২০২৬ সালের জানুয়ারির এক সকাল। চট্টগ্রামের মিরসরাই, হাদি ফকিরহাট বাজারের ঠিক উত্তর দিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গা ঘেঁষে একটা টিনশেড ঘর। মাসখানেক আগে ঘরটা উঠেছিল, তারপর ভাড়াও হয়ে গিয়েছিল - বাইরে থেকে দেখলে নেহাতই মামুলি একটা ঘর, তাই এর ভেতরে যে কী চলছে তা পাড়ার লোকে টেরও পায়নি। সেদিন সকালে হঠাৎ ঘরের চারপাশ দিয়ে গলগল করে তেল বেরিয়ে সড়কে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল তখনই ফাঁস হল আসল কেসটা! ঘরের মেঝে প্রায় দশ ফুট খোঁড়া, কারণ ঠিক সেই বরাবরই মাটির অনেকটা তলা দিয়ে চলে গেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) -র তেল পরিবহনের পাইপলাইন। ঘরের আড়ালে দিনের পর দিন সন্তর্পণে ড্রিল চালিয়ে সেই ইস্পাতের পাইপ ফুটো করে হাজার হাজার লিটার তেল সরিয়ে ফেলছিল একটা মাফিয়া চক্র।
খবরটা পড়ে আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল, আরে, এখানেও এই জিনিস হয় নাকি! এ তো হুবহু নাইজেরিয়া কিংবা মেক্সিকোর চিত্রনাট্য! মাটির নিচের তেলের পাইপলাইনে চুপিচুপি ছিদ্র করে চুরি, এই একই গল্প পৃথিবীর নানা কোণে, নানা ভাষায়, নানা মাপে ঘটে চলেছে বছরের পর বছর। কেবল কুশীলবরা আলাদা, স্কেলটা আলাদা। ইনফ্যাক্ট আমি তেল কোম্পানীতে কাজ শুরু করার পর ল্যাবে প্রথম যে ফেলিওর অ্যানালিসিস করেছিলাম তা এই পাইপলাইনে পাওয়া ছিদ্র-র উপরেই, যা কিনা কৃত্রিম ভাবে বানানো হয়েছিল তেল চুরির জন্য! তো কিভাবে সেই ছিদ্র তৈরী হয়েছিল তা বের করতে প্রথমবার বেশ মাথা ঘামাতে হয়েছিল, কারণ তার আগে আমি এমন কিছু নিয়ে কাজ করি নি। সে এক রোমাঞ্চকর গল্প, পরে সেই নিয়ে বলা যাবেক্ষণ।
তেল-গ্যাস ইন্ডাষ্ট্রিতে কাজ করতে ঢুকে ইস্তক এই একটা ব্যাপার আমাকে বরাবর ভাবিয়েছে। ভাবুন একবার – একটা অয়েল ওয়েল (মানে তেলের কূপ) থেকে যেখানে তেল ওঠে, আর যেখানে সেটা পরিশোধিত হয়ে আমাদের গাড়ির ট্যাঙ্কি কিংবা রান্নার চুলা পর্যন্ত পৌঁছায়, এই দুইয়ের মাঝখানে প্রায়ই থাকে হাজার হাজার কিলোমিটার লম্বা পাইপলাইন। শেল, এক্সনমোবিল, বিপি, শেভরন, টোটাল - নামজাদা আন্তর্জাতিক কোম্পানি হোক বা এক-একটা দেশের নিজস্ব রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি, সবার হাতেই এমন বিস্তীর্ণ পাইপের জাল। এই ধরুণ ভারতেই আমাদের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস অর্গানাইজেশন (ONGC) প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটারের বেশী পাইপলাইন অপারেট করে। তাছাড়া আছে GAIL এর প্রায় ১৭ হাজার, Indian Oil প্রায় ২০ হাজার, HPCL প্রায় ৫ হাজার, Oil India প্রায় ১২০০ কিলোমিটার পাইপলাইন। এই পাইপ কখনও মরুভূমির বুক চিরে, কখনও জঙ্গলের তলা দিয়ে, কখনও নদী-খাঁড়ির নিচ দিয়ে চলে যায় নিঃশব্দে। আর ঠিক এইখানেই তেল চুরির গল্পের শুরু। হাজার হাজার কিলোমিটার পাইপ আপনি কী করে পাহারা দেবেন!
তাই তেল চুরির সবচেয়ে বড় আসরটা বসে এই পাইপলাইনকে ঘিরেই। ব্যাপারটা শুনতে যতটা মামুলি মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। এ নিছক দু-এক টিন তেল হাতিয়ে নেওয়া নয় - এ এক আস্ত অন্ধকার বিশ্ববাজার, যার বার্ষিক মাপ শুনলে চোখ কপালে উঠবে। সেই বাজারে জড়িয়ে আছে জঙ্গি গোষ্ঠী, মাদক-চক্র, দুর্নীতিবাজ আমলা, দরিদ্র গ্রামবাসী, আর দুঃখজনক হলেও সত্যি, বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ। তো চলুন, মাটির তলার এই চোরাস্রোত নিয়ে একটু নাড়াঘাঁটা করা যাক।
একশো তেত্রিশ বিলিয়ন ডলারের অন্ধকার বাজার
প্রথমে মাপজোকটা বুঝে নেওয়া দরকার, নাহলে গল্পের গুরুত্বটা ধরা পড়বে না। পৃথিবীতে আজও শক্তির প্রধান উৎস তেল। বছরে যত তেল উৎপাদন হয়, তার বাজারদর দাঁড়ায় ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে - দুনিয়ার তাবৎ দামি ধাতুর বাজার একসঙ্গে জুড়লেও তেলের বাজার তার চেয়ে বড়। এত বড়, এত দামি, আর এত লোভনীয় একটা জিনিসের কালোবাজার থাকবে না, তা কি হয়?
বিশ্বজুড়ে বছরে যত অপরিশোধিত তেল তোলা হয়, তার বাজারমূল্য মোটামুটি ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার - অর্থাৎ সতেরোশো বিলিয়ন, মানে প্রায় ১৬২ লক্ষ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল তেলের সিংহভাগ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় মূলত তিন পথে - জাহাজে (ট্যাঙ্কারে), রেল আর সড়কে, আর সবচেয়ে বেশি পাইপলাইনে। গোটা দুনিয়ার তেল-গ্যাসের পাইপলাইন জুড়লে তার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় পৃথিবীকে বহুবার পাক খাওয়ানোর মতো, লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার। এর বেশির ভাগই মাটির নিচে, জনমানবহীন এলাকায়, চোখের আড়ালে। এই আড়ালই চোরের সবচেয়ে বড় বন্ধু। একটা ব্যাংকের ভল্ট পাহারা দেওয়া সহজ, কারণ সেটা এক জায়গায় স্থির; কিন্তু হাজার কিলোমিটার লম্বা একটা ভল্ট, যার গা ঘেঁষে যেকোনো জায়গা থেকে সিঁদ কাটা যায়, সেটা পাহারা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
মজার কথা কী জানেন? তেল চুরি এমন একটা রোগ, যা এই ইন্ডাষ্ট্রির সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে। গবেষকরা বলছেন, এই চুরি এতটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে যে বহু ব্যবসায়ী আগেভাগেই দামের মধ্যে চুরির খরচ ধরে রাখেন, আর বহু শিপিং কোম্পানি একে ‘সামান্য হাতসাফাই’ বলে মেনেই নেয়। লন্ডনের নামজাদা নিরীক্ষা ও পরামর্শদাতা সংস্থা আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং (ইওয়াই) আরও একটা চমকপ্রদ কথা বলেছে যে তেল-গ্যাস খাতের সব জালিয়াতির প্রায় সাতান্ন শতাংশই কোনো-না-কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ, শুধু বাইরের চোর নয়, ভেতরের পচনও কম নয়!
আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং -এর হিসেব বলছে, প্রতি বছর প্রায় একশো তেত্রিশ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল আর পরিশোধিত জ্বালানি হয় চুরি যায়, নয় ভেজাল মিশিয়ে বেচে দেওয়া হয়.। সংখ্যাটা একবার মনে গেঁথে নিন - একশো তেত্রিশ বিলিয়ন ডলার, মানে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় এক লক্ষ সাতাশ হাজার কোটি টাকা! জাতিসংঘের গবেষণা-সংস্থা ইউএনইউ-ওয়াইডারের দুটি বিশদ গবেষণাপত্র আরও চাঁছাছোলা ভাষায় বলছে যে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি যে প্রাকৃতিক সম্পদটি চুরি যায়, তার নাম তেল; আর সবচেয়ে বেশি যা পাচার হয়, তার নাম জ্বালানি। এই চুরির পরিমাণ গোটা বিশ্বের তেল ও জ্বালানি-বাজারের প্রায় পাঁচ থেকে সাত শতাংশ। মানে, আপনি-আমি যতটা তেল পুড়িয়ে গাড়ি চালাই, তার প্রতি কুড়ি লিটারের মধ্যে অন্তত এক লিটারের হদিস কোথাও-না-কোথাও গুলিয়ে যায় চোরাপথে।
আর এই টাকাটা যে কেবল কোম্পানির খাতায় লালকালির দাগ, তা নয়। ইওয়াই সাফ জানিয়েছে, এই চুরি-যাওয়া টাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক কিছু গোষ্ঠীর তহবিলে গিয়ে ঢোকে - ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মতো জঙ্গি সংগঠন, মেক্সিকোর মাদক-চক্র, ইতালির মাফিয়া, পূর্ব ইউরোপের অপরাধী দল, লিবিয়ার সশস্ত্র মিলিশিয়া, নাইজেরিয়ার বিদ্রোহী—তালিকাটা লম্বা এবং গা-ছমছমে। এক সময় তো খোদ আইএস মাসে পাঁচ কোটি ডলার কামাত কেবল তেল বেচে। অর্থাৎ পাইপে ফুটো করে যে তেলটা বেরিয়ে যায়, সেটা নিছক তেল নয়, কখনও কখনও তা বন্দুকের গুলি হয়ে ফিরে আসে!
চুরির কারিগরি: শীতল ছিদ্রকরণ, গরম ছিদ্রকরণ আর ‘ধৈর্যশীল চোর’
এবার আসল কারিগরির কথায় আসি, কারণ এখানেই আসল চমক। পাইপলাইন থেকে তেল সরানোর মূল কায়দা দু-রকম—চলতি ভাষায় যাকে বলে ‘কোল্ড ট্যাপিং’ আর ‘হট ট্যাপিং’, বাংলায় বলা যায় শীতল ছিদ্রকরণ আর গরম ছিদ্রকরণ।
শীতল ছিদ্রকরণের বেলায় আগে পাইপের একটা অংশে তেলের বওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর দু-দিকে প্লাগ বসিয়ে, মাঝের অংশটা কেটে-বদলে সেখানে ছিপি বা কল লাগানো হয়, শেষে ঢালাই করে জোড়া দিয়ে আবার তেল চালু করে দেওয়া হয়। এটা তুলনায় নিরাপদ, কিন্তু সময়সাপেক্ষ আর তেলের বওয়া বন্ধ রাখতে হয় বলে ধরা পড়ার ঝুঁকিও বেশি।
আসল বাহাদুরি ‘গরম ছিদ্রকরণে’। এখানে তেলের বওয়া চালু রেখেই, বইতে থাকা পাইপে সরাসরি একটা কল বসিয়ে দেওয়া হয়, অনেকটা চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়ার মতো। শিল্পে এই কায়দাটা বৈধ কাজেও লাগে, যেমন লাইন বন্ধ না করে রক্ষণাবেক্ষণের সময়; ছিদ্রের মাপ আধ ইঞ্চি থেকে শুরু করে আটচল্লিশ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু চোরের হাতে পড়লে এই কায়দা ভয়ানক কারণ ধাতুতে ধাতু ঘষে একটা স্ফুলিঙ্গ ছুটলেই দাউদাউ আগুন। আর তখন যা ঘটে, কি হয় তার গল্প একটু পরেই বলছি। আমি নিজে বৈধ হট ট্যাপিং এর কাজ করেছি – তবে এখনে কাজ মানে তো আর একা একার কাজ নয় – বিশাল প্রোজেক্ট টিমের সাথে কাজ করা। সে কাজেও গল্পও যেমন ঝুঁকির তেমনি রোমাঞ্চকর, সেই গল্পও না হয় অন্যদিন হবে।

এবার একটু খানি বুঝে নেবেন, আধুনিক চোরেরা আর হাতুড়ে নেই, মানে গায়ে তেল মেখে কেউ অ্যালুমিনিয়ামের থালা বা সন্তোষ রেডিও চুরি করতে আসছে না বাড়িতে! তারা রীতিমতো পেশাদার, দলবদ্ধ, আর অনেক সময় ভেতরের লোক, অর্থাৎ কোম্পানিরই কর্মী হাত মেলায়। এদের একটা দল আছে যাদের কারবারিরা মজা করে বলে ‘ধৈর্যশীল চোর’ (patient thieves)। এরা পাইপে এমন সূক্ষ্ম, পিনের ফুটোর মাপের ছিদ্র করে আর এত ধীরে ধীরে তেল টানে যে গোটা পাইপলাইনের প্রবাহের শূন্য দশমিক এক শতাংশও নড়চড় হয় না। ফলে দূরে বসে থাকা যে কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত নজরদারি ব্যবস্থা (স্কাডা) চাপ আর প্রবাহ মেপে যায়, তার চোখেও ব্যাপারটা ‘স্বাভাবিক ওঠানামা’ বলে ঠেকে। চোর জানে, একবারে বেশি টানলে অ্যালার্ম বাজবে; তাই সে ফোঁটায় ফোঁটায়, মাসের পর মাস, নিঃশব্দে চুরি করে যায়। ধৈর্যই এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
পাইপে ছিদ্র তো গেল একরকম। কিন্তু তেল চুরির জাল আরও অনেক বড়। কয়েকটা কায়দার নাম শুনুন—
- অবৈধ বাঙ্কারিং: পাইপ থেকে চুরি করা তেল ছোট ছোট বার্জ বা নৌকায় ভরে সাগরে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজে চালান করে দেওয়া।
- জাহাজ-থেকে-জাহাজ হস্তান্তর: মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে চোরাই তেল ঢেলে, সেটাকে ‘বৈধ আমদানি’ বলে চালিয়ে দেওয়া। যেমন লিবিয়ার চোরাই তেল ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে হাতবদল হয়ে ইউরোপে ঢোকে।
- সশস্ত্র ছিনতাই বা তেল-জলদস্যুতা: তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে মুক্তিপণ আদায় বা তেল লুট। হলিউড সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিয়ে সিনেমা বানিয়ে বিখ্যাত করেছে বটে, কিন্তু নাইজেরিয়া-লাগোয়া গিনি উপসাগরই আসলে বেশি ভয়ঙ্কর, গত কয়েক বছরে সেখানে শত শত হামলা হয়েছে।
