এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভাঙনের রাজনীতি, রাজনীতির ভাঙন

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩১ বার পঠিত
  • যখন এই লেখা লিখছি তখন বঙ্গ রাজনীতিতে কিছুটা শোরগোল পড়েছে  এক নবীন  বামপন্থী কর্মীর দলত্যাগের ইচ্ছে প্রকাশ নিয়ে। সংসদীয় আসন শূণ্যতার মধ্যেও কম্যুনিস্ট দলগুলোর প্রতি আগ্রহ মানুষের একটু আলাদা কারণেই থাকে। আবার এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে রোগগুলোতে বামপন্থী বিশেষত  কম্যুনিস্ট দলগুলি ভুগেছে এত দিনেও তার কোনো নিরসন হয় নি। এক্ষেত্রে এই রোগের নাম গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নামে আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা চালানো । ফলে দলের অঙ্গহানি। অতীতে বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাঙনগুলো এই কারণেই হয়েছে। নামে মতাদর্শ বলা হলেও আসলে বিরোধ হয়েছে বিভিন্ন কৌশলগত প্রশ্নে।আসলে কৌশলও নয়, সুবিধাবাদ আর নীতিদৌর্বল্যের প্রশ্নে। 

    বলছি বটে রাজনীতির ভাঙন, আসলে তা মূল্যবোধের ভাঙন। রাজনীতি যখন ভেতর থেকে হালকা, ফোঁপরা হয়ে যায় তখন তা  ভেতরে ভেতরে ভাঙতেই থাকে অনেক কিছু। সেই ভাঙনে সবকিছু খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় এমন নয়,কিন্তু ভেতরে ভেতরে অকালবার্ধক্যের হাড়ের মত ভঙ্গুর হয়ে থাকে অনেক কিছু। বিশ্বাসকে নষ্ট করে সন্দেহ। সন্দেহ যে অমূলক  থাকে সর্বদা তাও নয়। 

    আরেকটু কংক্রিটভাবে বলা যাক। ১৯৭৭ সালে এরাজ্যে পালাবদলের পর সাধারণ মানুষের মনে কত আশা, কত বিশ্বাস।উৎসাহের প্রাবল্যে কিছু ভুল সত্ত্বেও মানুষ তখন বিশ্বাস করত যে এসব আসলে ভুলই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব থিতিয়ে এলে সেই বিশ্বাসের জোরও কমে গেল। বন্ধ কারখানার শ্রমিক দিনের পর দিন কারখানার গেটে এসে ফিরে যেতে যেতে বুঝল যে এই ব্যবস্থায় তার লাল ঝাণ্ডার ইউনিয়ন গতানুগতিক প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে পারবে না। মধ্যবিত্ত ও শিক্ষকদের অবস্থা অনেকটা ভালো হল বটে কিন্তু তাঁরাও বুঝলেন যে মিটিংয়ে মিছিলে চেতনায় শান না দিলেও বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যে নৈবেদ্যের ফলমূল ঠিকই জুটে যাবে। আসলে মিছিলগুলিও হয়ে পড়েছিল এতই গতানুগতিক যে মিছিলের সামনের অংশ থেকে শ্লোগান পেছনের দিকেই পৌঁছাচ্ছিল না--- দিল্লী বা পেন্টাগন তো দূরের কথা। এই ফিকে হয়ে আসা গতানুগতিক বামপন্থা যত নিয়মতান্ত্রিক আর আনুষ্ঠানিক হচ্ছিল, যত তাতে সৃজনশীলতার ঘাটতি ঘটছিল , ততই তা ভেতরে ভেতরে ভাঙ্গছিল । ক্ষমতার পালাবদলের পর যা এল তা হল ব্যক্তিপূজার রাজনীতি। সাধারণ মানুষ হয়ে দাঁড়াল বৃহৎ গ্রাহক গোষ্ঠী। রাজনীতিকে আরও হালকা, চটকদার ও দেখনসুলভ  করে তোলার জন্য সিনেমা সিরিয়ালের অভিনেতা আর অভিনেত্রীদের সাংসদ, বিধায়ক বানানো শুরু হল। একই সঙ্গে শুরু হল ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি। যার বিরুদ্ধে মূল্যবোধ আর আদর্শভিত্তিক রাজনীতির স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো অসহায়ভাবে কোণঠাসা বোধ করতে লাগলেন। প্রলোভনের উপঢৌকন দিয়ে দলবদলের রাজনীতিকে  স্বাভাবিক করে তোলা হল। সাধারণ ভোটারও দেখলেন তার ভোটে জেতা প্রার্থী কীরকম অনায়াসে ঠিক বিপরীত দলে চলে যাচ্ছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শের ভাঙ্গন এর চেয়ে আর বেশি কী হতে পারে ? 

    নদীর এক পাড় যখন ভাঙ্গে তখন আর এক পাড় গড়ে ওঠে এরকম একটা কথা চালু  আছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও কী সেরকম হওয়ার কথা, বিশেষত আমি যে পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা করলাম সেখানে ? যদি ঘটমান মূর্ত বাস্তবতার দিকে তাকানো  যায় তাহলে দিগন্তে বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না,এক অপরিসীম  শূণ্যতা ছাড়া। কিন্তু যদি সম্ভাবনার কথা বলা হয় তবে সত্যিই ভাঙনের পাশাপাশি গড়ে  ওঠার ভবিতব্যকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কে না জানে পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা দেশেই এমন সব দ্বিমেরু বিভাজন গড়ে তোলা হচ্ছে, এমন সব দেখনদারির লড়াই তৈরি করা হচ্ছে  যাতে মানুষের  জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলি চাপা পড়ে যায়। এবার সেগুলো নিয়ে আন্দোলন করার জন্য যে  রাজনৈতিক দলগুলির ময়দানে থাকার কথা বিভিন্ন কারণে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। তাদের সাংগঠনিক পদ্ধতি এবং কলাকৌশলও যুগোপযোগী, সৃজনশীল এবং আকর্ষণীয় নয়। যেমন অনেকেই ভাবছেন, এখন কিছূটা সোচ্চারেই, যে একটা রাজনৈতিক  মঞ্চ বা দল দরকার যা সাংবিধানিক মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করবে। বিশেষত বিভিন্ন বাম দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এরকম স্বপ্ন দেখে চলা মানুষের সংখ্যা এখনও নগণ্য নয়। মানব সভ্যতার পক্ষে চরম ক্ষতিকর পুঁজিবাদের যে রোগগুলি যেমন আর্থিক বৈষম্য, যুদ্ধ, পরিবেশের বিপর্যয় – এসবের বিরুদ্ধে  একজোট হওয়ার প্রয়োজনীয়তা  তো একটুও কমে নি, বরং বেড়েছে। মুশকিল হল পরিবর্তনের আবাহক পুরোনো দল, সংগঠন এবং সাংগঠনিক ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে যেটুকু প্রতিরোধ করা যায় তা পর্যাপ্ত নয় । ফলে অভিন্ন মঞ্চ বা দল, যেখানে উল্লম্ব নয় যতটা সম্ভব আনুভূমিক রীতিতে দল বা সংগঠন পরিচালিত হবে তার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।
     
     এই সম্ভাবনার পথেই ভাঙ্গনের রাজনীতি ইতিবাচক পূর্ণতা পেতে পারে। নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়। 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন