সুরক্ষার বন্ধন ও প্রতীক্ষিত ইশারা: সমকালীন জনমতের এক নিবিড় ব্যবচ্ছেদ
নির্বাচনের ফল বেরোলেই একটা অদ্ভুত ছবি আমাদের চোখে ভাসে—হাজারো বিকল্প আর প্রার্থীর ভিড়েও দেখা যায়, এক অদৃশ্য জাদুবলে জনস্রোত একজনের বাক্সেই পাহাড়ের মতো জমা হচ্ছে। কেউ পাচ্ছেন পঞ্চাশটি ভোট, আর ঠিক তার পাশের জন হয়তো স্রেফ দুটো ভোট নিয়ে ধুঁকছেন। এই যে সংখ্যাতত্ত্বের আকাশ-পাতাল তফাৎ, এটা কি কেবলই প্রার্থীর জনপ্রিয়তা? নাকি এর গভীরে কাজ করে মানুষের এক জটিল মনস্তত্ত্ব আর ‘অস্তিত্ব রক্ষার আদিম প্রবৃত্তি’? এই প্রশ্নটি থেকেই জন্ম নেয় আজকের এই বিশ্লেষণ।
ব্যক্তি কি একান্তই নিজের স্বাধীন ও যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি দিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচন করে, নাকি এক বিশাল অদৃশ্য জনস্রোতের টানে নিজের অজান্তেই তার ব্যক্তিসত্তা কোনো বৃহত্তর পরিচয়ে বিলীন হয়ে যায়? যখন কোটি কোটি মানুষ একটি নির্দিষ্ট প্রতীকের নিচে সমবেত হন, তখন সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সেটি কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং এক প্রকার 'যৌথ অবচেতন মনের' বহিঃপ্রকাশ।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষ অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়। রাজনীতির হাটে যখন শত শত পসারি পসরা সাজিয়ে বসেন, তখন সাধারণ মানুষ সেই দোকানের দিকেই ঝোঁকে যার পাল্লা আগে থেকেই ভারী। বিষয়টি অনেকটা সেই রাস্তার ধারের বিখ্যাত বিরিয়ানির দোকানের লম্বা লাইনের মতো—দোকানে ঢোকার আগে কেউ বিরিয়ানির স্বাদ পরখ করে দেখে না, কিন্তু লাইনের বহর দেখেই অবচেতন মনে গেঁথে যায় যে, "এত লোক লাইনে দাঁড়িয়েছে মানে মালটা নিশ্চয়ই সেরা হবেই!" এই ‘নিরাপত্তা সমীকরণ’-এর কাছে তখন ব্যক্তিগত যুক্তি হার মেনে যায়। গ্রামশির 'সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ'-এর নিরিখে দেখলে বোঝা যায়, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা মানুষের মনের ভেতরে এমন এক 'অদৃশ্য দেওয়াল' তুলে দেয়, যার বাইরে তাকানোর সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই অবশিষ্ট থাকে না।
এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের দেওয়া বিবিধ পরিষেবা কেবল বস্তুগত প্রাপ্তি নয়, বরং নাগরিকের মনে এক ধরণের ‘মনস্তাত্ত্বিক ঋণ’ তৈরি করে। সমাজবিজ্ঞানে এটিই ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্কের আধুনিক বিবর্তন। এটি অনেকটা সেই পারিবারিক বড়দের আশীর্বাদের মতো—যেখানে ছোটরা মাসিক হাতখরচ আর নিরাপত্তার বিনিময়ে বড়দের ত্রুটিগুলোকেও প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেয়। ঠিক যেমন একটি বিপন্ন চারাগাছ প্রবল ঝড়ে বড় গাছের ছায়ায় আশ্রয় খোঁজে, মানুষও তেমনি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে পরিচিত আশ্রয়ের হাত ছাড়তে ভয় পায়।
তবে এই ৫০ বনাম ২-এর ব্যবধান কেবল ‘সুবিধা’ দিয়ে হয় না; এর পেছনে থাকে এক দানবীয় 'সংগঠন'। এই সংগঠন আসলে কোনো ভয়ের আবহ নয়, বরং একটি 'সমান্তরাল সমাজব্যবস্থা'। মাঝরাতের অসুখ থেকে শুরু করে পাড়ার ঝগড়া—যাদের হাত সর্বত্র পৌঁছে যায়, মানুষ তাদেরই ‘ভরসা’র প্রতীক বলে মেনে নেয়। যেখানে বিকল্প প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা হয়তো হিমালয়প্রমাণ, কিন্তু তার কোনো ‘লোকবল’ নেই; সেখানে সাধারণ মানুষ সেই ‘চেনা মুখ’ বা সংগঠনকেই ভোট দেয়, যে তার দরজায় কড়া নেড়েছে। এই 'বিকল্পহীনতা' মানুষকে বাধ্য করে পরিচিত স্থিতাবস্থার আরামকে নিরাপদ মনে করতে।
এই ঋণের বোঝা, সংগঠনের জাল আর ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ মানুষের মনে এক ধরণের ‘বিচ্ছিন্নতার ভয়’ তৈরি করে। তারা ভাবে, "যে দোকানের বিরিয়ানির জন্য লাইনে আধ মাইল লোক দাঁড়িয়ে, সেখানে না দাঁড়িয়ে পাশের ফাঁকা দোকানে যাওয়া মানেই নির্ঘাত ঠকে যাওয়া।" এই ভয়ই এককভাবে চিন্তার সাহসকে সংকুচিত করে দেয়। কিন্তু মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতা বা হেগেলীয় দর্শনের অমোঘ নিয়মে, মানুষের এই ‘নিরাপদ খাঁচা’টি একসময় তার চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করে তোলে। মানুষ যখন অনুভব করে যে তার উদরপূর্তির সংস্থানটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থার কাছে একপ্রকার বন্ধক পড়ে গেছে, তখন অবচেতন মনেই এক ধরণের ‘অস্তিত্বের সংকট’ বা ‘মর্যাদার তৃষ্ণা’ দানা বাঁধতে শুরু করে। এটিই সেই বিন্দু, যেখানে পেটের খিদে’র চেয়ে আত্মমর্যাদা বড় হয়ে ওঠে।
বর্তমানে এই বিশাল জনসমর্থন আসলে এক ধরণের ‘সামাজিক স্থবিরতা’র ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ইতিহাসের নিয়ম অনুযায়ী ‘সোশ্যাল স্যাচুরেশন’ যখন তুঙ্গে পৌঁছায়, তখন স্রেফ সময়ের প্রয়োজনে এক নতুন **‘ইশারা’**র জন্ম হওয়ার কথা। মানুষ আর কেবল ‘গ্রহীতা’ বা 'উপভোক্তা' হয়ে লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় না, বরং চায় প্রকৃত ‘মর্যাদাপূর্ণ অংশীদার’ হতে।
আপাতদৃষ্টিতে চারপাশ শান্ত এবং পরিচিত সমীকরণেই থিতু হয়ে আছে বলে মনে হয়; কিন্তু ইতিহাসের সেই ‘অদৃশ্য বাঁকবদল' হয়তো মানুষের মনের গহীন কোণে নিঃশব্দে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি অনেকটা দীর্ঘ খরা বা দাবদাহের পর হঠাৎ এক চিলতে কালবৈশাখীর মেঘের মতো—আকাশের এক কোণে ছোট্ট একটা কালো বিন্দু দেখেই যেমন চাষি বুঝতে পারে যে মাটির তৃষ্ণা মেটার সময় এল, তেমনি জনগণের ছোট কোনো অসন্তোষই জানান দেয় যে কোনো এক বড় পরিবর্তনের সুর বাজছে। যা সময়ের দাবি মেনেই একদিন আপন তেজে আত্মপ্রকাশ করবে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই 'সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্তব্ধতা'ই বর্তমানের পরম সত্য।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।