোলা, সংবেদনশীল। আমি আমার কুণ্ডলগুলির কথা মনে করি, যা এখনও আমার কানে আছে। আমি সেগুলিও দান করব? হয়তো। হয়তো সবকিছু।

    রাত নেমে আসে। আমি বেরিয়ে যাই, আকাশের দিকে তাকাই। তারা এখন উজ্জ্বল, যেন তারা উদযাপন করছে। তারা কি উদযাপন করছে আমার দান? নাকি আমার মূর্খতা?

    আমি নদীর দিকে যাই না। আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি, মাঠে, একা, একটি গাছের মতো যা তার ছায়া হারিয়েছে। আমি আমার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করি। আমি দেখি যুদ্ধ, রক্ত, ধূলি। আমি দেখি সে, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, তার চোখে বিস্ময় যখন সে জানবে আমি কে। আমি দেখি আমার মৃত্যু, তার হাতে, বা অন্য কারো হাতে। এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, শেষ মুহূর্তে, আমি জানব কে আমি। আমি কি রাজপুত্র? নাকি দানবীর? নাকি শুধু একটি ছায়া, যা আলোর সাথে লড়াই করে, এবং হারিয়ে যায়?

    আমি আমার চোখ বন্ধ করি। আমি সূর্যের কথা মনে করি, আমার পিতা। আমি জিজ্ঞাসা করি: তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে? কোনো উত্তর নেই। শুধু গরম, দূরের গরম, যা কখনো নিকটে আসে না।

    আমি আমার তাবুতে ফিরে যাই। আমি ঘুমাতে যাই। কোনো স্বপ্ন নেই। শুধু অন্ধকার, গভীর, সম্পূর্ণ, একটি কূপের মতো যার তলায় জল নেই, শুধু নিঃশব্দতা, শুধু শূন্যতা।

    এবং এই শূন্যতার মধ্যে, আমি প্রস্তুত হই। যুদ্ধের জন্য। শেষ যুদ্ধের জন্য। যে যুদ্ধ আমার জীবনের যুদ্ধ নয়, আমার পরিচয়ের যুদ্ধ, আমার অস্তিত্বের যুদ্ধ। আমি জিতব না। আমি শুধু লড়ব। এবং লড়াই করাই হবে আমার বিজয়, আমার ব্যর্থতা, আমার সবকিছু, এবং আমার কিছুই নয়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন