‘কালো মাটির ভাটিয়ালি’
প্রবুদ্ধ বাগচী
হালের বাংলায় যখন চারদিকে ‘বদল’ ‘পরিবর্তন’ ‘ভয়’ ‘ভরসা’ ইত্যাদি প্রভৃতি নানান শব্দমালা ঘূর্ণি তুলে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে তখন ভেবে দেখছি বাংলা কবিতায় এসবের তেমন কোনো পাঞ্জা-ছাপ নেই। বাংলা কবিতা যারা পড়েন বা পড়েন না তাঁদের তেমন কোনো পরিবর্তন বা বদল ঘটেছে বলে মনে হয় না। কবিতার সঙ্গে নিশ্চয়ই সৃজনী সংরাগ অন্বিত থাকে আর তা নিজের মতোই বয়ে চলে। কেউ কেউ প্রচারিত বা আলোচিত অথবা আলো-দ্বারা অনুগৃহীত হয়ে থাকেন, হতেই পারেন, কিন্তু এর প্রতিস্পর্ধী একটা আয়োজন থাকে যা তির তির করে অন্তঃসলিলা —- তবু তাকে জোনাকির আলো বলে মুখ ব্যাঁকাতে ‘মন মোর নহে রাজি’।
পার্থপ্রতিম রায় কবিতা লিখছেন গত প্রায় চল্লিশ বছর, একেবারেই আয়োজন করা আড়ালে। ইতিউতি তা প্রকাশ হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনে, কোনো ঘন বন্ধুবৃত্তে সেগুলি হয়তো পড়াও হয়েছে কোথাও —-- কিন্তু দুই মলাটের ভিতর একটি সংকলন প্রকাশে যে প্রায় চার দশক তিনি সময় নিলেন এই সংযম ও প্রতীক্ষা একালে প্রায় বিরল। কেননা, কিছু কিছু মরশুমি লিটল ম্যাগাজিনের বদান্যতায় শীর্ণকায় কিছু কবিতার বই বা পুস্তিকা বেরোনোর চল আগেই ছিল, বইমেলার ভিড়ে আগত উদ্ভ্রান্ত দর্শককে তাক করে এসব কৃশতনু কাব্যপ্রয়াস উড়ে আসত। এদের কবিতা প্রস্তুতির থেকে প্রকাশের তাগিদ ছিল সুতীব্র। এখন আকবর বাদশার মতো এদেরও দিন গিয়েছে। বরং সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় বহুপ্রজ পোল্ট্রির মুরগীর মতো কবিতার ডিম পাড়া অনেক সহজ ও তাতে বাহবা পাওয়ার অবাধ পরিসর। কবিতা তরল হয়েছে এবং তরলের ধর্ম মেনে সে গড়িয়ে চলেছে হাততালির অ্যারেনায়, আগুন থেকে ফুলকির অন্তরীপে। পার্থপ্রতিম এইসব ধামাকার ধারে কাছেও কোনোদিন ছিলেন বলে শুনিনি বরং নিজের মেধা ও প্রজ্ঞাশাসিত এক নিভৃত অবস্থান থেকে চর্চা করেছেন কবিতার প্রতিমা নিয়ে —- এই সুদীর্ঘ অপেক্ষার জোর সেখানেই।
কিন্তু শুধুই কি অপেক্ষা ? না। অপেক্ষার পাশাপাশি একরকম নিবিড় নিরীক্ষণ আর সুষম অবলোকনের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে লিপ্ত রেখেছেন তিনি। এই গ্রন্থের কবিতাগুচ্ছ আদপে তার সেই দেখার একেকটা শব্দরূপ যা শব্দের খোসা ছাড়িয়ে চলে যায় বিমূর্ত এক নদীপারের আষাঢ়বেলায়। যেমন লেখেন তিনি, ‘সেইসব দৃশ্যে ফিরে যেতে চাইছি/ যেখানে ফোটায় ফোটায়/ আমার জন্ম হতো’ অথবা বলেন, ‘রৌদ্রের দুপুরের ভেতর দিয়ে হাটতে হাটতে পূর্বজন্মের স্মৃতির মতো/ নদীর কাছে আসি’ কিংবা ‘দুপুরের ভেতর থেকে একটা চর জেগে উঠছে।/সাদা ধোঁয়ার মতো’। অবশ্য ‘কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’ বলে দিলেই এ বইয়ের কথা ফুরোয় না, আছে তার ভিন্ন কিছু ভাঁজ ও বিন্যাস। সে এক একলা মানুষের কথা, একলা যাপনের কথা, একলা পরিব্রাজকের আখ্যান। যেখানে শুনতে পাই —- ‘রাস্তায় আড়াল থাকে না বলেই/ দেখা হয়ে যায়’ অথবা ‘ঠিক ঠিক কত বছর আগে/এমনই চৈত্রের বিকেলে/ একটা কথা তির তির তির তির করে পুড়ে গেল বুকের ভেতর/ কিছুতেই কিছুতেই/ঠোটের নাগাল পেল না’ কিংবা ‘হাটছি / হাটছি/ ক্লান্ত উটেদের দীর্ঘ ছায়া মাড়িয়ে মাড়িয়ে/ জলচর জীবনের কথা মনে পড়ছে’ —--- এসবই তো ধারণ করে থাকে একলা মানুষের পায়ের ছাপ। তারই মধ্যে আছে কিছু সুতীক্ষ্ণ উচ্চারণ যা জানান দেয় দেখা ও অভিযাত্রার অলিন্দ দিয়ে যে কবির মুখ ভাসমান তিনি আর যাই হোক সমসময়ের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে উৎসুক নন। তার লেখায় ছড়িয়ে থাকে সেইসব ইশারা অবিরত। কারণ, ‘পাহাড়তলির ভারী অন্ধকার কাঁধে করে/ বয়ে আনছে কালো মহিষেরা’, ‘মেঘলা আকাশ’ কে তার মনে হয় ‘রুগ্ন বালিশের মতো’, ‘প্রতিটি রোমকূপের ভেতরে ডুবুরি নামিয়ে/ তোলপাড় করে খোজা হচ্ছে – কোন ধর্ম !’ দৃষ্টান্তের সরণি আরও দীর্ঘ। কিন্তু তাতে কোনো বাড়তি সুবিধে নেই।
কারণ, কবিতা কোথাও কোথাও ‘স্মরণীয় উচ্চারণ’ বা ‘মেমোরেবল স্পিচ’ হিসেবে জেগে থাকে পাঠকের মনে। আর এই স্মরণীয়তা পাঠকভেদে ভিন্ন। তাই সত্যি সত্যি কবিতার বইয়ের কোনো নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা হয় না, হতেই পারে না। তাছাড়া, একটি কবিতার সমগ্র আয়তনে যে শিল্পের বিস্তার, খন্ড পঙক্তির উদ্ধারে তার অঙ্গচ্ছেদ ঘটে তবু আগ্রহী পাঠককে কোনও কবিতার সংকলনের দিকে ‘প্রোভোকিত’ (ঋণ : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত) করতে গেলে এই রাস্তা একটা মিতাংশ পথ। কাজেই কবিতাগুলির কাছে পৌছাতে গেলে আদপে হাতে নিতে হবে বইটি। আমি মনে করি, প্রতিটি সংবেদী মানুষের মনের ভেতর একটি শান্ত সরোবর আছে। যে কোনো লেখালিখির অক্ষর, বিন্যাস, উপমা, আঙ্গিক সেই প্রশান্তির বুকে যদি নিয়ে আসে অশান্তির আলোড়ন তবেই সেই দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ মানুষ কিছু লিখে উঠতে পারেন। এই কাব্যগ্রন্থ আমায় সেই অশান্তির বীণার সুর শুনিয়েছে, তাই এত কথা।
তবে বইটি মুদ্রণপ্রমাদ মুক্ত নয়, আছে বানানের অসামঞ্জস্য। প্রকাশক আরও যত্নবান হলে ভাল হত। আর কবি যদি দুয়েকটা লেখায় একটু ছন্দের সমীপবর্তী হতে পারতেন হয়তো একটু বৈচিত্র্যের স্বাদ পেতাম আমরা।
===================================================
অর্ধেক মাঠ ডুবে আছে অন্ধকার জলে।। পার্থপ্রতিম রায়
প্রকাশকঃ সুভাষ ভৌমিক মূল্যঃ অনুল্লিখিত
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।