১৭ ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৮..কলকাতা
আজ বিশ্বকরমা পূজো
ভোর চারটেয় ঘুম ভেঙ্গে গেছে. জানালের দিকে চেয়ে বসে আছি..কখন ভোরের আলো ফুটবে. হাতে বেশী সময় নেই. স্কুল খোলা..
আটটার মধ্যে বেরোতে হবে..তার আগে চান খাওয়া. যত তারাতাড়ি সম্ভব ছাদে গিয়ে আকাশে ঘুড়িটা ওড়াতে হবে
সারা বছর পয়সা জমাই আজকের দিনটার জন্য.
কাল বিকেলে কিনলাম ১০টা মাঝারি ঘুরি.. ৫টা বড় ঘুরি আর মাঞ্জা সুতর লাটাই..নিজে মাঞ্জা দিলে ভাল হত যেমন আর সবাই দেয়। কিন্তু অত সময় কোথায়।
আমাদের লেক প্লেসের বাড়ির ছাদটা বেশ বড়. সাত আট জন একসাথে ঘুড়ি ওড়াতে পারে. আসলে এটা আমাদের ছাদ বলাটা ঠিক হবেনা. এটা সবার ছাদ..যে কেউ যখন খুসি আস্তে যেতে পারে. আজ কমকরে দশ জন আসবে।
আমাদের পাড়ায়, অনেকটা সমাজবাদ চালু হয়ে গেছিল। সবাই একরকম সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। রোজগারের তারতম্যের কিছুটা কম বেশি ছিল, কিন্তু প্রকাশ ছিল না। আমাদের বাড়িতে প্রথম টেলিফোন আসে, সেটা কজের জন্য, কোন দেখানোর জন্যে নয়। সেই টেলিফোন প্রতিবেশী রা সবাই, দরকার মতন ব্যবহার করত। এক ডক্টর বাবুর গাড়ী ছিল, সেটা আমরা সবাই চড়তে পারতাম। একবার বাত্সরিক পরীক্ষা চলছে, স্কুল বাসের দেখা নেই, ডক্টর বাবু আমাদের দুই ভাইকে পৌছে দিলেন।
এটা ঠিক, সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে, বড়লোকি প্রকাশ অর্থহীন হয়ে পড়ে। রেষারেষি পিছিয়ে পড়ে, মানবিকতা এগিয়ে আসে, জীবন আনন্দময় হয়ে ওঠে। এটা ফাঁকা কথা নয়, এক পরম বাস্তব উপলব্ধি।
যাই হউক, ফিরে যাই, 17 সেপ্টেম্বরের ভোর বেলা।
আমার ছাড়া সবার স্কুল ছুটি, কি যে একটা স্কুলের পাল্লায় পড়েছি।
ভোর সারে পাচটায় ছাদে গিয়ে দেখি আকাশে একটাও ঘুড়ি নেই..না না আছে..আকাশের ঘুমন্ত তারাদের মাঝে একটা নীল ঘুড়ি আকাশের মধ্যে মিশে আছে.একদম স্থির হয়ে..এত দুরে যেন আকাশ ছুয়ে গেছে..
এটা যার ঘুরি তাকে আমরা সবাই চিনি. ইনি বছরের প্রতিদিন ঘুড়ি ওড়ান..এটা ওনার নেশা. আদি লেক পল্লির দুরগা পূজো মন্ডপের পাশের বাড়িটা ওনার. আমাদের বাড়ি থেকে অন্তত তিনশ মিটার..তাহলে বোঝ ওনার লাটাই যে কত সুতো। বড় হলে যখন রোজগার করব আমিও ওনার মতন অনেক সুতো কিন্তে পারব..একদম আকাশ ছোয়া যাবে।
সকাল সারে সাতটা অবধি আকাশে থাকলাম..চারটে কাটলাম আমার তিনটে কাটা গেল..আসলে লাটাই ধরার কেউ নেই..নাহলে আর একটু ভাল ফল হত।
অন্য সময় যেই ছাদে থাকে..তাকেই পাকড়াও করি..কখনো দাদা..কখনো বাবু.(আমার ছোট ভাই) .কখন কোনো বন্ধু..একজন থাকলে ভাল হত।
একবার কাজের মাসী ছাদে শাড়ি মেলতে আসল..তাকেই বল্লাম লাটাই ধরতে..সে মাকে নালিশ করে দিল, কি যে ভুল করলাম কে জানে।
এর মধ্যে অনেকে এসে গেছে..কত রকমের ঘুড়ি..এক রং..দু রং..পেটকাট্টি..মোম্বাতি..লম্বা লেজ ওলা..শুকনো মুখে নীচে নেমে এলাম..স্কুল তো যেতে হবে, না হলে শাস্তি।
শুধু শুধু স্কুলে গেলাম..চোখ ক্লাসের জানালা পেরিয়ে আকাশে..কত ঘুড়ি..কত রকমের লড়াই..কেউ নীচ থেকে টানছে..কেউ ওপর থেকে সুতো ছারছে..
এমনিতেই ক্লাস গুলো যেন জেল খানা। কথা বললে শাস্তি, প্রশ্ন করলে স্যার উদাসিন।
কি করে হয়, তার একটা উত্তর পাওয়া যায়। কেন হয় কোনো উত্তর নেই। নেই, নেই, নেই, খালি মনের মধ্যে পাক খেতে থাকে। তার থেকে জানলার বাইরে নীল আকাশ অনেক ভাল। তার মধ্যে কল্পনার সাদা মেঘ ভাসিয়ে দাও।
বিকেল চারটায় স্কুল থেকে ফিরে এক ছুটে ছাদে..পুরপোরি যেন মেলা বসে গেছে..অন্তত বার জন ঘুরি ওড়াচ্ছে..আশে পাশে ছাদ ভরতি..ভওকাট্টা আওয়াজে আকাশ মুখর.
আকাশ ঘুড়িতে ঢেকে গেছে..কোথাও ঘন্টা বাজিয়ে বিজয় ঘষিত হচ্চে..কোথাও বিষন্ন মুখের সারি..বিষাদময়..হাসি কান্নার খেলা ..আকাশ অবাক হোয়ে দেখছে, সুখ দুঃখের এক অদ্ভুত মিশেল।
হটাৎ করে অন্ধকার নেমে এল..আজকে যেন একটু তাড়াতাড়ি..সব কিছুরি শেষ আছে..আজকের দিনটাও ফুরিয়ে গেল..আমি আর ঘুড়ি টাকে নামালাম না..সুতোটা ছিড়ে দিলাম. আমার কাছে বেশ কয়েকটা আছে..কারো হয়ত একটাও নেই..সে যদি এটা পেয়ে যায়..তাহলে বেশ হয়
ঘুড়িটা আস্তে আস্তে আধো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল.
-------------------------------------------------------
17 সেপ্টেম্বর 2021, সিঙ্গাপুর
এখানে সাতটা নাগাদ আলো ফোটে। কেমন যেন মনে হল, আমি কলকাতা তেই আছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো ঘুড়ি দেখা গেল ন। অনেক খূঁজে দেখলাম।
চা খেয়ে সম্বিত ফিরে এল।
ছোটবেলা হারিয়ে গেছে, আর ফিরবে না।
চিন দেশে তিন হাজার বছর আগে প্রথম ঘুড়ি ওড়ানো হয়।
এখানে চিন দেশী মানুষেরা ঘুড়ি ওড়ায়। সমুদ্রের ধারে, বলির চরে, অথবা খুব উচু বড়ির ছাদে। নানান ধরনের ঘুড়ি ওড়ায়, যেমন বক্স ঘুড়ি, ড্রাগন ঘুড়ি।
আমার এগুলি ভাল লাগেনা। একজন একটা ঘুড়ি নিয়ে দৌড়তে থাকে, যতক্ষণ না ঘুড়ি আকাশে ওড়ানো যায়। মনে হয়, ঘুড়ি মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, মানুষ ঘুড়িকে না।
তাছাড়া, দুটি ঘুড়ির মধ্যে প্যাচ না হলে, আর মজা কোথায়। লাটাই নেই, মানযা সুতো নেই। এরকম ঘুড়ি ওড়ানোর দরকার কি।
স্কুল জীবনের পরে আর ঘুড়ি ওড়ায় নি। এখন আপসোস হয়, কেন স্কুল বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি দিতনা। অনেক অনুরোধ করা হয়েছে, কাজ হয়নি।
স্কুল কর্তারা আমদের মনের ভেতর ঢুকতে পারেনি, আমদের চোখের জল দেখতে তারা অপরাগ ছিল। কড়া শাসন, কখনো শেষ কথা বলে না।
এখনও কি স্কুল খোলা থাকে, জানিনা। প্রাক্তনী রা স্কুলের কর্তৃপক্ষর সঙ্গে বসে এটার একটা রফা করুক, অনুরোধ রইল।
যাই হোক, ফিরে যাই সেই ছোটবেলায়।
কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, লেক প্লেসের, আদি লেক পল্লির দুর্গা পূজার আয়োজন হচ্ছে। প্যান্ডেল শুরু হয়ে গেছে।
পাশের বাড়ির ছাদে, সেই মানুষ একমনে, ধ্যানস্থ। হাতে লাটাই, চোখ ঘুড়ির দিকে, আকাশের দিকে। যুবক থেকে উনি এখন অশীতিপর বৃদ্ধ, তার সারাদিন গল্প আকাশের সঙ্গে। রাতে তারাদের সঙ্গে। তারাদের স্নেহের স্নিগ্ধ আলো, তার ঘুড়ির উপর, অন্ধকারে দৃশ্যমান।
নিচে তাকাতে তার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা করেনা।
দুনিয়াটা কেমন বদলে গেল, ছেলের দল আর ঘুড়ি ওড়ায় না, রাস্তায় ক্রিকেট খেলেনা, রবারের বলে ফুটবল খেলে না।
অজয় বসু রা আর ধারাবিবরণী দেয় না। পি কে নেই, চুনী নেই, বলরাম নেই, সবাই হারিয়ে গেছে।
আগে বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুরে, ছোটরা ঘুড়ি ওড়াত চন মনে স্কুল পড়ুয়াদের বাড়ির ছাদে লাটাই হাতে দেখা যেত।
সেই সময় হারিয়ে গেল
--------------------------
17 ই সেপ্টেম্বর 2026, কলকাতা
আজকে ঘুড়ি ওড়ানোর দিন। কলকাতায় বসে আছি, অথচ, ঘুড়ি ওড়ানোর উপায় নেই।
এই বাড়িটার ছাদে তালা দেওয়া।
আশেপাশে কোন ঘুড়ি দেখা যাচ্ছে না। খুব দূরে পিয়ার লেস হসপিটালের পাশে একটা ঘুড়ি দেখা গেল। সে একদম একা।
আসলে জগতকে, কিছু বুদ্ধিমান লোক বদলে দিয়ে মোটা মুনাফা করছে। আমরা সেই আপাত মোহে পড়ে, সময় ও অর্থ, দুটো ই নষ্ট করে চলেছি।
মুক্ত জগতকে ভালবাসি, প্রতিদিন আরও প্রসারিত করি, আরো বেশি মুক্ত হতে চাই। নীল আকাশের নীচে, বসে, মুক্ত চিন্তা, মুক্ত হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার আনন্দ, উপভোগ করার সুযোগ একটা প্রকৃতির আশীর্বাদ। অথচ, আমরা জাগতিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, ক্ষুধার্ত জীবের মতন খূঁজে চলেছি, এক পঙ্কিলতার জগতে। জানিনা এর শেষ কোথায়।
ঘুরি কি ভাবে আমার জীবনটাকে প্রভাবিত করল। এক এক করে বলতে থাকি।
যখন ছোটো ছিলাম সবচেয়ে উচু ছাদে উঠে পড়তাম, সেখানে জীবন মৃত্যু তফাত মাত্র কয়েক ফুটের। পড়ে গেলে একদম নীচে, মাটিতে, কেউ বাঁচাতে পারবে না। সেই থেকে মৃত্যু ভয় ছুতে পারেনি।
জীবনটাকে একটা লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়ে নিরন্তর ছুটে চলা, চাকরির নিশ্চয়তা কে পাশ কাটিয়ে, দেশে বিদেশে আপন মনে চলেছি, কাজ আছে, রোজগার আছে, কাজ নেই, পকেট খালি, কোন মতে টিকে থাকার লড়াই, কিন্তু মুক্ত জীবনের পরম আস্বাদ। কেউ খবরদারি করার নেই। অনেকটা ঘুড়ির কাটাকাটি, হার জিতের মিশেল। মেঘ, বৃষ্টি আর রোদ সাথে নিয়ে পথ চলা, চরাই উতরাই ভেঙে, কখন বা সমতলের পথে হাঁটতে হাঁটতে চার পাশ চিনে নেওয়া।
ঘুরির সঙ্গে পরিবার, বন্ধু, পরিজন একেবারে মিলে মিশে একাকার। তার স্বাদ আলাদা। প্রচন্ড গরমের মধ্যে, ছাদে দাড়িয়ে আছি, তারপর, আবার সব ঘুড়ি কেটে গেল। নীচে মা কে গিয়ে ধরলাম, পয়সা দাও, ঘুরি কিনতে হবে। মা কিছুক্ষণ বকুনি দিল, তারপর আচল থেকে একটা সিকি বার করে দিল, তার সঙ্গে মুখটা আচল দিয়ে মুছে দিল, আমি লাফাতে লাফাতে রাস্তায়। সেই আচলের স্পর্শ গন্ধ, এখন মনে হয়, এই সেদিনের কথা। এগিয়ে চলার পাথেয়।
এইভাবেই চলব, সবার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে, মাথা উঁচু করে, মানুষের সঙ্গে, মানুষের মতন
কোন বিভাজন মানব না।
আজাদি জিন্দাবাদ, মুক্ত চিন্তা জিন্দাবাদ।
(অতনু রায়)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।