এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  রাজনীতি

  • এসআইআর বিরোধী আন্দোলন — সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষার দাবী ক্ষতিকারক  

    Bhattacharjyo Debjit লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ১০ মার্চ ২০২৬ | ১৪৬ বার পঠিত
  • বিহারে 'সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষা’র আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সহ আরও ১২টি রাজ্যে এসআইআর করবার দুঃসাহস দেখালো রাষ্ট্র। এই আন্দোলন কেন ব্যর্থ হল, কোথায় তার খামতি ছিল, সেইসব খোঁজার দরকার ছিল। কিন্তু, এ কাজ করবে কে? এ কাজ করা সম্ভব — সর্বাধুনিক মতাদর্শে বিশ্বাসী, রাষ্ট্র বিরোধী যুদ্ধ পরিচালনাকারী, শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে চলা কমিউনিস্ট বিপ্লবী পার্টির। নানা কারণে সেই অসম্ভবতা, সর্বাধুনিক মতাদর্শে বিশ্বাসী কমিউনিস্ট বিপ্লবী পার্টির অনুপস্থিতি পশ্চিমবঙ্গকে বিহারের পাশে নিয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গ এসআইআর বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলবার ক্ষেত্রে প্রথম থেকে অনেকখানি পিছিয়ে ছিল।

    এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের শুরুয়াত: 

    এ রাজ্যে এসআইআর শুরু হয়েছিল ৪ঠা নভেম্বর। তখন টিমটিম করে অর্ধেক জ্বলে থাকা কিছু আলো অনেকের কাছে বর্ষাকালের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতন হালকা আশার আলো হয়ে উঠেছিল। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল রাজনৈতিক — তাঁরা সেই সময় থেকে এটিকে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করবার হাতিয়ার হিসেবে জনগণের মাঝে তুলে ধরেছিলেন। যেখানে বাকি মূলধারার সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এসআইআরের পক্ষে ছিল। কোনো দল 'স্বচ্ছ' এসআইআর চেয়ে বসলো, আবার কেউ কেউ "দেখি কী হয়" বলে চুপ রইলো, কেউ সরাসরি এর পক্ষে অবস্থান নিলো (পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে)। এমন ধরনের সব উদ্ভট, রাজনৈতিক উদাসীনতা, জনগণের প্রতি আন্তরিকতার অভাব, জনগণের অধিকারকে রাজনৈতিকভাবে ভাগ করে শাসন করার নীতি — রাজ্যে এসআইআরে কাজকে সম্পন্ন করতে সাহায্য করলো। অনেক নেতিবাচক অবস্থার মধ্যেও একমাত্র আশার আলো সেই টিমটিম করে জ্বলে থাকা কিছু আলো। তাঁদের মারফতই এসআইআর বিরোধী আন্দোলনে প্রধান স্লোগান হল — 'নাগরিকত্ব বাঁচাও বা এসআইআর-এনআরসি বাতিল করো'। কিন্তু, কমিউনিস্ট বিপ্লবী পার্টির অভাব, রাজনৈতিক সংকট আবারও ফুটে উঠলো। কীভাবে এটি বাতিল হবে, কোন পদ্ধতিতে হাঁটলে এটিকে বাতিল করানো সম্ভব হবে, তা নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়ায় অনেকখানি ঘাটতি ছিল। যাঁরা বললেন, এন্যুমুরেশন ফর্ম পূরণ করলে বহু বিপদের আশঙ্কা আছে, তাঁরা নিজেরাই, সিংহ ভাগই ফর্মপূরণ করলেন, হয়তো তা পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে। তবে তখনও প্রধান স্লোগান,  লক্ষ্য একটাই ছিলো — ‘নাগরিকত্ব বাঁচাও বা এসআইআর-এনআরসি বাতিল করো’। এই প্রধান লক্ষ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরেই 'শুনানি' র সময় পরিষ্কার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেল যে, শুনানির বিরোধিতা করা, শুনানি বন্ধ করানোতে জোর দেওয়া দরকার। তার জন্য শুনানি কেন্দ্র থেকে নানা জায়গা জুড়ে শুনানি বন্ধ করানোর দাবিতে কর্মসূচি গৃহীত হলো। এই উদ্যোগ, কর্মসূচির মাধ্যমে অনেকে আরও অনেকখানি শক্তি পেলো, যখন অনেক জায়গার জনগণ 'শুনানি বন্ধ করানো'র আকাঙ্খায় রাস্তায় নামলেন, প্রতিবাদ করলেন, বিক্ষোভ দেখালেন। তখন অনেকেই খানিক মনোবল বাড়িয়ে এন্যুমুরেশন ফর্ম পূরণ করা সত্ত্বেও কর্মসূচি গ্রহণ করতে জোর পেলেন। নতুন ভোটার তালিকা বেরোনোর আগে পর্যন্ত এমনভাবে খামতি-গর্ত-ভরাট - তিন ধরনের চরিত্রের টানাটানির দ্বারা এ আন্দোলন মৌলিকভাবে সঠিক দিকে এগোচ্ছিল। রাষ্ট্র সেই দেখে আতঙ্কিত হয়ে, এ আন্দোলনকে ভেতর থেকে খুইয়ে দিতে দুই দিকের দুই ধরনের পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলো; এক, রাজনৈতিক; দুই, সামরিক। আন্দোলনকে আদর্শগত, রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জননেত্রী বানালো হলো, তিনি আবারও হয়ে উঠলেন ‘বাংলার বাঘিনী', 'বাংলাকে বাঁচাতে' ছুটে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দুয়ারে। সেইখানে এসআইআর-এনআরসি বাতিলের প্রশ্নকে চেপে দিয়ে আওয়াজ তুললেন শুধুই 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির' ব্যাপারে। এটা নাগরিকত্ব বাঁচানোর আন্দোলন গোড়া থেকে দুর্বল করার, ভাঙবার রাজনৈতিক কৌশলের প্রাথমিক পদক্ষেপ ছিলো। এটাই প্রধান ছিলো। দুই নম্বর, সামরিকভাবে আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমন নামানোর নির্দেশ এলো, বিচার ব্যবস্থার পক্ষ থেকে। মূলত এই জন্যই রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রের দানবীয় বাহিনী নতুন ভোটার তালিকা বেড়ানোর আগেভাগে রাজ্যে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘাঁটি বানালো। এখন সকলে মিলে আদিবাসী ও মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোতে ডেরা বানিয়েছে, বন্দুক-লাঠি হাতে ইউনিফর্ম পরে প্রতিদিন মিছিল করছে। রাষ্ট্রের এই কৌশল হল, প্রধানত, মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে অংশ, প্রতিবাদীদের ভয় দেখিয়ে ছন্নছাড়া, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হাতিয়ার মাত্র।(যদি আন্দোলনের গতি রাজনৈতিকভাবে সঠিক দিকে থাকে, এক্ষেত্রে, SIR-NRC বাতিলের জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও না সরে)।

    নতুন ভোটার তালিকা বেড়ানোর পর:

    মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধরে রাষ্ট্রের এক অংশ যে পুরোনো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলা দাবিকে তুলে রাস্তায় নামতে চলেছে, এ বার্তা আগেই পাওয়া গেছিলো। যখন মুখ্যমন্ত্রী 'লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র আওয়াজ তোলা শুরু করলেন, সুপ্রিম কোর্টে হাজির হলেন, তাঁকে সামনে রেখে, জনগণের আন্দোলনের জোর দেখে ও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়ার জায়গায় সাময়িক ঠেকনা লাগিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তোলবার জন্য, পুনর্গঠনের জন্য রাষ্ট্র এই উদ্যোগ নিলো। এরই সাথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা বাঁচানোর ও আখের গোছানোর স্বার্থ জড়িত। এই দুই কারণের জন্য প্রধানত, এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের মুখ্য ভূমিকায় একটি স্লোগান জায়গা করে নিচ্ছে, যা আন্দোলনকে গোড়া থেকে দুর্বল করে ও উপর থেকে ভেঙে দিয়ে বিপথগামী করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বানানো। এই স্লোগান হলো — 'ভোটাধিকার রক্ষা করো'। আন্দোলনের নেতৃত্বে কে থাকবেন, কোন কোন জায়গায় কী কী ধরনের উদ্যোগ সংগঠিত হবে, সেইগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিতে রাজনৈতিক বাণিজ্যিক সংস্থা 'আইপ্যাক' আসরে নামে। একধারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরেকধারে আইপ্যাক, চটপট তৈরি হলো, 'ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চ'। এতে যোগ দিলেন — এতদিন উদাসীন হয়ে বসা থাকা, ফুর্তিতে মজে থাকা, মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা কিছু মুসলমান নেতৃত্ব, জনগণের সাথে দীর্ঘদিন ধরে, এক দশক ব্যাপী বিশ্বাসঘাতকতা করা উচ্চবর্ণের মতাদর্শের আচার, আচরণে বিশ্বাসী অনেক দালাল, ধান্দাবাজ, সুবিধাভোগী ও কেতাবি পন্ডিতদের ছোট ছোট গোষ্ঠী বা দলগুলো এবং ব্যক্তিবর্গ (যাদের দালালির কাজ দেখে মমতা অনেককেই ‘ভালো জায়গা’ করে দিয়েছেন, আবার এর মধ্য থেকেও অনেককে নতুন জায়গা করে দেবেন।)। পাকাপোক্ত হল — এসআইআর বিরোধী আন্দোলনের মাঝে বিভাজন, যা জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি বাড়ালো ও জনগণের ঐক্যে বিভাজনের স্রোত ছড়ালো। প্রথম থেকে যাঁরা প্রকৃত অর্থে এসআইআর বাতিল, নাগরিকত্ব বাঁচানোর দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চালালেন, তাঁদের প্রধান দাবির জায়গাতেও দখল বসালো, ও অর্ধেকখানি জায়গাও করে নিলো 'ভোটাধিকার রক্ষা করো'। অর্থাৎ, এসআইআর-এনআরসি বাতিলের দাবি, নাগরিকত্ব বাঁচানোর লড়াইয়ে অর্ধেকখানি জায়গা হল ভোটাধিকার রক্ষা দাবির অন্দোলনের। এই দুই দাবির রাজনৈতিক দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন, দুই দিকের লক্ষ্যের। এসআইআর বাতিল, নাগরিকত্ব বাঁচানোর দাবি পুরোপুরি রাষ্ট্র বিরোধী। কারণ, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের সমগ্র শক্তির জোরের সাথে নাগরিকত্ব সংশোধনী(১৯৮৬-৮৭, ২০০৩, ২০১৯) আইনের দ্বারা দেশের ব্যাপক জনগণ, নাগরিকদের নাগরিকত্ব, ন্যূনতম অধিকারকে খাদের কিনারায় দাঁড় করানো হয়েছিল। আর, 'ভোটাধিকার রক্ষা'র দাবি হলো প্রধানত — রাষ্ট্রের মদতপুষ্ট, শাসক শ্রেণির মধ্যকার কমজোরী অংশ, ভন্ড, লুম্পেন সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার্থে। যারা বাজার বহির্ভূত শোষণ জোর কদমে জারি রাখতে আইন বহির্ভূত নানা কাজের সাথে যুক্ত। এখন অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যাপক জনগণ এদেরই নানা অসহ্যকর চাপে অতিষ্ঠ, বিভ্রান্ত হয়ে এই আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দিকে বাঁক নিয়েছেন। অনেক জনগণ, নাগরিকেরা বলছেন, 'এই বার ভোট দিতে পারব না, তো কী হবে? কী পেয়েছি এতদিন ভোট দিয়ে?' জনগণের এ প্রশ্নগুলো বাস্তব সম্মত ও বিকল্প রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা যুক্ত। দীর্ঘদিনের অত্যাচারের করুণ ফলাফলের বাস্তবিক চিত্র এটাই যে, খাতায় কলমে ব্যাপক জনগণ এতদিন ভোট দেওয়ার অধিকার পেলেও প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রয়োগ করতে পারেননি, জনগণের জীবনযাপনে কোনো প্রকার উন্নতিমূলক ছাপ আসেনি। ফলে, ব্যাপক জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা বোধের বৃদ্ধিবিকাশও ঘটেনি, যার দরুন তাঁরা ভোটাধিকারের আক্ষরিক অর্থ বুঝতে পারে, ভোট ব্যবস্থার স্বাদ পেতে পারে, ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের এদেশের একজন 'নাগরিক' হিসেবে আত্মমর্যাদার জায়গাটা ধরতে পারে, বুঝতে পারে। কিছুই পাননি, কিছুই হয়নি — তাই ভোটার তালিকা থেকে প্রায় কোটি খানেক নাগরিকের নাম বাদ পড়ার পরেও এ নিয়ে বেশিরভাগই খুব একটা চিন্তিত নন।  

    ভোটাধিকার রক্ষার দাবি কেন ক্ষতিকারক:

    ভোটাধিকারের আগে 'সর্বজনীন' শব্দটি বসে। 'সর্বজনীন ভোটাধিকার'-এর আক্ষরিক অর্থ — সকল শ্রেণি-বর্ণ-লিঙ্গের সমানভাবে গণতন্ত্রে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করবার সুযোগ এবং তার সুবিধা পাওয়া। অর্থাৎ, সকলে শুধু ভোট দিতে পারলেই হবে না, ভোটে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বী বাছাই করবার সুযোগও পেতে হবে। যে শ্রেণি-বর্ণ-লিঙ্গ ইত্যাদি গোষ্ঠীর এ সুযোগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা নেই, সেই গোষ্ঠীকে রাষ্ট্র নানাভাবে সাহায্য করবে। এমনটাই সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূল বক্তব্য। 

    নির্বাচন বা ভোট ব্যবস্থার জন্ম হয় প্রাচীন গ্রীসের অ্যাথেন্স শহরে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে। অনেক ঐতিহাসিক এই সময়টিকেই গণতন্ত্রের জন্মকাল বলেছেন। তখনকার অ্যাথেন্সে এই ভোট ব্যবস্থা সর্বজনীন ছিলো না, কেবলমাত্র পুরুষ নাগরিকরা ভোটে অংশগ্রহণ করতেন। এটিকে বলা হতো — ‘সরাসরি গণতন্ত্র’। সেই সময় ভোটের জন্য পাথর, ধাতব চাকতি বা কখনো টুকরো মাটির পাত্র ব্যবহার করা হতো, যা ছিল এক ধরনের প্রাচীন ব্যালট। আধুনিক গণতন্ত্রের জন্ম হয় প্রথম শিল্প বিপ্লবের কোলে — জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, একজাতি রাষ্ট্র গঠন, সামন্ততন্ত্রকে দেশীয় পুঁজিপতিদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার মধ্য দিয়ে। ১৭ শতকের শেষভাগে ইউরোপে যুক্তিবাদ ও বুদ্ধিবাদ, মানবাধিকার এবং সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ১৭৭৬ সালের মার্কিন স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব — গণতান্ত্রিক চেতনার বৃদ্ধিবিকাশের কারণ, ফলস্বরূপ ইউরোপ ও মার্কিনের সকল নাগরিকদের চেতনায় আসে সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রশ্ন, যার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা বাস্তব জীবনে অনুভব করলেন। ইউরোপে ১৮৩২ সালের ‘রিফর্ম অ্যাক্ট’ ভোট বা নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। একে বলা হয় — গণতন্ত্রকে সকলের মাঝে সকলের সাথে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথম বড়ো পদক্ষেপ। ইউরোপ ও আমেরিকায় সকল শ্রেণি-বর্ণ-লিঙ্গের নাগরিকরা এর আওতায় আসেন। সমাজে সার্বজনীন ভোটাধিকার দার্শনিক দিক থেকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
    ভারতের ক্ষেত্রে এসবের বিপরীত, এখানে শিল্প বিপ্লব হয়নি। দেশীয় পুঁজির বিকাশকে ভ্রূণ অবস্থাতেই হত্যা করা হয় — ইউরোপের নানা শক্তিধারী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর দখলদারি চরিত্রের ব্যবসায়িক লোভে। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো ভারতকে প্রথমে কাঁটাছেঁড়া করে অর্থনৈতিকভাবে লুঠ করা শুরু করে (বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে), তারপর আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রিটিশ সহ আরও অনেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ভারতের নানা অঞ্চলগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। ফলে, ভারতে সামন্ততন্ত্র বহাল তবিয়তে টিকে যায় বর্ণ-ভিত্তিক শোষণের উপরে ভীত করে এবং ভারতে অঞ্চল ভিত্তিক দেশীয় পুঁজির বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনে। ঔপনিবেশিক আমলে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ১৯২০ সালে প্রথমবারের মতো সীমিত প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। এ সময় ভারতের শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব হয়, ব্যাপক আকারের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ব্যাপক জনগণের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, জাতীয় মুক্তি স্পৃহা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। তাই ভোট বা নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রবেশের সাথে সাথে অনেক সংগঠনও গড়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের তত্ত্বাবধানে, আন্দোলনগুলোকে পেছন থেকে টেনে ধরা, আইনি বাঁকে ঠেকানো, ঠেকনা দেওয়া ইত্যাদি নানা লক্ষ্যে। তবে এই ভোট ব্যবস্থা  'সর্বজনীন' ছিল না। ভারতে সর্বজনীন ভোটাধিকার আসে ১৯৪৭ সালের পরর্বতীতে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন সরাসরি দেশ ছেড়ে পালানোর পর। ভারতে ১৯৫১-৫২ সালে প্রথম 'সর্বজনীন ভোটাধিকার' অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়টা ছিলো — সামন্তশ্রেণি, সমন্তপ্রভু, জমিদারদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার আন্দোলনগুলোর বিকাশের সময়। এ সময়তেই সংগঠিত হয় তেভাগা, তেলেঙ্গানার মতন সামন্তপ্রভু, জমিদার শ্রেণি বিরোধী উত্তাল কৃষক বিদ্রোহ। এই কৃষক বিদ্রোহগুলো রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন নামিয়ে রোধ করা হয়। পাশপাশি, রাষ্ট্রের তরফ থেকে, সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের স্বার্থে সামন্ততন্ত্রকে আগলে রাখতে রাজনৈতিক সংস্কার হিসেবে, রাষ্ট্রের উপরি কাঠামোয়, উপরের আবরণে 'সর্বজনীন ভোটাধিকার'-কে স্বীকৃতি দেওয়া হয় সাম্রাজ্যবাদী অনুকরণে। সেই সময়তেও ভারতের সকল নাগরিক ভোট দেওয়ার বা ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ, সুবিধা পাননি। লিখিতভাবে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও অনেকটাই কম এই তথাকথিত সর্বজনীন ভোট ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করবার সুযোগ পেয়েছিলেন (৩৭ কোটির মধ্যে মাত্র ১৭ কোটি)। পরর্বতীতে নিয়ম মাফিক 'সর্বজনীন ভোটাধিকার' পর্ব চললেও সত্তর দশকের আগে পর্যন্ত সকল শ্রেণি-বর্ণ-লিঙ্গ ভোটাধিকারের সুযোগ, ভোটে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করবার সুযোগ পাননি। তবে সত্তর দশকে সামন্ত শ্রেণি ও সাম্রাজ্যবাদ এর বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণ, আদিবাসীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নকশালবাড়ি কৃষক বিদ্রোহের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের বিপ্লবী রাজনীতি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিকভাবে প্রায় গোটা দেশ জুড়ে বইতে শুরু করে। তা আটকাতে, নয়া সামন্ত শ্রেণির উত্থান ঘটাতে এবং নিম্নবর্ণ, আদিবাসী ভূমিহীন কৃষক, শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে নানা ধারার রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী গড়ে উঠতে শুরু করে, যারা কেবল বর্ণ ভিত্তিক রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সের সাথে যুক্ত। এটা শুরু হয় সত্তর দশকের শেষভাগে। এই গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা শুরু করে আশির দশকের শুরু ও মধ্যভাগ থেকে। নব্বই দশক থেকে ভারত রাষ্ট্রের সাথে প্রধানত, ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক চুক্তি ভারতের মাটিতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির প্রসার বাড়ায়, সামন্ততন্ত্রকে নিজের মতন করে নতুন নতুন রূপে সাজিয়ে গুছিয়ে নেয় এবং সব কিছুকে ব্যবসায়িক আঙিনায় নামিয়ে আনতে থাকে। ভারতের ভোট ব্যবস্থা বা নির্বাচনী ব্যবস্থা বা সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রকাশ্য প্রহসনে পরিণত হয়। এখন ভারতে একশো শতাংশ (২০১৬-১৭) বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বাণিজ্যিক সময়। যার নির্মম পরিণতি হিসেবে, দুই বছর আগে নির্বাচনের প্রকাশ্য প্রহসনকে সামনে নিয়ে আসে — নির্বাচনী বন্ড। পুঁজিবাদী অর্থনীতি, বুর্জোয়া দর্শন ও ভাবধারায় চলা ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’(EIU)-এর ২০২৪ সালের গণতন্ত্র সূচকে বলা হয়, বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশকে সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক বলা যায়। এ সংস্থা ভারতের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ব্যবস্থা বা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বলে — নির্বাচনী স্বৈরাচার বা নির্বাচনী রাজতন্ত্র। তাদের মতে, এদেশে বাস্তবে গণতন্ত্র আছে কিনা তা সন্দেহজনক, এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ওই সংস্থা 'ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র' হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। সর্বাধুনিক ও বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ, মার্কসবাদী দৃষ্টি দিয়ে গভীরতার সাথে দেখতে গেলে, ভারতে মাটিতে বাস্তবিকভাবে গণতন্ত্র নেই। এই দেশ আধা সামন্ততান্ত্রিক ও আধা ঔপনিবেশিক। এখানে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়া দ্বারা ভাগবাঁটোয়ারা করে, আঞ্চলিক সামন্ত শক্তির হাতে হাত মিলিয়ে, এদের গর্ভ দিয়ে ভারতের বৃহৎ পুঁজিপতিদের (আমলাতান্ত্রিক মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি) জন্ম দেয় এবং তার মাধ্যমে এদেশের সমস্ত কিছুকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করছে। ডব্লুটিও, আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক, ব্রিকস প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলো কাড়াকাড়ি ও ভাগবাঁটোয়ারা স্বার্থের চূড়ান্ত পদক্ষেপে এদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা বা সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রয়োগ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিয়মিত হচ্ছে। একে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাণ ভোমরা বলা যায়, যা আছেই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে। ভারতের আজকের নির্বাচনী ব্যবস্থা সাথে রোমান প্রজাতন্ত্রের (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৭) মিলও দেখা যায়। যেখানে ‘কমিতিয়া’ নামে একটি পরিষদের মাধ্যমে সকল নাগরিকরা  নিয়মিতভাবে কনসাল, প্রেটর, সেনেটর প্রভৃতি প্রতিনিধি নির্বাচন করতেন। কিন্তু, এই নির্বাচন ছিল শ্রেণিভিত্তিক। সকলে অংশগ্রহণ করতে পারলেও ধনীদের ভোটের ওজন বেশি থাকত। মৌলিকভাবে ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা অনেকটা একই রকম, এখানের নির্বাচনী ব্যবস্থা বা সর্বজনীন ভোটাধিকার বর্ণ ও শ্রেণি, দুইয়ের সংমিশ্রণের আধিপত্য-কেন্দ্রিক। ভারতের 'সর্বজনীন ভোটাধিকার' অনেকটা উচ্চবর্ণের 'সর্বজনীন দুর্গোৎসব'-এর মতন, যেইখানে মুখে মুখে সকলের কথা বলা হলেও বাস্তবে গণতান্ত্রিকভাবে এতে সকল শ্রেণি-বর্ণ-লিঙ্গের অংশগ্রহণ করবার জায়গা নেই, সকলের সমান সুযোগ নেই, সমানাধিকার নেই। ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা আধুনিক গণতন্ত্রের ভাবনা বা আদর্শ থেকে শত হস্ত দূরে। বরং, তা ভারতকে নয়া ঔপনিবেশিক বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থ, একটি আধা সামন্ততান্ত্রিক ও আধা ঔপনিবেশিক দেশ বানিয়ে রাখতে চায়। যার উদাহরণে সামান্য উপাদানে প্রকাশ্যে দেখা গেছিল - নির্বাচনী বন্ড। সাম্প্রতিক সময়ে যার উদাহরণের সম্পূর্ণ উপাদান দিয়ে একদম খোলাখুলিভাবে দেখালো — এসআইআর। যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র উপরের কাঠামো, গণতন্ত্রের উপরের দেখানো 'আইনের শাসন' সরাসরি বাতিল করলো। শাসক শ্রেণিগুলোর প্রতিটা অংশ, প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটা রাজনৈতিক দল ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে এসআইআর করে ব্যাপক সংখ্যার আদিবাসী, দলিত, মুসলমান ও নারী তথা শ্রমজীবী নাগরিকদের নাগরিকত্বের সুযোগ, সুবিধা পাওয়ার জায়গা থেকে বাদ দিলো। সামনে রাখা হলো — ভোটাধিকার হরণ। কিন্তু, কেন? কারণ, ভারতে এই ভোটাধিকার কার গেলো, কার থাকলো তাতে ব্যাপক জনগণের কিছুই এসে যায় না। এ নিয়ে জনগণ বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন, তা নিয়ে অসংখ্য উদাহরণ দেখানো যেতে পারে। তাহলে এদেশের ব্যাপক নাগরিক, জনগণের চিন্তা কোথায়? শুধুমাত্র সরকারি সুযোগ, সুবিধা ও নানা নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া নিয়ে। তাই আগে যাঁরা ভোট দিতেন না, তাঁরাও নানা আতঙ্কে এবারে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে তৎপর হয়েছেন, অনেকে নতুন ভোটার কার্ডের আবেদন করেছেন, অনেকে তা নতুন করে বানিয়ে ফেলেছেন — এমন উদাহরণ বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ দুই রাজ্যেই দেখা যায়। তাই ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে কেবলমাত্র নাগরিকত্ব বাঁচানো ও নাগরিক অধিকারগুলো রক্ষা করবার দাবিকে সামনে রেখে, ব্যাপক জনগণকে সংগঠিত করবার মধ্যে দিয়ে। যা রাষ্ট্রের উপরের কাঠামোগত চরিত্র ধরে দেখলে, সর্বজনীন ভোটাধিকারের সাথে আংশিকভাবে যুক্ত হলেও সম্পূর্ণভাবে এক নয়। ঐতিহাসিকভাবে দুইয়ের বাস্তবিক ভিত্তি ও দর্শন আলাদা দিকে বইছে। নাগরিক অধিকার, নাগরিকত্ব বাঁচানো, এসআইআর-এনআরসি বাতিলের দাবি সম্পূর্ণভাবে জনগণকে বাঁচানো, জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করবার জন্য। বিপরীতে সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষা করবার দাবি — রাষ্ট্রকে আগালানোর জন্য, এ আন্দোলনকে গোড়া থেকে দুর্বল করে, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, জনগণের ঐক্যকে ভেঙে দিয়ে বিপথগামী করবার উদ্দেশ্যে। এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে ভোটের ‘মোহ’ ও ভোটাধিকারের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ানোর মধ্যে দিয়ে জনগণের মধ্যে রাষ্টকেন্দ্রিক ঝোঁক বাড়িয়ে তোলার উদ্দেশ্যে। জনগণকে বিদ্রোহ বিমুখ করবার জন্য, স্বনির্ভর না হতে দেওয়ার জন্য। এখানের ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন — দুই ধরনের শ্রেণির স্বার্থে সংগঠিত হয়েছে। এদের নেতৃত্বে তিন ধরনের শ্রেণি একত্রিত (যৌথতায়) হয়ে, চার ধরনের গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গের আমদানি হয়েছে এই আন্দোলনের মাঝে। যাদের স্বার্থে ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন, সেই দুই ধরনের শ্রেণিগুলো হলো - এক, সামন্তশ্রেণি। দুই, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বারা পরিচালিত এদেশীয় বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণি (আমলাতান্ত্রিক মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি)। এক্ষেত্রে, এদের নেতৃত্বের প্রায়োগিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ও তৃণমূল। যুক্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপরতলার বড় অংশ এবং মাঝারিদের এক অংশ। যাঁরা বিশ্বায়ন পরর্বতীতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির প্রসাদের স্বাদ ভালো পরিমাণে পেয়েছেন, যাঁরা ২০১১ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে নানা সুযোগ, সুবিধা পেয়ে 'দিদির ঘোষিত দালাল'-এ পরিণত হয়েছেন। বর্ণগতভাবে এরা সকলেই উচ্চবর্ণ ও উচ্চবর্ণীয় মতাদর্শ, অনুশীলনের সাথে যুক্ত। পাশপাশি, এ আন্দোলনে যুক্ত আছেন, কিছু নিপাট ভদ্র ও ভালো ব্যক্তিত্ব, যাঁরা বাস্তবিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণের তুলনায় অনেক বেশি আবেগে জোর দিয়ে রাজনীতিটাকে দেখেন, রাজনীতি করেন। এঁরা ভালো, এঁদের এই প্রগতি বিরোধী তথাকথিত আন্দোলন থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব এবং প্রয়োজনও। 

    এখন কী করণীয়:

    এসআইআর বিরোধী আন্দোলনে প্রধান দাবি — নাগরিকত্ব বাঁচানো, ভোটাধিকারকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় মদতে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে। এটিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে, এই স্লোগানকে সামনে রেখে, এটিকেই প্রাথমিক ও চুড়ান্ত দাবিতে পরিণত করে নানা রকম পদ্ধতিতে ব্যাপক আকারে প্রচার চালানো দরকার, জনগণের মাঝে জনগণের সাথে। ব্যাপক জনগণের চেতনায় জাগ্রত করা দরকার যে, তাঁরা আগে নাগরিক ও পরে কোনো রাজনৈতিক দলের ভোটার। অথবা, ভোটার নন। পাশপাশি, এ দাবিকে সামনে রেখে অঞ্চলে অঞ্চলে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করা। এ সময়ে এই দুই ধরনের কাজ (রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগঠন) সমানভাবে গুরুত্বপূর্ন। একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেখানে প্রধান শর্তই হলো, রাজনৈতিক দর্শন ও এ আন্দোলনের প্রধান স্লোগান। এর দ্বারাই কেবলমাত্র নিজেদের মতাদর্শভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো ও আগামীতে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের দ্বারা নাগরিকত্ব বাঁচানোর আন্দোলনকে গণআন্দোলনের রূপ দেওয়া এবং এদেশের ব্যাপক জনগণের নাগরিকত্ব রক্ষা করা সম্ভব। এই কাজ হলেই কেবলমাত্র দুই ধারার শক্তি ও শত্রু — যারা সরাসরি জনগণের নাগরিকত্বহরণে যুক্ত(যেমন, আরএসএস ও বিজেপি) এবং যারা প্রথম থেকে জনগণের মাঝে, আন্দোলনের মাঝে নানা বাধা, বিপত্তি খাড়া করে ঘুরপথে নাগরিকত্বহরণের সাথে জড়িত(যেমন, এ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল(প্রধান) ও বাকিরা)। তাদের প্রত্যেককে, প্রতিটি শক্তিকে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে, ক্ষতিকারক দাবী ও বিপথগামী মতাদর্শকে জনগণের থেকে আলাদা করে, এই দুই ধারার শক্তি ও শত্রুর সামগ্রিক শক্তিকে কমজোরী ও দুর্বল করা সম্ভব। এ সময় হলো — বিহার থেকে শিক্ষা নিয়ে, নাগরিকত্ব আগলানোর ও নাগরিক অধিকার বাঁচানোর আন্দোলনকে গোড়া থেকে দর্শনিকভাবে মজবুত করার, নতুন করে সাজাবার সময়। এনআরসি বিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করবার প্রস্তুতি পর্ব।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ১০ মার্চ ২০২৬ | ১৪৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন