এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা   ইতিহাস

  • বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী 

    দীপ
    আলোচনা | ইতিহাস | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৯২ বার পঠিত
  • অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই ইতিহাস আমরা যেন ভুলে না যাই!
    অবশ্য এই ইতিহাস ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা যথেষ্ট ক্রিয়াশীল।
     
    এদের‌ই একজন রমা চৌধুরী। বীরাঙ্গনা নারী জীবনে অজস্র দুঃখ পেয়েছেন; তবুও হার মানেননি!
     
    বীরাঙ্গনা, আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম!
    -------------------------------------------------------------------
     
     
    রমা চৌধুরী: একাত্তরের জননী ও এক অসীম জীবনসংগ্রামের নাম

    একজন নারী। একাত্তরের আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি জীবন। একের পর এক সন্তান হারানোর অসহনীয় শোক। ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো। তবু থেমে যাননি তিনি। খালি পায়ে হেঁটেছেন, নিজের লেখা বই মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন, আর বুকের ভেতর জমে থাকা অগণিত ক্ষতকে শব্দে রূপ দিয়েছেন। তিনি রমা চৌধুরী—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক বীরাঙ্গনা, লেখক এবং অসীম জীবনসংগ্রামের প্রতীক।

    রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই মেধা ও মননে ছিলেন উজ্জ্বল। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বলা হয়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে তিনি অন্যতমা। শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী প্রায় ১৬ বছর বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বপালন করেন।

    কিন্তু ১৯৭১ তাঁর জীবনকে এমনভাবে বদলে দেয়, যার ক্ষত আর কখনো শুকায়নি।মুক্তিযুদ্ধের সময় তিন সন্তানকে নিয়ে পৈতৃক ভিটায় ছিলেন রমা চৌধুরী। তাঁর স্বামী তখন ভারতে চলে গিয়েছিলেন। ১৩ মে ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। তাঁকে জোর করে পাশের একটি নির্জন ঘরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের পরও সন্তানদের কথা ভেবে আত্মহননের পথ বেছে নেননি তিনি। বরং সুযোগ পেয়ে হানাদারদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেন।

    তারপরও রক্ষা মেলেনি। হানাদাররা গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়ি ও সহায়সম্পদ। এক মুহূর্তে আগুনে ছাই হয়ে যায় আশ্রয়, সংসার ও জীবনের পরিচিত সবকিছু। এরপর তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে শুরু হয় তার আরেক যুদ্ধ—বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

    স্বাধীনতার বাকি আট মাস তাঁকে কাটাতে হয় জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে। দিনের আলোয় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ, আর রাত নামলে পোড়া ভিটায় ফিরে কোনোভাবে মাথা গোঁজার চেষ্টা। কখনো পলিথিন, কখনো খড়কুটো—এসব দিয়েই তৈরি হতো রাতের সাময়িক আশ্রয়। চারপাশে যুদ্ধ, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা; আর সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

    সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তিনি নিজের মধ্যে চাপা রাখেননি। বহু বছর পর কলম ধরেছিলেন সেই স্মৃতি লিখতে। তাঁর লেখা ‘একাত্তরের জননী’ হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের এক হৃদয়বিদারক দলিল। সেখানে উঠে এসেছে একজন নারীর চোখ দিয়ে দেখা যুদ্ধ, নির্যাতন, অনিশ্চয়তা, সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি এবং স্বাধীনতার জন্য মানুষের অসীম ত্যাগের কথা। বইটি তাই শুধু রমা চৌধুরীর আত্মজীবনী নয়; এটি একাত্তরের ইতিহাসেরও এক বেদনাময় দলিল।

    কিন্তু স্বাধীনতা তাঁর জীবনে শান্তি নিয়ে আসেনি। যুদ্ধ শেষ হলেও শুরু হয় আরেক দীর্ঘ শোকের অধ্যায়। বিজয়ের ঠিক আগে ১৫ ডিসেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়ে তাঁর সন্তান সাগর। ২০ ডিসেম্বর রাতে মারা যায় সে। পরের বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি আরেক সন্তান টগরও মারা যায়। এরপরও নিয়তি তাঁকে ছাড়েনি। দ্বিতীয় সংসারে জন্ম নেওয়া ছেলে টুনুও ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।

    একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় শোক আর কী হতে পারে? একে একে তিন সন্তানকে হারানোর সেই বেদনা নিয়েই বেঁচে ছিলেন রমা চৌধুরী। তার জীবন যেন বারবার ভেঙেছে, কিন্তু প্রতিবারই কোনো অদৃশ্য শক্তিতে তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।

    মুক্তিযুদ্ধের পর প্রায় দুই দশক লেখালেখিকেই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেন তিনি। প্রথম দিকে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। লেখার বিনিময়ে অর্থের বদলে পেতেন পত্রিকার কপি। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন। পরে নিজের লেখা বই নিজেই প্রকাশ করতে শুরু করেন। বই হাতে নিয়ে চট্টগ্রামের পথে পথে ঘুরেছেন, মানুষের কাছে নিজের লেখা পৌঁছে দিয়েছেন।

    তাঁর সাহিত্যজগৎও ছিল বিস্তৃত। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতায় তিনি তুলে এনেছেন জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের অন্তর্গত বেদনার কথা। ‘একাত্তরের জননী’, ‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’, ‘আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রু ভেজা একটি দিন’, ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘অপ্রিয় বচন’, ‘লাখ টাকা’ ও ‘হীরকাঙ্গুরীয়’ তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

    তবে লেখক পরিচয়ের বাইরেও রমা চৌধুরী মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তার জীবনযাপনের অনন্যতার কারণে। মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন তিনি জুতো পরতেন না। সন্তান হারানোর পর সেই অভ্যাস আরও দৃঢ় হয়। কেউ প্রশ্ন করলে বলতেন, "এই মাটিতে আমাদের দেশের ছেলেরা শুয়ে আছে, কিকরে তাদের বুকের উপর দিয়ে জুতোপায়ে হাঁটি?"
    চট্টগ্রামের রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে বই বিক্রি করেছেন তিনি। মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও যেন নিজের এক গভীর নিঃসঙ্গতা বয়ে বেড়াতেন। তাঁর খালি পা হয়ে উঠেছিল কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এক নীরব প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের প্রতীক।

    জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল কষ্টে ভরা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় তার। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করার পর ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রমা চৌধুরী। বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

    রমা চৌধুরীর জীবনের দিকে তাকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যে যুদ্ধে শুধু রণাঙ্গনের যোদ্ধারাই লড়েননি, লড়েছেন অসংখ্য নারীও। কেউ অস্ত্র হাতে, কেউ সন্তানকে বুকে আগলে, কেউ ঘর হারিয়ে, কেউ নির্যাতনের ক্ষত বয়ে। রমা চৌধুরী সেই অগণিত নারীর একজন, যাঁর ব্যক্তিগত জীবন একাত্তরের নির্মম ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গেছে।

    তিনি হারিয়েছেন ঘর, স্বজন, সন্তান, স্বাভাবিক জীবন। তবু হার মানেননি। নিজের ক্ষতকে শক্তিতে পরিণত করে কলম ধরেছেন। তাই রমা চৌধুরী শুধু একজন লেখক নন, শুধু একজন বীরাঙ্গনাও নন—তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অপরাজেয়া প্রতিমা; যাঁর জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাঁদের বেঁচে থাকার গল্প কখনো শেষ হয় না।

    তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমাদের বিনম্র প্রণাম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন