এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • যাবার পথ খাবার পথ

    প্রবুদ্ধ বাগচী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • যাবার পথ খাবার পথ (সপ্তম পর্ব)

    তিনশো পেরোনো শহর কলকাতার স্থায়ী উপনিবেশের চিহ্ন যদি ধরতে হয় তা অবশ্যই রাইটার্স বিল্ডিং। সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই শাসন পরিচালনার সদর দফতর হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা। পরে প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনেও এই প্রকান্ড প্রাসাদ হয়ে উঠেছিল প্রশাসনের ভরকেন্দ্র। প্রবল প্রতাপান্বিত রাজপুরুষ ও পুলিশকর্তারা এখান থেকেই দেশ শাসন করতেন অন্তত ১৯১১ অবধি, যতদিন না দেশের রাজধানী সরে যায় নতুন দিল্লিতে। তার পরের একশো বছরে এইটিই ছিল রাজ্যের প্রশাসনিক সদর — শুধু রাজপুরুষ নন, পরের আমলে মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব ও অন্য মন্ত্রীরা এখানেই বসতেন, মন্ত্রীসভার বৈঠক হত এখানকার সুবিখ্যাত ক্যাবিনেট রুমে আর নানা প্রশাসনিক বৈঠকের ঠিকানা ছিল রোটান্ডা। এবং সেই সঙ্গে ছিলেন বিপুল বড় মেজো সেজো কর্মচারীরা যাদের বলা হয় কেরাণি। স্বাভাবিকভাবেই রাইটার্স বিল্ডিংকে কেন্দ্র করে যে অফিসপাড়া তা ঘিরে তৈরি হয়েছে এক খাবার পথ যা যাবার পথের পথিকদের মুখে নিত্যদিন তুলে ধরে রকমারি খাবারের পসরা। এই এলাকার মাঝখানে যদি রাইটার্সকে রাখা যায় তাহলে তার আশেপাশে রাখতে হবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, ফেয়ারলি প্লেসে রেলের সদর দফতর, জিপিও, ব্যাঙ্কশাল কোর্ট, কলকাতার কালেক্টরেট, ডেড লেটার অফিস, স্টিফেন হাউস, সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিস, টেলিফোন ভবনসহ আরও নানান অফিস এবং তার বিপুল কর্মীবাহিনী। ফলে ভৌগোলিকভাবে রাইটার্সের দক্ষিণদিকের রাস্তাটুকু ছাড়া বাকি তিনটে দিকই ঘিরে আছে খাবার পথ। সেই সঙ্গে জুড়ে নিতে হবে ফেয়ারলি প্লেসে রেলের আঞ্চলিক অফিসের উত্তরদিকে স্ট্র্যান্ড রোডের সংযোগকারী রাস্তা। আর দক্ষিণদিকে জিপিওর পাশ দিয়ে পশ্চিমমুখী রাস্তাটুকু। তারই আশেপাশে হেয়ার স্ট্রিট ও ব্যাংকশাল স্ট্রীটের এলাকা, এর মাঝেই সেই পুরনো অল ইন্ডিয়া রেডিওর গারস্টিন প্লেসের ঐতিহাসিক বাড়ি। সুমনের গানে যেমনটি ছিল ঠিক সেইরকম ‘কেরাণি ও পাটোয়ার, ক্রেতা বিক্রেতা/ বেশ্যা দালাল’----- অবশ্য যৌনকর্মীদের এখানে সেইভাবে পাওয়ার সুযোগ নেই, ওই শব্দটা আমরা বাদ দিয়ে পড়ব। তবে গিজগিজে ভিড়ের মধ্যে যাবার পথ আর খাবার পথ মিলেমিশে একাকার। কাউকে নিয়ে কারোর তেমন কোনো সমস্যা নেই —- এ যেন এক মিথোজীবি বন্দোবস্ত।

    যদি আদালতপাড়া থেকেই ধরি, তাহলে কলকাতা মেট্রোপলিট্যান আদালতের আশেপাশে একটু দামি খাবারের দোকান। বিরিয়ানি, চিলি চিকেন, ফ্রাইড রাইস, ফলের রস, দামি পেস্তা বাদাম কাজু দেওয়া লস্যি। কারণটা খুব সহজবোধ্য। ফৌজদারি আদালতের উকিলবাবুদের দর ও চাহিদা দুটোই বেশি, ফলে তাঁদের পকেট সব সময় একটু ভারি থাকে মক্কেলদের দাক্ষিণ্যে। এইসব স্টলে তাঁদের নিত্য আসা-যাওয়া আর সব সময়ে যে নিজের পকেট থেকেই খরচ করতে হবে তারও তো কোনো মানে নেই। ফৌজদারি কেসে ধরা পড়া আসামীদের জামিন করাতে তাঁদের পরিবারের লোকেরা কি জাঁদরেল উকিলবাবুকে বড় এক গেলাস ফলের রস বা শীতল লস্যি খাইয়ে তৃপ্ত করতে পারেন না ? আলবত পারেন। আর ব্যাঙ্কশাল কোর্টের বার লাইব্রেরিতে যদি কেউ গিয়ে থাকেন দেখবেন সেখানে তিল ধারণের স্থান নেই। একেকটা লম্বা বেঞ্চিতে সার দিয়ে বসে আছে কালো কোট ব্যবহারজীবিরা, তাঁদের মক্কেলরা বসে দুদন্ড কথা বলবেন সেই ঠাঁইটুকুও নেই। ফলে বাইরের খাওয়ার দোকানে একটু নিরিবিলি বেঞ্চিতে বসে কথা বলার সুযোগ বেশি। অবশ্য তার মানে এই নয় আদালত চত্বরে পুরোটাই জাঁকালো খাবারে ভর্তি। মোটেও নয়। আদালতের মূল ফটকের সামনে যেখানে ঘন ঘন এসে দাঁড়াচ্ছে আসামীবহ পুলিশভ্যান আর রোগা চিমসে চেহারার একদল দালাল লোক দেখলেই কানের কাছে ফুসফুস করে বলছে ‘এফিডেফিট এফিডেফিট’ ‘নোটারি নোটারি’ —- ঠিক তার বিপরীত দিকেই গরম কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে ফুলুরি ও পিঁয়াজি। সঙ্গে টাটকা মুড়ি। পাশেই ঝাঁকা নিয়ে বসে আছে কচি শশা। চাইলে ভুজিয়াওয়ালার বাদাম ছোলাভাজাও পাওয়া যাবে পাশে। জিপিওর প্রকান্ড ধাপ ধাপ সিঁড়ির আশেপাশে খাম, আঠা, জেমস ক্লিপ, মার্কার বিক্রেতার আশেপাশে ওই তো দেখা যাচ্ছে একজন নিয়ে বসেছেন নধর জামরুল, টাটকা কাঁঠালি কলা। সব মিলিয়ে যাকে বলে সস্তায় পুষ্টিকর খাদ্য। আর যদি একটু মিষ্টিমুখ করতে চান কেউ তার জন্য দু-কদম এগিয়েই সোনালি রঙের অমৃতি। সেগুলো যদিও খুব একটা চাপাচোপা দিয়ে রাখা নয় তবু কড়াইয়ের গরম আর খিদের তাপে ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া মহাশয়দের প্রাণান্ত, তাঁদের ছোবল দেওয়ার ক্ষমতা আপাতত নির্বাপিত।

    এবার আসা যাক ফেয়ারলির দিকে। যে যতই চেঁচামেচি করুন, পশ্চিমমুখী ওই রাস্তার বাম ফুটপাথ ষোলো আনা ‘ফুড’পাথে রূপান্তরিত। আসলে আপত্তি জানাবেন কারা ? রেল দফতরের বিপুল কর্মচারীরা তো আছেনই সেই সঙ্গে আশেপাশের অগুনতি অফিসের বড়-মেজো-সেজো-ছোট কর্তারা ভিড় করেন এই ‘সব পেয়েছির আসরে’। মাথায় প্লাস্টিকের ছাউনি থাকায় রোদ বর্ষা থেকেও রেহাই আর রকমারি খাবার তো আছেই। তবে এই রাস্তায় সব থেকে বড় আকর্ষণ ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা। এমনকি খিচুড়ি ও পাঁপড়ভাজাও মেলে এখানে। আর অত্যন্ত ভাল চা। বছর তেরো আগে (২০১৩) এপ্রিল-মে মাসের দুপুরে একটানা মাস তিনেক রাইটার্সে যেতে হত প্রায় সপ্তাহে দু তিনদিন। স্বাভাবিক, বড়বাবু বা আধিকারিকদের সময়মত সিটে পাওয়া যেত না, কিন্তু গরজ বড় বালাই —- অগত্যা ফেয়ারলি প্লেসে কর্মরত এক বন্ধু কাম দাদার সঙ্গে বসে থাকতাম মাঝ দুপুরের ফেয়ারলি প্লেস চক্ররেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, আর মাঝে মাঝে গিয়ে পান করে আসতাম ফুটের চা। সে বড় সুখের সময়।

    রেলের দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট কাটার ব্যবস্থা পুরোটাই যখন কাউন্টারভিত্তিক ছিল তখন খুব সকাল থেকেই এই অঞ্চলে এসে পড়তেন নানা প্রান্তের মানুষ। আটটায় বুকিং কাউন্টার খুলত, অন্তত সাতটার মধ্যে না এলে টিকিট পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। দূর দূর থেকে যারা আসতেন তাঁরা অধিকাংশই থাকতেন অভুক্ত। খুব সকালে টিকিট কাটতে গিয়ে কয়লাঘাট বুকিং কাউন্টারের পাশে আমাকেও দুয়েকবার ভাত খেতে হয়েছে ফুটপাথের বেঞ্চিতে বসে। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, সঙ্গে ডাল, তরকারি —-- খুব সকালে মাছের ঝোল পাওয়া যায় না, তখন মাছভাজা। স্টিলের থালার ওপর কলাপাতা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। প্রথম সকালের গঙ্গাপারের স্নিগ্ধতায় চেটেপুটে খেয়ে এক অনাস্বাদিত আনন্দের শরিক হওয়া —- সাধে কি আমরা বলি পেটপুজো ! আর ‘আরাধনা’ বা ‘পুজো’ মোডে খেলে পাকস্থলীও যে তেমন বিদ্রোহ করে না, খানিকটা অতিলৌকিক হলেও তা সত্যি। তো, সেই বিক্রেতার থেকে শুনেছিলাম তার রোজনামচা। সোনারপুর পেরিয়ে কোন একটি গ্রামাঞ্চল থেকে সেই ফার্স্ট ট্রেন ধরে চলে আসেন দুজন। সাড়ে পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে কয়লাঘাটার ফুটপাথে উনুনে আঁচ দিয়ে চালু হয় দোকান। আসার পথে শিয়ালদহ থেকে কাঁচা সব্জি আর মাছ কেনা। চাল ডালের পসরা রাখা থাকে ওই রেলের অফিসেরই এক অস্থায়ী আস্তানায়, সৌজন্য বাড়ির সরকারি দারোয়ান। মোটামুটি সাতটার মধ্যে ডাল ভাত একটা তরকারি রেডি এবং গুটি গুটি পায়ে কেউ কেউ ভিড় করছেন বেঞ্চির সামনে। আটটার পর থেকে ভিড় বাড়ে। এঁরা সব টিকিটকাটা পার্টি। এদের মুখে গ্রাস তুলে দিয়ে আবার একবার ভাত বসে। একটু যারা দূর থেকে অফিস পাড়ায় কাজে আসেন তারা অনেকেই কাজে ঢোকার আগে দিনের ভাতটুকু খেয়ে নেন এখানেই। আর তারপর, দুপুরের খদ্দের। তখন মাঝের ঝোল রেডি, ডিমের তরকারিও পাওয়া সম্ভব, পাওয়া যাবে চিকেন কারি। মোটামুটি তিনটের পরে আর ভাতের খদ্দের থাকে না। বাসন ধুয়ে, সব গুছিয়ে আশেপাশে কাকেদের ওড়াউড়ি পেরিয়ে এবার বাড়ি ফেরার পালা। আবার পরের দিনের ফার্স্ট ট্রেন। এমনি ভাবেই বয়ে চলে পথের জীবন, বেঁচে থাকা।

    সবশেষে আসে রাইটার্স বিল্ডিঙের গপ্পো। এই বাড়ির পুবদিকের রাস্তায় পাওয়া যায় না এমন জিনিশ নেই। ধরা যাক, গরমের দিনে চিড়ে দই বা ঘোলের সরবত। চিড়ে খই মুড়কি দই বাতাসা দিয়ে অমন সুস্বাদু এক মণ্ড কেরাণির শরীর স্নিগ্ধ করার পক্ষে যথেষ্ট। আছে বেলের পানা, প্রকান্ড এক কাচের জার থেকে যা ঢেলে দেওয়া হয় ক্রেতার গ্লাসে। আছে সস্তার বিরিয়ানি —-- ভারিসারি মাংস খন্ডের পরিবর্তে নেহাত আলু-বিরিয়ানি বা ডিম-বিরিয়ানি দিয়েও পেট ভরানো যায়। আছে আদি অকৃত্রিম টোস্ট, রুটি তরকারি ও মুড়ি- ঘুগনি। কাচে ঢাকা বাক্সে পাওয়া যাবে নানা রকম মিষ্টি —--- কাঁচা গোল্লা, মাখা সন্দেশ, ছানার জিলিপি, মিষ্টি দই, আর শীতকালে জয়নগরের মোয়া। বলা বাহুল্য, দামে সস্তা, স্বাদে স্বর্গীয়। আর বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে দিয়ে যদি পশ্চিমে যান তাহলেও পর পর অফিসবাড়ির নিচে খাবারের মহাসমারোহ। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের যে পুরোনো বাড়ি, তার নড়বড়ে তিনতলায় ওই দফতরেই চাকরি করতেন আমাদের অকালপ্রয়াত এক কবিবন্ধু নাসের হোসেন —-- টিফিন টাইমে নাসেরদার অফিসে আড্ডা দিতে গিয়ে দেখেছি তার একতলায় প্রকান্ড উনুনে জ্বাল হচ্ছে দুধ। ভাঁড়ে করে গরম দুধের সঙ্গে খেতে পারেন সেঁকা পাউরুটি। অথবা জেলি বা মাখন নয়, এই দোকানেই দেখেছি পাউরুটি টোস্টের সঙ্গে পাওয়া যায় পুরু করে মাখানো দুধের সর।

    এ তো গেল বাইরের ছবি, রাইটার্সের অন্দরমহল মানেও এক খাবারের পথ বা উদ্যান অথবা আরেকটু চালু ভাষায় ফুড-হাব। তবে আমজনতার সেইভাবে সুযোগ ছিল না প্রশাসনিক সদরের অন্দরে ঢোকার —-- দর্শনার্থীর ও দর্শনপ্রার্থীর নাম ঠিকানা পুলিশের কাছে জমা দিয়ে তবে ছাড়পত্র। যাঁরা কাজের সূত্রে ওই প্রাসাদের ভিতরে গেছেন তারা জানবেন, রাইটার্সের অন্দরে একবার ঢুকলে আপনার সরকারি দফতরের কাজ হবে কি হবে না তার নিশ্চয়তা না থাকলেও আপনার ক্ষুন্নিবৃত্তির কোনো অভাব থাকবে না। সরকারিভাবেই রাইটার্সের নিচের তলায় সব ব্লকগুলির মাঝে এক বিরাট ক্যান্টিন। সেখানে ভাত রুটি তরকারি মাছ মাংস ডিম চপ কাটলেট সব মেলে সুলভে, ক্যান্টিনের হলটি ব্যবহার হয় সভা-সমিতিতে। এটি হল সরকারি ব্যবস্থা। আর বেসরকারি হল গোটা একতলা জুড়ে নানা খাবার দোকান। সেখানেও চমৎকার বেঞ্চি, বা অস্থায়ী চেয়ার টেবিল, খাসা রসনা তৃপ্তির আয়োজন। এখানে পাওয়া যাবে রুটি, লুচি, পরোটা সঙ্গে ধোকার ডালনা, এঁচোড়ের তরকারি, ছোলার ডাল, কাঁচকলার কোপ্তা। আবার আরেকপ্রান্তে শশা আর মুড়ি, বাদাম। আর আশ্চর্য এই যে এইসব দোকানিদের মধ্যে, এঁরাও আসতেন দূর গাঁ থেকে, খেয়াল করেছি এক নমিত আচরণ। খাবার পরিবেশনের মধ্যে যেমন এক আন্তরিকতা, তেমনি নম্র বিনতি —- খাবার ঠিক ছিল তো ? এই জিজ্ঞাসার ভিতর নিখাদ এক অপাপবিদ্ধ সম্পর্কের বিচ্ছুরণ যা উত্তীর্ণ হয়ে যেতে চায় ক্রেতা-বিক্রেতার নগদ বিদায়ের আকাঁড়া যোগসূত্র থেকে। কী আর দাম ছিল খাবারের—- নয়ের দশকের মাঝামাঝি, বড়জোড় কুড়ি টাকা কিন্তু এই প্রশ্নগুলো শুধু আর্থিক মূল্যের থেকে ছিটকে আসে না। আজকের দামী রেস্তোঁরায় হাজার টাকায় এক প্লেট খাবার খেয়ে যাকে বলি সারভিস রেটিং, এ যেন তারই এক মিত সংস্করণ।

    তবে মহাকরণের খাবার যে শুধু নীচের তলায় তা নয়। প্রতিটি ব্লকের প্রতিটি বারান্দায় ও দফতরের প্রধান ঢোকার পথে ছিল খাবারের কর্নার। চা কফি বিস্কুট কেক লাড্ডু নয় সেখানে সকালের দিকে এগারোটা নাগাদ চলে আসত গরম সিঙ্গাড়া, ডিমের ডেভিল, ভেজিটেবল চপ, মাংসের চপ। কেরাণিবাবুরা টেবিলে বসে আয়েস করে সকালের চা খেয়ে দুয়েকটা ফাইল নেড়েচেড়েই বেরিয়ে পড়তেন করিডরে। হয় ধূমপান, নয় ওই খাবার কর্নার ঘিরে গুলতানি আর তারই সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যেত গরম চপ সিঙ্গাড়া, আবার একপ্রস্থ ভেজে আসত। মাঝে মাঝে অভিযোগ উঠত, সরকারি অফিসের ভিতরে স্টোভ বা গ্যাস জ্বেলে এসব কাজের যাথার্থ্য নিয়ে, আবার থিতিয়েও যেত। কারণ পেট বড় বালাই। বড় বড় আমলারা কি আর জানতেন না ? কিন্তু তাঁদেরও তো খিদে পেত আর পদাধিকারের ভারে তাঁরা করিডরে আসতে না পারলেও আর্দালিদের দিয়ে সেইসব সুখাদ্য তাঁদের ঘরেও তো অনুপ্রবেশ করত। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সামনের বারান্দায় চা আর ডিমের ডেভিল ছিল এক আশ্চর্য যুগলবন্দি। রাজ্য পুলিশের অধিকরণ তখন রাইটার্সেই, সেখানকার পুলিশ দফতরের বড়বাবু মেজবাবুদের অশেষ ক্ষমতা কিন্তু তেলেভাজার টানে তাঁরা চেয়ার ছেড়ে ঘুরে বেড়াতেন করিডরে। আইন দফতর, সমবায় দফতর ও স্বাস্থ্য দফতরের বিরাট গোলোকধাঁধা চৌহদ্দিতে বহুদিন যাতায়াত করেছি আর চোখে ও চেখে দেখেছি সেই খাদ্য সমারোহ। কিন্তু এতক্ষণ যেটুকু বললাম তার সবটাই যে অতীতকালের ক্রিয়ারূপে, পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন। হ্যাঁ, ঘটনাটা সবাই জানেন। ২০১১ সালের পালাবদলের পরে রাজ্যের ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সদর দফতর সরিয়ে নেওয়া হয় মহাকরণ থেকে। এর প্রত্যক্ষ ধাক্কায় বেসামাল হয়ে যায় রাইটার্সের সদর ও অন্দরের খাবার পথ। যারা ব্লকে ব্লকে করিডরে ও বারান্দায় খাবার বিক্রি করতেন তাঁদের সংখ্যা ছিল একশোর কাছাকাছি —- তাঁরা জীবিকা হারান। আর নিচের তলায় যারা ছিলেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে, অফিস উঠে যাওয়ার পর তাঁদের খদ্দের পাওয়ার আশাও হারিয়ে যায়, বন্ধ হয়ে যায় সুপ্রাচীন ক্যান্টিন। খন্ডহারের মতো সৌধের আনাচে কানাচে পায়রার বাসা, ধুলো, মাকড়সার জাল। বাইরের পথে কিছু মানুষ তখনও ছিলেন, কিন্তু এর পরে পথ খালি করার অছিলায় সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁদেরও। রাইটার্সের পুব ফুটপাথ এখন প্রশস্ত পথিকের। হায়, কোন পথিক আর হাঁটবেন সেই পথে ? উধাও হয়েছে কেরাণিকুল, ডোডোপাখির শূন্যতা নিয়ে ফিরে গেছেন খাবার পথের সেই শ্রমসিক্ত বেচারা মানুষগুলি।

    পরবর্তী ও শেষ পর্ব প্রকাশিত হবে ২০ সেপ্টেম্বর (রবিবার)

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন