এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জগন্নাথ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২ বার পঠিত
  •  

    জগু... এই জগু শিগ্গীর বাড়ি যা। তোর মা মরে গেছে। জগু বা জগা বা জগাই বা জগ্গু— মুখের ফেরে নামের ফের। নাম যাই হোক হাফ প্যান্ট আর হাফ শার্ট পরা শ্যামবর্ণ ছেলেটার বয়েস মোটে পাঁচ। ঘোষেদের পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছিল। জনা চারেক লোক ফাতনার দিকে চোখ রেখে ধ্যানমগ্ন মুনির মতো বসে আছে। ফিরফির করে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কার্তিক মাস পড়ল। হাওয়ায় বেশ টান লেগেছে। নীরব আশপাশ। তীরবেগে ছুটে আসা বাকুলির মুখ থেকে বাতাসে আছড়ে পড়ল কথা কটা।
    জগাই কি বুঝল কে জানে বাকুলির মুখের দিকে একটু হাঁ করে তাকিয়ে থাকল, তারপর তীরের বেগে আগান দিয়ে বাগান দিয়ে দৌড় লাগাল বাড়ির দিকে।

    ইঁটের গাঁথনির ওপর টালির চালের দুখানা ঘরের বাড়ি। সামনে একটু উঠোন। সেখানে জনা কুড়ি লোকের জটলা। জগন্নাথ ছুটতে ছুটতে সেখানে এসে পৌঁছল। দৌড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। সেখানে তার বাবা মৃদুল দাশ, ছোট মাসি, বড় জেঠা এবং পাড়ার বয়স্ক মানুষ রামেশ্বরবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। জগু বেড়ালের মতো লাফ দিয়ে চৌকিতে গিয়ে উঠল। মায়ের মুখ ধরে নাড়াতে লাগল — ‘ মা ওঠ ওঠ .... বিকেল হয়ে গেছে... ঘোষবাবুদের পুকুরে কত্ত ট্যাংরা মাছ উঠেছে দেখবে চল....ওঠ না...ওঠ না ... ‘, মরা মায়ের শরীর ধরে নাড়া দিতে লাগল। ঘরের সবাই ভিজে চোখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মৃদুল ধরা গলায় অস্ফুটে বলল, ‘ কাল রাতেও তো কিছু বুঝিনি... শুধু একটু তাপ ছিল গায়ে... ক’দিনের জ্বরে যে এতবড় সব্বনাশ হবে...হায় কপাল...কচি ছেলেটাকে সামলাব কি করে.... ‘।
    রামেশ্বরবাবুর শরীরটা বিশাল কিন্তু মন একেবারে নরম কাদার মতো। বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। তিনি অশ্রুসজল নয়নে চৌকির ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং শালপ্রাংশু দুটি হাত বাড়িয়ে মাতৃসুলভ মমতায় জগন্নাথকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরলেন।
    দাহ কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল। নদীর ধারে শ্মশান। আলো তেমন নেই।
    নদীর উল্টোদিকে দুটো ল্যাম্প পোস্ট। টিম টিমে হলুদ আলো। শ্মশান যাত্রীদের হারিকেন, হ্যাজাক সঙ্গে নিয়ে আসতে হয়। নদীর ধারে শ্মশান বরাবর ঝাউ গাছের সারি। গাছের আগায় শকুনের পাল ঝিমোয় সারা দিনমান। রাত নামলে নেমে আসে পটাপট। ঘাপটি মেরে থাকে আঁধার কোনে খাদ্য প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায়।ক্ষুধাতুর লোলুপ চোখে ভাবে এই জ্যান্ত মানুষগুলো কবে শব হবে। দক্ষিণদিকের পোড়ো জমির বাদাড়ে ঝোপের থেকে বেরিয়ে আসে শেয়াল। দল বেঁধে বসে থাকে শ্মশানের দিকে মুখ করে।
    জগন্নাথকে আনা হয়নি শ্মশানে।
    পাড়ার সকলেই একমত— পাঁচ বছরের ছেলের মুখাগ্নি ক্রিয়া হয়না। মহিলার দল সারাদিন জগুকে সামলে রাখলেও তার নিরন্তর ‘মা কোথায় গেল...মা-র কাছে যাব’ -র অমোঘ বোধহীনতা বুক পেতে নিয়েছেন রামেশ্বর ভটচাজ কয়েক ঘন্টা ধরে। তিনি শ্মশানবন্ধু হননি। এ বাড়িতে থেকে গেছেন জগন্নাথকে স্নেহচ্ছায়ায় ঘিরে রাখার জন্য। শ্রান্ত, বিভ্রান্ত পাঁচ বছরের শিশু জগন্নাথ একসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে একটা স্বপ্ন দেখল।
    নদীর ধারে সুন্দর একটা ফুলের বাগান। সেখানে ভোরবেলায় একটা শিউলি ফুলের গাছ থেকে মা ফুল তুলছে। গাছের তলাটা ভরে আছে ফুটফুটে সাদা ঝরা শিউলিতে। জগু বাগানে একটা মাটির ঢিপির ওপর বসে আছে। মা ফুল তুলতে তুলতে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকল একবার। জগু ঢিপিটা থেকে নেমে মার কাছে যাওয়ার জন্য ছুটতে গেল। পা দুটো আটকে যেতে লাগল। বাগানে হাওয়া বইছে শনশন করে। জগন্নাথ প্রাণপণে ছোটার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু হাওয়ায় তার পা জড়িয়ে যেতে লাগল। মা তার দিকে তাকাচ্ছে না। ফুল তুলে যাচ্ছে আপন মনে। জগু আরও জোরে ছুটতে গেল। পা জড়িয়ে যাচ্ছে খালি। খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছে। তাকে যেন জড়িয়ে ধরতে লাগল। সে আবার ছুটতে গেল। ছুটতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে......।জগন্নাথের ঘুম ভেঙে গেল। খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে ধড়মড় করে উঠে বসল। তারপর কান্না জুড়ল তারস্বরে — মা..র কাছে যা...ব ...
    মা...র কা...ছে যা...ব...।
    রামেশ্বরবাবুই পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। জগন্নাথকে কোলে বসিয়ে বলতে লাগলেন, ‘ তোর মা একটা জায়গায় বেড়াতে গেছে ... তুই ঘুমোচ্ছিলি বলে তোকে নিয়ে যেতে পারেনি। শিগ্গীর ফিরে আসবে। না আসলে আমরাই তার কাছে যাব ...বুঝলি তো জগু ... কিচ্ছু ভাবিসনি...নিশ্চই যাব ... ‘ প্রবীন পোড় খাওয়া মানুষ রামেশ্বরবাবুর কি জানি কেন চোখভরে নোনা জল উপচে উঠল। অমসৃণ গাল বেয়ে জল গড়াতে লাগল। জগন্নাথ কান্না ভুলে হাঁ করে তাকিয়ে রইল রামেশ্বরের গালের দিকে।
    তিনদিন পরে কালীপুজো। ভূত চতুর্দশীর রাত।

    জগন্নাথের বাবা মৃদুল দাশ একটা ছোট স্টেশনারি দোকান চালায়। দোকান বন্ধ করে রাখলে রোজগার মার খায়। মৃদুল পরের দিনই দোকান খুলল। জগন্নাথ রইল তার মাসীর জিম্মায়। সারাদিন বিশেষ মায়ের কথা বলেনি। শিশুদের মনে স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত বিস্মরণের আস্তরন পড়ে। কিন্তু সন্ধেবেলায় রামেশ্বরবাবুকে দেখে তার আবার মায়ের অনুপস্থিতির অনুভব বুক জুড়ে বসল। সে ছুটে গিয়ে রামেশ্বরের হাত ধরল। হাত ধরে নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতে লাগল— দাদু, আমরা কবে মার কাছে যাব... বলনা.. কবে যাব... বলনা..বলনা...’, জগন্নাথ আচমকাই অস্থিরতা প্রকাশ করতে লাগল।
    রামেশ্বর সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বলে দিল, ‘ এই তো... কালীপুজোর আগের দিন। ভূত চতুর্দশীর রাতে .... ‘
    ক্ষুদে জগন্নাথ রামেশ্বরের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, ‘ কবে বললে ? ‘
    রামেশ্বর জগুকে জানায়, ‘ এই তো...পরশুদিন ‘।

    দিলীপ আড্ডি মৃদুলের দোকানের বাইরে পাতা টুলে বসে পাঁচ কথা বলে বিকেলবেলায়। লোকজন আসে যায়। টুকিটাকি জিনিসপত্তর কেনে। দিলীপ বসে বসে লোকজন দেখে, বেচাকেনা দেখে। এসব আটপৌরে লোকের উষ্ণতা মাখতে তার ভাল লাগে।মাঝে মাঝে দু চারটে কথা বলে।
    — ‘ তা ঘরে বসেই বা কি করবি। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। যে যায় সে তো আর ফেরে না ... তা দোকান খুলে ভালই করেছিস... অ্যা..ই হ্যাট হ্যাট ... ‘ দোকানের বাইরে ঝোলানো রকমারি চিপস্-এর প্যাকেটের দিকে আগুয়ান একটা গরুর অগ্রগতি প্রতিরোধ করে দিলীপ দুহাতে তালি মেরে।
    — ‘ তোদের ঘাটকাজ তো বারো দিনে নাকি ?’
    — ‘ হ্যাঁ। শ্রাদ্ধ তেরো দিনে ‘, কাঁচের বয়াম থেকে গোটাকতক লজেন্স বার করতে করতে কথা কয় মৃদুল। সামনে খদ্দের দাঁড়িয়ে আছে।
    — ‘ হ্যাঁ ওই আর কি ... তা ছেলেটাকে কাছা টাছা পরাসনি তো। ওইটুকু বাচ্চা...’
    — ‘ না না ওইটুকু বাচ্চাকে কাছা পরানোর নিয়ম নেই।’
    — ‘ তাই তো .... ‘
    মৃদুল রাত নটা নাগাদ দোকান বন্ধ করে। তারপর আঁধার মাখা পথ ধরে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। দিলীপ আড্ডি আড্ডা দেয় সন্ধে সাতটা পর্যন্ত। তারপর গা তোলে। যাবার রাস্তায় কালীবাড়ি পড়ে। ওখানে একটু দাঁড়িয়ে পেন্নাম এবং প্রার্থনা সেরে যায়।
    সারা এলাকাতেই বিদ্যুৎ এসে গেছে। তবে আলোয় তেমন জৌলুস নেই। অনেক ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলেই না। রাস্তার দুপাশে অঢেল গাছ। আশ শ্যাওড়ার ঝাঁকড়া গাছে ভর্তি। কৃষ্ণপক্ষের রাত। তবে পরিষ্কার আকাশে তারার চুমকি। খালের ওপারে খানিকটা শহুরে পোঁচ পড়লেও এদিকটায় আদ্যন্ত গেরাম। ওই ল্যাম্পপোস্ট ছাড়া।
    অন্যদিন দিলীপ ঘরের পথ ধরা হাটের লোকজন পায় বাড়ি ফেরার পথে। আজ কি জানি কি কারণে রাস্তা ফাঁকা। দিলীপ আড্ডি একা একা হেঁটে চলেছে। চারপাশে ঝিঁঝির একটানা বাজনা শুরু হয়েছে। থেকে থেকে উত্তুরে হাওয়া দিচ্ছে। রাস্তায় একটা বেশ চওড়া খানা পড়ে। বহু পুরোনো। আজও বেঁচে এবং জেগে আছে। মুছে দেওয়া হয়নি। তার ওপরে একটা সাঁকো। বয়স্ক সাঁকো। কিন্তু থেকে গেছে এখনও। দিলীপ সাঁকোটার কাছাকাছি এসে গেল। আট দশ ফুট দূর থেকে নজরে এল সাঁকোর ওপর কে একটা দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু এগোতে বোঝা গেল ওটা একজন যুবতী মহিলা। শাড়ি পরা। দিলীপ আড্ডি ভাবল কি বেআক্কিলে মেয়েছেলে ! দিনকাল ভাল না। অন্ধকারে নির্জন রাস্তায় একলা দাঁড়িয়ে আছে কোন আক্কেলে। হাটের দিক থেকে ওর বরের আসার কথা নাকি ?
    সে যাই হোক দিলীপ এগোতে লাগল আপনমনে। ঠিক সামনা সামনি আসতে নারীকন্ঠ শোনা গেল— ‘ দিলীপদা ভাল আছেন ? পরশু ভূত চতুর্দশীর রাতে শ্মশানে থাকব। আমি তো শ্রাদ্ধ পর্যন্ত শ্মশান ছেড়ে বেরোতে পারব না।ওখানে জগাকে একটু দেখতে চাই... টানটা কাটাতে পারিনি মোটে...’।
    দিলীপ দেখল মৃদুলের দুদিন আগে দেহ ছেড়ে যাওয়া বউ গায়ত্রী দাঁড়িয়ে আছে।
    অন্য কোন লোক হলে ভিরমি খেত তক্ষুণি। দিলীপ সে ধাতের মানুষ নয়। তার বাপ পঞ্চানন আড্ডি নাম করা গুণিন ছিল। গুণিন মানে ভূতের গুণিন। তাদের বাড়ির পেছনে অন্ধকার বাগানে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য কাদের সঙ্গে যেন কথা বলত। অনেক বছর ধরে দিলীপ এসব দেখেছে।
    পঞ্চানন দেহ রাখার তিনমাস পর পর্যন্ত ফাঁকা রাস্তায় দিলীপের পাশে পাশে হাঁটত। টুকটাক পরামর্শও দিত। দিলীপ কোনদিন ঘাবড়ায়নি। সে ছোটবেলা থেকে এ সবে অভ্যস্ত। সে ওখানে দাঁড়িয়ে গেল। ইচ্ছে করেই টর্চ জ্বালাল না।টর্চের আলোয় স্বস্তি পাবে না ও, এটা জানে দিলীপ। অন্ধকার তেমন গাঢ় হয়নি এখনও। আবছা আঁধারে খুব কাছ থেকে পরিষ্কার দেখল ঘোমটা মাথায় দিয়ে একটা খয়েরি রঙের শাড়ি পরে গায়ত্রী দাঁড়িয়ে আছে। মুখে প্রসন্ন ভাব। দিলীপ খুব তাড়াতাড়ি জবাব দিল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে’। তাড়াতাড়ি বলল কারণ সে জানে দেহত্যাগী মানুষের অধিষ্ঠানের মেয়াদ অতি স্বল্পক্ষণ। ঠিক তাই হল। দিলীপ মুখ থেকে কথাটা ফেলার পরই আচমকা কোথা থেকে এক ঝলক ঝড়ো হাওয়া উঠল দশ বারো সেকেন্ডের জন্য এবং খয়েরি শাড়ি পরা গায়ত্রী হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

    এদিকে রামেশ্বরবাবু পড়েছেন মহা আতান্তরে। অবোধ সরল শিশু জগুকে তিনি কথা দিয়েছেন তার মা-র কাছে নিয়ে যাবেন আগামীকাল ভূত চতুর্দশীর রাতে।কিন্তু তিনি জানেন ব্যাপারটা কার্যত অসম্ভব।
    প্রথমত আমাবস্যার রাতে নির্জন নদীর পারে জঙ্গলের ধারে অন্ধকার শ্মশানে একা যাওয়ার মতো বুকের পাটা তার নেই। কোন পার্টি থাকলে অবশ্য আলাদা কথা। কিন্তু সেটা অনিশ্চিত। আর দ্বিতীয়ত, কথার কথা একটা বলেছেন বটে জগন্নাথকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এহেন আধিদৈবিক ব্যাপার স্যাপারে তিনি বিশ্বাস করেন না। এদিকে জগন্নাথ পুন:পুন: ‘কাল তা’লে মার কাছে যাব তো’-র সুনিশ্চিত আশ্বাসের নিশ্চয়তা আদায়ের উন্মাদনায় রামেশ্বরবাবুকে অস্থির করে তুলেছে। রামেশ্বর ভটচাজ মহা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। ব্যাপারটা না পারছেন গিলতে না পারছেন ওগরাতে।
    বেলা প্রায় বারোটা। রামেশ্বরবাবু মৃদুলদের ঘরের বাইরের বারান্দায় আনমনে বসেছিলেন গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে। এমন সময়ে উঠোনের ওপাশে দরমার বেড়া ঠেলে দিলীপ আড্ডি ঢুকল।
    — ‘ আরে ভটচাজ্ মশাই যে... ভাল আছেন। এখন আর বটতলায় তাস খেলতে যান না ?’
    — ‘ না: অনেকদিন যাওয়া হয়নি। তেমন সময় পাই না। এ বাড়ির ব্যাপার তো সব জান নিশ্চই।’
    — ‘ হ্যাঁ সব জানি। মৃদুলের দোকানে আমি প্রায় রোজই যাই। আপনার সমস্যাটাও আমি জানি। কাল রাত্রে আমার বাবা এসেছিল অনেকদিন পরে।বাবা আমাকে সব বলেছে।আমি সেই ব্যাপারেই আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি।
    — ‘ সেই ব্যাপারে মানে ?’
    — ‘ এই জগন্নাথকে নিয়ে...... ‘
    রামেশ্বর ভট্টাচার্য বিস্ময়ে বিমূঢ় এবং হতবাক হয়ে দিলীপের মুখে নিজেরই কানে নিজের সব কথা শুনলেন। তার পাঁচবছর আগের মৃত বাবা এসে নাকি দিলীপকে সব বলে গেছে। রামেশ্বর স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।
    — ‘ আপনি কিছু চিন্তা করবেন না রামেশ্বরদা। আমিই জগাকে শ্মশানে নিয়ে যাব কালকে।’

    ়়়়়়়়়়়়়়়়়়়
    ভূত চতুর্দশীর দিন গড়িয়ে গড়িয়ে পালিয়ে গেল। ক্রমে সন্ধে হল। রাত গাঢ় হতে লাগল। দু প্রহর গেল প্রায়। জগন্নাথ অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। জেগে বসে থাকতে থাকতে বেচারি ঘুমিয়ে পড়েছে। রামেশ্বরবাবু ঠায় বসে সেই সন্ধে থেকে।
    দিলীপ আড্ডি ঘুমন্ত জগন্নাথের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হাতের তর্জনি বাডিয়ে দিল তার দিকে। কেউ কিছু দেখতে পেল না। জগন্নাথ পরম ভরসায় হাত বাড়িয়ে ধরল দিলীপের সেই বাড়িয়ে দেওয়া আঙুল। সে চোখ মেলল। উঠে দাঁড়াল। তারপর দুজনে চলতে লাগল।
    দরমার দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। দুজনে পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে ঘোর আঁধার দন্ডিরহাটের গ্রাম্য পথে নির্বাকভাবে হাঁটতে লাগল। যেন তারা এইভাবে পথ চলতে যুগ যুগান্ত ধরে অভ্যস্ত। দুজনে পৌঁছে গেল নদী আর জঙ্গলের ধারে শ্মশানকালিতলায়।
    গ্রহ তারায় ভরা আকাশ। চাঁদ নেই। কৃষ্ণ পক্ষ। ওপর পানে মুখ করে হাঁ করে জঙ্গলের গাছগুলোর মাথা ছাড়িয়ে যে আঁধার ভরা গভীর আকাশ সেই দিকে তাকিয়ে রইল দুজনে একসঙ্গে। অনাদি অনন্তকালের সময় প্রবাহ শীতল স্রোতের পারা বয়ে যাচ্ছে অবিরাম। দুজনে দুজনের হাত সেই একইভাবে আঁকড়ে আছে। তাদের পায়ের ওপর দিয়ে সড়সড় করে কোন সরীসৃপ মাঠ পার হচ্ছে। অন্ধকারে দেখা যায় না কিছু। সাপ টাপ হবে বোধ হয়। কোন কালান্তক বিষধর হতে পারে। দুজনে শব্দহীন, বাক্যহীন, নীরব......
    বহু মুহূর্ত কেটে গেল সেই নিথর নির্জনতায়। এক সময়ে মুখ নামিয়ে ক্ষুদে জগন্নাথ এবং দিলীপ আড্ডি রহস্যময় শ্মশানভূমের দিকে চোখ রেখে কি এক গভীর আবেশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার তাদের চোখের আলোয় ফিকে হয়ে যাচ্ছে যেন। জীবন আর মৃত্যু নিবিড় গভীর আলিঙ্গনে পরষ্পরকে পরম স্নেহে বাঁধতে লাগল। শ্মশানভূমি সহসা যেন অনুপম সুগন্ধের রমনীয়তায় ছেয়ে গেল।

    এতক্ষণ নির্বাক দিলীপ আড্ডি হঠাৎ বাঙ্ময় হয়ে উঠল — ‘ ও..ই ওই দেখ জগু তোর মা দাঁড়িয়ে আছে। যা.... তুই... ‘।
    জগন্নাথ মা-র দিকে ছুট লাগাল। মাঠের ঠিক মধ্যিখানে শিশির ধোয়া শ্যামল ঘাসের কোলে জগন্নাথের মা দাঁড়িয়ে আছে ফলসা রঙা শাড়ি পরে। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। দুটো চোখ থেকে অবারিত স্নেহের ধারা কোন এক স্রোতস্বিনীর মন্দ্র স্রোতের মতো অবিরাম নেমে আসছে। ছোট্ট জগন্নাথ ছোট ছোট পায়ে আপ্রাণ ছুটছে আঁধার কেটে আলোর কাছে পৌঁছবার জন্য। দিলীপ আড্ডি সেই নির্জন প্রান্তরে এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো একাকী দাঁড়িয়ে মুহূর্ত গুনতে লাগল কতক্ষণে জগন্নাথ তার মা-র কাছে পৌঁছয়।
    দিলীপের মনে হল পেছন দিক থেকে একটা ঘূর্ণি বাতাস আসছে। সে বুঝতে পারল তার বাবা পঞ্চানন আড্ডির আবির্ভাব ঘটতে চলেছে তাকে কিছু পরামর্শ দেবার জন্য, খুব সম্ভবত: জগা এবং গায়ত্রীর পরবর্তী সাক্ষাৎ সম্পর্কিত নির্ঘন্ট আলোচনার জন্য।

