এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নব্বইয়ের পুজো

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪১ বার পঠিত
  • এটা ৯০ এর দশকের ঘটনা। কী অবস্থা ছিল সে সময় জেনজিরা ভাবতেও পারবেনা। সেবার পুজো হল বাবরি মসজিদের থিমে। এক মাস ধরে প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে, আর পাড়া থেকে বেরোলেই ডানদিক মসজিদ, বাঁ দিকে মসজিদ। সেখানে আবার রোজ সকালে আজান বাজানো হত। শুধু একটাই হয়েছিল একটু অন্যরকম। সেটা চার্চের মতো দেখতে। উড়িষ্যার কোন এক মিশনারীর স্মৃতিতে। মিশনারীরা কী ধরণের নারী ঠিক জানিনা, তবে দেখতাম, মা দুগ্গার নামগন্ধ নেই, একমাস ধরে গাউন পরা মেয়েরা সেখানে এসে মাতা মেরির গান গান গেয়ে যাচ্ছে। কায়দা করে এই পুরো ব্যাপারটার আবার নাম দেওয়া হয়েছিল শারদোৎসব। ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে এইজন্য 'শারদোৎসব' নামে বই লেখানো হল, ছেলেমেয়েরা 'মেঘের কোলে রোদ উঠেছে' বলে তাতে গেয়ে গেয়ে ধেই ধেই করে নাচল, সব পুজো সংখ্যার নাম হয়ে গেল শারদীয়া, নইলেই জেল-জরিমানা। যাতে কেউ বুঝতেও না পারে, এর সঙ্গে মা দুগ্গার কোনো সম্পর্ক আছে।

    পুজোর দিনগুলোতে তো আরও মারাত্মক ব্যাপার। সপ্তমীর দিন অঞ্জলি দেব বলে বেরোচ্ছি, মোড়ের মাথায় দেখি, মৌলবী বখতিয়ার খলজি। আমাকে দেখেই বললেন, আলহামদুলিল্লা, এতক্ষণে ফজরের প্রার্থনার সময় হল? লোকটা খতরনাক। এই নাকি আমাদের এলাকার নবনালন্দা ইশকুলে হামলা করেছিল। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ। তিনি চোখ রাঙিয়ে বললেন, কিন্তু টুপি কই? বলে একটা ফেজ টুপি বাড়িয়ে দিলেন। কী আর করি, আমি সেটা মাথায় গলিয়ে কোনোক্রমে মন্ডপের দিকে চললাম।

    কিন্তু তাতেও ঝামেলা মিটলনা। দু-পা এগোতেই দেখি গালকাটা পোপ-দা। ওপাড়ার বিখ্যাত গুন্ডা। দেখেই বলল, কোথায় যাচ্ছিস? আমি বললাম, এই তো, মন্ডপে। পোপদা বলল, মসজিদে না চার্চে? আমি বললাম, আমাদের পাড়ায় তো মসজিদ। পোপদা খুব রেগে বলল, কেন চার্চে যেতে কী হয়? কতই বা দূরে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ ওখানেও যাব। পোপদা বলল, তুই তো আবার গান গাস। মাতা মেরির ভজন গাইবি তো একটা। মেরির পায়ে জবা হয়ে ওঠনা ফুটে মন। কোনো রকমে হ্যাঁ হ্যাঁ বলে মন্ডপের দিকে এগোলাম।

    রাস্তায় আর কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু মন্ডপের সামনে গিয়ে দেখি আবার দুই মক্কেল। মাকুবাবু আর নকুবাবু। একদম আস্তিন ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই নকুবাবু বললেন, কীরে মসজিদে এলি? আমি বললাম হ্যাঁ। মাকুবাবু বললেন, তাহলে একটু প্রসাদ খেয়ে যা। বলে একটা বাটি বাড়িয়ে দিলেন। আমি ভাবছি পুজোর আগেই কীসের প্রসাদ। তাকিয়ে দেখি মাংস। মাকুবাবু চোখ মেরে বললেন, বড় মাংস রে। একটু মুখে দিয়ে তবে ঢোক। কী আর করি। ওঁদের কথাই তখন আইন। একটু মুখে দিতেই হল। একটু এগিয়ে অবশ্য থুথু করে ফেলে হাতে নিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু মুখে পুরতেই হল।

    এই ভাবে মাথায় টুপি পরে, মুখে মাংস নিয়ে তো মন্ডপে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি এলাহী কান্ড। বিরাট মন্ডপ। তাতে আর কিচ্ছু নেই, শুধু লাল শালু দিয়ে তৈরি একটা গামা স্টল। মাথায় লেখা, শারদোৎসব। স্টলের মধ্যে অনেকগুলো মূর্তি। মাঝখানে একটা চেঙ্গিজ খানের মতো ছুঁচলো দাড়িওয়ালা লোক। ডানহাতে কাস্তে, বাঁ হাতে হাতুড়ি। চাঁদমালার মতো করে গায়ে লাল-পতাকা ঝোলানো। নিচে লেখা, দেবাদিদেব লেনিন। একদিকে দিকে স্কার্ট পরা দেবী লক্ষীমবার্গ, তিনি রোজা রাখেন। অন্যদিকে জনযুদ্ধের দেবী মাও-যে-সং। হাঁ, করে দেখছি, এমন সময় স্টল থেকে ঘোষণা হল, এবার অঞ্জলি হবে। সবাইকে হাতে লাল গোলাপ ধরিয়ে দেওয়া হল। তারপর মাইকে শুরু হল ইন্টারন্যাশানাল। জাগো জাগো সর্বহারা। সবাই বুকে হাত দিল। দেখে টেখে আমিও। গান শেষ হবার পর গোলাপ ছুঁড়ে দিয়ে এক এক করে হাত মুঠো করে বলতে হল, শহীদ স্মরণে আপন মরণে রক্তে ঋণ শোধ করো। বাকি সবাই গলা মিলিয়ে বলল শোধ করো, শোধ করো। মাইকে ঘোষণা হল, অঞ্জলি শেষ। বেরোনোর সময় দেখি বাটি হাতে দাঁড়িয়ে মাকু আর নকুদা। আমাকে দেখেই বললেন, আর একটু প্রসাদ খাবি?

    তো, এই ছিল নব্বইয়ের দশকের পুজো। এখন যে জেনজিরা মুক্ত দুনিয়ায় নিশ্বাস নিচ্ছে, তারা ভাবতে পারবেনা, আমরা প্রতিমা চিনতাম না। কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতী দেখিনি কখনও। মন্ডপ বলতে শুধু জানতাম মসজিদ আর চার্চ। সেখানে সবাইকে নিয়ম করে মার্কস আর লেনিন পড়তে হত। এই চলেছিল অনেক দশক ধরে। মানুষ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস অবধি নিতে পারতনা। ১১ সালে যখন এক দফা পরিবর্তন হল, তখন সবাই ভেবেছিল অন্যরকম কিছু হবে। কিচ্ছু হয়নি, কেবল মৌলবী বখতিয়ারের জায়গায় এসেছিলেন মমতাজ বেগম। জনযুদ্ধের দেবীর নাম বদলে হয়েছিল মা-মাটি-মানুষ। আর শারদা নামের বানান বদলে কয়েক জায়গায় সারদা করে দেওয়া হয়েছিল, ব্যস। আনন্দের কথা, সেই দুঃসময় গেছে। এখন শুদ্ধ সনাতনী সময় ফিরে এসেছে। এখন বাংলায় প্রথমবার দুর্গাপুজো হবে। কোনো আমিষের উপদ্রব থাকবেনা পুজো জুড়ে। সারা পুজো ধরে সবাই লাউয়ের তরকারি দিয়ে রুটি খাবে। বিকেলে খাবে ধোকলা, আর সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে গুটখা। পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি আমিষ ঢাক মন্ডপে ঢুকবেনা। পরভিন নামের কোনো এক সুলতানার গলায় 'ভবানী দয়ানি' শুনতে হবেনা। তার জায়গায় হমুমান বন্দনা আর জয় জগদীশ হরে শোনা যাবে। এই দিনের অপেক্ষাতেই তো বাঙালি ছিল এতদিন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীপ | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৫০742601
  • যতো বেশি ছ্যাবলামো মারবেন, বিজেপি ততো শক্তিশালী হবে।
    অবশ্য সেটা বোঝার ক্ষমতাও আপনার নেই!
    নয়তো তাদের হয়েই কাজ করছেন!
  • ধোরবস | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:০৩742603
  • এতদিন চটি চটি করে এখন এসচে ছ্যাবলামো চোদাতে।আরে চাড্ডির পো স্যাটায়ার তোদের মগজে ঢুকবে এমন আশাও কোন সুস্থ মানু ষ করে না। তাই বলে সব জাগায় হেগে ছ্যাড়াবি?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন