এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • তাহলে কি মুগ্ধ হওয়া ছেড়ে দেব?

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ৩৭ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • জয় গোস্বামী শুনলাম পাবলিকের নীতিবোধের মাপকাঠিতে আটকে গিয়ে হইচইয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। এই নীতিবোধ জিনিসটাই গোলমেলে, তার উপর সে যদি সাহিত্য লাইনের হয়। তবে শুধু সাহিত্যই বা বলি কেন, এমন কোন বিষয়ই নেই যেখানে ঢুকে আমরা নীতিবোধের মাপকাঠি নিয়ে নাড়াঘাঁটা করি নি বা দোলচালে ভুগি নি। তাই ভাবলাম, আজ সেই বহু পুরানো তর্ক একটু ফিরে দেখা যাক।

    আমরা সেই সময়ে বেড়ে উঠছিলাম তখন খেলা ভালোবাসে এমন কোন ছেলের ঘরেতে ঘরেতে বা পাড়ার ক্লাবে মারাদোনার একটা ছবিও থাকবে না, এমনটা ভাবাই যেত না প্রায়! ক্লাবে টাঙানো ছবির তলায় পেন দিয়ে লেখা “ফুটবলের ভগবান” এমন দেখা পাওয়াটাও আশ্চর্য ছিল না। একবার আমাকে কেউ বলেছিল তাদের ক্লাবে ছবির তলায় কেউ লিখেছিল ভুল বানানে ‘ভোগবান’! তখন বেশ হাসাহাসি করেছিলাম, কিন্তু এতদিন পরে ভেবে দেখি ওই ভুল বানানটাই বোধহয় সবচেয়ে নির্ভুল ছিল! লোকটা সত্যিই ভোগ করেছিলেন সব কিছু, খ্যাতি থেকে কোকেন অবধি, একেবারে গলা পর্যন্ত। আমরা যাঁকে ঈশ্বর বানিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়েছিলাম, ষাট বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন নেশা আর অসুখে জর্জরিত একটা ক্লান্ত শরীর নিয়ে। আর্জেন্টিনা তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করল, আর আমি সেদিন নিজেকে সেই প্রশ্নটা আবার করলাম যেটা আমি আগেও অনেক বার করেছিলাম অন্য নানা প্রসঙ্গে, যাঁকে এত ভালোবাসি, তাঁর মত করে জীবনটা কি নিজে বাঁচতে চাইবো?

    বাইবেলের ‘বুক অফ ড্যানিয়েল’-এ একটা চমৎকার স্বপ্নের বর্ণনা আছে কোথায় যেন শুনেছিলাম। ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাদনেজার স্বপ্নে দেখলেন এক প্রকাণ্ড মূর্তি, মাথাটা খাঁটি সোনার, বুক রুপোর, পেট পিতলের, আর পা দুটো লোহায় মেশানো কাদামাটির। একটা ছোট্ট পাথর এসে সেই কাদার পায়ে লাগতেই গোটা মূর্তি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। ইংরেজিতে ‘ফিট অফ ক্লে’ কথাটা এসেছে ওখান থেকেই আর আমার মনে হয়, মানুষের তৈরি যাবতীয় ঠাকুর-দেবতার এর চেয়ে ভালো বর্ণনা আজও কেউ দিতে পারেনি। সোনার মাথা আমরা সবাই দেখি, মানে সেই দেবতাদের করা গোলটা, বিখ্যাত সমীকরণটা, যুগান্তকারী কবিতাটা। কাদার পা-টা দেখা যায় না, কারণ ওটা ঢাকা থাকে মালায়, ধূপের ধোঁয়ায়, আর আমাদের নিজেদের না-দেখতে-চাওয়ায়।

    তো এই লেখায় ভাবছিলাম সেই কাদার পায়ের গল্প কিছু করব। মারাদোনা এখানে শুধু ফটকের চৌকিদার মাত্র, ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি থেকে সাহিত্যের লাইব্রেরি, আর্ট গ্যালারি থেকে কনসার্ট হল, প্রতিভার প্রতিটি মহল্লাতেই এমন বাসিন্দার ছড়াছড়ি, যাঁদের কীর্তির সামনে মাথা নত হয়ে আসে, আর জীবনী পড়লে মাথা ঘুরে যায়। মোটামুটি যে ঘটনাগুলি সত্যি বলে স্থাপিত সেই সব গল্পগুলি নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করব, এবং তারপর দেখব মনোবিজ্ঞানীদের সেই নিয়ে কি বলার আছে, মানে আমাদের মগজ এই স্ববিরোধটা সামলায় কী করে, সেই নিয়ে আর কি। শেষের দর্শনের সেই পুরনো তর্কটায় ঢুকব, যেটা আজকাল প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়া ঝগড়ার তলায় চাপা পড়ে আছে - শিল্পকে কি শিল্পীর থেকে আলাদা করা যায়? গোড়াতেই বলে রাখি নৈতিকতার সংজ্ঞা নিয়ে ফান্ডা দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং মানুষগুলোকে দেখা, আর মানুষ হিসেবে নিজেদের চেনা, এইটুকুই।
     

    শীতের ছুটি, দু'টি মুক্তো, একটি সমীকরণ

    ১৯২৫ সালের বড়দিনের কয়েকদিন আগে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ আড়াই সপ্তাহের ছুটি কাটাতে গেলেন সুইস আল্পসের আরোসা শহরে। সঙ্গে নিলেন দ্য ব্রয়-এর গবেষণাপত্র, দু'টি মুক্তো (কানে গুঁজে বাইরের আওয়াজ আটকানোর জন্য, ভদ্রলোকের নিজস্ব পদ্ধতি), আর ভিয়েনার এক পুরনো বান্ধবীকে। স্ত্রী আনি রয়ে গেলেন জুরিখে। সেই তুষারঢাকা ভিলায়, সেই রহস্যময়ী নারীর সান্নিধ্যে, জীবনীকার ওয়াল্টার মুরের ভাষায় যাঁর পরিচয় আজও অজানা, এরভিন শ্রোয়েডিঙ্গার লিখে ফেললেন সেই তরঙ্গ-সমীকরণ, যেটা আজ পৃথিবীর প্রতিটি ফিজিক্সের ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডের মাঝখানটা দখল করে বসে আছে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর, ১৯৩৩ সালের নোবেল, আধুনিক ইলেকট্রনিক্স থেকে রসায়ন, সবের গোড়ায় আরোসার সেই শীতের ছুটি। শ্রোয়েডিঙ্গারের গণিতজ্ঞ বন্ধু হেরমান ভাইল পরে রসিকতা করে বলেছিলেন, ওই আবিষ্কার এসেছিল শ্রোয়েডিঙ্গারের জীবনের এক বিলম্বিত প্রেমোচ্ছ্বাসের ফসল হিসেবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন রোমান্টিক জন্মকাহিনী আর ক'টা তত্ত্বের আছে!

    গল্পটা এখানে থামলে দিব্যি একটা মশলাদার আড্ডার বিষয় হয়ে থাকত - প্রতিভাবানদের একটু-আধটু রঙিন জীবন থাকেই, এই বলে হেসে চা শেষ করা যেত। মুশকিল হল, ওয়াল্টার মুর তাঁর প্রামাণ্য জীবনীটা লিখতে গিয়ে শ্রোয়েডিঙ্গারের ডায়েরিগুলো খুলে ফেলেছিলেন। তাতে দেখা গেল, ভদ্রলোক ছোট ছোট কালো নোটবুকে তাঁর জীবনের প্রতিটি নারীর নাম সাংকেতিক চিহ্নসহ লিখে রাখতেন রীতিমত খাতা মিলিয়ে। সেই খাতায় এমন সব হিসেব আছে যা পড়লে বেশ চমকে যেতে হয়। তরঙ্গ-বলবিদ্যা আবিষ্কারের অব্যবহিত পরে তিনি চোদ্দো বছরের দুই যমজ বোনকে অঙ্ক পড়ানোর দায়িত্ব নেন, তাদের একজন, ইটি ইউঙ্গার-এর সাথে ক্রমশ যা করলেন, আজকের পৃথিবী তাকে এক কথায় শিশু-নির্যাতন বলে। সতেরো বছর বয়সে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, শ্রোয়েডিঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ হারান, আর এক বিপর্যয়কর গর্ভপাতের পর মেয়েটি চিরকালের জন্য সন্তানধারণের ক্ষমতা হারায়। এর পরে সহকারীর স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক, তাঁকে নিয়ে রীতিমত ত্রিভুজ সংসার, যে ব্যবস্থা দেখে খোদ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অস্বস্তিতে নাক কুঁচকেছিল।

    এই ইতিহাসের হিসেব চোকানো শুরু হয়েছে সম্প্রতি। শ্রোয়েডিঙ্গার জীবনের শেষ পর্বে ডাবলিনে কাটিয়েছিলেন। সেখানকার ট্রিনিটি কলেজে তাঁর নামে ছিল একটা বিখ্যাত লেকচার থিয়েটার, যেখানে ১৯৪৩ সালে তিনি ‘হোয়াট ইজ লাইফ?’ নামের সেই যুগান্তকারী বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যা পড়ে ওয়াটসন-ক্রিকের মত মানুষরা ডিএনএ-র খোঁজে নেমেছিলেন। ২০২২ সালে, ছাত্রছাত্রীদের দাবিতে আর নথিপত্র পর্যালোচনার পর, ট্রিনিটি কলেজ সেই লেকচার থিয়েটার থেকে শ্রোয়েডিঙ্গারের নাম মুছে দিয়েছে। সমীকরণটা অবশ্য বহাল তবিয়তে আছে, ব্ল্যাকবোর্ড থেকে ওটাকে মোছার সাধ্য কারো নেই, কারণ ওটা সত্যি। এইখানেই আমাদের সমস্যার আসল চেহারাটা প্রথম স্পষ্ট হয় - নামফলক খুলে ফেলা যায়, সমীকরণ ফেলা যায় না। মানুষটাকে বাদ দিয়ে কাজটাকে রাখা, কথাটা বলা যত সহজ, করা তত নয়; কারণ প্রতিবার সমীকরণটা লেখার সময় নামটাও সাথে সাথে লিখতে হয়।
     

    ল্যাবরেটরির অন্ধকার কোণগুলি

    শ্রোয়েডিঙ্গার একা নন, বিজ্ঞানের প্যান্থিয়নে কাদামাটির পায়ের ছড়াছড়ি। রবার্ট হুক-এর নামটাই ধরুন, কোষ বা ‘সেল’-এর নামকর্তা, স্থিতিস্থাপকতার সূত্রের জনক, অণুবীক্ষণের জাদুকর, আর নিউটনের আজীবনের প্রতিদ্বন্দ্বী। এই হুকের বাড়িতে ছোটবেলা থেকে থাকত তাঁর ভাইঝি গ্রেস এবং হুকের নিজের ডায়েরির সাংকেতিক চিহ্নগুলো সাক্ষী, কিশোরী সেই ভাইঝির সাথে তাঁর ছিল দীর্ঘ শারীরিক সম্পর্ক। ভদ্রলোক ডায়েরিতে সব লিখে রাখতেন - বিজ্ঞানীর অভ্যাস, তথ্য নথিভুক্ত না করে শান্তি নেই, ফলে তিনশো বছর পরে ইতিহাসবিদদের আর অনুমানের দরকার পড়েনি। খালি একটু বুঝতে সময় লেগেছিল তাঁর ডায়েরীর সাংকেতিক চিহ্নগুলির অর্থ কি!

    ফ্রিৎস হেবার-এর গল্পটা আবার সম্পূর্ণ অন্য গোত্রের, এখানে কেচ্ছা নয়, রীতিমত গণমৃত্যু। এই নিয়ে তো আমি একটা সিরিজ লেখাই শুরু করেছিলাম, দুই পর্ব লিখেছিলামও। তারপর আরো অনেক লেখার মত, সেই লেখাও শেষ করা হয় নি, শেষ করতে হবে একটু সময় নিয়ে! যাই হোক হেবারের গল্পে ফিরে আসা যাক। বাতাসের নাইট্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া বানানোর যে পদ্ধতি তিনি ১৯০৯ সালে আবিষ্কার করলেন, সেই হেবার-বশ প্রক্রিয়ার কৃত্রিম সারে আজ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের পাতে ভাত ওঠে, ইতিহাসে একক কোন আবিষ্কার সম্ভবত এত প্রাণ বাঁচায়নি। সেই একই মানুষ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্বেচ্ছায় জার্মান বিষগ্যাস কর্মসূচীর নেতৃত্ব নিলেন, ১৯১৫-র এপ্রিলে ইপ্রিস-র রণাঙ্গনে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লোরিন গ্যাসের প্রথম আক্রমণ তদারকি করলেন, হাজার হাজার সৈনিক শ্বাস আটকে মারা গেল। তাঁর স্ত্রী ক্লারা ইমারভার যিনি নিজেও রসায়নে ডক্টরেট, এই কাজের তীব্র প্রতিবাদী ছিলেন। ইপ্রিস-র দিন দশেকের মাথায় স্বামীরই সার্ভিস রিভলভার দিয়ে নিজের বুকে গুলি চালালেন। পরদিন সকালে হেবার রওনা দিলেন পূর্ব রণাঙ্গনে পরের গ্যাস আক্রমণের তদারকিতে। ১৯১৮-র রসায়নের নোবেলটা অবশ্য আটকায়নি।

    এমনকি বিজ্ঞানের সবচেয়ে আদুরে এবং জনপ্রিয় মুখটিও ধোয়া তুলসীপাতা নন। আইনস্টাইন, দেওয়ালে-টাঙানো জিভ-বার-করা সেই ছবি, প্রথম স্ত্রী মিলেভা মারিচের সাথে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকলে ১৯১৪ সালে। তাঁকে লিখিত শর্তের তালিকা ধরিয়েছিলেন, ইতিহাসবিদরা যা উদ্ধার করেছেন তাঁর চিঠিপত্র থেকে যে, আমার জামাকাপড় গোছানো থাকবে, তিনবেলা খাবার ঘরে পৌঁছবে, আমার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের আশা করবে না, আমি বললে কথা বন্ধ করবে, আমি বললে ঘর ছেড়ে যাবে। পড়লে মনে হয় জমিদার নায়েবকে হুকুমনামা পাঠাচ্ছেন।
    আর নিউটন? মাধ্যাকর্ষণের আবিষ্কর্তা ছিলেন প্রতিহিংসায় বিশ্বকর্মা যাকে বলে একেবারে! ক্যালকুলাসের স্বত্ব নিয়ে লাইবনিৎসের বিরুদ্ধে রয়্যাল সোসাইটির ‘নিরপেক্ষ’ তদন্ত রিপোর্টটি গোপনে লিখেছিলেন স্বয়ং নিজে, রায় অবশ্যই নিজের পক্ষে। বৈজ্ঞানিক প্রতিভা আর ব্যক্তিগত ঔদার্য যে এক প্যাকেজে আসে না, এই তালিকা তার জ্যান্ত প্রমাণ।
     

    কলমের কালিতে দাগ

    সাহিত্যের দিকে চোখ ফেরালে অস্বস্তিটা আরো বাড়ে, কারণ অনেক লেখকরা তো আবার নীতিকথা শোনানোর ব্যবসাতেই আছেন! লিও তলস্তয়ের কথাই ধরুন। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ আর ‘আনা কারেনিনা’-র স্রষ্টা, জীবনের শেষ তিরিশ বছর যিনি কাটালেন সাধুসন্ত হয়ে, অহিংসা, ব্রহ্মচর্য, সরল জীবনের প্রচারে; গান্ধী পর্যন্ত যাঁর পত্রশিষ্য। অথচ ঘরের ভিতরের ছবিটা? বিয়ের আগে চৌত্রিশ বছরের তলস্তয় আঠারো বছরের সোফিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজের যৌবনের ডায়েরিগুলো যাতে খুঁটিয়ে লেখা তাঁর যাবতীয় লাম্পট্যের হিসেব, এমনকি জমিদারির এক কৃষক-রমণীর গর্ভে তাঁর অবৈধ সন্তানের কথাও। বাসর রাতের আগে নববধূকে এই উপহার, সোফিয়া সেই ধাক্কা জীবনে ভোলেননি। তারপর আটচল্লিশ বছরের দাম্পত্য, তেরোটি সন্তান, এবং ক্রমাগত যুদ্ধ – যে মানুষ পৃথিবীকে সম্পত্তি ত্যাগের উপদেশ দিচ্ছেন, তিনি নিজের বইয়ের স্বত্ব নিয়ে স্ত্রীর সাথে দর কষাকষি করছেন; যিনি ব্রহ্মচর্যের মহিমা লিখছেন, তেরো সন্তানের পিতা তিনিই। শেষটা রীতিমত করুণ – ১৯১০ সালের এক হিমেল নভেম্বর রাতে বিরাশি বছরের বুড়ো মানুষটা স্ত্রীকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালালেন, আর কয়েকদিন পরে মারা গেলেন আস্তাপোভো নামের এক অখ্যাত রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টারের ঘরে। সোফিয়াকে শেষ মুহূর্তের আগে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে স্বামীকে দেখেছিলেন তিনি। মজা হল, এই তলস্তয়ই তাঁর ‘হোয়াট ইজ আর্ট?’ বইতে উপদেশ দিয়েছিলেন যে শিল্পের একমাত্র কাজ মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করা। উপদেশ আর জীবনের এই দূরত্বটা মাপতে পারলে পদার্থবিদ্যায় নতুন একক চালু করা যেত!

    পাবলো নেরুদার গল্পটা শুনলে অবশ্য তলস্তয়কেও নিরীহ মনে হবে তুলনায়। প্রেমের কবিতার রাজপুত্র, নোবেলজয়ী, যাঁর পংক্তি না-আওড়ানো প্রেমিক দক্ষিণ গোলার্ধে খুঁজে পাওয়া শক্ত – তাঁর মরণোত্তর আত্মজীবনী ‘কনফিয়েসো কে হে ভিভিদো’ (স্বীকার করছি, বেঁচেছিলাম) বেরোল ১৯৭৪ সালে, আর তাতে ভদ্রলোক নিজের কলমে লিখে গেলেন এক ভয়ঙ্কর স্বীকারোক্তি। ১৯২৯ সালে সিলোনে (আজকের শ্রীলঙ্কা) চিলির কনসাল থাকাকালীন, তাঁর বাড়ির শৌচাগার পরিষ্কার করতে আসা এক তামিল তরুণীকে তিনি একদিন হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন বিছানায়, মেয়েটি গোটা সময় চোখ খোলা রেখে পাথরের মত নিথর পড়ে ছিল, কবির নিজের ভাষায় সে মিলন ছিল “এক পুরুষ ও এক মূর্তির”। নেরুদা লিখেছেন, মেয়েটি তাঁকে ঘৃণা করে ঠিকই করেছিল, অথচ গোটা বিবরণে অনুশোচনার চেয়ে নন্দনতত্ত্ব বেশী। চার প্যারাগ্রাফ, মেয়েটির পুরো নামটুকুও নেই - তারপর কবি পাতা উল্টে চলে গেছেন পরের অধ্যায়ে, পরের খ্যাতিতে। আরো আছে, একমাত্র সন্তান মালভা মারিনা জন্মেছিল জলশীর্ষ রোগ নিয়ে; নেরুদা মেয়ে আর মেয়ের মা-কে ত্যাগ করেন, আট বছর বয়সে মেয়েটি মারা যায়, বাবা শেষ দেখাটুকুও দেখতে যাননি।
     
    ইতিহাসের ভুলের সংশোধন এখানেও শুরু হয়েছে - ২০১৮ সালে সান্তিয়াগোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেরুদার নামে করার সরকারি প্রস্তাব নারী আন্দোলনের প্রবল প্রতিবাদে বাতিল হয়ে যায়। প্রশ্নটা সেদিন চিলির রাস্তায় প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, আজ আমাদের সবার ঘরে ঢুকে পড়েছে, স্বীকারোক্তিটা যাঁর নিজের কলমের, তাঁর প্রেমের কবিতা পড়ে আজ ঠিক কী অনুভব করা উচিত?
    তালিকায় চার্লস ডিকেন্সও আছেন। গরীব-দুঃখীর দরদী কথাশিল্পী, যিনি দশ সন্তানের জননী স্ত্রী ক্যাথরিনকে মাঝবয়সে এক তরুণী অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ে কার্যত ঘর থেকে বার করে দেন, শোবার ঘরের মাঝের দরজাটা পর্যন্ত তক্তা মেরে বন্ধ করিয়ে, এবং নিজের সাফাই গেয়ে খবরের কাগজে প্রকাশ্য বিবৃতি ছাপিয়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন চিঠিপত্রও মিলেছে যাতে দাবি, সুস্থ স্ত্রীকে পাগলা গারদে ঢোকানোরও চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

    আছেন রোয়াল্ড ডাল, যাঁর ‘চার্লি অ্যান্ড দ্য চকোলেট ফ্যাক্টরি’ পড়ে আমাদের ছেলেবেলা মিষ্টি হয়ে আছে। ভদ্রলোক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি ইহুদি-বিদ্বেষী মন্তব্য করে গেছেন। মৃত্যুর তিরিশ বছর পরে, ২০২০ সালে, তাঁর পরিবার ওয়েবসাইটে চুপিচুপি একটা ক্ষমাপ্রার্থনা টাঙিয়ে দায় সেরেছে। শিশুসাহিত্যিকের এই দিকটা জানার পর বইগুলো ছোটদের হাতে তুলে দিতে হাত কাঁপে কিনা এ প্রশ্নের উত্তর পাঠকভেদে আলাদা হবে, জানি।

    রং, সুর আর বাঁ পায়ের জাদু

    চিত্রকলার জগতে ঢুকলে প্রথমেই রয়েছেন কারাভাজ্জো। আলো-আঁধারির যে জাদুতে ইউরোপীয় ছবি আঁকা চিরকালের মত বদলে গেল, তার স্রষ্টা ১৬০৬ সালে রোমের রাস্তায় ঝগড়ার মাথায় এক লোককে খুন করে মৃত্যুদণ্ডের হুলিয়া নিয়ে জীবনভর পালিয়ে বেড়িয়েছেন এবং পালাতে পালাতেই এঁকেছেন ইতিহাসের সেরা কিছু ছবি।

    পিকাসোর ব্যাপার স্যাপারের খবর দিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ফ্রাঁসোয়াজ জিলো। পিকাসো বলতেন, মেয়েরা হয় দেবী, নয় পাপোশ। তাঁর সংসারের খতিয়ানও সেই অনুপাতে, জীবনের দুই নারী পরে আত্মহত্যা করেছেন, একজন ভুগেছেন স্নায়ুবৈকল্যে।

    সঙ্গীতে রিখার্ড ভাগনার, অপেরার যুগপুরুষ যাঁর সুরের সামনে আজও গোটা পৃথিবী নতজানু। ১৮৫০ সালে ছদ্মনামে লিখেছিলেন ‘সঙ্গীতে ইহুদিয়ানা’ নামের এক বিষাক্ত ইহুদি-বিদ্বেষী প্রবন্ধ, পরে সেটা সগর্বে নিজের নামেই ছাপান। হিটলারের প্রিয়তম সুরকার ছিলেন তিনি, আর সেই ইতিহাসের চাপ এতটাই যে ইজরায়েলে আজও ভাগনারের সঙ্গীত জনসমক্ষে বাজানোর উপর কার্যত এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা চলে। ২০০১ সালে ডানিয়েল বারেনবয়েম জেরুজালেমে এনকোর হিসেবে ভাগনার বাজিয়ে যে ঝড় তুলেছিলেন, তার রেশ বহুদিন ছিল। ওদিকে জ্যাজ-কিংবদন্তী মাইলস ডেভিস তো নিজের আত্মজীবনীতেই স্ত্রীদের গায়ে হাত তোলার কথা লিখে গেছেন, অনুশোচনার ভাগ লক্ষ্যণীয়রকম পাতলা রেখে।

    খেলার মাঠের প্রতিনিধি হিসেবে সেই ক্যালেন্ডারের লোকটাই যথেষ্ট যার উল্লেখ করে লেখাটি শুরু করেছিলাম। ১৯৮৬-র ২২শে জুন আজতেকা স্টেডিয়ামে, একই ম্যাচের একই দশ মিনিটে, মারাদোনা ঘটিয়েছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে কুখ্যাত প্রতারণা আর সবচেয়ে মহিমান্বিত মুহূর্ত। হাত দিয়ে ঠেলে দেওয়া সেই ‘ঈশ্বরের হাত’-এর গোল, আর চার মিনিট পরে পাঁচজনকে কাটিয়ে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। ওঁর গোটা জীবনটাই ছিল ওই দশ মিনিটের লম্বা সংস্করণ টাইপের – নাপোলিকে প্রথম লিগ জেতানো ফুটবল-ঈশ্বর, ওদিকে কোকেন, কামোরার সঙ্গ, পনেরো মাসের নির্বাসন, ১৯৯৪-এর বিশ্বকাপ থেকে ডোপ পরীক্ষায় বহিষ্কার (“ওরা আমার পা দুটো কেটে নিল”), অস্বীকৃত সন্তান, এবং সব শেষে ২০২০-র নভেম্বরে ষাট বছর বয়সে ক্লান্ত হৃদযন্ত্রের হাল ছেড়ে দেওয়া - সব একই খাতায়। খেয়াল করার বিষয়, প্রতিটি ক্ষেত্রের গল্পের কাঠামোটা কেমন যেন এক – একদিকে আকাশছোঁয়া কীর্তি, অন্যদিকে মাটিতে-গড়ানো জীবন, আর মাঝখানে আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকা জনতা, যারা ঠিক করতে পারছি না মালাটা পরাব না খুলে নেব।
     

    সিলিকনের দেবতারাও মাটির

    কেউ ভাবতে পারেন, এসব বুঝি সেকেলে যুগের গল্প, আজকের আলোকপ্রাপ্ত পৃথিবীতে প্রতিভা আর চরিত্র হাত ধরাধরি করে চলে। তাঁদের জন্য হালের দুটো উদাহরণ দিয়ে রাখি, দুটোই আপনার পকেটের মোবাইল ফোনের সাথে সম্পর্কিত। উইলিয়াম শকলি ছিলেন ট্রানজিস্টরের সহ-আবিষ্কারক, ১৯৫৬ সালের পদার্থবিদ্যার পেয়েছিলেন নোবেল। এই লেখা আপনি যে যন্ত্রে পড়ছেন, তার প্রতিটি চিপের গোড়ায় ওঁর সেই আবিষ্কার, সেই ভাবে দেখতে গেলে সিলিকন ভ্যালি নামের জায়গাটার জন্মও কার্যত ওঁর হাত ধরে। সেই শকলি জীবনের শেষ দশকগুলো ব্যয় করলেন প্রকাশ্য জাতিবিদ্বেষী ‘বিজ্ঞান’ প্রচারে - বুদ্ধিমত্তা নাকি বর্ণভেদে নির্ধারিত, এই তত্ত্বে মজে কম আই-কিউ মানুষদের স্বেচ্ছা-বন্ধ্যাকরণের প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়ে বসলেন। শেষ জীবনে সহকর্মীরা ওঁকে দেখলে রাস্তা বদলে হাঁটতেন, নোবেলের পদক গলায় ঝুলিয়েও মানুষ কতটা একা হতে পারে, শকলি তার করুণ প্রমাণ।

    আর স্টিভ জোবস, আমাদের যুগের সবচেয়ে পূজিত প্রযুক্তি-ঋষি, যাঁর বক্তৃতার ক্লিপ শেয়ার করে আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবনের মানে খোঁজে। তাঁর প্রথম সন্তান লিসার জন্মের পর জোবস বছরের পর বছর পিতৃত্ব অস্বীকার করেছেন। আদালতের কাগজে হলফ করে বলেছিলেন তিনি সন্তানের জনক হতে অক্ষম আর অ্যাপলের শেয়ারে কোটিপতি হয়ে ওঠার সেই দিনগুলোতে মেয়ে আর মেয়ের মা চলেছেন সরকারি ভাতায়। লিসা বড় হয়ে নিজের স্মৃতিকথায় সে দিনগুলোর কথা লিখেছেন, পড়লে ‘স্টে হাংরি, স্টে ফুলিশ’ শুনতে একটু অন্যরকম লাগে।

    বলার কথা এটাই, কাদামাটির পা কোন বিশেষ শতাব্দীর ব্যাধি নয়। ল্যাবরেটরির অ্যাপ্রন, কবির শাল বা কালো টার্টলনেক – পোশাক যা-ই হোক, ভিতরের মানুষটা সব যুগেই মানুষ, এবং মানুষ মাত্রেই অসম্পূর্ণ। ফারাক শুধু এই যে, সাধারণ মানুষের অসম্পূর্ণতার দাম দেয় তার নিজের সংসার, আর ক্ষমতাবানের অসম্পূর্ণতার দাম দেয় অন্যেরা – প্রায়শই তারা, যাদের গলার জোর সবচেয়ে কম।
     

    মগজের ভিতরের কারসাজি

    তা আমরা এমন দু-টানায় পড়ি কেন, এবং পড়েও দিব্যি ভক্তি চালিয়ে যাই কী করে সেই নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা কি বলেন সেই নিয়ে এবার একটু তলিয়ে দেখা যাক। এমন একটা জম্পেশ জিনিস নিয়ে ওঁরা মাথা ঘামাবেন না, এটা প্রায় অসম্ভব! ওঁরা গত একশো বছর ধরে এই নিয়ে রীতিমত ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন, এবং স্বীকার করতেই হবে, মালপত্র জমিয়েছেন ভালোই।

    ওঁদের দাগানো প্রথম আসামীর নাম ‘হেলো এফেক্ট’, মানে জ্যোতির্বলয়ের ধাঁধা। ১৯২০ সালে এডওয়ার্ড থর্নডাইক দেখিয়েছিলেন, সেনা অফিসাররা যে সৈনিককে চেহারায় সুপুরুষ মনে করছেন, তাকে বুদ্ধি-নেতৃত্ব-চরিত্র সব গুণেই বাড়তি নম্বর দিয়ে বসছেন - একটা গুণের আলো এতই জোরালো যে বাকি সব খুঁত সেই আলোয় ঢাকা পড়ে যায়। এখন ভাবুন, সামান্য সুন্দর মুখেরই যদি এই ক্ষমতা, তাহলে তরঙ্গ-সমীকরণের আলো, বা শতাব্দীর সেরা গোলের আলো, কতখানি চোখ-ধাঁধানো! প্রতিভা আসলে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হেলো যার ছটায় কোকেনও ঝাপসা দেখায়, ডায়েরির কালো নোটবুকও!

    দ্বিতীয় কারসাজি দেখাচ্ছে ‘প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক’। ১৯৫৬ সালে হর্টন আর ভোল টেলিভিশন-দর্শকদের লক্ষ্য করে দেখালেন, পর্দার মানুষটিকে নিয়মিত দেখতে দেখতে দর্শকের মনে জন্মায় এক ঘনিষ্ঠতার বোধ, লোকটা যেন চেনা, প্রায় বন্ধু - অথচ সম্পর্কটা ষোলো আনা একতরফা। ওঁরা নাম দিয়েছিলেন ‘দূরত্বে থেকেও অন্তরঙ্গতা’। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই একতরফা প্রেম মহামারী - প্রিয় তারকার সকালের ডিমভাজা থেকে রাতের মন-খারাপ সবই নখদর্পণে, ফলে মনে হয় মানুষটাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। কিন্তু চিনি আমরা আসলে একটা সযত্নে-সাজানো সংস্করণকে। এই সম্পর্ক কতদূর গড়াতে পারে, তা মাপতে ম্যাককাচন, ল্যাঞ্জ আর হাউরান ২০০২ সালে বানিয়েছেন ‘সেলিব্রিটি অ্যাটিটিউড স্কেল’। তাঁদের গবেষণা বলছে তারকা-ভক্তির তিনটে ধাপ আছে - নিরীহ বিনোদন, তারপর ব্যক্তিগত আচ্ছন্নতা (তারকার কষ্টে নিজের বুকে ব্যথা), আর শেষ ধাপে প্রায়-রোগ যেখানে ভক্তের মনে হয় তারকার সাথে তার গোপন যোগ আছে, তার জন্য বেআইনি কাজও করা চলে। যাদের নিজেদের পরিচয়ের ভিত নড়বড়ে, তারাই তারকার জীবনে ডুবে সেই ফাঁক ভরাট করতে চায় এবং নেশার মতই ডোজ ক্রমশ বাড়ে।

    তৃতীয়টা ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেষ্টিং, তাক বলে ‘বার্গ’, বেসকিং ইন রিফ্লেক্টেড গ্লোরি, অর্থাৎ প্রতিফলিত গৌরবে গা-সেঁকা। ১৯৭৬ সালে রবার্ট চালডিনি আর সঙ্গীরা আমেরিকার ক্যাম্পাসে নজর রেখে দেখলেন যে ফুটবল টিম শনিবার জিতলে সোমবার টিমের জার্সি পরা ছাত্র লাফিয়ে বাড়ে, হারলে আলমারিতে অন্য জামার আবির্ভাব ঘটে; আর জিতলে সবাই বলে “আমরা জিতেছি”, হারলে “ওরা হেরে গেল”। এই ‘আমরা-ওরা’র খেলা একবার কানে ধরা পড়লে আর রেহাই নেই, পাড়ার চায়ের দোকান থেকে ফেসবুক অবধি সর্বত্র শুনবেন। প্রিয় প্রতিভার গৌরবের সাথে আমাদের আত্মসম্মান এমন জট পাকিয়ে যায় যে তাঁর দোষ মানা মানে খানিকটা নিজের দোষ মানা, আর ওই কাজটি স্বেচ্ছায় কে-ই বা করে!

    তাহলে কেচ্ছা যখন অস্বীকারের অতীত, মগজ করে কী? ২০১৩ সালে ভট্টাচার্য, বারমান আর রীডের গবেষণা দেখাল, আমরা দুটো রাস্তা নিই। প্রথমটা খাটনির রাস্তা, সেটা হল ‘যুক্তির প্রলেপ’, দোষটাকেই ছোট করা: আহা, অত চাপে ওরকম হয়েই থাকে, মিডিয়া বাড়িয়ে বলছে, যুগটাই তো আলাদা ছিল ইত্যাদি। এতে বিবেকের সাথে খানিক ঝাপটাঝাপটি করতে হয়। তাই জনপ্রিয়তা বেশী দ্বিতীয় রাস্তার, সেখানে হয় ‘মরাল ডিকাপলিং’, নৈতিক বিচ্ছেদ: মানুষটাকে মাঝখান থেকে দু-ভাগ করে ফেলা। এদিকে পদার্থবিদ শ্রোয়েডিঙ্গার, ওদিকে মানুষ শ্রোয়েডিঙ্গার; আমি শুধু এদিকটার ভক্ত, ওদিকটা আমার দেখার বিষয় নয়। গবেষণা বলছে, এই রাস্তায় মনের অস্বস্তি কম, নিজেকে যুক্তিবাদীও লাগে, যাকে বলে একেবারে সস্তায় পুষ্টিকর সমাধান!

    কিন্তু ভাগাভাগিটা কি সত্যিই হয়? এইখানে বার্লিনের হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের সেই ইইজি-গবেষণাটা আসল আলোটা ফেলেছে। কাউবে, আইজারবেক আর আবদেল রহমান ৩২ জন শিল্প-অনভিজ্ঞ মানুষকে অচেনা শিল্পীদের ছবি দেখিয়ে রেটিং নিলেন। তারপর অর্ধেক শিল্পীর নামে জঘন্য (বানানো) কেচ্ছা শোনালেন, বাকিদের নামে নিরীহ তথ্য, কোন ছবি কার ভাগে পড়বে তা লোকভেদে ওলটপালট করে, যাতে ‘ছবিটাই খারাপ ছিল’ বলার রাস্তা না থাকে। ফলাফল হল গিয়ে কেচ্ছা জানার পর সেই ছবিগুলো ভালো লাগল কম, অথচ ‘শিল্প হিসেবে মান কেমন’ এই বিচার প্রায় অটুট রইল। মাথায় লাগানো ইলেকট্রোড ধরে ফেলল আসল ঘটনাটা, ছবি চোখে পড়ার মাত্র ২৫০-৩৫০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে, সচেতন চিন্তা শুরুর ঢের আগে, ‘খারাপ’ শিল্পীর ছবিতে মস্তিষ্কে জেগে উঠছে বাড়তি আবেগ-সংকেত – রিফ্লেক্সের মত, ইচ্ছেয় থামানো যায় না; অথচ পরের ধাপের ধীর, হিসেবি সংকেতে কোন ফারাক নেই। মানে দাঁড়াল, মগজের হিসেবি বিভাগ শিল্প আর শিল্পীকে আলাদা খাতায় তুলতে পারে বটে, কিন্তু আবেগের বিভাগ ওসব ভাগাভাগির ধার ধারে না। সে ছবি আর ছবিওয়ালাকে একসাথেই ভালোবাসে, একসাথেই ত্যাগ করে। সবচেয়ে মোক্ষম তথ্যটা হল যাঁরা জানিয়েছিলেন শিল্পে তাঁদের আগ্রহ গভীর, কেচ্ছার ধাক্কা তাঁদের মস্তিষ্কের গভীরতর স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ভক্তি যত গভীর, ক্ষতও তত গভীরে - ব্যাপারটা কাব্যিক শোনালেও এ একেবারে ইলেকট্রোডের সাক্ষ্য।

    আশেপাশের গবেষণাগুলোও কম মজার নয়। ফান টিলবুর্গ আর ইগু ২০১৪ সালে দেখালেন উল্টো ফল। শিল্পীকে ‘খ্যাপাটে-ছিটগ্রস্ত’ বলে বর্ণনা করলে লোকে তাঁর ছবিকে বেশী দক্ষ আর উপভোগ্য ভাবে। গবেষণাপত্রের নামই ছিল “ফ্রম ভ্যান গঘ টু লেডি গাগা” - কান কাটার গল্প জানা থাকলে ছবির কদর বাড়ে! অর্থাৎ শিল্পীর ‘পাগলামি’ শিল্পের বিজ্ঞাপন, কিন্তু ‘পাপ’ শিল্পের বিষ, সমাজের খাতায় দুটো খরচ সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে লেখা। ওদিকে পল রোজিন-ক্যারল নেমেরফের বিখ্যাত পরীক্ষাগুলো বলছে, ব্যাপারটার শিকড় প্রায় জাদু-বিশ্বাসের স্তরে – ভালো করে কাচা হয়েছে জেনেও অধিকাংশ মানুষ খুনির গায়ে-দেওয়া সোয়েটার পরতে রাজি হয় না, যেন মন্দত্ব ছোঁয়াচে, সুতোয় লেগে থাকে। নিউম্যান আর সঙ্গীরা (২০১১) দেখালেন উল্টোটাও, প্রিয় তারকার ছোঁয়া-লাগা জিনিসের দাম নিলামে চড়ে, ঘৃণিত মানুষের ছোঁয়ায় দাম পড়ে। শিল্পকর্ম তো শুধু ছোঁয়া নয় - স্রষ্টার হাত, মন আর সময়ের ঘনীভূত রূপ; কেচ্ছার ছোঁয়াচ সেখানে লাগবেই।
     

    দুই দল, আর মাঝখানে আমরা

    বিজ্ঞান যেখানে থামে, দর্শন সেখান থেকে তর্ক শুরু করে – এই তর্কটা রীতিমত দেড়শো বছরের পুরনো। এক দিকে যাঁরা, তাঁদের পোশাকি নাম ‘অটোনমিস্ট’ – শিল্প এক স্বশাসিত রাজ্য, নৈতিকতার সেখানে ভিসা লাগে না। এ দলের সবচেয়ে ঝকঝকে মুখপাত্র অস্কার ওয়াইল্ড, যিনি ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’-র ভূমিকায় ঘোষণা করেছিলেন – নৈতিক বা অনৈতিক বই বলে কিছু হয় না, বই হয় ভালো-লেখা নয়ত খারাপ-লেখা, ব্যস। এই মতে শ্রোয়েডিঙ্গারের সমীকরণ বিচার হবে গণিতের আদালতে, নেরুদার কবিতা ছন্দের আদালতে, স্রষ্টার চরিত্র সেখানে অবান্তর সাক্ষী। উল্টো দিকে ‘মরালিস্ট’ বা নীতিবাদীরা, যাঁদের সবচেয়ে গর্জনমুখর সেনাপতি, মজার ব্যাপার, স্বয়ং তলস্তয়! তাঁর ‘হোয়াট ইজ আর্ট?’-এর মূল কথাই ছিল, যে শিল্প মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করে না তা শিল্পই নয়। নিজের জীবনটা যে এই মাপকাঠিতে ডাহা ফেল, সেটা অবশ্য আলাদা প্রবন্ধের বিষয়। নীতিবাদের পতাকা সবচেয়ে জোরে ওড়ান প্রায়শই তাঁরাই, যাঁদের নিজেদের পতাকাদণ্ডে ঘুণ ধরা।

    আধুনিক দার্শনিকরা এই দুই মেরুর মাঝে সূক্ষ্মতর অবস্থান খুঁজেছেন। বেরিস গাউটের ‘এথিসিজম’ বলে শিল্পকর্ম যদি আমাদের কাছ থেকে এমন কোন অনুভূতির দাবি করে যা নৈতিকভাবে বিকৃত, তবে সেটা তার নান্দনিক খুঁতও বটে। আবার আন্ডারসন-ডিনের ‘মডারেট অটোনমিজম’ বলে নৈতিক খুঁত আর শৈল্পিক খুঁত দুটো আলাদা খাতা, এক খাতার লাল কালি অন্য খাতায় গড়ায় না। জেমস হ্যারল্ড তাঁর ‘ডেঞ্জারাস আর্ট’ বইতে প্রায় আমাদের ঘরোয়া সিদ্ধান্তটাই দার্শনিক ভাষায় লিখেছেন, স্রষ্টার চরিত্র দিয়ে সৃষ্টিকে বিচার করা যুক্তির চোখে হয়ত অসিদ্ধ, কিন্তু মানুষের পক্ষে প্রায় অনিবার্য। কাজেই প্রশ্নটা ‘উচিত কি না’ থেকে সরিয়ে ‘কীভাবে বাঁচব এই টানাপোড়েন নিয়ে’ সেদিকে আনাই বুদ্ধিমানের কাজ। এর সাথে জুড়ুন বার্নার্ড উইলিয়ামসের ‘মরাল লাক’-এর সেই বিখ্যাত ধাঁধা – গগ্যাঁ স্ত্রী-সন্তান ফেলে তাহিতি গিয়েছিলেন ছবি আঁকতে; ছবিগুলো অমর হল বলে আজ আমরা বলি ‘যাক, গিয়ে ভালোই করেছিলেন’; কিন্তু ছবিগুলো মাঝারি হলে? তখন তিনি স্রেফ এক পলাতক দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বামী। কাজ এক, অথচ নৈতিক রায় ঝুলে রইল ফলাফলের উপর, ফলাফল যেখানে অনেকটাই ভাগ্য। আমরা আসলে সাফল্যকে ক্ষমাপত্র হিসেবে ব্যবহার করি এবং করতে করতে সমাজকে শিখিয়ে ফেলি যে যথেষ্ট বড় প্রতিভার জন্য নিয়মগুলো একটু আলগা।

    বাস্তবের মাটিতে এই তর্কের একটা কেজো দিকও আছে, সেটাও একটু বলা দরকার। মৃত স্রষ্টা আর জীবিত স্রষ্টায় ফারাক আছে – ভাগনারের রেকর্ড কিনলে ভাগনারের পকেটে পয়সা ঢোকে না, কিন্তু জীবিত কোন অভিযুক্ত তারকার সিনেমার টিকিট কাটলে আমি সরাসরি তাঁর পরের প্রজেক্টের পুঁজি জোগাই, ভোক্তা হিসেবে আমার টাকাটাও একরকম ভোট। ইজরায়েলের সেই ভাগনার-নিষেধাজ্ঞাও এই যুক্তিতেই আলাদা মাত্রা পায়, ওখানে প্রশ্নটা সুরের গুণাগুণের নয়, আউশভিৎস-ফেরত মানুষদের সামনে সেই সুর বাজানোর যন্ত্রণার। অর্থাৎ ‘শিল্পকে শিল্পীর থেকে আলাদা করব কি না’ – এর কোন এক-মাপের উত্তর হয় না; উত্তরটা নির্ভর করে কে শুনছে, কে দাম দিচ্ছে, আর ক্ষতটা কার – এই তিন প্রশ্নের উপর।

    মূর্তি নয়, আলোটুকু

    তাহলে শেষমেশ দাঁড়াল কী? মুগ্ধ হওয়া ছেড়ে দেব? তার দরকার আমি নিজে তো দেখি না! মুগ্ধতা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ক্ষমতাগুলোর একটা, ওটা খুইয়ে লাভ নেই। সব মানুষের মুগ্ধ হবার ক্ষমতা থাকে না এবং তারা টেরও পায় না কিসের অভাব নিয়ে তারা জীবন কাটাচ্ছে! এখানে একটা সাদামাটা প্রস্তাব দেওয়াই যেতে পারে যে পুজোর উপকরণটা বদলানো। মানুষটাকে নয়, মানুষটার ভিতর দিয়ে যেটা প্রকাশ পেয়েছিল, সেই সমীকরণ, সেই কবিতা, সেই দশ সেকেন্ডের দৌড়, তাকে ভালোবাসা। শ্রোয়েডিঙ্গারের সেই তরঙ্গ-সমীকরণ মানব-মেধার এক পরম বিস্ময় হয়ে থাকবে, তার সামনে ফিজিক্সের ছাত্ররা আজও নতজানু। কিন্তু সমীকরণকে ভালোবাসতে গিয়ে গোটা শ্রোয়েডিঙ্গারকে দেবতা বানানোর দায় আমাদের থাকা উচিত নয়। দেবতা বানালেই মুশকিল, দেবতার সমালোচনা চলে না, দেবতার বিচারও চলে না। আর দেবতার আশেপাশে জড়ো হয় সেই মানুষের ভিড়, যারা ‘না’ বলতে জানে না। ভেবে দেখলে, ইটি ইউঙ্গার থেকে ক্লারা ইমারভার, সোফিয়া তলস্তয় থেকে সেই নামহীন তামিল তরুণী – কাদামাটির পায়ের তলায় চাপা পড়েছেন মূলত তাঁরাই, দেবতার সংসারে যাঁদের কণ্ঠস্বর পৌঁছয়নি। মূর্তি ভাঙা বা গড়ার তর্কে আমরা প্রায়ই এই মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই, অথচ গল্পের আসল ট্র্যাজেডি ওঁরাই।

    আর নিজেদের জন্য একটা ছোট্ট পরীক্ষা, কাউকে আদর্শ বানানোর আগে জিজ্ঞেস করা, আমি ওঁর ঠিক কোনটা চাই? প্রতিভাটা, খ্যাতিটা, না গোটা জীবনটা? প্রথমটা চাইলে ওঁর সাধনার রাস্তাটা দেখুন – ভোরের অনুশীলন, হাজার ঘণ্টার একঘেয়ে খাটুনি। ওই অংশ নকল করায় বিপদ নেই, যদিও ওই অংশটা নকল করতেই আমাদের উৎসাহ সবচেয়ে কম। আর গোটা জীবন চাইলে প্যাকেজটা পুরো খুলে দেখবেন; ভিতরে আজতেকার সেই দশ মিনিট যেমন আছে, আস্তাপোভো স্টেশনের সেই হিম রাতটাও আছে!

    ক্লাবঘরের ক্যালেন্ডারটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ওটা দিয়েই শেষ করি। বহু বছর পরে গ্রামে গিয়ে কেউ দ্যাখে ক্লাবঘর নতুন হয়েছে, দেওয়ালে রঙ, ক্যালেন্ডার উধাও - উইয়ে ধরেছিল, ফেলে দেওয়া হয়েছে। শুনে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে, কিন্তু ফেরার পথে মনে হয় ক্যালেন্ডার যায় ক্যালেন্ডারের নিয়মে, উই ধরে কাগজে, কাদায় গড়া পায়ে চিড়ও ধরে তার নিজের নিয়মেই। যা থেকে যায় তা কাগজের মানুষটা নয় - বাঁ পায়ের সেই আলোটুকু, খাতার সেই সমীকরণটুকু, পাতার সেই পংক্তিটুকু। ওঁরা অনেকে ভোগবানই ছিলেন, ভগবান আমরা বানিয়েছিলাম। আলোর দিকে তাকানো এক জিনিস, আগুনে হাত ঢোকানো আরেক - মুগ্ধতা থাকুক, মূর্তি নৈব নৈব চ!
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ৩৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ০৩ আগস্ট ২০২৬ ১৬:২৭742101
  • অসাধারণ। কত অজানারে জানিলাম ! এমনি একটি ছোট সিরিজ লেখার সুপ্ত বাসনা ছিলো ( স্ত্রী সেটির মুলে কুঠারাঘাত করেছেন বড়োমানুষদের টেনে নামানোর কি প্রয়োজন)। আপনার লেখা পড়ে মনে হল প্রদীপের পেছনের অন্ধকারটুকু জানলে জানালে ক্ষতি কি ? ভাবছি ইকনমিকসের গুরুদের ধরা যাক ! যেমন আলফ্রেড মার্শাল মেয়েদের ইউনিভারসিটিতে পড়ার অধিকারের বিরুদ্ধে পথে মার্চ করেছেন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন