১) টাকা কই কই, টাকা কই কই?কথা ছিল, প্রশিক্ষণ শেষ করে সার্টিফিকেট পেলে প্রত্যেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ৫০০ টাকা জমা পড়বে। এর জন্য দরকার ছিল একটাই জিনিস, একটা অ্যাকাউন্ট নম্বর।
অডিট করতে গিয়ে দেখা গেল, PMKVY-র দ্বিতীয় আর তৃতীয় পর্বের ৯৫ লক্ষ ৯০ হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৯০ লক্ষ ৬৬ হাজার জনের অ্যাকাউন্ট নম্বরের ঘরে হয় বসানো আছে শূন্য, নয় "Null", নয় "N/A", নয়তো একেবারেই ফাঁকা। শতাংশের হিসেবে প্রায় ৯৫%। মানে যাঁদের নামে সার্টিফিকেট, তাঁদের প্রায় সবার ক্ষেত্রেই টাকা পাঠানোর কোনো উপায়ই নেই।
বাকি যে সোয়া পাঁচ লক্ষের মতো অ্যাকাউন্ট নম্বর ছিল, সেখানেও গণ্ডগোল। মোটে ১২ হাজারের মতন অ্যাকাউন্ট নম্বর ভাগাভাগি করে ব্যবহার হয়েছে ৫২ হাজারের বেশি লোকের নামে। এমন কী, একটাই অ্যাকাউন্ট নম্বর তো দেখানো হয়েছে দুই হাজারের বেশি জনের অ্যাকাউন্ট বলে। আর যেখানে সংখ্যা বসানো আছে, সেখানেও অনেক জায়গায় লেখা "১১১১১১১১১১১", কোথাও "১২৩৪৫৬", কোথাও নিছক কারও নাম বা ঠিকানা। এ মানে কী বলব, এতো জালি তো কলেজের দুষ্টু বাচ্চারা হোমওয়ার্ক টুকলিতেও করে না। যাক গে।

ইমেল আইডির অবস্থা আরও করুণ। কোথাও abc@gmail.com, কোথাও abcd@gmail.com, কোথাও শুধু গোটাকয়েক শূন্য বসিয়ে জিমেল। মাত্র ৫৩টা ইমেল আইডি ব্যবহার হয়েছে ৪৪ লক্ষের বেশি লোকের হয়ে। আর ৩৬ লক্ষ জনের ইমেলের ঘরে লেখা শুধু "Migrated data"। লাও!
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। শুরুতে ৫০০ টাকা ঠিকঠাক পৌঁছেছিল মাত্র সাড়ে আঠারো শতাংশ লোকের কাছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরেও ৩৪ লক্ষের বেশি সার্টিফায়েড মানুষ তাঁদের প্রাপ্য টাকাটা পাননি। আদৌ পাবেন এ আশা ক্ষীণ।
কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভিএর পরের গপ্পো মনিটরিং, মানে, প্রশিক্ষণটা সত্যিই হয়েছে কিনা সেটা যাচাই করা। নিয়ম হল, পরিদর্শনের সময় ঘটনাস্থলে ছবি তুলতে হবে, প্রমাণ হিসেবে। অডিটে ধরা পড়ল, ৪৫টা মনিটরিং রিপোর্টে একই ছবি বসিয়ে আলাদা আলাদা ট্রেনিংয়ের প্রমাণ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই মুখ, একই ঘর, একই ভঙ্গি, শুধু ব্যাচ নম্বর আলাদা, রাজ্যও আলাদা। কাটনি হোক (মধ্যপ্রদেশ), কোল্লম হোক (কেরল), কি ঔরঙ্গাবাদ (মহারাষ্ট্র), সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন একই কয়েকজন মানুষ। এ এক আশ্চর্য ম্যাজিক!


স্পোর্টস সেক্টরে চমকটা আরও বড়। Edujoin নামের একটা সংস্থা ১০টা রাজ্যে ২৫,৩৪৮ জনকে "ফিটনেস ট্রেনার" হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়েছে, আর এই গোটা কারবার দাঁড়িয়ে আছে মোটে ৩৩টা জিমের সঙ্গে একটা টাই-আপের ওপর। মন্ত্রক নিজেই জানিয়েছে, ওই জিমগুলোর প্রতিটায় এক কি দুজন করে কর্মচারী। তা হলে ৩৩টা জিম

মিলিয়ে বড়জোর জনা সত্তর লোক। অথচ একই ব্যাখ্যায় দাবি করা হল, এদের হয়ে নাকি কাজ করছেন প্রায় ৩০,০০০ জন। মানে জিম-প্রতি ৯০০ জন? ভাবা যায়? হয়ত এক একটা মাসলের এক এক জন ট্রেনার। তাতেও কিছু কম পড়বে।