    দিলীপ আড্ডি এরপর দুটো আমাবস্যার রাতে জগন্নাথের সঙ্গে তার মায়ের দেখা করাল শ্মশানের কাছে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে।
    তৃতীয় আমাবস্যার দিন সন্ধেবেলা দিলীপ ওদের বাড়ি গিয়ে দেখল বাইরের বারান্দায় জগন্নাথ বাবার কোলে বসে। মাথা নীচু করে খুব মন দিয়ে কী একটা ছবি আঁকছে নানা রঙের রঙ পেন্সিল দিয়ে। তার বাবা মৃদুল তাকে আঁকড়ে ধরে আছে পেটের কাছে বেড় দিয়ে ধরে।
    দিলীপ বলল, ' কী ব্যাপার, আজ দোকান খোলনি ? '
    মৃদুল জগার ছবি আঁকা দেখছিল। সে মুখ তুলে বলল, ' হ্যাঁ... ওবেলা খুলেছিলাম। এবেলা আর বেরতে ইচ্ছে করল না। এ..ই ছেলে কোলে নিয়ে বসে আছি। বলল যে, আমি মার ছবি আঁকছি .... দেখ তুমি... ওর বোধহয় খেয়াল নেই আজ আমাবস্যা... '
    দিলীপ বলল, ' খেয়াল না থাকাই ভাল। আস্তে আস্তে টানটা কমে আসলেই ভাল। এভাবে সাক্ষাৎ হওয়া তো মঙ্গলের ব্যাপার না। তোমার বউ এখন আর এক লোকে অধিষ্ঠান করছে। তাকে ডাকাডাকি করলে তার শুধু কষ্টই বাড়বে। দুই জায়গার টানাটানির ফল ভাল হয় না... '
    মৃদুল বলল, ' হ্যাঁ, তা ঠিক। জগার মনে হয় টানটা পাতলা হয়ে এসেছে। আর দু চার দিনে ভুলে যাবে আশা করি ... '
    ----- ' হুঁ হুঁ... সেটাই দরকার সেটাই দরকার ... '

    জগন্নাথ হঠাৎ তার আঁকা ছবি থেকে মুখ তুলে সামনে একটু ওপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
    হঠাৎ বলল, ' ওই দেখ ... মা... '
    মৃদুল চমকে উঠে বলল, ' কে... কে ? '
    দিলীপ আড্ডি বুঝতে পারল একটু দূরে মাটি থেকে
    তিনতলা সমান উঁচুতে ধুলো পাকিয়ে উঠছে ঘোর লাগা বাতাসে ।
    সে গুণিন পঞ্চানন আড্ডির ছেলে দিলীপ আড্ডি। বুঝতে কোন সমস্যা হল না গায়ত্রী এখনও জগন্নাথের মায়া কাটাতে পারেনি। জগন্নাথের অশরীরি মা জানে জগা আজ শ্মশানে যাবে না। তাই সে নিজেই চলে এসেছে এখানে, হয়ত অনেক কষ্টে আর এক ভূবনের জাল ছিঁড়ে।
    দিলীপ আড্ডি ওই দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ ।
    তারপর মৃদুলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ' ওকে ছেড়ে দাও। ওর মা এসেছে... সে ছেলের টান কাটাতে পারেনি এখনও ... '
    একটা সাদা পাতায় জগন্নাথের আঁকা ছবিটাকে অন্ধকার থেকে ছুটে আসা একটা দমকা হাওয়া আচমকা উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল ওই সামনের মাঠের ঘূর্ণি বাতাসের দিকে।
    পিছনে পিছনে ছুটল জগন্নাথ। ছবি বাতাসে ভেসে ভেসে যাচ্ছে। আর পিছন পিছন জগন্নাথ ।

    **************★***************★**********★***


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন