এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • যাবার পথ, খাবার পথ

    প্রবুদ্ধ বাগচী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০১ আগস্ট ২০২৬ | ১১৮ বার পঠিত
  • প্রথম পর্ব
    [ রাজধানী শহরের পথ নিয়ে পথচারীদের অসুবিধের শেষ নেই। অথচ সেই পথেরই কেন্দ্রে আর প্রান্তে হাজারো রসনা তৃপ্তির আয়োজন। কলকাতার পথ মানে তাই অনিবার্য পথের খাবার। সুদীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো পান্থজনের রঙিন অভিজ্ঞতা নিয়েই এই লেখা। অফিসপাড়া সহ আরও নানা প্রান্তীয় এলাকার পথ আর পথের খাবারের সুলুক সন্ধান আর তারই সঙ্গে অজানা নানা মানবিক সম্পর্কের রামধনু ক্যানভাস ধরা দেবে এই প্রতিবেদনে। আজ থেকে প্রতি রবিবার প্রকাশিত হবে এই ধারাবাহিক ]

    যাবার পথ, খাবার পথ / পর্ব ১
    ===============
    ফুটপাথ কথাটার বাংলা মানে যদি হয় পায়ে চলার পথ অর্থাৎ কি না যাবার পথ তাহলে তার সঙ্গে দাবি করা যায় আমাদের এই পোড়া শহরে বা রাজ্যেও তা একই সঙ্গে খাবার পথ। যাবার পথ কেন খাবার পথ হবে এনিয়ে টৈটুম্বুর বিতর্ক ও বাগবিতণ্ডা আছে বহু বছর ধরেই তবে তাতে এই পথের কৌলীন্য কিছুমাত্র খাটো হয়েছে বলে মনে হয় না। সাউথ সিটি ও মানিকতলা খালপাড়, নিউটাউন ও একবালপুর যদি একই মেট্রোপলিসের মানচিত্রে থেকে যেতে পারে তাহলে মেইনল্যান্ড চায়না ও মোকাম্বোর সঙ্গেই একপাতে আমরা বসিয়ে দেব চিত্তদার চা-টোস্ট ও কালিকার আলুর চপ-বেগুনিকে। চৌতিরিশ বছরই হোক বা পরিবর্তন —- এই দুই পাখনা মেলা বং রাজনীতির থোঁতা মুখ ভোঁতা করে পাকস্থলীর সাম্যবাদ চলছে, চলবে। নামী খাদ্যতীর্থের সামনে শনিবারের বিকেলে যত দামী গাড়ির জটলাই হোক সংকীর্ণ যাবার পথের ওপর টুল-বেঞ্চি পেতে বসে চল্লিশ পঞ্চাশ টাকার ‘জনতা’ চাউমিন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিধানসভায় সরকার গঠন করে দিতে পারে অনায়াসেই। সুতরাং মন্বন্তর বা মারী আমাদের দহন করতে পারে না, বিচিত্রগামী ভোগবাদের সুতীব্র আলো তাঁদের ওপর না পড়লেও ল্যাম্পপোস্টের এল ই ডি কিংবা ত্রিফলা থেকে ঠিকরে আসা র-ফলার মতো আলোয় তারা সমুজ্জ্বল। নাক সিঁটকানো পদাতিক, ক্রুদ্ধ প্রশাসক ও বেপরোয়া পুলিশ কেউই তাঁদের ঝাড়ে বংশে উচ্ছেদ করতে পারেনি। কেননা যাবার পথের ওপর নির্মিত এই খাবার পথের একটা অর্থনীতি আছে, আছে নিবিড় এক ঐতিহ্য। কলকাতা শহর থেকে একদিন হয়তো ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধ বা শহিদ মিনার মুছে গেলেও যেতে পারে —--- থেকে যাবে খাবার পথের অফুরন্ত বৈভব। ব্যাপ্ত আর বিচিত্র তার আখ্যান, তার পরতে পরতে নানা জীবনের নরম ও নম্র সঞ্চাররেখা যা আসলে বয়ে চলে নাগরিক ক্লান্তির অবতলে।