আর ভৌগোলিক বণ্টন আরও অদ্ভুত। ঝাড়খণ্ডে ফিটনেস ট্রেনারের ৮,৯২২টা সার্টিফিকেটের মধ্যে ৭,১৪৫টাই একা একটা জেলা, পূর্ব সিংভূম থেকে। রাজস্থানে গোটা ৫,৪৪৪টা সার্টিফিকেটই একা চুরু জেলার। ঐখানে সবাই আশা করি অচিরেই স্ট্যালোন কিংবা বাহুবলী হবেন।
ম্যাজিক কার্পেট তৃতীয় ম্যাজিকটা সময় আর জায়গা নিয়ে। NSDC-র ইন্সপেক্টররা মাঠে গিয়ে সশরীরে ট্রেনিং সেন্টার পরিদর্শন করবেন, এটাই নিয়ম। অডিটে বেরোল, ৮০টা ক্ষেত্রে একই ইন্সপেক্টর একই দিনে আলাদা আলাদা রাজ্যে সশরীরে হাজির ছিলেন বলে রিপোর্টে লেখা। এর ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। হয় উহারা কোয়াণ্টাম টানেল আবিষ্কার করেছেন, আমাদের বলেননি, নয় যাদুই কার্পেট।


এই যেমন, একজন ইন্সপেক্টর, নাম আশিস সেনওয়াল, ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি একই দিনে অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাত, ঝাড়খণ্ড, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু আর তেলঙ্গানা, আটটা রাজ্য ঘুরে ১৯টা পরিদর্শন সেরে ফেলেছেন। দুদিন পরে, ২৩ ফেব্রুয়ারি, একদিনেই ৩০টা। উঃ কী এফিশিয়েন্ট ভাবুন? আর আপনি একদিন দুটো লেজারে টিক মেরে হেদিয়ে যান।
এ কীভাবে সম্ভব? উত্তরটাও রিপোর্টেই আছে, একটু দ্যাখা যাক। একটা পরিদর্শন শুরু করা, আর অনলাইনে "শেষ হয়েছে" বলে জমা দেওয়া, এই দুটোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান কোথাও ১২ সেকেন্ড, কোথাও আবার ৬৯৮ ঘণ্টা। আর ২৯৫টা ক্ষেত্রে একই ইন্সপেক্টরের একই দিনে দুটো আলাদা জায়গায় পরিদর্শন শুরুর মধ্যে ফারাক পাঁচ মিনিটেরও কম। অর্থাৎ পাঁচ মিনিটে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য। এআইও এত এফিশিয়েন্ট নয়।
অবশ্য মন্ত্রকের ব্যাখ্যাও এসে গ্যেছে। ওঁরা বলেছেন, আসলে সবাই একটাই লগইন ব্যবহার করছিলেন, আর নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য ছবিগুলো আপলোড হয়েছে হেড অফিস থেকে। কিন্তু এতে তো ব্যাপারটা আরও গোলমেলে হয়ে যায়। পরিদর্শনের গোটা উদ্দেশ্যই ছিল স্বাধীনভাবে যাচাই করা যে ট্রেনিংটা হয়েছে কিনা। এক অফিসে বসে সবাই এক লগইনে কাজ সারলে সেই স্বাধীন যাচাইয়ের আর কিছুই থাকে না। অবশ্য স্বাধীনতা এক অলীক প্রকল্প।
শেষ কথাএই তিনটে উদাহরণ রিপোর্টের আলাদা আলাদা অধ্যায় থেকে নেওয়া। কিন্তু একসাথে পড়লে একটা কথাই দাঁড়ায়: যে ডেটার ওপর গোটা প্রকল্প দাঁড়িয়ে, সেই ডেটা দিয়ে সবচেয়ে দরকারি প্রশ্নটারও উত্তর মেলে না। কাকে সত্যিই প্রশিক্ষণ দেওয়া হল, আর টাকাটা সত্যিই কার কাছে গেল? এখানে একটু টুকরো তুলে দেওয়া হল, কারুর রহস্যোপোন্যাস কিংবা হাসির হররা পড়তে হলে গোটা পিডিএফ পড়তে পারেন। মাত্র ১০৮ পাতা।
যে জিনিষ ছিল দক্ষতা শেখানোর প্রকল্প, উপায়-উপার্জনহীন তরুণের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার, তাতে দশ হাজার কোটি টাকা খরচের পরেও ক্যাগের রিপোর্ট বলছে, খাতায়-কলমে যতটা সাফল্য দেখানো হয়েছে, তার কিস্যু যাচাই করা যায় না। ক্যাগ যা বলছে না তা হল এই যে, এই স্কিল ইন্ডিয়া স্কিম গোটাটাই একটি অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব স্ক্যাম। সাদা বাংলায়, অর্থাৎ, গোটাটাই গুপি, এবং লোকের মাথায় টুপি।
সেই টুপি খুলে এবার অভিবাদন জানাবেন কী না সরকার বাহাদুরকে, সে সিদ্ধান্ত একান্ত আপনার।
সূত্র: Comptroller and Auditor General of India, "Skill Development under Pradhan Mantri Kaushal Vikas Yojana", Report No. 20 of 2025 (Performance Audit). এইখানে পিডিএফ
https://cag.gov.in/uploads/download_audit_report/2025/Report-No.-20-of-2025_PA-PMKVY_English-PDF-A-06943abec463479.68516873.pdf বিশেষত অনুচ্ছেদ ২.৪.২ (অ্যাকাউন্ট ও ইমেল), ৩.৮.১ (Edujoin ও জিম) এবং ৩.৮.৩ (মনিটরিং ও পরিদর্শন)।