
অলংকরণ: রমিত
দ্বিতীয় দফার এস আই আরের ফলে বাংলায় যত নাম কাটা গেছে, তার যদি বিধানসভাভিত্তিক গড় নেওয়া হয়, সেই সংখ্যাটা বিগত নির্বাচনে শাসক-বিরোধীর বিধানসভা প্রতি গড় ভোটের ফারাকের আদ্ধেকের মতন। ফলে, ঐ গড়ের হিসেবে শুধুমাত্র এস আই আরের ফলে আসনের হেরফের হওয়ার কথা না। কিন্তু, গড় এখানে সামগ্রিক ভোট শতাংশের বিচার হতে পারে, আসনসংখ্যার হেরফের হতে পারে সেই সব বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য যেখানে দুটি দলের মধ্যে ভোটের ফারাক অনেকটা কম ছিল। এইসব আসনগুলি নিয়ে পূর্বাভাস করতে গেলে এস আই আরে কত বিদ্যমান ভোটারের নাম কাটা গেছে এবং তাঁরা কোন সম্প্রদায় থেকে আসছেন তা হিসেবে আনতে হবে বই কী! বাংলার, সম্ভবতঃ ভারতেরও, বেশ কিছু অঞ্চলে ভোট হয় সম্প্রদায়কে ভিত্তি করে। ইলেক্টরাল ভোটিং মেশিনে যেহেতু মেশিন ধরে ভোট গোনা হয়, বুথ বা পার্টভিত্তিক ভোটের হিসেব পাওয়া যায়। সেই হিসেব যদি আপনি দেখেন, বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় দেখবেন, এমন অজস্র বুথ আছে যেখানে একটি দল মোট ভোটের ৯০-৯৫% পেয়ে যাচ্ছে। এই দলটি কিন্তু সব সময়ে সেই বিধানসভার বিজয়ী দল নয়, কিন্তু ঐ বুথ বা পার্টে মূলতঃ যে সকল সম্প্রদায়ের বাস, তাঁরা ঐ দলটিকে ভোট দিচ্ছেন। এবং প্রায় যেকোনও বিধানসভা ধরলে আমরা খেয়াল করতে পারি, জয় পরাজয় নির্ভর করে কোন দলের হাতে এইরকম গ্রামের সংখ্যা বেশি তার উপর। শহর বা আধাশহর অঞ্চলে এই ধাঁচে ভোট কম হয় অবশ্য। এইবার, আমরা যদি এস আই আরের ফলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কোন কোন সম্প্রদায় তা দেখি, দেখব মূলতঃ মুসলমান এবং নমঃশূদ্র ও কিছু পরিমাণে আদিবাসীরা সম্প্রদায়গতভাবে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে, যে সকম বিধানসভা আসনে এই সম্প্রদায়ের কিছু অংশ আছে, তুল্যমূল্য ভাবে অন্যান্য সম্প্রদায়গুলোর পাশাপাশি সেখানে এস আই আরের প্রভাবে ফলের হেরফের ভালোরকম হবে আশংকা করা যায়। এইপ্রসঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের সীমান্তলগ্ন আসনগুলি বা উত্তরবঙ্গের কিছু আসনের কথা ভাবা যায়।
অথচ, একদমই এইরকম নয় এরকম একটি আসন সামশেরগঞ্জ। মান্য হিসাব অনুযায়ী এই বিধানসভার ৮০% মুসলমান। এই বিধানসভায় গত লোকসভা নির্বাচনের (২০২৪) হিসাব অনুযায়ী ১ লক্ষ ৯১ হাজারের মতন ভোট পড়েছিল, যার ১ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি ভোট বিজয়ী কংগ্রেস ও দ্বিতীয় তৃণমূল মিলে পেয়েছিল এবং বিজেপি পেয়েছিল ২৮ হাজারের মতন ভোট। ২০২১-এর বিধানসভাতে বিজেপি পেয়েছিল ১০ হাজারের মতন ভোট। অর্থাৎ, বিজেপির ভোট এই বিধানসভায় এত কম যে সে জেতার ধারে কাছে নেই। জামানত বাঁচানোই তার সম্মানজনক ফলাফল এখানে। এবং, এও খেয়াল করবার যে বিজেপি এই আসনে হিন্দু ভোটারদেরও সকলের ভোট পায় না। গত বিধানসভায় হিন্দু ভোটারদের ১/৩ ও বিজেপিকে ভোট দেয়নি।
এইবার আমরা সামশেরগঞ্জে এস আই আরে কতজনের নাম কাটা গেছে, দ্বিতীয় পর্বে বা লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সিজনিত বিচারের পর্বে, তা খেয়াল করি। সংখ্যাটা হল- ৭৪০০০ এর কিছু বেশি। এর ফলে, এই বিধানসভায় বর্তমানে ৪৯ হাজার হিন্দু এবং ১ লক্ষ বারো হাজার মুসলিম হয়েছে। এই সংখ্যাটি ২২শে এপ্রিলের টেলিগ্রাফ কাগজ থেকে গৃহীত। লক্ষ্য করবার যে যদি মুসলমান ভোট কংগ্রেস ও তৃণমূলে আড়াআড়ি ভাগ হয় এবং বিজেপি সমস্ত হিন্দুর ভোট পায়, তাহলেও এই আসনে সরল পাটগণিতের নিয়মে বিজেপির জয় হচ্ছে না। তাহলে এই আসনের এই বিশাল নাম বাদ পড়া, যা প্রায় ১/৩ অংশ, তার কারণ ও ফলাফল কী হতে পারে, আমরা খতিয়ে বুঝতে চাইব। আমরা আগের হিসেবে এই তিনটে দলের বাইরে কাউকে ধরিনি কারণ তাদের ভোট ছিল নগণ্য।
সামশেরগঞ্জে ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটেছে। বিগত এপ্রিলে ওয়াকফ বিল বিরোধী আন্দোলন থেকে এখানে স্থানীয় হিন্দুদের ওপর আক্রমণ নেমে আসে। দুজন হিন্দু মারা যান, অনেকে নদী পেরিয়ে মালদাতে আশ্রয় নেন। আক্রমণকারীরা মুসলিম ছিল। এর ফলে, সামশেরগঞ্জ জাতীয় সংবাদে আসে, আর স্থানীয়ভাবে এইখানে হিন্দুদের একটা প্রো-বিজেপি সংঘবদ্ধতা ঘটে, এরকমও আশা করা যায়। ফলে, হিন্দুভোটের অধিকাংশ বিজেপি পাবে এরকম হতেই পারে। তার থেকে বড়ো কথা, নিশ্চিতভাবে সামশেরগঞ্জের ঘটনা ভিত্তি করে বিজেপির সাংগঠনিক স্তরে কিছু সংহতিকরণ হয়। সাধারণতঃ দাঙ্গা উপদ্রুত অঞ্চলের সংখ্যালঘুরা পাশের যেখানে আশ্রয় নেন, সেখানকার লোক তাঁদের প্রতি সহমর্মী হয়ে ওঠেন। ফলে, ভাগীরথীর ওপারে মালদাতেও এই দাঙ্গার পর বিজেপির পার্টিগত ভিত মজবুত হবে আশা করা যায়।
আমরা এইবার সামশেরগঞ্জের ভোটার ডিলিশন -বিচারপরবর্তী পর্যায়ে কী মাত্রায় হয়েছ খেয়াল করি। বাংলা গবেষণা কেন্দ্রের সূত্রে আমরা এখানে বুথওয়াড়ি নাম বাদ, তার হিন্দু-মুসলিম ভাগ পেয়েছি। ইলেকশন কমিশনের ওয়েবসাইটে বিগত লোকসভায় এই বুথগুলিতে কত ভোট পড়েছিল আর কে কত ভোট পেয়েছিল, তার হিসেব আছে। আমরা দেখি ২৪৬টি বুথের মধ্যে অন্তত ৫৮টি বুথে বিগত ভোটের ভোটারদের ৫০% বা তার বেশি এই পর্যায়ের এস আই আরে বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে অন্তত পনেরটি বুথে ৮০% এর বেশি এই সংখ্যা। আর, আমরা অন্তত তিনটি বুথ পাচ্ছি, যেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিগত লোকসভায় পড়া ভোটের ১০০%-এর বেশি। কোনও বুথেই ১০০% লোক ভোট দেন না ধরলে আমরা ধরতে পারি ওই বুথের প্রায় সকলেই বাদ পড়েছেন, এইবারের ভোটে ঐ বুথে ভোটকর্মীরা কী করেন জানতে আমাদের আগ্রহ হতে পারে। এইবার, আমরা বাদ পড়া মুসলিম ভোটারদের তৃণমূল বা কংগ্রেসে ভাগ করে দিলেও দেখব, প্রায় সমস্ত অনুপাতেই বিজেপিকে এখানে জয়ী করা যাচ্ছে না। এবং, প্রায় বেশ কিছু (প্রায় ৪০০০) নাম এখানে বাদ পড়েছে যেগুলি মুসলিম নয় আর এদের মধ্যে একটা বড়ো অংশ হিন্দুও।
তাহলে এই বাদ দেওয়ায় কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের লাভ কী হল? আমরা বলব লাভ এই কেন্দ্রে জয় পরাজয়ের হিসেবে নয়, এই লাভ সাংগঠনিক। দাঙ্গা করা মুসলমান, বা ওয়াকফ বিল বিরোধী সি এ এ বিরোধী আন্দোলন করা মুসলমান, কিম্বা বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী জেলার মুসলমান কিম্বা সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠা মুসলমানকে সে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিতে পারছে, তার নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারছে, এইটা তার সমর্থকদের কাছে প্রভূত ব্রাউনির স্কোর করায়। এই সমর্থকরা সারাভারত জুড়েই, আবার স্থানীয়ভাবে পাশের জেলাতেও। কিন্তু, এই কাজটা করতে গিয়ে এমন কিছু কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ হয়েছে যা তার সাংগঠনিক শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধও করে। আমরা সামশেরগঞ্জের কিছু বুথ খেয়াল করতে চাই, যেখানে ২০২৪-এর ভোটে বিজেপি শক্তিশালী ছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছি ২৪৫টির মধ্যে অন্তত ৩৫টি বুথে সেই নির্বাচনে বিজেপি বাকিদের থেকে বেশি ভোট পেয়েছিল। এইরকম বুথগুলিতে অমুসলিম নাম বাদ পড়ার সংখ্যাও খুব কম নয়, ৪০-৫০ এর ঘরে অবধি যাচ্ছে। এর পাশাপাশি এও দেখা যায় বিজেপিকে সমর্থন করা সমস্ত গ্রামের ভোটার শুধু হিন্দু নয়, স্থানীয় রাজনীতির কম্পালশনে কিছু মুসলিমপ্রধান গ্রাম আছে, যেখানে বিজেপি সংগঠন তৈরি করতে পেরেছে। সেইসব গ্রামেও এত পরিমাণ নাম বাদ গিয়েছে যা বিজেপির লিডকে ঋণাত্মক করে দিতে পারে। আমরা এরকম বুথও পাচ্ছি যেখানে বিজেপি ৭০০র উপর ভোট পেয়েছে, কংগ্রেস ও তৃণমূলের ভোট ৫০-এর নীচে, সেখানেও এস আই আরে ৪০০র উপর নাম বাদ গেছে। অর্থাৎ, সেই অঞ্চলের বিজেপির এই এস আই আরে কোনও লাভ হচ্ছে না বরং ক্ষতিই হচ্ছে। তার মানে, স্থানীয় বিজেপির সংগঠন এই এস আই আর পর্বে খুব কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পেরেছে এরকম মনে হচ্ছে না। আমরা দক্ষিণবঙ্গের কিছু বুথ যদি দেখি, তৃণমূলের অবিসম্বাদী লিড কিন্তু শুধু নাম বাদ যাওয়ায় পুরো ঘুরে যাচ্ছে না। অর্থাৎ স্থানীয় স্তরে পার্টি বিচারপর্বেও নিজের ভোটার সম্প্রদায়কে সাহায্য করতে পেরেছে। সেইটা সামশেরগঞ্জে হয়নি। এখানে লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সির সফটওয়ারই যা করবার করেছে, কিন্তু বুথওয়াড়ি সংগঠনের মাধ্যমে সেই বাদ পড়া না পড়ার হিসেবকে বিজেপি কর্মীরা প্রভাবিত করতে পারেনি, তেমনি বাদ পড়া নিজ ভোটারকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াতে সাহায্য করতে পেরেছে বলেও আমাদের মনে হয় না। ফলে, এই এস আই আর পর্বে বিজেপি যতটা সরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা পেয়েছে, তার সংগঠন সেই সহযোগিতার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারেনি বলেই আমাদের মনে হচ্ছে।
দক্ষিণবঙ্গ, যেমন দুই চব্বিশ পরগণার তুলনায় সামশেরগঞ্জে তৃণমূল কম শক্তিশালী। মুসলিমরা সংখ্যাগুরু হওয়ায় বিজেপি বিরোধিতাই তাঁদের রাজনীতির একমাত্র অভিমুখ নয়, এখানে। তাই, এখানে তৃণমূলের পাশাপাশি কংগ্রেসও সমরূপে শক্তিশালী। ফলে, তৃণমূল তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন নিয়ে বিচার প্রক্রিয়ার হিয়ারিংগুলিতে ভোটারদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি বলেই বোধ হয়। সম্ভবতঃ, এই প্রচুর বাদ পড়ার একটা কারণ সেইটাও।