যখন এই লেখা লিখছি তখন বঙ্গ রাজনীতিতে কিছুটা শোরগোল পড়েছে এক নবীন বামপন্থী কর্মীর দলত্যাগের ইচ্ছে প্রকাশ নিয়ে। সংসদীয় আসন শূণ্যতার মধ্যেও কম্যুনিস্ট দলগুলোর প্রতি আগ্রহ মানুষের একটু আলাদা কারণেই থাকে। আবার এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে রোগগুলোতে বামপন্থী বিশেষত কম্যুনিস্ট দলগুলি ভুগেছে এত দিনেও তার কোনো নিরসন হয় নি। এক্ষেত্রে এই রোগের নাম গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নামে আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা চালানো । ফলে দলের অঙ্গহানি। অতীতে বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাঙনগুলো এই কারণেই হয়েছে। নামে মতাদর্শ বলা হলেও আসলে বিরোধ হয়েছে বিভিন্ন কৌশলগত প্রশ্নে।আসলে কৌশলও নয়, সুবিধাবাদ আর নীতিদৌর্বল্যের প্রশ্নে।
বলছি বটে রাজনীতির ভাঙন, আসলে তা মূল্যবোধের ভাঙন। রাজনীতি যখন ভেতর থেকে হালকা, ফোঁপরা হয়ে যায় তখন তা ভেতরে ভেতরে ভাঙতেই থাকে অনেক কিছু। সেই ভাঙনে সবকিছু খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় এমন নয়,কিন্তু ভেতরে ভেতরে অকালবার্ধক্যের হাড়ের মত ভঙ্গুর হয়ে থাকে অনেক কিছু। বিশ্বাসকে নষ্ট করে সন্দেহ। সন্দেহ যে অমূলক থাকে সর্বদা তাও নয়।
আরেকটু কংক্রিটভাবে বলা যাক। ১৯৭৭ সালে এরাজ্যে পালাবদলের পর সাধারণ মানুষের মনে কত আশা, কত বিশ্বাস।উৎসাহের প্রাবল্যে কিছু ভুল সত্ত্বেও মানুষ তখন বিশ্বাস করত যে এসব আসলে ভুলই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব থিতিয়ে এলে সেই বিশ্বাসের জোরও কমে গেল। বন্ধ কারখানার শ্রমিক দিনের পর দিন কারখানার গেটে এসে ফিরে যেতে যেতে বুঝল যে এই ব্যবস্থায় তার লাল ঝাণ্ডার ইউনিয়ন গতানুগতিক প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে পারবে না। মধ্যবিত্ত ও শিক্ষকদের অবস্থা অনেকটা ভালো হল বটে কিন্তু তাঁরাও বুঝলেন যে মিটিংয়ে মিছিলে চেতনায় শান না দিলেও বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যে নৈবেদ্যের ফলমূল ঠিকই জুটে যাবে। আসলে মিছিলগুলিও হয়ে পড়েছিল এতই গতানুগতিক যে মিছিলের সামনের অংশ থেকে শ্লোগান পেছনের দিকেই পৌঁছাচ্ছিল না--- দিল্লী বা পেন্টাগন তো দূরের কথা। এই ফিকে হয়ে আসা গতানুগতিক বামপন্থা যত নিয়মতান্ত্রিক আর আনুষ্ঠানিক হচ্ছিল, যত তাতে সৃজনশীলতার ঘাটতি ঘটছিল , ততই তা ভেতরে ভেতরে ভাঙ্গছিল । ক্ষমতার পালাবদলের পর যা এল তা হল ব্যক্তিপূজার রাজনীতি। সাধারণ মানুষ হয়ে দাঁড়াল বৃহৎ গ্রাহক গোষ্ঠী। রাজনীতিকে আরও হালকা, চটকদার ও দেখনসুলভ করে তোলার জন্য সিনেমা সিরিয়ালের অভিনেতা আর অভিনেত্রীদের সাংসদ, বিধায়ক বানানো শুরু হল। একই সঙ্গে শুরু হল ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি। যার বিরুদ্ধে মূল্যবোধ আর আদর্শভিত্তিক রাজনীতির স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো অসহায়ভাবে কোণঠাসা বোধ করতে লাগলেন। প্রলোভনের উপঢৌকন দিয়ে দলবদলের রাজনীতিকে স্বাভাবিক করে তোলা হল। সাধারণ ভোটারও দেখলেন তার ভোটে জেতা প্রার্থী কীরকম অনায়াসে ঠিক বিপরীত দলে চলে যাচ্ছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শের ভাঙ্গন এর চেয়ে আর বেশি কী হতে পারে ?
নদীর এক পাড় যখন ভাঙ্গে তখন আর এক পাড় গড়ে ওঠে এরকম একটা কথা চালু আছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও কী সেরকম হওয়ার কথা, বিশেষত আমি যে পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা করলাম সেখানে ? যদি ঘটমান মূর্ত বাস্তবতার দিকে তাকানো যায় তাহলে দিগন্তে বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না,এক অপরিসীম শূণ্যতা ছাড়া। কিন্তু যদি সম্ভাবনার কথা বলা হয় তবে সত্যিই ভাঙনের পাশাপাশি গড়ে ওঠার ভবিতব্যকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কে না জানে পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা দেশেই এমন সব দ্বিমেরু বিভাজন গড়ে তোলা হচ্ছে, এমন সব দেখনদারির লড়াই তৈরি করা হচ্ছে যাতে মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলি চাপা পড়ে যায়। এবার সেগুলো নিয়ে আন্দোলন করার জন্য যে রাজনৈতিক দলগুলির ময়দানে থাকার কথা বিভিন্ন কারণে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। তাদের সাংগঠনিক পদ্ধতি এবং কলাকৌশলও যুগোপযোগী, সৃজনশীল এবং আকর্ষণীয় নয়। যেমন অনেকেই ভাবছেন, এখন কিছূটা সোচ্চারেই, যে একটা রাজনৈতিক মঞ্চ বা দল দরকার যা সাংবিধানিক মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করবে। বিশেষত বিভিন্ন বাম দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এরকম স্বপ্ন দেখে চলা মানুষের সংখ্যা এখনও নগণ্য নয়। মানব সভ্যতার পক্ষে চরম ক্ষতিকর পুঁজিবাদের যে রোগগুলি যেমন আর্থিক বৈষম্য, যুদ্ধ, পরিবেশের বিপর্যয় – এসবের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তো একটুও কমে নি, বরং বেড়েছে। মুশকিল হল পরিবর্তনের আবাহক পুরোনো দল, সংগঠন এবং সাংগঠনিক ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে যেটুকু প্রতিরোধ করা যায় তা পর্যাপ্ত নয় । ফলে অভিন্ন মঞ্চ বা দল, যেখানে উল্লম্ব নয় যতটা সম্ভব আনুভূমিক রীতিতে দল বা সংগঠন পরিচালিত হবে তার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।
এই সম্ভাবনার পথেই ভাঙ্গনের রাজনীতি ইতিবাচক পূর্ণতা পেতে পারে। নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।