    একেবারে ছেলেবেলায় অবশ্য আমাদের বেড়ে ওঠা ছিল কলকাতার অল্প বাইরের এক বিষণ্ণ মফস্বলে। পথ বলতে সেখানে পাড়ার ভিতরে ভিতরে কোথাও ইট বিছানো পথ কোথাও এবড়োখেবড়ো পিচ —-- এইসব রাস্তায় সেই অর্থে যাকে ফুটপাথ বলে তা থাকার কথা নয়। রাস্তার দুপাশে দোকানপাসার ছিল তবে তার বেশিটাই খাবার জিনিসের নয়। একমাত্র মিষ্টির দোকান দুয়েকটাকে যদি সেই অর্থে খাবার দোকান ধরা যায় তাই —-- মিষ্টির দোকানের সঙ্গে যদি প্রভাতী জিলিপি-কচুরি ও বৈকালিক সিঙ্গাড়া-চপের সংস্থান থাকে, তাকে অনায়াসেই ‘খাবার দোকান’ বলা হত। যেহেতু ফুটপাথ বলে আলাদা কিছু নেই তাই তাকে আটকে কোনো দোকান হয়েছে এমনও বলার উপায় নেই। প্রধান সড়ক যা দিয়ে বাস চলত সেটি জি টি রোড, তারও কোনও আলাদা ফুটপাথ ছিল না। মূলপথের পাশ দিয়েই হাটাচলা, সেখানে কিছুটা রাস্তা সংকীর্ণ করে অল্প দোকান —-- প্রধানত ফলবিক্রেতা, সাইকেল সারাই ও পাম্প দেওয়া, ঝুপড়ি চায়ের স্টল আর তেলেভাজা। গত শতকের আশির দশকে পোল্ট্রি বিপ্লবের পরে বাঙালি মধ্যবিত্তের ঘরে মুরগির মাংস যখন সুলভ প্রোটিন হিসেবে কড়া নাড়তে লাগল তখন রাস্তার দুধারে মুরগির দোকান হয়ে উঠল যে কোনো মফস্বলের স্মারকচিহ্ন। তার আগে আমাদের শিশুবেলায় ‘চিকেন’ কথাটাই আমাদের প্রতিদিনের অভিধানে ছিল না, মাংস মানে পাঁঠার মাংস —-- যা মাসে এক দুদিন আনা হয় এবং প্রেসার কুকারবিহীন সেই সময়কালে হাঁড়ি থেকে মাংস রান্নার যে আমোদিত গন্ধ তা পাভলভের বেড়ালের মতোই আমাদের মুখে ডেকে আনত লালারস। পরে সেই সুলভ চিকেনেরই হাত ধরে চাউমিন আর রোল সদস্যপদ পেল বাঙালির সান্ধ্য জলখাবারের। আর সেই সূত্রে রাস্তার ধারে চাকা লাগানো ভ্যানে ফুট দুয়েক উল্লম্ব কাচ লাগানো কাউন্টার আর প্রকান্ড তাওয়া-শোভিত স্টল দেখা দিতে লাগল ইতিউতি। খুব ভুল যদি না বলি, রাস্তার পাশের এই স্টল বন্টনের প্রশ্নে তৎকালীন শাসকদলের একটা অনুমোদন লাগত। তাঁদের যুবফ্রন্টের সদস্য সমর্থকরা রক্ত বেচে হলদিয়া বক্রেশ্বরে শিল্প-কারখানা স্থাপনার মিছিলে পথ হাঁটলেও এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগের পথ ছেড়ে দেননি। হয়তো নিজেদের এই রোজগার নিশ্চয় করার ক্ষেত্রে তাঁরা দলের বড়-মেজোদের সুনজরে থাকার চেষ্টা করতেন, কিছু সুবিধেও হয়তো পেতেন। কিন্তু এতে চোখ টেরাবার কিছু আছে বলে মনে হয় না। এমন দুয়েকজনকে আমরা চিনতাম বইকি। একটু সাবালক হয়ে হাতে কিছুটা পয়সা এলে এসব স্টল থেকে সন্ধ্যেবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে এগ রোল কিনে খেয়েছি, যার দাম ছিল পাঁচ টাকা, খুব যদি ভুল না করি তখন ডিমের দাম ষাট পয়সা থেকে পঁচাত্তর পয়সার মধ্যেই ঘোরাঘুরি করত।

    তবে আরেকটু পেছিয়ে গেলে যে স্কুলবেলা সেখানে পথের খাবারের কোনো স্পর্শ লাগেনি। কারণ, একেবারে বাড়ির পাশেই স্কুল, টিফিন খেতে অনায়াসে বাড়ি চলে আসা যায়। স্কুলের মাঠে ঘিরে থাকত আলুকাবলি, ঘুগনি, আলুর দম, আচার, কারেন্ট নুন (এই নুন মুখে লাগালে বিদ্যুতের শক লাগার মতো অনুভূতি হত), বিলিতি আমড়ামাখা। এবং আইসক্রিম। এর প্রতিটিই ছিল কঠোর নিষেধের বেড়ায় ঘেরা। আমরা তো তখন জানতাম লোক্যাল কোম্পানির আইসক্রিম আসলে নর্দমার জল থেকে তৈরি হয়! ফলে ঘুণাক্ষরেও ওই পথে হাটার সাহস হয়নি। বাবার সঙ্গে কলকাতা গেলেই শুধু কোয়ালিটি আইসক্রিম খাওয়ার সুযোগ হয়। আর এলাকার ছোটখাটো ‘কেবিন’ জাতীয় খাবার দোকানে সাধারণত আমাদের যাতায়াত ছিল না। ফলে এর ওঁর মুখে ‘ডিমের ডেভিল’ শব্দটা শুনলেও আসলে যে সেটা কী বস্তু তা তখন একেবারেই জানতাম না, বুঝতেই পারতাম না ডিমের সঙ্গে ‘ডেভিল’ বা শয়তানের যোগাযোগ কীভাবে এমন প্রত্যক্ষ হতে পারে ? জেনেছি অনেক অনেক পরে। ঠিক যেমন ফুচকা ব্যাপারটা ব্রাত্য ছিল পারিবারিকভাবে —-- কারণ ওই একই, ওই হাড়ির গোলা তেঁতুলজলে নাকি ফুচকা বিক্রেতার নাসা নিঃসৃত তরল মিশে যায় ! সত্যি বলতে কি আমার ফুচকায় ‘মুখেভাত’ হয়েছে একেবারে আধবুড়ো বয়সে ! তবে সেই মফস্বলবেলায় একটা সুখাদ্য বেশ সস্তায় প্রায়ই খাওয়া হয়ে যেত, সেটা শোনপাপড়ি। জিটি রোডের ধারে ছিল একটা শোনপাপড়ি তৈরির কারখানা, বিকেলের দিকে সেখানে তৈরি হত গরম শোনপাপড়ি। আমরা সেখানে গেলে খুব অল্প দামে মিলে যেত বেশ অনেকটা —-- এটা ঠিক মিষ্টির দোকানে শোভা পাওয়া চৌকোণা পাপড়ি নয়। এক এক ঠোঙ্গা ভর্তি ঝুরঝুরে হাল্কা ঘি রঙের মোলায়েম ঝুড়িভাজার মতো যা নাকি মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে গরম অবস্থায়, তারপর সেগুলোকে ডাইসে ফেলে আয়তাকার দেওয়া হয়। শোনপাপড়ির এই অন্দরমহল হয়তো অনেকেই দেখেননি। রক্তের চিনি নিয়ে তখন যেহেতু কোনো দুর্ভাবনা ছিল না তাই ওই এক ঠোঙ্গা শোনপাপড়ি নিয়ে সহমর্মী বন্ধুদের আড্ডা জমত রেল প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তের গড়ানে ঢালে। পাখির ডানায় মিলিয়ে আসত দিনের আলো, নিত্যযাত্রীরা ফিরতে শুরু করতেন যে যার বাড়ি।


    তবে সত্যি সত্যি কলকাতার ফুটপাথের খাবারের সঙ্গে আমাদের যোগ ঘটে আশির দশকের মাঝামাঝি। ঠিক যে সময়টায় আমরা স্নাতকস্তরের শিক্ষার খোঁজে নিয়মিত রাজধানীর অলি-গলি থেকে রাজপথ ঘুরে বেড়াতে থাকি। তখন নিত্য নতুন কলেজের ভর্তির ফর্ম সংগ্রহ করতে প্রায় দিনই আসতে হচ্ছে কলকাতায়। সকালে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে উতরে যায়। স্বাভাবিকভাবেই দুপুরের খাবারটুকু সারতে হয় পথেই। নতুন নতুন রাস্তা আর এলাকা চেনার সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে পাই নানান কিসিমের খাবার পথ। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে প্রেসিডেন্সি হয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স, মৌলানা আজাদ কলেজ। আরেকদিকে আশুতোষ কলেজ হয়ে যাদবপুর।। পরিবারের এতটা সাধ্য ছিল না যে ছেলের সারাদিনের বাসভাড়া ট্রেনভাড়া পেরিয়েও বেশ একটা মোটা টাকা দুপুরের টিফিনের জন্য বরাদ্দ থাকবে। ফলে অল্প খরচে ফুটপাথের খাবারই ছিল আমাদের সহজপাঠ। সেইসব পেটের টানেই খুঁজে পেয়ে যাই বিদ্যাসাগর কলেজের ঢোকার মুখে ফুটের চায়ের দোকান যেখানে চায়ের সঙ্গে মিলে যেত পাউরুটি টোস্ট, ডিমসিদ্ধ, ঘুগনি, আলুর দম অথবা জেলি মাখানো রুটি। রাস্তা জুড়ে অপরিসর বেঞ্চি তাতে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। তারই মধ্যে একটু জায়গা করে আমাদের দ্বিপ্রাহরিক ক্ষুধার প্রশমন। সেই সময়টায় খেয়াল না করলেও এর অনেক পরে খুঁজে পেয়েছি, বিদ্যাসাগর কলেজের বিপরীত দিকে ‘বীণা’ সিনেমা হলের পাশে এক দেহাতি দোকান যেখানে বিকেলের দিকে সুস্বাদু কচুড়ি সিঙ্গাড়া মেলে। ওই কলেজের ইংরেজির বিভাগীয় প্রধানের ঘরে আমাদের একটা অনিয়মিত বৈকালিক আড্ডা বসত আর ওই চমৎকার অধ্যাপক ও সুলেখক মানুষটি আমাদের দুচারজনকে কচুরির আমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতেন সেখানে। সঙ্গে মিলত গরম রসোগোল্লা। সে বড় সুখের সময়।

    আর কলেজ স্ট্রিট চত্বরের খাবার তো বহুবিধ স্তরের। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক শিক্ষাসত্রগুলির গায়ে গায়ে শুধু ইতিহাস নয় খাবারেরও ভূগোল। প্রেসিডেন্সির নিজস্ব ক্যান্টিন খুব সম্ভবত বাইরের মানুষদের জন্য খোলা থাকত না। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের যে মূল ক্যান্টিন তাতে সকলেরই প্রবেশাধিকার ছিল। আমরাও কয়েকবার তার খাবারের আস্বাদ পেয়েছি, দামও বেশ কিছুটা কম। যদিও সেই তালিকায় সুখাদ্য হিসেবে ফিশ ফ্রাইএর নাম থাকলেও সেকালেও তার দাম আমাদের আর্থিক নাগালে ছিল না। আমরা ঘোরাফেরা করতাম ওই টোস্ট ঘুগনির সীমানার মধ্যেই। আরেকটি খুব ছোট্ট দোকান ছিল সংস্কৃত কলেজের মূল গেটের পাশে ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ’ এর বিক্রয়কেন্দ্রের লাগোয়া। আক্ষরিক অর্থেই ফুটপাথের দোকান, চারদিকে বইয়ের গুমটি, রাস্তার সামনে আখের রসের স্টল আর তারই ফোঁকরে এক মিতায়ত বিপণি। ডিম-টোস্ট নামের এক খাদ্য তখন বেশ চালু হয়েছে সেটি পাওয়া যায় এখানেও, সঙ্গে খুব সুন্দর মাটির ভাঁড়ের চা —-- কার্যত থারমোকল বা প্লাস্টিকের কাপ তখন পাওয়াই যেত না। গোটা পাঁচেক টাকায় তখন যথেষ্ট ক্যালরি সংগ্রহ করে নেওয়া যেত অনায়াসে। উত্তরে স্কটিশ চার্চ কলেজেও বার দুয়েক যেতে হয়েছিল তবে স্কটিশ বলতেই হেদুয়ার পাড়ে যে বসন্ত কেবিনের নাম এসে পড়ে তাতে ঢোকার আর্থিক স্পর্ধা আমাদের ছিল না। ঠিক যেমন অধুনালুপ্ত কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের মধ্যে ছিল পাশাপাশি দুটি ‘বসন্ত কেবিন’ —--- তার সন্ধান পেয়েছি আরও কিছুটা পরে। অবশ্য ওই ধরনের রেস্টুরেন্ট প্রথমত ফুটপাথের নয় আর ওগুলি সরগরম থাকত মূলত সন্ধ্যাবেলায়, দুপুরের টিফিনের জন্য কেউ ওখানে যেতেন বলে মনে হয় না। ঠিক যেমন কলেজ স্ট্রিটের অসংখ্য মধ্যাহ্নে আমরা তখন কখনো ‘কফি হাউস’ নামক বিষয়টার পেটের ভিতর ঢুকিনি, বলা ভাল পেরে উঠিনি। বাকি ছিল তো কতই। অমন সুবিখ্যাত ‘ফেভারিট কেবিন’ও ওই কালপর্বে অধরা ছিল, ছিল ‘পুটিরাম’ বা ‘প্যারামাউন্ট’ কিংবা ‘দিলখুশা’ —- অবশ্য এর কোনোটাই সেই অর্থে পথের খাবার নয়, প্রত্যেকেরই ছিল পাকা দোকান। কলেজ খুঁজে বেড়ানোর তাগিদে যখনই এখানে ওখানে যেতাম সকালে বেরোনোর আগে বাবা শিখিয়ে দিত কোন পথে যেতে হবে, ধরতে হবে কত নম্বর বাস বা ট্রাম এবং নামতে হবে ঠিক কোন স্টপেজে। সেইসঙ্গে হদিশ দিত খাবার দোকানের। স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল, মধ্য কলকাতায় চৌরঙ্গির আশেপাশে সেই হিসেবে কোনও কলেজ না থাকলেও ওখানে অন্য একটা আকর্ষণ ছিল মার্কিন তথ্যকেন্দ্র। জহরলাল ঠিক যেখানে সুরেন্দ্রনাথের হাত ধরছেন সেই চৌমাথায় অতি বিখ্যাত মেট্রোপলিট্যান বিল্ডিং এর একতলার প্রায় পুরোটা জুড়ে তখন তাঁদের অফিস ও বিশাল লাইব্রেরি। একেবারে বিনি পয়সায় তাঁদের সদস্য হওয়া যায়, একখানা কার্ডে তুলে আনা যায় তিনখানা বই। এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল রিডিং রুমে যতক্ষণ খুশি বসে থাকা যায় একটি বা দুটি বই নিয়ে। এমনকি আরামদায়ক সোফার লাগোয়া টিভি সেটের সামনে কানে হেড ফোন লাগিয়ে দেখা যায় ফিল্ম —- সেইসব ফিল্মের সারি সারি ভিডিও ক্যাসেট (এগুলির আসল নাম ভি এইচ এস টেপ) সাজানো থাকে সুসজ্জিত তাকে। খুঁজে পেতে একবার ইস্যু করিয়ে নিলেই হল। বলা বাহুল্য, এখানকার সব ছবিই মূলত মার্কিনীদের প্রচারের নানা অলংকৃত বীরগাথা। তবে বিভিন্ন বিষয়ের যেসব বই সেখানে পাওয়া যেত সেগুলি খুবই উঁচু মানের বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বইয়ে যেহেতু মার্কিনীদের আলাদা করে জয়গান গাইবার সুযোগ নেই, গুণেমানে সেগুলি উৎকৃষ্ট বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু ওই মাগনায় পাওয়া আরামের লোভে প্রায়ই চলে যেতাম সেখানে। আর তাঁদের ঠিক বিপরীত ফুটেই বিখ্যাত ‘অনাদি কেবিন’ যাদের মোগলাই পরোটা আর কষা মাংস নাকি স্বর্গীয় স্বাদে ভরপুর বলেই কথিত ছিল। একবার বাড়ি থেকেই আলাদা পয়সা পেয়েছিলাম সেখানে খাওয়ার জন্য। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি তাঁদের দোকান অনেকটাই ম্লান ও বিবর্ণ, স্থান অকুলান। স্বাদে গন্ধে যে তাঁদের খাবার খুব স্পেশ্যাল এমন মনে হয়নি। হয়তো বা কিছুটা ভারে কাটার মতোই অবস্থান। মেট্রোপলিট্যান বিল্ডিং থেকে সামান্য উত্তরে ‘মেট্রো’ সিনেমা হল পেরিয়েই ডানদিকের সারিতে ছিল আরেক বিখ্যাত রেস্টুর‍্যান্ট ‘কাফে ডি মনিকো’ —--- এই দোকানের ফিস ফ্রাই ছিল লতা মঙ্গেশকরের কন্ঠের মতোই কিম্বদন্তী। তবে পড়ুয়াবেলার সেই ঊষাকালে তার সামনে দিয়ে হেঁটেই গেছি বারবার, দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশের রেস্ত ছিল না। এর একদশক পরে প্রায় নিয়মিত এই দোকানের ফিস ফ্রাই চলে আসত অফিসের টেবিলে। তার উৎস আমার তখনকার কর্মস্থলের এক অগ্রজ সহকর্মী যিনি ছিলেন মোহনবাগান ক্লাবের সদস্য তথা অন্ধ সমর্থক। মোহনবাগান দল কোথাও কোনো টুর্নামেন্টে জয় লাভ করলেই তিনি আনন্দে উচ্ছ্বাসে আকন্ঠ মদ্যপান করে সেকশনের সহকর্মীদের জন্য নিয়ে আসতেন ফিস ফ্রাই ও ভীম নাগের প্রায় মুসুম্বি লেবুর মতো বড় জলভরা সন্দেশ, নব্বই দশকের গোড়ায় সেগুলির একেকটির দাম ছিল সম্ভবত পঁচিশ টাকা। সংবাদমাধ্যমে মোহনবাগানের জয় মানেই আমরা জানতাম আজ আমাদের আর টিফিন খেতে বাইরে যেতে হবে না। এমনও হয়েছে আমাদের ওই অফিসতুতো দাদা হই হই করে অফিসে ঢুকে আমাদেরই হাতে ধরিয়ে দিয়েছে বড় একটা নোট আর আমরাই দুরন্ত গতিতে ছুটেছি ‘কাফে ডি মনিকো’ তে, ফিরেছি যুদ্ধ জয় করে।

    অনেকেই জানেন না, ‘কাফে ডি মনিকো’র আরেকটা ‘তাৎপর্য’ ছিল —--- বেলা ফুরোলে চৌরঙ্গী এলাকায় যে সব দেহপসারিণী জীবিকার সন্ধানে আসতেন তাঁরা বেশিরভাগ দাঁড়িয়ে থাকতেন এই খাদ্যসত্রটির সামনে। সন্ধ্যের মুখোমুখি এই বিষয়টা বহুবার চোখে পড়েছে আমার। মতি নন্দি বা দিব্যেন্দু পালিতের গল্পেও আছে এর উল্লেখ। এই দৃশ্য মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলে গভীর বেদনার বোধ —-- এইভাবে বিষাদবিদ্ধ হয়ে একবার একটা কবিতা লিখবার চেষ্টা করেছিলাম, বোধহয় কোথাও সেটা প্রকাশ হয়েছিল বলেও মনে পড়ে। একটি খাদ্যবিপণি ঘিরে এই অভিজ্ঞতার বিস্তার বেশ অভিনব বই কি।

    মার্কিন তথ্যকেন্দ্র এখন উঠে চলে গেছে অন্যত্র, উত্তর-২০০১ পর্বে নিরাপত্তার ব্জ্রআঁটুনিতে সেখানে প্রবেশ ও প্রস্থান এখন রীতিমতো কঠিন কাজ। ‘অনাদি কেবিন’ বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে, আপাতত সেটি একটি রেডিমেড জামা কাপড়ের দোকান। এমনকি ‘কাফে ডি মনিকো’ ও হারিয়ে গেছে সময়ের গর্ভে, এখন সেটি একটি রোলের দোকান। হয়তো রূপোপজীবিনীদের এখনও সেটাই ল্যান্ডমার্ক। কারণ, এই শহর থেকে তাঁরা আজও হারিয়ে যেতে পারেননি।

    পরের পর্ব প্রকাশিত হবে ৯ আগস্ট ২৬ (রবিবার)
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    প্রথম পর্ব
  • ধারাবাহিক | ০১ আগস্ট ২০২৬ | ১১৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | ০১ আগস্ট ২০২৬ ২২:১৫742058
  • বাঃ, এইটা তো আমার খুব পছন্দের বিষয়। পরের পর্বগুলো আসুক। অপেক্ষায় রইলাম।
  • মৌমিতা... | ০২ আগস্ট ২০২৬ ১২:১৪742072
  • চিত্ত দার দোকানের চিকেন স্ট্রু থেকে শুরু করে মিত্র ক্যাফের এর কবিরাজি, পুঁটিরাম এর কচুরি, প্যারামাউন্টের হরেক রকমের লস্যি - কলকাতার ফুটপাথ এর অলিতে গলিতে আনাচে কানাচে ছোট বড়ো দোকানের এর সেই সুস্বাদু খাবার এর স্বাদ জিভের ডগায় আজও বিরাজমান এবং মন হলেই আরো একবার চেখে দেখার সুযোগ আছে বলে আরও খুশি । জন্মের পূর্ববর্তী কলকাতার সাথে খাদ্যরসিক মেয়ের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এই লেখার পরবর্তী পর্ব গুলোর অপেক্ষাকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস করছি না ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন