কী করা যায়, কে করবে, আর শুরু কবে
প্রথম পর্বের বক্তব্য ছিল, বাংলা আখ্যানের দুটি ভুল করেছিল। নিজের বিপর্যয়ের দায় পাঠিয়েছিল সবচেয়ে কাছের দৃশ্যমান লক্ষ্যের দিকে, দূরের আসল লক্ষ্যের দিকে নয়; আর নিজের নায়কতালিকা এত সংকুচিত করেছিল যে যে সমাজ প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা, বিজ্ঞানী, শিল্পোদ্যোগী আর প্রশাসক তৈরি করেছে, সে মনে রাখল গুটিকয় নাম আর একজন মহীরুহ কবিকে। দ্বিতীয় পর্বে দেখেছি চার দশক ধরে সেই দুই ব্যর্থতার দাম কী দাঁড়াল, আর তার পাশে চলেছে আরেকটি ধারা, যা বাংলার নিজের করা নয়: নিষ্কাশন, দেশভাগ, বাঙালি ব্যাঙ্কের পতন, ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন, লাইসেন্স ব্যবস্থা, আর পঁচিশ বছর ধরে উদ্বাস্তু ধারণ।
এবার সবচেয়ে কঠিন অংশ। রোগনির্ণয় আরামের কাজ। যে কেউ লিখতে পারে, আর লেখার পর কাউকে কিছু করতে হয় না। দাওয়াই আলাদা জিনিস, কারণ তাকে পরীক্ষা করা যায়, আর গুরুত্বসহ পড়া পাঠকের প্রথম প্রশ্নই হয়: করবে কে?
তাই সবার আগে সেই প্রশ্নের উত্তর দিই। এই লেখার প্রায় সবটাই আমাদের উদ্দেশে, আর আমাদের বলতে বোঝাচ্ছি সেইসব সাধারণ মানুষ যাঁদের হাতে কোনও পদ নেই, কোনও বাজেট নেই। রাষ্ট্র গুরুত্বহীন বলে নয়। রাষ্ট্র বিপুলভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এবং কেবল রাষ্ট্রই যা পারে সে কথায় আমি আসছি। কিন্তু যে প্রবন্ধ দুটো পর্ব ধরে ব্যাখ্যা করল রাষ্ট্র কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে আর নাগরিক সমাজ কীভাবে ফাঁকা হয়ে গেছে, সে তারপর রাষ্ট্রের হাতে একটা কাজের তালিকা ধরিয়ে দিয়ে সেটাকে পরিকল্পনা বলতে পারে না। যুক্তিটা ঠিক হলে মেরামতও শুরু হতে হবে সেখানেই যেখানে ক্ষতি শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ একটা সমাজ কাকে সম্মান করে আর তার মানুষ কারও নির্দেশ ছাড়াই কী গড়ে, সেখানে।
এ কাজ আমরা আগে করেছি
বাংলাকে নতুন কিছু শিখতে বলা হচ্ছে না। যা সে নিজেই আবিষ্কার করেছিল, সেটা মনে করতে বলা হচ্ছে।
১৮৭৬ সালে মহেন্দ্রলাল সরকার প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স, এশিয়ার প্রথম বিশুদ্ধ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। এটা সরকারি প্রকল্প ছিল না। এটা গড়ে উঠেছিল জনসাধারণের চাঁদায়, ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার বিরুদ্ধে এবং একইসঙ্গে নিজের শ্রেণির সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। অর্ধ শতাব্দী পরে ওরই গবেষণাগারে সি ভি রামন যে কাজ করেন, তা নোবেল পুরস্কার পায়।
১৮৯২ সালে প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রায় সাতশো টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন যা পরে বেঙ্গল কেমিক্যালস। কোনও অনুদান নয়। নিজের টাকা, আর এই বিশ্বাস যে ভারতীয়রাও উৎপাদন করতে পারে।
১৯১৪ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স গড়েন দুজন মানুষকে রাজি করিয়ে, তারকনাথ পালিত আর রাসবিহারী ঘোষ, যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির বড় অংশ দান করে দেন। সেই ভবন থেকেই এসেছেন সাহা, বসু আর রামন। এর টাকা দিয়েছিলেন দুজন বাঙালি, কোনও মন্ত্রক নয়।
১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু মূলত নিজের সংস্থান থেকেই গড়েন বসু বিজ্ঞান মন্দির। ১৯১১ সালে বেগম রোকেয়া কলকাতায় মুসলিম মেয়েদের জন্য স্কুল খোলেন গুটিকয় ছাত্রী নিয়ে, কর্তৃপক্ষের কোনও সাহায্য ছাড়াই।
তালিকাটা আবার দেখুন। বাংলা যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে সবচেয়ে গর্বিত, তার প্রতিটি গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, এমন এক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ভিতরে যে সর্বোত্তম ক্ষেত্রেও উদাসীন, প্রায়ই বৈরী। একটিও নীতির অপেক্ষা করেনি। বাংলা যে অভ্যাসটি হারিয়েছে, তা অভিযোগের অভ্যাস নয়। তা হল অনুমতি না নিয়ে গড়ার অভ্যাস, এবং এই প্রবন্ধে এটাই একমাত্র জিনিস যা কারও অনুমোদন ছাড়াই ফিরে পাওয়া যায়।
এক. আমরা কাকে সম্মান করি
প্রথম মেরামতটি সবচেয়ে সস্তা এবং সবচেয়ে ধীর। খরচ শূন্য, সময় এক প্রজন্ম।
সমাজ যা উদযাপন করে, তারই আরও পায়। বাংলা উদযাপন করে শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী আর পরীক্ষার ফল (Generally speaking. There are always exceptions)। সে উদযাপন করে না প্রতিষ্ঠাতাকে, উৎপাদককে, সেই ইঞ্জিনিয়ারকে যিনি কারখানা চালু রেখেছেন, বা সেই মহিলাকে যিনি আটজন ছাত্রী নিয়ে স্কুল শুরু করেছিলেন। যতদিন এটা না বদলায়, প্রতিভাবান তরুণ বাঙালি ঠিকই সিদ্ধান্তে পৌঁছবে যে সম্মানের রাস্তাটা যায় ডিগ্রি, সরকারি চাকরি বা উড়োজাহাজে চড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার ভিতর দিয়ে।
তাই: প্রতিষ্ঠান গড়াকে আবার সাংস্কৃতিক গুণ বানানো দরকার। স্লোগান হিসেবে নয়, অভ্যাস হিসেবে। পরিবারে বসে কেউ যখন কোনও বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করে সে কী হতে চায়, লক্ষ করুন কোন উত্তরে অনুমোদন আসে আর কোন উত্তরে ভদ্র নীরবতা। স্থানীয় কাগজ যখন কারও কথা লেখে, লক্ষ করুন কখনও এমন কারও কথা লেখে কি না যিনি চল্লিশজন মানুষকে কাজ দেন। প্রাক্তনীদের সভা যখন বসে, লক্ষ করুন তারা টাকা তোলে গবেষণাগারের জন্য না ভোজসভার জন্য।
আর তার সঙ্গে, ক্ষোভের মনস্তত্ত্বের জায়গায় কর্তৃত্বের মনস্তত্ত্ব আনা দরকার। এটি বেশি সূক্ষ্ম কথা, কারণ ক্ষোভটা সত্যি, আর এই সিরিজ দুই পর্ব ধরে সেটাই নথিভুক্ত করেছে। কিন্তু ক্ষতের নাম দেওয়া আর ক্ষতের ভিতরে বাস করা এক জিনিস নয়। নাম দেওয়ার জন্যই প্রথম পর্ব ছিল। ভিতরে বাস করা গত চল্লিশ বছর ধরে চলছে।
আমার মাপকাঠিটা সহজ। যে ক্ষোভ একটা পরিকল্পনা তৈরি করে, সেটা ইতিহাস। যে ক্ষোভ কেবল শ্রোতা তৈরি করে, সেটা নাটক।
কে করবে: প্রতিটি অভিভাবক, শিক্ষক, সম্পাদক, আর যিনি কখনও কোনও তরুণকে উপদেশ দিয়েছেন। খরচ: নেই। ফল দেখতে: কুড়ি বছর, আর ঠিক সেই কারণেই শুরু আজ হওয়া দরকার।
দুই. আমরা কী গড়ি
এটাই এই প্রবন্ধের কেন্দ্র, এবং এখানেই সাধারণ মানুষের হাতে সবচেয়ে বেশি কাজ আছে।
বাংলা এখনও অসাধারণ কাঁচামাল তৈরি করে। তার ছাত্ররা এখনও প্রতিযোগিতা জেতে। যা নেই, তা হল এমন একটি পাইপলাইন যা একজন উজ্জ্বল আঠারো বছরের ছেলেমেয়েকে এমন মানুষে পরিণত করে যে এখানে কিছু গড়ে। সেই পাইপলাইন তিনটি নির্দিষ্ট জায়গায় ভাঙা, আর প্রতিটি ভাঙনের একটি ব্যক্তিগত দাওয়াই আছে।
প্রথম ভাঙন: স্কুল মুখস্থ শেখায়, নির্মাণ নয়
বাঙালি শিক্ষাব্যবস্থা এমন মানুষ তৈরিতে খুব ভালো যারা উত্তর পুনরুৎপাদন করতে পারে, আর এমন মানুষ তৈরিতে খুব খারাপ যারা প্রশ্ন সাজাতে পারে। এটা কেবল বাংলার দোষ নয়, কিন্তু বাংলা এর ভার বেশি অনুভব করে, কারণ বাংলার হারানোর বেশি আছে। যে ব্যবস্থা পরীক্ষার জন্য অনুকূলিত, সে ঠিক তা-ই তৈরি করে: চমৎকার পরীক্ষার্থী।
নির্মাণ একটা অভ্যাস, আর অভ্যাস শেখাতে হয় ছোটবেলায়। যে শিশু একবার এমন কিছু বানিয়েছে যা আগে ছিল না, একটা কাজ করা সার্কিট, মেলায় কিছু বিক্রি করা ছোট ব্যবসা, সারানো একটা যন্ত্র, এমন একটা সফটওয়্যার যা অন্য কেউ ব্যবহার করে, সে এমন কিছু শিখেছে যা কোনও পাঠ্যক্রম দেয় না। সে শিখেছে যে পৃথিবীটা সম্পাদনযোগ্য।
গত তিন বছর ধরে আমি এই কাজটাই করার চেষ্টা করছি। আমার বিশ্বাস, বাংলায় একজন সাধারণ নাগরিকের হাতে সবচেয়ে বেশি লিভারেজ যেখানে, তা হল বারো থেকে আঠারো বছর বয়সের মধ্যে কী ঘটে সেটা বদলানো, কারণ তার পরের সবকিছু ওখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়।
দ্বিতীয় ভাঙন: বিশ্ববিদ্যালয় আর শিল্পের মধ্যে কোনও যাতায়াত নেই
কার্যকর ব্যবস্থায় একটি গবেষণাদলের কাছে সমস্যা নিয়ে আসে কোনও সংস্থা, আর সংস্থার দরজায় এসে দাঁড়ায় এমন স্নাতক যে ইতিমধ্যেই একটা বাস্তব সমস্যা দেখেছে। বাংলায় দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত প্রায় নেই। শিক্ষকের পুরস্কার প্রবন্ধে, সহযোগিতায় নয়। সংস্থা রাজ্যের বাইরে থেকে লোক নেয়, ধরে নিয়ে যে স্থানীয় স্নাতক কারখানার ভিতরটা কখনও দেখেনি।
এই ফাঁক ভরাতে আইন লাগে না। মানুষ লাগে। কুড়ি বছরের শিল্প-অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ার সেমেস্টারে একটা করে ঐচ্ছিক বিষয় পড়াতে পারেন। একটা সংস্থা বছরে ছয়জন ইন্টার্ন নিতে পারে। একজন বিভাগীয় প্রধান ফোন তুলে কোনো সংস্থার সাথে কথা বলতে শুধু একটু উদ্যোগ লাগে। এর কোনওটির জন্য বাজেট লাগে না, আর এগুলোই সেই যাতায়াত, যা দিয়ে পাইপলাইন তৈরি হয়।
তৃতীয় ভাঙন: যা বেরোয় তার জন্য স্থানীয় পুঁজি নেই
ভালো ভাবনা বেরোলেও তাকে বড় করার টাকা থাকে অন্যত্র। দ্বিতীয় পর্বে দেখেছি ১৯৪৭ থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝির মধ্যে বাঙালি ব্যাঙ্কজাল কীভাবে ভেঙে পড়ে, আর স্থানীয় শিকড় ও স্থানীয় বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন কিছু দিয়ে তার জায়গা কোনওদিন পূরণ হয়নি। আজ কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠাতা টাকা তোলেন বেঙ্গালুরু থেকে, আর টাকা সরলে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতাও সরে যান।
তাই: উদ্যোগ আর পুঁজিগঠনের প্রতি সম্মান ফেরানো দরকার। কথাটা যতক্ষণ না ব্যক্তিগত করা হয়, ততক্ষণ বিমূর্ত শোনায়। এর মানে, ভালো করেছেন এমন একজন বাঙালি একজন তরুণ বাঙালির উদ্যোগে টাকা রাখাকে স্বাভাবিক ও সম্মানজনক কাজ বলে মনে করবেন, দান বা রুচিহীনতা বলে নয়।
এখানে প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে একটা অস্বস্তিকর কথা বলি। বাংলার বাইরে বহু সচ্ছল বাঙালি আছেন। তাঁদের টাকা দেশে ফেরে দুই পথে: পরিবারের কাছে, যা ভালোবাসা এবং যার সাফাই লাগে না; আর নস্টালজিয়ায়, অর্থাৎ পুজো, পুনর্মিলন, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আর স্মারক বক্তৃতায়। প্রতিষ্ঠানে বা কোনো স্টার্ট আপ এ যায় প্রায় তার কিছুই না। বাংলার বড় কলেজগুলোর তহবিল তাদের নিজেদের প্রাক্তনীরা যা অনায়াসে দিতে পারতেন তার তুলনায় নগণ্য।
তারকনাথ পালিত আর রাসবিহারী ঘোষ ১৯১৪ সালে একটি বিজ্ঞান কলেজ গড়তে নিজেদের সম্পত্তির বড় অংশ দিয়ে দিয়েছিলেন। আজ তাঁদের সমতুল্য মানুষ, এবং তাঁরা অনেকেই আছেন, একটি পুরস্কারের টাকা দেন, একটি ভোজসভায় যান, আর বাড়ি ফেরেন। ঠিক এই অভ্যাসটাই বদলাতে হবে, আর সেটা একটা করে সিদ্ধান্তে বদলানো যায়।
কে করবে: শিক্ষক, কর্মরত পেশাজীবী, প্রাক্তনী সংগঠন, আর সঞ্চয় ও বিবেক আছে এমন প্রতিটি বাঙালি। ফল দেখতে: পাঁচ থেকে পনেরো বছর, এবং তা যৌগিক হারে বাড়ে।
তিন. আমরা কোথায় গড়ি
তৃতীয় অংশটি স্থান নিয়ে, আর এখানেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ সবচেয়ে তাড়াতাড়ি নিজের সীমায় পৌঁছয়।
হাওড়া আর হুগলির শিল্পাঞ্চলকে আবার শিল্পে ফেরানো স্পষ্ট লক্ষ্য, এবং কঠিনতমও। ওই অঞ্চলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জমি আছে, জল আছে, রেল আছে, বন্দর আছে, শ্রমের ঐতিহ্য আছে, আর যেকোনও কিছু চালানোর মতো ঘন জনসংখ্যা আছে। যা নেই, তা হল উৎপাদনের জন্য যে নির্ভরযোগ্য ইনফ্রাস্ট্রাকচার : বিদ্যুৎ যা যায় না, রাস্তা যাতে লরি চলে, আর সবচেয়ে বড় কথা, এই আস্থা যে চলন্ত একটা কারখানা অন্য কারও রাজনৈতিক সম্পদ হয়ে যাবে না।
নির্ভরযোগ্যতা সাধারণ মানুষ জোগাতে পারে না। কিন্তু প্রথম ভাড়াটে তারা হতে পারে। পৃথিবীর যেকোনও জায়গায় শিল্পের পুনরুজ্জীবন শুরু হয়েছে গুটিকয় মানুষ দিয়ে, যাঁরা এমন জায়গায় গড়তে গেছেন যেখানে গড়া তখনও স্পষ্টভাবে যুক্তিসঙ্গত ছিল না। কাউকে না কাউকে প্রথম বোকাটা হতে হয়, আর প্রতিটি সফল ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেই বোকা আসলে ভুল ছিল না, আগে এসেছিল।
এমন শহর গড়া যা প্রতিভাকে টানে, তাড়ায় না, একই সমস্যার অন্য প্রান্ত। তরুণরা বাংলা ছাড়ে কেবল মাইনের জন্য নয়। তারা ছাড়ে সাধারণ জিনিসের জন্য: এমন একটা জায়গা যেখানে কাজ হয়, যেখানে যোগ্যতা কোনও চেনাশোনার ভিতর দিয়ে যায় না, যেখানে একজন মেয়ে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরতে পারে। এর কিছুটা রাষ্ট্রের কাজ। কিছুটা পাড়ার কাজ, আর পাড়ার কাজ পুরোপুরি আমাদের হাতে।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ফেরানো তিনটির মধ্যে গভীরতম এবং সবচেয়ে কম চটকদার। বাংলায় যে প্রতিষ্ঠানই স্বাধীনতা হারিয়েছে, একইভাবে হারিয়েছে: ছোট ছোট ধাপে, প্রতিটি ধাপ তখন যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে, আর প্রতিটি ধাপ মেনে নিয়েছেন এমন মানুষ যাঁরা না বলতে পারতেন। স্বাধীনতা আইন দিয়ে ফেরে না। ফেরে এমন একটি পেশাদার সংগঠন দিয়ে যে নিজের মান নিজে বলবৎ করে, এমন একটি পরিচালন পর্ষদ দিয়ে যে না বলে, এমন একটি নির্বাচনী কমিটি দিয়ে যে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ করে যখন না করাটাই সহজ ছিল। এ হল একশোটি ছোট সাহসের কাজ, এমন মানুষদের হাতে যাঁদের নাম কেউ কোনওদিন জানবে না।
কে করবে: ফিরে আসা পেশাজীবী, প্রথম পা রাখা সংস্থা, আবাসিক সমিতি, পেশাদার সংগঠন। খরচ: শূন্য থেকে সর্বস্ব। ফল দেখতে: দশ থেকে তিরিশ বছর।
কেবল রাষ্ট্রই যা পারে
নাগরিক যা পারে না, সেটা স্পষ্ট না বলে শেষ করা অসৎ হবে, কারণ যে দাওয়াই এ নিয়ে ভান করে সে গুরুত্বসহ নেওয়ার যোগ্য নয়।
নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, রাস্তা, নিরাপত্তা আর নাগরিক পরিষেবা রাষ্ট্রের কাজ। এমন জমি অধিগ্রহণ যা চুরিও নয় অচলাবস্থাও নয়, রাষ্ট্রের কাজ, আর বাংলার শেষ দুটি চেষ্টা দুই দিকেই ভুল করার পাঠ্যপুস্তক। আইনশৃঙ্খলা, এবং তার সম্পর্কে ধারণা, রাষ্ট্রের কাজ। এমন বিচারব্যবস্থা যা বাণিজ্যিক বিরোধ দশকের বদলে বছরে বা মাসে মেটায়, রাষ্ট্রের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় আর হাসপাতালের নিয়োগ থেকে দলীয় যন্ত্রকে দূরে রাখা রাষ্ট্রের কাজ, আর শূন্য রাজকোষ ব্যয়ে বাংলার যেকোনও সরকার সবচেয়ে বেশি মূল্য যোগ করতে পারে ঠিক এই একটি কাজেই।
এর কোনওটাই আমাদের হাতে নয়। তবে দুটো কথা মনে রাখার মতো। এক, সরকার সাড়া দেয় সমাজ যা দৃশ্যমানভাবে চায় তাতে, আর যে সমাজ নির্মাতাদের দৃশ্যমানভাবে উদযাপন করে সে সময়ের সঙ্গে অন্যরকম সরকার পায়। দুই, এবং আরও তাৎক্ষণিকভাবে, উপরে বর্ণিত ব্যক্তিগত কাজের জন্য এসবের কোনওটিরই অপেক্ষা করার দরকার নেই। মহেন্দ্রলাল সরকারের হাতেও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ছিল না।
একজন মানুষ এই বছরেই যা করতে পারেন
উপরের সবটাই অকেজো যদি তা নীতির স্তরে থেকে যায়। এর যেকোনও একটি এই প্রবন্ধের বেশিরভাগ পাঠকের হাতের নাগালে, এই বছরেই, কারও অনুমতি ছাড়াই।
একদল তরুণকে একটি জিনিস শেখান। কাছের কোনও স্কুলে মাসে একটি ক্লাস, আপনি সত্যিই যা জানেন তার উপর।
একজন ইন্টার্ন নিন, নিজের কর্ম সংস্থা তে সুযোগ থাকলে। একটি সত্যিকারের সমস্যা তাকে সমাধান করতে দিন।
নিজের কলেজের প্রাক্তনী সংগঠনকে জিজ্ঞেস করুন তাদের তহবিল কত, আর সেটা কীসের জন্য। তারপর জিজ্ঞেস করুন উত্তরটা এমন কেন।
নামগুলো বলুন। কোনও তরুণের সঙ্গে বাংলার কৃতিত্ব নিয়ে কথা বলার সময় সবাই যাঁদের নাম করে তাঁদের পাশে মহেন্দ্রলাল সরকার, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জী, পি সি মহলানবীশ স্যার বীরেন মুখার্জী, Dr মেঘনাদ সাহা, বেগম রোকেয়াকেও দের ও রাখুন। নায়কতালিকা এমনিতেই জনস্মৃতি তে সংকুচিত। তাকে চওড়া করতে সাধারণ কথাবার্তায় সচেতন চেষ্টা লাগে।এর একটিও কোনও পরিসংখ্যানে উঠবে না। অথচ পাইপলাইন আসলে এগুলো দিয়েই তৈরি।
আমি নিজে এগুলোই করার চেষ্টা করছি। নিজের জায়গা থেকে, ছোট মাপে। আপনি যদি এর একটাও করেন, আমরা দুজন হলাম।
শেষ হিসেব
এই সিরিজ শুরু হয়েছিল নিজেকে সভ্যতার নিজের কাছে জবাবদিহি বলে, আর জবাবদিহির মানে হল হিসেবটা শেষ পর্যন্ত মেটাতে হয়, শুধু বলে গেলে হয় না।
তিন পর্ব জুড়ে একটি ছবি আমার সঙ্গে থেকে গেছে। ঠাকুরবাড়ি, যেখানে দ্বারকানাথ গড়েছেন ব্যবসা, তাঁর পুত্র হয়েছেন দার্শনিক, তাঁর পৌত্র হয়েছেন কবি, আর বাংলা মনে রেখেছে কবিকে, আর যে বণিক পরিবারের ভাগ্য গড়েছিলেন তাঁকে প্রায় ভুলে গেছে।
কোনও ছবিই শিল্পকলার বিরুদ্ধে যুক্তি নয়। রবীন্দ্রনাথ সমস্যা নন, আর যে সমাজ তাঁকে তৈরি করেছে তার ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। সমস্যা হল এমন একটি নায়কতালিকা যাতে কেবল একরকম মহত্ত্বের জায়গা আছে।
বাংলার দরকার কবিকে সম্মান করা বন্ধ করা নয়। দরকার নির্মাতাকে আবার সম্মান করতে শুরু করা, আর সম্মান করার পর, নিজে সেই নির্মাতা হয়ে ওঠা।
রাষ্ট্র আসছে না। রাষ্ট্র কোনওদিন উৎসও ছিল না। এই সিরিজ যেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য শোক করেছে, সেগুলো গড়েছিলেন সাধারণ মানুষ, যাঁরা অপেক্ষা করেননি, আমাদের চেয়ে অনেক খারাপ পরিস্থিতিতে।দাওয়াই এইটুকুই। বাকি সব খুঁটিনাটি।
এটি তিন পর্বের প্রবন্ধের শেষ পর্ব। প্রথম পর্বে ছিল যে ক্ষতের নাম কেউ দেয়নি, দ্বিতীয় পর্বে দীর্ঘ ক্ষয়, আর এই পর্বে প্রশ্ন ছিল কী করা যায়। লেখক লেখেন শিক্ষা, জ্বালানি, ভূরাজনীতি আর ঝুঁকি নিয়ে, এবং স্কুলপড়ুয়াদের জন্য শিক্ষণব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন।
সূত্র প্রসঙ্গে
এই পর্ব ইতিহাস নয়, যুক্তি। তাই তালিকা ছোট, আর মূলত বাংলার নিজের প্রতিষ্ঠান-নির্মাতাদের নিয়ে যে দাবিগুলো করা হয়েছে তার পিছনের নথির দিকে ইঙ্গিত করে।
Subrata Dasgupta, Jagadis Chandra Bose and the Indian Response to Western Science (Oxford, 1999).
Pratik Chakrabarti, Western Science in Modern India (Permanent Black, 2004).
ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (১৮৭৬), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স (১৯১৪) ও বসু বিজ্ঞান মন্দিরের (১৯১৭) প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস।
প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রসঙ্গে তাঁর নিজের Life and Experiences of a Bengali Chemist.
বেগম রোকেয়া ও সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রসঙ্গে প্রামাণ্য জীবনী এবং তাঁর নিজের রচনা।
Amiya Kumar Bagchi, Private Investment in India 1900-1939 (Cambridge, 1972).
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।