বিজেপি শেষ বেলায় দুটো জিনিস করছে। প্রথমটা হল গল্প ছড়ানো। শুরু হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে এবার রেকর্ড ভোট পড়েছে, এই দিয়ে। তারপর শুরু হল, এর পুরোটাই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। সঙ্গে ছেঁটেকেটে ছড়ানো হল বায়রন বিশ্বাসের ভিডিও, যেখানে তিনি বলছেন, তিনি তো হেরেই গেছেন। এবার কান পাতলেই শুনতে পাবেন, উত্তরবঙ্গ তো বিজেপি জিতেই গেছে।
এই গুল্প তৈরির গোদি মিডিয়া আর হোআ ইউনিভার্সিটিকে আমরা যারা অনুসরণ করি, তারা বিলক্ষণ জানি, এসব কিছুই না পারসেপশন তৈরির খেলা। গুজব তৈরির যে সেলগুলো গত বছর দুয়েক নান গুজব তৈরি করেছে, সবাইকে এবার একসঙ্গে নামানো হয়েছে। বস্তুত এটাই প্রমাণ করে যে, উত্তরবঙ্গটা ওরা জিতে যায়নি। বরং উল্টো। জিতে গেলে অমিত শাহ আর মোদিকে পাড়ার মোড়ে মোড়ে ঘুরে মিটিং করতে হতনা। এবং এটা শুধু আমরা বলছি না, প্রসূনদা বিজেপির ভিতরের রিপোর্টের খবর একটা দিয়েছেন। সেখানেও ওই একই তথ্য। যে, প্রথম দফায় বিজেপি, নিজেদের হিসেবেই, এগিয়েছে লবডঙ্কা।
বিজেপির ভিতরের খবর অবশ্য আমি জানিনা। কিন্তু গুলবাজির বাকি ধাপগুলো পরিষ্কার। প্রথমত সংখ্যার বিচারে ভোট কিছুই বেশি পড়েনি। প্রথম দফায় গতবার ভোট পড়েছিল ৩ কোটি ১৪ লক্ষ। এবার ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ। ২২ লাখ বেড়েছে। সেটার সঙ্গে যদি ওই এলাকার বাদ যাওয়া ভোটারদের ধরেন, আন্দাজ ২০ লাখ, তাহলে সংখ্যাটা ৪২ লাখে পৌঁছয়। সেটা নিয়ে জটিল একটা হিসেব করলে দেখবেন, আসলে ভোটদানের হার বেড়েছে ৩%। আগের লেখাতেই সেটা দিয়েছিলাম, নতুন করে দিলাম না। ফলে রেকর্ড ভোট, কথাটারই কোনো মানে নেই। ভোটার কমিয়ে দিলে এমনিই শতকরা বাড়বে। আর ৩% বৃদ্ধি, পুরোটাই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা হবার কোনো কারণই নেই। আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, যেখানে যেখানে লোকে তেমন বাদ যায়নি, সেখানে তেমন কিছু শতাংশ বাড়েনি, বা আদৌই বাড়েনি। যেখানে বেশি বাদ গেছে, সেখানে ভোটের শতাংশ বেড়েছে। নেহাৎ পাগল না হলে এই বৃদ্ধিকে কেউ প্রতিষ্ঠনবিরোধী বলবেনা। মানে, আপনার বাড়ির দুটো লোক বাদ গেল, পাড়ার কিছু লোক বাদ গেল, আর আপনি মহানন্দে এসআইআরের পক্ষে ভোট দিয়ে এলেন, সেটা হয়না। এই বর্ধিতাংশের বেশিটাই এসআইআর বিরোধী ভোট হবারই কথা। আমরা কেউ হাতে টিয়াপাখি নিয়ে বসে নেই, ফলে এটা অনুমানই, কিন্তু যৌক্তিক অনুমান।
আসলে, এইগুলো পারসেপশন তৈরির খেলা। প্রসূনদার ভিডিওতেই শুনলাম, অমিত শাহ হারের গন্ধ পাচ্ছেন। অমিত মালব্য থেকে শুরু করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত পথসভার বক্তা করে পাড়ার নেতার পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছেন। কারণ বাংলায় এবার হারলে ভিটেমাটিচাঁটি হবে। তাই মরীয়া চেষ্ট হিসেবে ঝুঁকি নিয়েও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে আইটি-ভাইটি সেলদের। সেই "আমি সোমা বলছি" থেকে শুরু করে "অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তান দখল হয়ে গেল" বলে প্রচার-টচারে এরা হাত পাকিয়েছে। ভারত জুড়ে বাঙালিকে বাংলাদেশী আখ্য দেবার কৃতিত্ব এদের। এসআইআর আতঙ্কে সীমান্তে ভিড়ের গুলবাজি এরাই দিয়েছে। সঙ্গে নামানো হয়েছে ইডিতে মাথা মুড়িয়ে আসা প্রাক্তন সাংবাদিক, ফলিডলের প্রেসক্রিপশন দেওয়া ডাক্তার, ডেমোগ্রাফি বিশেষজ্ঞ সাহিত্যিক, এই সমস্ত উমিচাঁদ-মিরজাফরদের। তারাই এখন বিজেপিকে জিতিয়ে দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত একটা অংশ এখনও গুলবাজি খায়। এবং এদের আশা, তাদেরকে এখনও টুপি পরানো যাবে।
তো, যাঁরা স্বেচ্ছায় টুপি খাচ্ছেন খান। বাকিদের বলি, অন্যবারের মতোই এবারও গোদি-মিডিয়ার গুলবাজিতে বিন্দুমাত্র কান দেবেন না। এখনও পর্যন্ত বিশ্লেষণ যা, তাতে উত্তরবঙ্গে বিজেপি দস্তুরমতো পিছিয়ে আছে। এবং ভোটের অল্প শতাংশ বৃদ্ধিটা এখনও পর্যন্ত বিজেপির উল্টোদিকেই যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই নিয়ে পুরো লেখাটা শেষ হলেই লিংক গিয়ে দেব। আমার পাতায়, অথবা গুরুর সাইটে নজর রাখবেন। আর আরেকটা জিনিস মনে রাখবেন, এটা গোদি মিডিয়ার ফাঁদে পা দেবার জন্য আদৌ আদর্শ সময় না। কারণ এটা ভোটই না। হিন্দুস্তানি আগ্রাসন, স্পষ্ট এবং প্রকট। বাঙালি খেদানো হবে এরকম রটিয়ে ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। অর্জুন সিং, রাকেশ সিংরা এখনই লাফাচ্ছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ওদেরই রাজত্ব হবে। বিজেপির বাঙালি প্রার্থীরা হিন্দিভাষীদের কাছে এখনই মারধোর খাচ্ছেন, ক্ষমতায় এলে কান ধরে জুতো চাটানো হবে। নইলে ডিটেনশন ক্যাম্প। এই সোজা জিনিসটা যাতে বোঝা না যায়, তাই বিভীষণদের নামানো হয়েছে। ইডির কাছে মাথা মুড়িয়ে আসা সাংবাদিক এখন ইন্টারভিয়ে 'খবর' দিচ্ছেন, ডাক্তার সায়ানাইডের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন, সাহিত্যিক অর্ডারি রূপকথা লিখছেন। এতদিন আমাদের প্রগতিশীলরা এঁদের শাঁসেজলে আহ্লাদ দিয়ে বাড়িয়েছেন, এখন একটু এইসব উপদ্রব হবে। সে হোক, কিন্তু বিশ্বাস করবেন না।
তা, এইটা গেল প্রথমটা। দ্বিতীয়টা হল উত্তর ভারতীয় পৌরুষের আস্ফালন। নারীর ক্ষমতায়নের হদ্দমুদ্দ হচ্ছে একদম। পরশু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কদর্য মিম ছড়ানো হয়েছে, কাল সকালে সাংসদ মিতালী বাগকে আক্রমণ করা হয়েছে, আর বিকেলে পানিহাটিতে সিপিএমের একটি বাচ্চা মেয়েকে মারধোর করা হয়েছে। যা দেখলাম, রত্না দেবনাথ দাঁড়িয়ে উসকানি দিচ্ছেন, তারপর শোনা গেল মার-মার। কী মারা হল, সে আর দেখা যায়নি। এই মেয়েটিই 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস' লিখে কিছুদিন আগে তিলোত্তমা-আন্দোলনে সামিল ছিল। তখন সে মার খায়নি, অতবড় আন্দোলনে কোনো ডান্ডাবাজিই হয়নি কার্যত, শেষমেশ মেয়েটি মার খেল তিলোত্তমার মায়েরই উসকানিতে, যিনি এখন বিজেপির প্রার্থী। এবং যাঁকে বামপন্থী নেতা-কর্মীরা এখনও কাকিমা-কাকিমা করে অপার আহ্লাদ করে চলেছেন।
এটা কিন্তু কোনো আয়রনি নয়, এটাই বস্তুত হবার ছিল। শহরের মাঝখানে এক ডাক্তার ধর্ষিতা এবং খুন হলেন, সে নিয়ে বহু মানুষ পথে নেমেছিলেন, বেশ করেছিলেন। কিন্তু যখনই পুরোটা চলে গেল হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির হাতে, আমাদের প্রতিবাদীরা সেটা না বুঝে পরিণত হলেন হাতের পুতুলে। তাঁদের বলতে দেওয়া হল, প্রচার দেওয়া হল, কিন্তু ততক্ষণই, যতক্ষণ গোদি-মিডিয়ার সুরে সুর মেলালেন। আজ সেই প্রয়োজন ফুরিয়েছে, আপাতত বিজেপির বার্তা পরিষ্কার। নারী স্বাধীনতা, আন্দোলন, সবই ভালো, যতক্ষণ উত্তর-ভারতীয় পৌরুষের বুটের নিচে থাকবে। তাদের স্বার্থে আন্দোলন করবে। দরকার না লাগলে করবেনা। যখন দরকার ছিল নেচেছ কুঁদেছ, এখন না থামলে ঠ্যাঙানি দেওয়া হবে। রত্না দেবনাথ, তাঁর সমস্ত ব্যক্তিগত ক্ষতি নিয়েও, আপাতত এই উত্তর-ভারতীয় পৌরুষের এজেন্ট। তাঁকে কাকিমা-কাকিমা করে আদিখ্যেতা করা, কার্যত অভিজিৎ গাঙ্গুলি বা নারায়ণ ব্যানার্জি বা সুমন চট্টোপাধ্যায়কে তোল্লাই দেবার থেকেও একধাপ খারাপ। কারণ, এর থেকে বোঝা যায় কীভাবে নেচেছেন, কীভাবে নাচানো হয়েছে, গোদি-মিডিয়া এবং এই হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির কর্মপন্থা নিয়ে এখনও যথেষ্ট কান্ডজ্ঞান হয়নি।
মাসের পর মাস বলে চলেছি, এই শেষ ঘন্টায় বলে কী লাভ জানিনা, তবু বামদের আলাদা করে বলব, অনুগ্রহ করে কোনোরকম নরম মনোভাব দেখাবেন না। রামবাম কিছু বিদেয় হয়েছে, কিন্তু কিছু তো এখনও আছে। এটা তাদের অ্যাজেন্ডার প্রতি নরম মনোভাব দেখানোর সময়ই না। রত্না দেবনাথ জিতলে, এমনকি দ্বিতীয় স্থান পেলেও কিন্তু গোবলয়ের পৌরুষ জিতবে। মেয়েদের ঠ্যাঙানি খাওয়া জিতবে। গোদি-মিডিয়া জিতবে। হিন্দুস্তানি আগ্রাসন জিতবে। হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির গুলবাজি জিতবে। আরজিকর গুজবে যে গোদি-মিডিয়া এবং যে হোআ চ্যানেলগুলো কাজে লেগেছিল, তারাই এবারও সক্রিয়, "বিজেপি জিতে গেছে" প্রচার নিয়ে। এই চ্যানেলগুলোই তুবড়ে দেওয়া দরকার। এটা খুব স্পষ্ট করে দেড়-দু বছর আগে থেকে বলা দরকার ছিল। বলা হয়নি, কিন্তু এখন অন্তত বলুন।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।