দৃশ্যটা এখন প্রায় ঘরোয়া হয়ে উঠেছে। কোনো এক অলস দুপুরে ফোন বাজে, ওপারে ভারী, দাপুটে গলা, ঠিক যেন সরকারি দপ্তরের বড়বাবু। "আপনার আধারের সঙ্গে যুক্ত একটা পার্সেল মুম্বই কাস্টমসে আটক হয়েছে। তাতে পাসপোর্ট, কয়েকটা এটিএম কার্ড, আর কিছু নিষিদ্ধ জিনিস পাওয়া গেছে। বিষয়টা এখন নার্কোটিক্স বিভাগে চলে গেছে। আপনি কি এখন একা, কথা বলার মতো জায়গায় আছেন?" যিনি ফোনটা পান, তিনি হয়তো জীবনে মুম্বইতে কোনো পার্সেল পাঠাননি, পাসপোর্টটা দিব্যি ড্রয়ারে শোয়ানো আছে। তবু "কার্ড", "নার্কোটিক্স", "আটক" শব্দগুলো কানে ঢোকামাত্র শরীরের ভেতরটা যুক্তির অপেক্ষা না করেই একবার ঠান্ডা স্রোত পাঠিয়ে দেয়। বুদ্ধি ফিরতে সময় লাগে বড়জোর কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু ওই কয়েক সেকেন্ডই এই গোটা গল্পের বীজ যাকে বলে। সেই সরু ফাঁকটা, যেটা দিয়ে যুক্তিকে টপকে ঠকবাজ সোজা বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে।
আমরা যখন কাগজে পড়ি, অমুক অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার চল্লিশ লাখ খুইয়েছেন কিংবা তমুক গৃহবধূ সর্বস্ব দিয়ে বসেছেন কোনো "অনলাইন বন্ধু"-কে, আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়াটা প্রায় সবসময় এক, "কী বোকা রে বাবা! আমাকে হলে কক্ষনো পারত না।" এই বাক্যটি ভারি আরামদায়ক, কারণ এতে একই সাথে দুটো জিনিস প্রমাণ হয়ে যায়, অন্যের বোকামি আর নিজের বুদ্ধি। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক ঘেঁটেঘুঁটে ঠিক এই আরামটুকুই কেড়ে নিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ঠকে যাওয়া বোকামির রোগ নয়, ওটা একটা বিচারের ভুল। আর বিচারের ভুল করার ব্যাপারে বোকা আর চালাকের মধ্যে ভেদাভেদ বিশেষ নেই, সে-ব্যাপারে আমরা মোটামুটি সবাই সমান কাঁচা।
এই জিনিসটা নিয়ে আমি অনেকদিন থেকেই ভাবি বা পড়াশুনা করার চেষ্টা করেছি - "সাইকোলজি অফ স্ক্যামারস", মানে বাংলা বলতে গেলে ঠকবাজের মনস্তত্ত্ব। এই নিয়ে বেশ কিছু পেপার, বই ইত্যাদি যোগাড় করেও লেখা লিখি আর হয়ে উঠছিল না। আসলে এই টপিকটা কম চর্চিত এমন কিছুও নয়, বরং উল্টোটাই – এদিক ওদিক আজকাল প্রচুর প্রচুর উদাহরণ ছড়িয়ে ঠকবাজির। তাহলে ঠিক নিয়ে লিখবো? আগে ভাগেই বলে নিই, আমার নিজের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয় ওই মনস্তত্ত্বিক দিকটা। মানে যে ঠকাচ্ছে, বা যে ঠকছে উভয় দিক থেকেই। তবে যারা ঠকছে তাদের দিকটা আরো বেশী ভাবার – প্রশ্ন সাধারন, যারা ঠকছে তারা যে সব বোকা এমনটা নয়। বরং অনেকেই বেশ বুদ্ধিমান। তাহলে তারা ঠকছে কেন? আর একটা কথা, আমি এখানে যা অ্যানালিসিস করব, সেটাই একমাত্র সত্যি এমন কোন দাবিই নেই! আমি যেমন দেখেছি বা বুঝেছি তেমনটাই লেখার চেষ্টা।
মাস তিনেক আগের কথা। আমার এক দাদা, লেখার জগত থেকেই আলাপ, আমেরিকায় থাকে। নিজে উচ্চশিক্ষিত, ডক্টরেট ডিগ্রী আছে। এক বিখ্যাত বহুজাতিক সংস্থায় বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন, পেপার, পেটেন্ট সবই আছে। তারা নাকি স্ক্যামারদের চক্করে তিন না চারদিন হাউস অ্যারেষ্টে ছিল! সেটা জানার পর মনে হল, এটা নিয়ে লিখেই ফেলা যাক।
তত্ত্বে ঢোকার আগে চলুন ইতিহাসের এক জনপ্রিয় ঠকবাজের গল্পটা ঝালিয়ে নেওয়া যাক।
যে লোকটা আইফেল টাওয়ার বেচেছিল
সাল ১৯২৫, শহর প্যারিস। যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ সবে ধুলো ঝাড়ছে। শহরের গর্ব সেই আইফেল টাওয়ার তখন কিন্তু ঠিক গর্বের বস্তু নয়। ১৮৮৯ সালের বিশ্বমেলার জন্য বানানো ওই ইস্পাত-কাঠামোটা আসলে ছিল সাময়িক, কিছুদিন পরে ভেঙে ফেলার কথা। ভাঙা হয়নি নানা কারণে, কিন্তু ১৯২৫-এ এসে সেটা দাঁড়িয়েছিল এক বিরাট মাথাব্যথা হয়ে - রং, লিফট, মরচে, খরচের কোনো শেষ নেই। সে বছর খবরের কাগজে জল্পনাও বেরোল, শহর কর্তৃপক্ষ হয়তো জিনিসটা ভেঙেই ফেলবে।
সেই কাগজের কোণে সাঁটা ছোট্ট খবরটা এক হোটেলঘরে বসে পড়ছিলেন ভিক্তর লুস্তিগ। জন্ম ১৮৯০, অধুনা চেক প্রজাতন্ত্রের এক গ্রামে, তখন যা অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অংশ। পাঁচটা ভাষায় সাবলীল, পায়ে অস্থিরতা, আর মাথায় শয়তানি বুদ্ধির এক অফুরান ভাণ্ডার। খবরটা পড়তে পড়তে লুস্তিগের মাথায় এমন এক মতলব খেলে গেল, যাকে "দুঃসাহসিক" বললে কম বলা হয়। তিনি ঠিক করলেন, আইফেল টাওয়ারটাই বেচে দেবেন। যে টাওয়ার তাঁর নয়, যেটার ওপর তাঁর এক পয়সার অধিকার নেই, সেটাই।
কাজটা তিনি করলেন নিখুঁত পরিকল্পনায়। প্রথমে জোগাড় করলেন সরকারি সিলমোহর-আঁকা চিঠির কাগজ, যাতে দেখতে হয় ঠিক ডাক ও তার বিভাগের কোনো উঁচু আমলার দপ্তর থেকে আসা। তারপর প্যারিসের সবচেয়ে দামি হোটেল "দ্য ক্রিয়ঁ"-তে বিলাসবহুল সুইট নিয়ে সেখান থেকে শহরের সবচেয়ে বড় ইস্পাত-স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীদের গোপন চিঠি পাঠালেন - এক গোপনীয় বৈঠকে ডেকে। হোটেলের ঝাড়বাতির নিচে, গম্ভীর মুখে লুস্তিগ তাঁদের জানালেন এক দুঃখের কথা: প্রযুক্তিগত ত্রুটি আর বিপুল রক্ষণাবেক্ষণ-খরচের কারণে সরকার স্থির করেছে, আইফেল টাওয়ার এবার ভেঙে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হবে - প্রায় সাত হাজার টন লোহা। তবে বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর, জনরোষের ভয় আছে, তাই পুরোটা রাখতে হবে সম্পূর্ণ গোপন।
খেয়াল করুন, লুস্তিগ একটাও অলৌকিক বা অবাস্তব কাজ করেননি। তিনি শুধু এমন এক দৃশ্য সাজিয়েছিলেন, যেখানে প্রতিটা খুঁটিনাটি "ঠিকঠাক দেখাচ্ছে" - সরকারি কাগজ, দামি হোটেল, আমলার ভাবগম্ভীর চাল, আর সবচেয়ে বড় কথা, গোপনীয়তা। ব্যবসায়ীদের একজন, আঁদ্রে পোয়াসঁ, টোপটা গিলে ফেললেন। তিনি বোকা লোক ছিলেন না, বরং প্যারিসে নিজের ব্যবসা বড় করতে চাওয়া এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ। লুস্তিগ ঠিক সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ভেতরের অনিশ্চয়তাটুকু চিনতে পেরেছিলেন। পোয়াসঁ টাওয়ারের দাম তো মিটিয়েই দিলেন, উপরন্তু "সরকারি অফিসারকে ঘুষ" হিসেবে বাড়তি কিছু টাকাও গুঁজে দিলেন - কারণ ঘুষ দিলে ব্যাপারটা আরও বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে, দুর্নীতিটাই যেন হয়ে ওঠে সত্যতার প্রমাণ। টাকা হাতে নিয়ে লুস্তিগ পত্রপাঠ প্যারিস ছাড়লেন।
ওদিকে পোয়াসঁ যখন বুঝলেন ঠকেছেন, তখন এতটাই লজ্জিত আর অপমানিত বোধ করলেন যে পুলিশে নালিশই করলেন না। সর্বস্ব খোয়ানোর চেয়ে কাগজে নিজের নামটা দেখা তাঁর কাছে বেশি অসহনীয় ঠেকেছিল, আর ঠকবাজের পক্ষে এর চেয়ে ভালো সুখবর আর হয় না। এই নীরবতার সুযোগেই লুস্তিগ মাসখানেক পরে ফিরে এসে ঠিক একই কায়দায় আরেকবার টাওয়ার বেচার চেষ্টা করলেন; যিনি একবার আইফেল টাওয়ার বেচে ফেলেন, তাঁর কাছে দ্বিতীয়বারটা নেহাতই পুনরাভিনয়। এবার অবশ্য শিকার পুলিশে খবর দেওয়ায় তাঁকে চম্পট দিতে হল। এই লুস্তিগই পরে খোদ শিকাগোর কুখ্যাত গ্যাংস্টার আল কাপোনকেও এক "লগ্নি"-র ফাঁদে ফেলে পাঁচ হাজার ডলার কামিয়েছিলেন। তাঁ র আরেক বিখ্যাত কীর্তি ছিল এক "রোমানিয়ান বাক্স" - এমন এক যন্ত্র, যা নাকি টাকার নোট নকল করে দ্বিগুণ করে দিতে পারে; বহু বিষয়-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মোটা দাম দিয়ে সেই অকেজো কাঠের বাক্স ঘরে তুলেছিলেন।
এবার সেই বিব্রতকর প্রশ্নটা: আঁদ্রে পোয়াসঁ কি বোকা ছিলেন? মোটেই না। তিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, ইস্পাতের বাজার হাতের তালুর মতো চিনতেন। তবু ঠকলেন - ঠিক এই কারণেই যে, লুস্তিগ তাঁর বুদ্ধিকে আক্রমণ করেননি, করেছিলেন বুদ্ধির নিচের স্তরটাকে। কর্তৃত্বের প্রতি সহজাত আনুগত্য, বড় লাভের হাতছানিতে চোখ ঝলসে যাওয়া, "শুধু আমাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে" এই অহংবোধ, আর গোপনীয়তার ঘেরাটোপ - এই কটা জিনিস একসঙ্গে ঠিকঠাক সাজাতে পারলে ভালো ইস্পাত-চেনা মানুষও লোহার টাওয়ার কিনে ফেলেন। লুস্তিগ পরে সৎ ছেলেছোকরাদের জন্য নাকি "ঠকবাজির দশ আজ্ঞা" লিখে গিয়েছিলেন, যার প্রথমটাই ছিল ধৈর্য ধরে শোনো। দ্রুত কথা বলা নয়, মন দিয়ে শোনাটাই একজন ঠকবাজের আসল অস্ত্র; কারণ যে মন দিয়ে শোনে, শিকার তাকে বিশ্বাস করে ফেলে।
ঠকা মানে বোকামি নয়, বিচারের ভুল
এবার সেই তত্ত্বটায় ঢোকা যাক, যা এই গোটা লেখার মূল সেই ভাবে দেখতে গেলে। ২০০৯ সালে ব্রিটেনের "অফিস অফ ফেয়ার ট্রেডিং" এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মনোবিজ্ঞানীকে দিয়ে এক বড়সড় গবেষণা করায়, "দ্য সাইকোলজি অফ স্ক্যামস"। তার আগে অবধি বেশিরভাগ ভাবনা চলত সেই পুরোনো লাইনে - শিকারেরা নিশ্চয়ই লোভী কিংবা হাবাগোবা। এক্সেটারের গবেষকরা হাজার-হাজার আসল প্রতারণার চিঠি ঘেঁটে, শিকারদের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়ে, আর সরাসরি নকল প্রতারণা-পরীক্ষা চালিয়ে একদম অন্য কথা বললেন। তাঁরা বললেন, ঠকে যাওয়া মানে "বিচারের ভুল" - এমন এক ভুল, যা করানোর জন্য ঠকবাজ পরিকল্পনামাফিক আমাদের মনের কতগুলো নির্দিষ্ট বোতামে চাপ দেয়।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর কথাটা এই যে বোতামগুলো কোনো নতুন আবিষ্কার নয়। এগুলো ঠিক সেই জিনিস, যা দিয়ে বৈধ বিজ্ঞাপন, বৈধ ব্যবসা, এমনকি বৈধ রাজনীতিও আমাদের রাজি করায়। প্রতারণা আসলে বৈধ প্ররোচনারই এক কালো ছায়া। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী রবার্ট সিয়ালদিনি তাঁর বিখ্যাত বই "ইনফ্লুয়েন্স"-এ প্ররোচনার যে সাতটি অস্ত্রের কথা বলেছিলেন - একাত্মতা, কর্তৃত্ব, ঘাটতি, সামাজিক প্রমাণ, পছন্দ, ধারাবাহিকতা আর প্রত্যুপকার - ঠকবাজ সেই একই অস্ত্র চালায়, শুধু অন্ধকার দিকটা নজরে রেখে।
কর্তৃত্বের কাছে মাথা নত
সবার আগে কর্তৃত্ব। আমরা মানুষ প্রজাতিটাই এমন, সাজানো কর্তৃপক্ষকে অমান্য করতে ভেতরটা কুঁকড়ে যায়। উর্দি, সিলমোহর, "স্যার", অফিসিয়াল-শোনানো ভাষা কানে ঢুকলেই আমরা প্রশ্ন করার অভ্যাসটা খুইয়ে ফেলি। লুস্তিগের সরকারি চিঠি এই বোতামই টিপেছিল; আজকের "ডিজিটাল অ্যারেস্ট" স্ক্যামে ফোনের ওপারে যে "সিবিআই অফিসার" গর্জান, তিনিও সেই একই বোতাম টেপেন। এক্সেটারের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতারণার চিঠিতে সবচেয়ে ঘন ঘন ফিরে আসা শব্দগুলোর মধ্যে থাকে official, document, signature, অর্থাৎ পুরো কায়দাটাই বৈধ, ক্ষমতাবান কোনো প্রতিষ্ঠানের মতো "দেখতে" হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা।
কর্তৃত্বের কাছে মানুষ ঠিক কতটা মাথা নোয়াতে পারে, তার এক গা-শিউরানো প্রমাণ ষাটের দশকে রেখে গিয়েছিলেন মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিখ্যাত পরীক্ষায় সাধারণ মানুষদের বলা হয়েছিল, পাশের ঘরে বসা এক ব্যক্তিকে ভুল উত্তরের জন্য ক্রমশ চড়া মাত্রার বৈদ্যুতিক শক দিতে হবে। ওপাশের মানুষটি আসলে ছিলেন অভিনেতা, সত্যিকারের কোনো শক লাগছিল না; কিন্তু পরীক্ষার্থীরা তা জানতেন না। তাঁরা ওপাশ থেকে যন্ত্রণার আর্তনাদ শুনছিলেন, তবু সাদা অ্যাপ্রন পরা এক "বিজ্ঞানী" পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় শুধু বলে যাচ্ছিলেন যে "পরীক্ষার স্বার্থে আপনাকে চালিয়ে যেতে হবে।" ফল? পরীক্ষার্থীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেষ, সর্বোচ্চ, প্রাণঘাতী মাত্রা পর্যন্ত শক দিয়ে গিয়েছিলেন। এঁরা দুষ্ট লোক ছিলেন না, ছিলেন আমার-আপনার মতোই সাধারণ মানুষ, শুধু "কর্তৃপক্ষ বলছে" এই একটা কারণেই নিজের বিবেককে চাপা দিয়ে ফেলেছিলেন। ঠকবাজ এই দুর্বলতাটা রক্তের মধ্যে চেনে। তাই ফোনের ওপারে সে "অফিসার" সাজে, "স্যার" ডাকে, ভাবগম্ভীর গলায় নির্দেশ দেয় এটা জেনেই যে, নির্দেশ শুনলে আমাদের প্রশ্ন করার হাতটা আপনা থেকেই নেমে আসে।
আবেগের বোতামগুলো
তারপর ধরুন ভিসেরাল ট্রিগার, শরীরের গভীর থেকে ওঠা তাৎক্ষণিক আবেগের বোতাম। লোভ, ভয়, যন্ত্রণা এড়ানোর তাগিদ, ভালোবাসা পাওয়ার আকুতি, প্রিয়জনকে ভালো রাখার আকাঙ্ক্ষা, এগুলো এতই প্রাচীন, এতই গভীর যে চাগিয়ে দিলেই আমাদের যুক্তিবুদ্ধি খানিকক্ষণের জন্য ছুটি নিয়ে নেয়। সেই দুপুরের ফোনে "নার্কোটিক্স", "গ্রেপ্তার" শব্দদুটো শিকারের যুক্তিকে জিজ্ঞেসই করে না, সোজা মেরুদণ্ড বেয়ে ভয় পাঠিয়ে দেয়। ঠকবাজ জানে, যতক্ষণ আপনি ভয় পাচ্ছেন বা লোভে টগবগ করছেন, ততক্ষণ আপনি চিঠির খুঁত ধরার মতো ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারবেন না।
তৃতীয় বোতাম ঘাটতি আর তাড়া। "শুধু আজকের জন্য", "আর মাত্র দুটো স্লট বাকি", "চোদ্দো দিনের মধ্যে জবাব না দিলে সুযোগ চলে যাবে" - এই বাক্যগুলোর একটাই কাজ, আপনাকে ভাবার সময় না দেওয়া। এক্সেটারের বিশ্লেষণে সুইপস্টেক-জাতীয় প্রতারণার চিঠিতে সবচেয়ে চেনা শব্দগুলোর একটা ছিল deadline। ভাবার সময় পেলেই তো বিপদ - তখন আপনি হয়তো কাউকে জিজ্ঞেস করবেন, কিংবা গুগল করে ফেলবেন।
চতুর্থ, আর সম্ভবত সবচেয়ে চতুর, বোতামটা হল ধারাবাহিকতা আর প্রতিশ্রুতি। ঠকবাজ কখনও প্রথমেই বড় টাকা চায় না। সে চায় ছোট্ট একটা ধাপ, শুধু একটা ফর্ম ভরে দিন, শুধু পঞ্চাশ টাকার "প্রসেসিং ফি", শুধু একটা ছোট্ট "হ্যাঁ"। একবার সেই ছোট্ট হ্যাঁ বলে ফেললে মনের ভেতর এক অদ্ভুত চাপ তৈরি হয় - নিজের সঙ্গে সঙ্গতি রাখার চাপ। "যখন প্রথম ধাপটা এগিয়েছি, তখন পিছিয়ে আসি কী করে?" এই মনস্তত্ত্বকে বলে "ফুট-ইন-দ্য-ডোর", দরজায় পা গলিয়ে দেওয়া। বিদেশি লটারি প্রতারণায় শিকারকে বারবার একটু-একটু করে টাকা পাঠাতে বলা হয় ঠিক এই কারণেই, প্রতিটা পাঠানো টাকা আগের টাকাটাকে "সমর্থন" করে, আর পিছিয়ে আসা মানে স্বীকার করে নেওয়া যে এতক্ষণ ভুল করছিলাম। এই স্বীকারোক্তিটা মানুষ ভয়ানক অপছন্দ করে।
আর সবশেষে সেই জিনিসটা, যাকে গবেষকরা নাম দিয়েছেন "ফ্যান্টম ফিক্সেশন" - মায়া-লক্ষ্যে আটকে থাকা। শিকারের চোখের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এমন এক বিশাল পুরস্কার, কোটি টাকার লটারি, জীবন-বদলে-দেওয়া লগ্নি, দুরারোগ্য রোগের নিরাময় - যে তার তুলনায় যেটুকু "খরচ" করতে হচ্ছে সেটা নেহাতই তুচ্ছ মনে হয়। "দু কোটি পেতে গেলে বিশ হাজার তো লাগবেই, তাতে আর কী!" - এই হিসেবটাই ফাঁদ। বড় সংখ্যাটা এত জ্বলজ্বল করে যে ছোট সংখ্যাটার দিকে আমরা আর সন্দেহের চোখে তাকাই না। অথচ ছোট সংখ্যাটাই আসল, বড় সংখ্যাটা কস্মিনকালেও নেই।
আরও কিছু অস্ত্র, আর একটা সাধারণ সত্য
সিয়ালদিনির তালিকায় বাকি অস্ত্রগুলোও ঠকবাজ সমান পটুতায় চালায়। প্রথমটা প্রত্যুপকার, কেউ আগে আপনাকে সামান্য কিছু দিলে, একটা "ফ্রি গিফট", একটা "বিশেষ ছাড়", কিংবা নেহাত একটা উপকার, ভেতরে ভেতরে আমরা প্রতিদান দিতে বাধ্য বোধ করি; ঠকবাজ তাই আগে কিছু "উপহার" গুঁজে দিয়ে আপনাকে অদৃশ্য ঋণে বেঁধে ফেলে। দ্বিতীয়টা সামাজিক প্রমাণ, মেলার মাঠে তিন তাসের জুয়ায় যে খেলা আজও চলে, তার আধুনিক সংস্করণ। ওই খেলায় ভিড়ের ভেতর থেকে যে লোকটা বারবার অনায়াসে জিতে যায়, সে আসলে খেলুড়েরই লোক, সাজানো টোপ; তার একটাই কাজ, আশপাশের মানুষকে দেখানো যে "অন্যরা তো জিতছে, তবে আমিই বা পারব না কেন?" আজ সেই সাজানো লোকের নাম বদলে হয়েছে "হাজার হাজার সন্তুষ্ট গ্রাহকের রিভিউ" আর "লাভের স্ক্রিনশট"। তৃতীয়টা পছন্দ ও সাদৃশ্য, যে মানুষকে আমাদের ভালো লাগে, যাকে নিজেদেরই মতো মনে হয়, তাকে আমরা অনায়াসে বিশ্বাস করি। এই কারণেই রোম্যান্স স্ক্যামার প্রথম কয়েক সপ্তাহ শুধু আপনার পছন্দের গান, প্রিয় খাবার, ছেলেবেলার দুঃখের গল্প মন দিয়ে শুনে যায়, টাকার "ট"-ও তখন ওঠে না। সে আপনাকে ভালোবাসছে না; সে আপনার প্রোফাইলটা খুঁটিয়ে পড়ছে।
এই সবকটা অস্ত্রের ওপরে একটা সাধারণ সত্য ঝুলে আছে, যা এক্সেটারের গবেষকরা বারবার বলেছেন যে প্রতারণা সফল হয় কারণ সেটা "ঠিকঠাক দেখায়"। ঠকবাজ হয় বৈধ প্রতিষ্ঠানের নকল করে, নয়তো আগের সফল প্রতারণার নকল করে এমন এক জিনিস বানায় যা চেনা, বিশ্বাসযোগ্য, একেবারে "স্বাভাবিক" ঠেকে। ব্যাংকের ইমেলের হুবহু ফন্ট, একই লোগো, একই মেপে-বলা ভদ্র ভাষা। এখানে একটা সূক্ষ্ম ফাঁদ লুকিয়ে, আমরা যেই একটা চেনা প্রতারণা শিখে ফেলি ("ও, নাইজেরিয়ান চিঠি? ওসব আমার জানা"), তখন আমরা ঠিক ততটুকুই এড়াতে পারি। কিন্তু ঠকবাজ যেই একটা একদম নতুন, অচেনা গল্প নিয়ে হাজির হয়, সেই "নতুনত্ব"-টাই তাকে সাফল্য এনে দেয় কারণ আমাদের সতর্কতার ছাঁচে সেটা তখনও ধরা পড়েনি। এই জন্যই প্রতারণার চেহারা প্রতি বছর খোলস বদলায়; গতবারের টোপ এবার আর খাটে না বলেই এবারের টোপটা নতুন করে বানাতে হয়।
যা আমরা ভাবতেই পারি না
এতক্ষণ যা বললাম, তা মোটামুটি আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এক্সেটারের গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ কথাগুলো এবার - যেগুলো শুনলে "আমাকে হলে পারত না" বাক্যটা সত্যিই হাওয়া হয়ে যায়।
এক। ভাবছেন, শিকারেরা নিশ্চয়ই বিষয়টা নিয়ে কম ভেবেছিল, তাড়াহুড়োয় ভুল করেছিল? উল্টো। গবেষণা বলছে, যারা ঠকেছে তারা প্রায়ই প্রতারণার চিঠিটা নিয়ে সাধারণ লোকের চেয়ে বেশি মাথা ঘামিয়েছিল, বেশি সময় দিয়েছিল। যারা ঠকেনি, তারা অনেক সময় চিঠিটা এক পলক দেখেই ছুঁড়ে ফেলেছে, পড়েইনি। অর্থাৎ বেশি মনোযোগ কখনও কখনও বেশি বিপদ; একবার ভেতরে ঢুকে গেলে যত ভাবি, তত জালে জড়াই।
দুই। এই লাইনটা আরও অস্বস্তির। বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতারণায় ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি, যাদের বিনিয়োগ সম্পর্কে খানিক জ্ঞান আছে। লটারির ফাঁদে বেশি পড়েন তাঁরা, যাঁরা বৈধ লটারি-খেলায় অভ্যস্ত। অর্থাৎ যে বিষয়টা আপনি খানিক বোঝেন, ঠিক সেই বিষয়েই আপনি বেশি বিপন্ন কারণ আধা-জ্ঞান আত্মবিশ্বাস জোগায়, আর আত্মবিশ্বাসই সতর্কতার প্রথম শত্রু। "আমি তো ব্যাপারটা বুঝি" এই ভাবনাটাই দরজা খুলে দেয়।
তিন। বহু শিকার তাঁদের সিদ্ধান্তটা পরিবার-বন্ধুর কাছে গোপন রেখেছিলেন। কেন? গবেষকদের ব্যাখ্যা মন কেমন করে দেওয়া যেন মনের কোনো এক কোণে তাঁরা টেরই পাচ্ছিলেন যে কাজটা বোকামি হচ্ছে, আর ভয় পাচ্ছিলেন যে অন্য কেউ শুনলেই সেই বোকামিটা মুখের ওপর বলে দেবে। তাই তাঁরা শুধু বাইরের লোকের থেকে নয়, খানিকটা নিজের যুক্তিবাদী সত্তার থেকেও ব্যাপারটা লুকিয়ে ফেলেছিলেন। এই জন্যই ঠকবাজ চিঠির শেষে লিখে দেয়, "দয়া করে বিষয়টা গোপন রাখবেন।" সে জানে, আপনি কাউকে বললেই তৃতীয় কোনো মানুষ ঠান্ডা মাথায় বলে দেবে, "আরে, এ তো জোচ্চুরি!" তাই আপনাকে একা করে ফেলাটাই তার প্রথম কাজ। সামাজিক বন্ধন, বন্ধুর ধমক, পাশের বাড়ির কাকিমার সন্দেহ - এগুলোই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ, আর ঠকবাজ সবার আগে সেই কবচটাই খুলে নেয়।
এই সব মিলিয়ে সেই বহুল-প্রচলিত ছবিটা, লোভী, নির্বোধ, একলা বৃদ্ধ শিকার - আসলে অসত্য। এক্সেটারের গবেষণা বলছে, যাঁরা বেশি ঠকেন তাঁরা মোটেই খারাপ সিদ্ধান্ত-গ্রহণকারী নন; অনেকেই সফল পেশাদার, ব্যবসায়ী। তাঁদের একটাই "দোষ", তাঁরা একটু বেশি সহজে প্ররোচিত হন। আর এমন মানুষ, দুঃখজনকভাবে, একবার ঠকলে বারবার ঠকেন; জনসংখ্যার মোটামুটি দশ থেকে কুড়ি শতাংশ মানুষ এই বাড়তি-বিপন্ন দলে পড়েন, সংখ্যাটা নেহাত ছোট নয়। ক্ষতিটা কেবল টাকার নয়। ঠকে-যাওয়া মানুষ সবচেয়ে গভীর আঘাত পান নিজের আত্মসম্মানে — টাকা তো যায়ই, তার সঙ্গে যায় নিজের ওপর ভরসাটুকু। "আমি কী করে এত বড় বোকামি করলাম?" - এই প্রশ্নটা রাতের পর রাত ঘুম কেড়ে নেয়।
ঠকবাজির মানচিত্র
এবার একটু মানচিত্রটা দেখে নেওয়া যাক - এই বিরাট রাজ্যে ঠিক কত রকমের প্রদেশ আছে। খুঁটিনাটিতে ঢুকব পরের পর্বগুলোয়, আপাতত শুধু চেনা-পরিচয়। সবচেয়ে পুরোনো আর নামজাদা হল অগ্রিম-ফি প্রতারণা, যাকে অনেকে "নাইজেরিয়ান স্ক্যাম" বা "৪১৯" বলে চেনেন (৪১৯ আসলে নাইজেরিয়ার দণ্ডবিধির একটা ধারা)। তারপর লটারি আর সুইপস্টেক প্রতারণা - "আপনি জিতে গেছেন!" বলে শুরু, পুরস্কার ছাড়ানোর নাম করে ফি আদায়। ভুয়ো জ্যোতিষী প্রতারণা - বিপদের ভয় দেখিয়ে তাবিজ-কবচ বেচা। রোম্যান্স স্ক্যাম - ভালোবাসার অভিনয় করে হৃদয় আর ব্যাংক-ব্যালেন্স দুই-ই খালি করা। ভুয়ো বিনিয়োগ আর "বয়লার রুম" প্রতারণা - চাপ দিয়ে ভুয়ো শেয়ার বা ক্রিপ্টো গছানো, যার আধুনিকতম নিষ্ঠুর রূপ "পিগ বুচারিং"। আর আজকের সবচেয়ে ব্যাপক রূপ, ফিশিং আর সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, নকল ব্যাংকের ইমেল, নকল লিংক, নকল কল সেন্টার, নকল "ডিজিটাল অ্যারেস্ট"। এদের প্রত্যেকের আলাদা গল্প, আলাদা মনস্তত্ত্ব; সে সব নিয়ে বসব পরের পর্বে।
আমাদের দেশের কি অবস্থা
এত পুরোনো আর দূরদেশের গল্প বলে ফেললাম, কিন্তু জিনিসটা আর কৌতূহলের বস্তু নয়, এ আমাদের রোজকার দাওয়ায় এসে বসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাইবার ক্রাইম সমন্বয় কেন্দ্র (আই৪সি)-র হিসেব সংসদে পেশ করা হয়েছে যে ২০২৪ সালে দেশে সাইবার প্রতারণায় খোয়া গেছে প্রায় ২২,৮৪৫ কোটি টাকা। আগের বছর, ২০২৩-এ, এই অঙ্ক ছিল ৭,৪৬৫ কোটি; মানে এক বছরে লাফ প্রায় ২০৬ শতাংশ। অভিযোগের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ছত্রিশ লাখ। আই৪সি-র আশঙ্কা, ২০২৫-এ ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়াতে পারে দেড় লাখ কোটির কাছাকাছি যা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ। একটা গোটা প্রতারণা-শিল্প নীরবে দেশের অর্থনীতির একটা মাপা টুকরো চেটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে।
আর এই রাজ্যের ফাঁদগুলো এখন এতটাই ঘরোয়া যে প্রায় প্রত্যেকের মোবাইলেই তার নমুনা জমে আছে। "আপনার কেওয়াইসি আপডেট করুন, নইলে আজ রাতেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ" এই এসএমএসটা পাননি, এমন লোক বিরল। "বিদ্যুতের বিল বকেয়া, আজ রাত সাড়ে নটায় লাইন কেটে দেওয়া হবে" শুনলেই বুক ধড়াস, কারণ ভরা গরমে লাইন কাটার ভয় বড় আদিম। কারও কাছে ফোন আসে সেনাবাহিনীর জওয়ানের ছদ্মবেশে, "হঠাৎ বদলি হয়ে যাচ্ছি, সস্তায় ফ্রিজ-সোফা বেচে দিচ্ছি, আগাম টাকাটা ইউপিআই-তে পাঠান" - কারণ উর্দির প্রতি সহজাত আস্থাই এখানে অস্ত্র। কেউ পান "ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গেছে, দয়া করে ফেরত পাঠান" মেসেজ, যেখানে আপনার সততার বোধটাকেই ফাঁদ বানানো হয়। প্রতিটার মোড়ক আলাদা, কিন্তু ভেতরের বোতামগুলো সেই একই, কর্তৃত্ব, ভয়, তাড়া, বিশ্বাস। মোড়ক বদলায়, মানুষের মন বদলায় না; ঠকবাজ ঠিক এইটাই জানে।
এর মধ্যে সবচেয়ে চোখে পড়া নতুন কৌশল সেই "ডিজিটাল অ্যারেস্ট"। এখানে ভুয়ো "পুলিশ" বা "সিবিআই অফিসার" ভিডিও কলে মানুষকে দিনের পর দিন কার্যত ঘরবন্দি করে রাখে, মিথ্যে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে অথচ আইনে "ডিজিটাল অ্যারেস্ট" বলে কিছুই হয় না। ২০২৪-এ এই ফাঁদে ক্ষতির অঙ্ক এক লাফে বেড়েছিল প্রায় ৪৬৫ শতাংশ। এতটাই ভয়ংকর চেহারা নিয়েছিল যে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে ২০২৪-এর অক্টোবরে "মন কি বাত"-এ দেশবাসীকে সতর্ক করতে হয়। আর একটা তথ্য গায়ে কাঁটা দেয় - অভিযোগগুলোর প্রায় ৪৫ শতাংশের সুতো গিয়ে ঠেকেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, কম্বোডিয়া-মায়ানমার-লাওসের সেই কুখ্যাত প্রতারণা-চক্রে, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে "চাকরির" টোপে নিয়ে গিয়ে জোর করে আটকে রেখে ঠকবাজি করানো হয়। অর্থাৎ পর্দার ওপারে যে "ঠকবাজ" ফোন করছে, সে নিজেও হয়তো আরেক ফাঁদের বন্দি শিকার। ঠকবাজির অর্থনীতিতে অন্ধকার এত স্তরে সাজানো।
রক্ষার উপায়
তাহলে রক্ষা কোথায়? এক্সেটারের গবেষকরা একটা ভারি সরল অথচ শক্তিশালী কথা বলেছেন। বিপদ ঘটে তখনই, যখন কোনো প্রস্তাব দেখে আমরা প্রথম প্রশ্নটা করি, "এতে আমার কী লাভ?" এই প্রশ্নটা মনকে শুধু লাভের দিকে টেনে নেয়, আর তখন আমরা শুধু সেই তথ্যগুলোই বেছে বেছে দেখি যা "হ্যাঁ"-এর পক্ষে যায়। উল্টে প্রশ্নটা যদি পাল্টে করি, "এতে আমার কী খোয়াতে পারি?" তখন মন আপনা থেকেই "না"-এর কারণ খুঁজতে শুরু করে। একটা মাত্র প্রশ্নের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া, অথচ এতেই খেলা বদলায়।
দ্বিতীয় কথাটা আরও পুরোনো অথচ আমরা মানি না। গবেষণা বলছে, বহু ঠকে যাওয়া মানুষ গোড়াতেই টের পেয়েছিলেন কিছু একটা গোলমাল আছে, কিন্তু নিজের সেই ভেতরের গলার স্বরটাকে চাপা দিয়ে দিয়েছিলেন। তাই সবচেয়ে সহজ নিয়মটা, যদি মনে হয় প্রস্তাবটা ঠকবাজি হতে পারে, তাহলে ধরেই নিন সেটা ঠকবাজি; এ-ব্যাপারে আপনার অন্তরের সন্দেহ প্রায় কখনও ভুল হয় না। ঠকবাজের বিরুদ্ধে কেউ কখনও জেতে না, লটারির মতো "ছোট বাজি, হয়তো লেগে গেলেও যেতে পারে" ভেবে যাঁরা এগোন, তাঁরা ভুলে যান যে এখানে বাজিটাই সাজানো, ঘরের দান কখনও শিকারের দিকে পড়ে না। সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে অবহেলিত রক্ষাকবচটা? পাশের মানুষটিকে বলে ফেলা। "শোনো তো, এমন একটা ফোন এল, কেমন যেন লাগছে" - এই একটা বাক্য বহু সর্বনাশ থামিয়ে দিয়েছে। যে ঠকবাজ "গোপন রাখুন" বলছে, সে আসলে বলছে "একা থাকুন, যাতে আমি আপনাকে গিলতে পারি"।
এই পর্বের শেষে
ভিক্তর লুস্তিগ পাঁচটা ভাষা জানতেন, কিন্তু তাঁর আসল বিদ্যেটা ছিল একটাই যে তিনি মানুষ চিনতেন। তিনি জানতেন, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা করে আঁদ্রে পোয়াসঁ বাস করে, সামান্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী, সামান্য অসুরক্ষিত, একটু বেশি লাভের আশায় সামান্য অন্ধ। সেই পোয়াসঁকে অস্বীকার করলেই বিপদ; বরং তাকে চিনে রাখাই ভালো। কারণ ঠকবাজের মনস্তত্ত্ব বোঝা মানে আসলে নিজেকেই একটু বেশি করে চেনা - আমরা কোথায় দুর্বল, কোন শব্দে গলে যাই, কোন হাতছানিতে যুক্তি খোয়াই। ঠকবাজের বিরুদ্ধে আসল ঢাল আমাদের বুদ্ধি নয়, আত্মবিশ্বাসও নয়, ও দুটোকে সে বরং অস্ত্র বানিয়ে নেয়। আসল ঢাল হল এই বিনয়টুকু মেনে নেওয়া যে, আমিও ঠকতে পারি।
পরের পর্বে আমরা এই আনাচ-কানাচ গুলোর ভেতরে একটা-একটা করে ঢুকব। শুনব সেই রাজকুমারের চিঠির গল্প, ভালোবাসার নাম করে হৃদয় আর ব্যাংক-ব্যালেন্স দুই-ই খালি করে দেওয়া ফাঁদের গল্প, আর ইতিহাসের সেই আশ্চর্য প্রতারকদের কথা যাঁরা প্রমাণ করে গেছেন, মানুষকে ঠকাতে জাদু লাগে না, শুধু মানুষটাকে চিনলেই চলে।
[ক্রমশঃ]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।