- ঘুষ ও যোগসাজশ: কিছু দেশে তেল-মুনাফার ভাগ পেলে কর্তৃপক্ষ দিব্যি চোখ বুজে থাকে।
- ভেজাল: বৈধ তেলে সস্তার কেরোসিন বা অন্য কিছু মিশিয়ে পুরো দামে বেচে দেওয়া। শুনতে নিরীহ, কিন্তু এই ভেজাল তেলেই গাড়ির ইঞ্জিন বসে যায়, জাহাজ বিকল হয়।
ভেজালের ব্যাপারটা একটু খুলে বলি, কারণ এটা আমাদের সবচেয়ে কাছের বিপদ। তানজানিয়ায় যেমন সস্তা কেরোসিন বা লুব্রিক্যান্ট মিশিয়ে দেওয়া হয় পেট্রল-ডিজেলে—মুনাফা বাড়ে, অথচ বাইরে থেকে চট করে ধরার উপায় নেই। এই ভেজাল তেল পুড়িয়ে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষইতে থাকে চুপচাপ, শেষে একদিন বসে যায়। আবার তেল যখন টার্মিনালে খালাস হয় বা ট্যাঙ্কারে ভরা হয়, তখনও একটু একটু করে সরানো যায়। সীমান্তের এপার-ওপার তেলের দামে ফারাক থাকলেই শুরু হয়ে যায় পাচার—এক দেশের ভর্তুকি-দেওয়া সস্তা তেল সীমান্ত পেরিয়ে চড়া দামে বিকিয়ে যায়। ইসলামিক স্টেট এক সময় তাদের দখল-করা তেল সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে বেচতে পারত না বলে সস্তায় তুরস্কে পাচার করত, আর সেই টাকাতেই চলত তাদের যুদ্ধযন্ত্র।

এখানে একটা ইন্টারেষ্টিং গল্প বলে নিই, তবে সেটা চুরির ব্যাপার নয়, সীমান্তের এপার-ওপার তেলের দামের পার্থক্য থাকলে পাবলিক কি করে। ব্রুনাই এবং মালয়েশিয়া পাশাপাশি দেশ, আর ব্রুনাই-য়ে তেলের দাম মালয়েশিয়ার থেকে অনেক কম। এবার তাহলে আপনার বাড়ি যদি মালয়েশিয়ায় হয় আর তা একদম ব্রুনাইয়ের গায়ে (এই দুই দেশে যাতাযাত করতে সে দেশের নাগরিকদের ভিসা লাগে না), তাহলে আপনি কি চাইবেন না যে গাড়ির খালি ট্যাঙ্কটা গিয়ে ব্রুনাইয়ের ভরে আনতে? এই জন্যই ব্রুনাইয়ের সীমান্তে নিয়ম ছিল যে কেউ অর্ধেক ভর্তি গাড়ির ট্যাঙ্ক নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে আসতে পারবে না। আবার পেট্রল পাম্পে মালয়েশিয়ার নাম্বার প্লেটের গাড়ির জন্য অন্য কাউন্টার এবং দাম ছিল। এই একই গল্প আবার মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মধ্যে – সিঙ্গাপুরের তেলের দাম মালয়েশিয়ার থেকে বেশি। সেখানেও সীমান্তে চেক করা হত – কিন্তু আমাকে একদিন এক গাড়ির ড্রাইভার বলল যে খুব ভোরের দিকে সীমান্তে অত কড়াকড়ি থাকে না, তাই সেই ভোর চারটের মধ্যে বর্ডার ক্রশ করে তেল ভরে নিয়ে আসে গাড়িতে।
এবার একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন, এই যে এত তেল চুরি হয়, বেচা হয় কোথায়? চোরাই তেলের আসল সুবিধা হল, সেটা বৈধ তেলের সঙ্গে হুবহু এক দেখতে; একবার বৈধ চালানের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারলে আর আলাদা করা যায় না। তাই চোরাই তেল কখনও সস্তায় খোলাবাজারে বিকোয়, কখনও বৈধ কার্গোর সঙ্গে ‘ধুয়ে’ নেওয়া হয় (কেতাবি ভাষায় যাকে বলে মানি লন্ডারিং), আবার কখনও সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে চালান হয়। ক্রেতার অভাব হয় না - সস্তায় তেল কে না চায়! আর ঠিক এইখানেই তেল চুরি অন্য সব চুরির থেকে আলাদা: হিরে বা টাকা চুরি করলে তার গায়ে দাগ লেগে থাকতে পারে, কিন্তু এক লিটার চোরাই তেল আর এক লিটার বৈধ তেল - দুটোকে আলাদা করবে কে?
সমুদ্রের গল্পটা আলাদা করে একটু বলা দরকার, কারণ সেখানে চুরির সঙ্গে সরাসরি জুড়ে যায় হিংসা। গিনি উপসাগর, নাইজেরিয়ার উপকূল ঘেঁষা এই জলরাশি গত এক দশকে জলদস্যুতার জন্য রীতিমতো কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল। তেলবাহী জাহাজে সশস্ত্র হামলা, নাবিকদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, জাহাজসুদ্ধ তেল লুট, সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে সেখানে শত শত হামলা হয়েছে। হলিউড সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিয়ে বিস্তর হইচই করেছে, অথচ এই গিনি উপসাগরের দস্যুতা অনেক সময় তার চেয়েও বেশি পরিকল্পিত আর নির্মম।
একটা মজার (এবং ভীতিকর) তথ্য দিয়ে এই অধ্যায় শেষ করি। মেক্সিকোর মাদক-চক্র নাকি একটাই সফল পাইপ-ছিদ্র থেকে মাত্র সাত মিনিটে নব্বই হাজার ডলারের তেল হাতিয়ে নিতে পারে। সাত মিনিট! এর কাছে যেকোনো ব্যাংক ডাকাতিও নেহাত ছেলেখেলা।
নাইজার ব-দ্বীপ: যেখানে তেল অভিশাপ
এবার একটু দেশ হিসেবে ধরে ধরে দেখা যাক কোথায় সবচেয়ে বেশি তেল হারিয়ে যায়, আর কারা হারায়। শুরু করি নাইজেরিয়া দিয়ে, কারণ এই গল্পের সবচেয়ে করুণ আর জটিল অধ্যায়টা ওখানেই লেখা।
পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটির দক্ষিণে, নাইজার নদীর মোহনায়, বিস্তীর্ণ এক ব-দ্বীপ—নাইজার ডেল্টা। খাঁড়ি, জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ বন আর অজস্র নদীনালার এক গোলকধাঁধা। এর তলাতেই আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেলের ভাণ্ডার, আর এর উপর দিয়েই জালের মতো ছড়িয়ে আছে পাইপলাইন। সরকারি হিসেবেই নাইজেরিয়া দিনে গড়ে চার লক্ষ ব্যারেল তেল চুরিতে হারায়; কেউ কেউ বলেন সংখ্যাটা ছয় লক্ষ ছুঁয়ে ফেলে। ভাবুন দিনে চার লক্ষ ব্যারেল (আজকের তেলের দামে এটা দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৬ কোটি টাকার মাত!), যেন প্রতিদিন একটা আস্ত তেলট্যাঙ্কার হাওয়া হয়ে যাওয়া।
ছবিটা একবার চোখের সামনে আনার চেষ্টা করুন। খাঁড়ির কাদাজলে হাঁটুসমান নেমে, খালি পায়ে, দু-হাতে হলুদ জেরিক্যান ঝুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একজন মানুষ - জ্যান্ত ছবির মতো এই দৃশ্য নাইজার ডেল্টার নিত্যদিনের। এই গোলকধাঁধার মতো খাঁড়িগুলোই তেল পাচারের জন্য আদর্শ জায়গা; পুলিশ-নৌবাহিনীর নজর এড়িয়ে ছোট নৌকায় চোরাই তেল পৌঁছে যায় মোহনায় অপেক্ষমাণ বার্জে, সেখান থেকে সাগরে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজে, তারপর দেশের বাইরে। আর যেটুকু বাইরে যায় না, তা জঙ্গলের ভেতরেই কোনো আদিম চুল্লিতে পরিশোধিত হয়ে বিকিয়ে যায় কাছের বাজারে। গোটা ব্যাপারটা এতটাই সংগঠিত যে একে আর নিছক ‘চুরি’ বলা যায় না, এ প্রায় একটা সমান্তরাল তেল-শিল্প।

এর অর্থনৈতিক ধাক্কাটা প্রায় অবিশ্বাস্য। নাইজেরিয়ার স্বচ্ছতা-সংস্থা এনইআইটিআই-এর হিসেব, ২০০৫ থেকে ২০২১ - এই ষোলো বছরে দেশটি প্রায় ৬১ কোটি ৯৭ লক্ষ ব্যারেল তেল চুরিতে খুইয়েছে, টাকার অঙ্কে যা ষোলো লক্ষ কোটি নাইরারও (প্রায় এক লক্ষ পনেরো হাজার দুইশত সাতষট্টি কোটি টাকা) বেশি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি এনএনপিসি জানিয়েছিল, কেবল তেল চুরিতেই তারা মাসে সত্তর কোটি ডলার হারাচ্ছে। লন্ডনের গবেষণা-সংস্থা চ্যাটাম হাউস তো বলেছিল, রাজস্ব-ক্ষতির অঙ্ক মাসে একশো কোটি পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চুরির চোটে ২০২২ সালে নাইজেরিয়ার তেল উৎপাদন এমন তলানিতে নামে যে আগস্ট মাসে দিনে উৎপাদন দাঁড়ায় মোটে নয় লক্ষ বাহাত্তর হাজার ব্যারেলে, গত কুড়ি বছরে সর্বনিম্ন। ওপেকের কোটা (OPEC হলো পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক প্রধান দেশগুলোর একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা, যা তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে কাজ করে) তো দূরস্থান, নিজেদের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাও ছোঁয়া গেল না। ব্যাপার এমন দাঁড়াল যে সেই বছর টানা চার মাসেরও বেশি এনএনপিসি দেশের কোষাগারে একটি পয়সাও জমা দিতে পারল না। তেলের দেশ, অথচ তেল বেচে আয় প্রায় শূন্য—এর চেয়ে নিষ্ঠুর কৌতুক আর কী হতে পারে।
২০২২ সালে নাইজেরিয়া সরকার তখন এক অদ্ভুত পথ ধরল - চোর ধরতে চোরকেই লাগাও। এক প্রাক্তন সশস্ত্র বিদ্রোহী নেতা, যাঁর ডাকনাম টম্পোলো, তাঁর নিরাপত্তা সংস্থাকে প্রায় এগারো কোটি ডলারের নজরদারি-চুক্তি দেওয়া হল। ফল হল চমকপ্রদ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর লোকজন ষাটটির মতো অবৈধ ছিদ্রবিন্দু ‘আবিষ্কার’ করে ফেলল যার একটি ছিল প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা এক গোপন পাইপ, যা সমুদ্রের তলা দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে গিয়ে সোজা এক অফশোর প্ল্যাটফর্মে তেল খালাস করত। এমন নিখুঁত প্রকৌশল দেখে খোদ বিশেষজ্ঞরাই থ। যাঁরা চুরি করছিল তারা যে আনাড়ি নয় এই একটা তথ্যই তার প্রমাণ। এত নিখুঁত চুরি বছরের পর বছর কী করে চলল, তার পেছনে ভেতরের লোকের মদত ছিল কিনা সেই প্রশ্নটাও কিন্তু থেকেই যায়।
চুরি করা তেলের একটা বড় অংশ আবার স্থানীয়ভাবেই পরিশোধিত হয় জঙ্গলের ভেতর টিন-টুকরো আর ড্রাম দিয়ে বানানো আদিম চুল্লিতে, যাকে বলে ‘আর্টিজানাল রিফাইনারি’ বা হাতুড়ে শোধনাগার। নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী বছরের পর বছর এইসব শোধনাগার ভেঙে দিচ্ছে, ২০২২ থেকে ২০২৪-এর মার্চ পর্যন্ত ভাঙা হয়েছে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি। কিন্তু একটা ভাঙলে জঙ্গলের আরেক কোণে দুটো গজিয়ে ওঠে। এ সেই আমাদের ওদিকে পুলিশের মদের ভাটিখানা ভাঙার মত আর কি!

এই গল্পটার সবচেয়ে বিষণ্ণ দিকটা এবার বলি। নাইজার ডেল্টা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত জায়গাগুলোর একটি। বছরে প্রায় চার কোটি লিটার তেল এখানে মাটি-জল-বাতাসে চুইয়ে পড়ে - কিছুটা পুরোনো পাইপের মরচেয়, কিছুটা চোরের ছিদ্রে, কিছুটা হাতুড়ে শোধনাগারের বর্জ্যে। ম্যানগ্রোভ বন মরছে, নদীর মাছ মরে ভেসে উঠছে, চাষের জমিতে ইয়াম-কাসাভার ফলন কমছে বছর বছর। তার উপর আছে গ্যাস পোড়ানোর (গ্যাস ফ্লেয়ারিং) দূষণ আর হাতুড়ে শোধনাগারের কালো ধোঁয়া। ওগোনিল্যান্ড নামের এক অঞ্চল নিয়ে জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থা ইউএনইপি বলেছিল, কেবল দূষণ সাফ করতেই লেগে যাবে পঁচিশ থেকে তিরিশ বছর, খরচ হবে অন্তত একশো কোটি ডলার। এক ওগোনি নারী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন এক হাড়-হিম-করা কথা, “জল ছিল আমাদের জীবনের উৎস; এখন সেটাই মৃত্যুর কারণ”। পরিসংখ্যান বলছে, নাইজার ডেল্টায় মানুষের গড় আয়ু নেমে এসেছে চল্লিশ বছরের কাছাকাছি, যেখানে গোটা নাইজেরিয়ায় তা তিপ্পান্ন থেকে পঞ্চান্ন।
এ কোনো সেকেলে গল্প নয়। ২০২৩ সালেও এক ট্রান্স-নাইজার পাইপলাইন থেকে তেল চুইয়ে ওগোনিল্যান্ডের ওকুলু নদী আর আশপাশের চাষজমি বিষিয়ে যায়; এক সপ্তাহেরও বেশি ধরে তেল গড়িয়ে পড়ে, বাস্তুচ্যুত হয় তিনশোরও বেশি জেলে-পরিবার। যাদের জীবন-জীবিকা পুরোটাই নদীর মাছের উপর, তাদের কাছে জলে একটা তেলের দাগ মানে নিছক নোংরা জল নয়—আজ রাতে উনুন জ্বলবে কি না, তার প্রশ্ন।
এই ক্ষোভের শিকড় অনেক পুরোনো। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় লেখক ও পরিবেশকর্মী কেন সারো-উইওয়া ওগোনি জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে দাবি তুলেছিলেন যে নিজেদের মাটির তেলের ন্যায্য ভাগ চাই, আর চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ। ১৯৯৫ সালে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, আর সেই ঘটনা গোটা দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তার পর থেকে ডেল্টার রাজনীতি বারবার দুলেছে আন্দোলন, সশস্ত্র বিদ্রোহ আর দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়ে। তেল এখানে কেবল অর্থনীতি নয়, রক্তমাখা রাজনীতিও।
আর এখানেই লুকিয়ে সেই জটিল প্যাঁচটা যা তেল চুরিকে নিছক অপরাধ বলে উড়িয়ে দিতে দেয় না। এই ব-দ্বীপের তলা থেকে তোলা তেলে দেশের কোষাগার ভরে, বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা ফুলেফেঁপে ওঠে; অথচ যাঁদের জমি-জল বিষিয়ে গেল, সেই স্থানীয় মানুষ পেল দূষণ, বেকারত্ব আর অবহেলা। এই ক্ষোভ থেকেই একদা জন্ম নিয়েছিল আন্দোলন, কখনও-বা সশস্ত্র বিদ্রোহ। বহু তরুণ, জমি-নদী হারিয়ে, রুটিরুজির আর কোনো পথ না পেয়ে, শেষে নেমে পড়ল সেই তেল চুরিরই কারবারে—যে তেল একদিন তাদের সর্বনাশ করেছে। বৃত্তটা এখানে নিদারুণভাবে সম্পূর্ণ।
মেক্সিকো: ‘ওয়াচিকোলেরো’ আর এক রাতের আগুন
এবার আটলান্টিকের ওপারে, মেক্সিকো। এখানে তেল চুরির একটা আলাদা চরিত্র আছে, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক ট্র্যাজেডি, যা পড়লে বেশ খারাপ লাগতে বাধ্য। মেক্সিকোয় তেল-চোরদের চলতি নাম ‘ওয়াচিকোলেরো’ (huachicoleros) যে শব্দটা এসেছে ‘ওয়াচিকোল’ থেকে, যার আদি মানে নিম্নমানের চোলাই মদ। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পেমেক্সের হিসেব বলছে, তারা শুধু অবৈধ পাইপ-ছিদ্রেই বছরে হারায় প্রায় একশো তিরিশ কোটি ডলার। ২০১৮ সালের প্রথম দশ মাসে দেশজুড়ে পাইপে অবৈধ ছিদ্র ধরা পড়েছিল বারো হাজার পাঁচশোরও বেশি বার, হিসেবটা কষলে দাঁড়ায় প্রায় প্রতি ঘণ্টায় দুটো করে! এদের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত কুখ্যাত ‘লস সেতাস’ (Los Zetas) মাদক-চক্র, মেক্সিকোর তেল-চুরির বাজারের প্রায় চল্লিশ শতাংশ ছিল তাদের হাতে।
মেক্সিকোর গল্পে একটা টানাপোড়েন আছে, যেমনটা থাকে প্রায় সব অভাবী দেশেই। চোরাই তেল প্রায়ই খোলাবাজারে সস্তায় বিক্রি হয়, তাই বহু দরিদ্র জনপদ এই চোরদের একরকম সমর্থনই করে - কেউ পায় সস্তা পেট্রল, কেউ পায় ‘পাহারাদার’ বা ‘বাহক’-এর কাজ। ফলে এ এমন এক অপরাধ, যেখানে গোটা সম্প্রদায় কখনও কখনও নীরব অংশীদার।
এই চুরি যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, তার আভাস অবশ্য আগেও মিলেছিল। ২০১০ সালে একটা পাইপে উচ্চচাপের তেলে ছিদ্র করতে গিয়ে যে বিস্ফোরণ ঘটে, তাতেই মারা গিয়েছিল আটাশ জন। তবু চুরি থামেনি, বরং বেড়েছে। ২০১৮ সালের শেষে মেক্সিকোর নতুন প্রেসিডেন্ট তেল চুরির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বহু পাইপলাইন বন্ধ করে দেন। উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু ফলে গোটা মধ্য মেক্সিকোয় শুরু হয় পেট্রলের তীব্র সংকট আর সেই সংকটই প্রস্তুত করেছিল এক ভয়ানক মঞ্চ।
এই নীরব অংশীদারিত্বই একদিন গুনে দিল ভয়ঙ্কর মূল্য। ২০১৯ সালের ১৮ই জানুয়ারি - মধ্য মেক্সিকোর হিদালগো রাজ্যের ছোট্ট শহর ত্লাউয়েলিলপান। নতুন প্রেসিডেন্ট তখন সবে তেল চুরির বিরুদ্ধে কড়া অভিযান শুরু করেছেন, পাইপলাইন বন্ধ রাখায় গোটা অঞ্চলে পেট্রলের হাহাকার। এমন সময় খবর রটল যে শহরের কাছেই এক পাইপে ছিদ্র করা হয়েছে, ফোয়ারার মতো পেট্রল উপচে পড়ছে মাঠে। ‘এখানে তেল আছে, তাও বিনা পয়সায়!’—এই ডাকে ছুটে এল শত শত মানুষ, গোটা পরিবার নিয়ে। বালতি, জেরিক্যান, প্লাস্টিকের জার হাতে তারা ভিড় করল সেই তেলের ফোয়ারার চারপাশে, প্রায় উৎসবের মেজাজে। সেনাবাহিনীর গুটিকয় জওয়ান ভিড় সামলাতে গিয়ে পারল না, আটশোর মতো মানুষ তখন সেই মাঠে।
তারপর যা ঘটল, তা মেক্সিকোর ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক পাইপলাইন দুর্ঘটনা। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ হঠাৎ আগুন। এক লহমায় সেই তেলের ফোয়ারা পরিণত হল আগুনের স্তম্ভে, আর তাতে ঝলসে গেল ভিড় করা মানুষগুলো। সরকারি হিসেবে সেই রাতে প্রাণ হারায় অন্তত একশো সাঁইত্রিশ জন, দগ্ধ হয় আরও বহু। কেউ ছেলেকে খুঁজতে গিয়েছিলেন, কেউ গিয়েছিলেন নেহাত ‘একটু দেখে আসি কী হচ্ছে’ বলে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী পরে বলেছিলেন, বেঁচে থাকাদের উদ্ধার করতে গিয়ে তাঁকে পুড়ে যাওয়া মানুষের দেহের টুকরো সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হয়েছিল। বিনা পয়সার তেলের লোভ সেদিন এক নিমেষে বদলে গিয়েছিল শ্মশানে।
এই একটা ঘটনা তেল চুরির গল্পের আসল মুখটা খুলে দেয়। কাগজে-কলমে এটা ‘অর্থনৈতিক অপরাধ’, কোম্পানির খাতায় লোকসানের অঙ্ক। কিন্তু মাটিতে এর দাম মেটায় প্রায়ই সেইসব মানুষ, যারা এই মুনাফার কিছুই পায় না, কেবল পায় দারিদ্র্যের তাড়নায় ঝুঁকি নেওয়ার ‘সুযোগ’, আর তারপর মৃত্যু।
শুধু গরিব দেশের রোগ নয়
এতক্ষণ শুনে মনে হতে পারে, তেল চুরি বুঝি কেবল আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার গরিব দেশের সমস্যা। মোটেও নয় তা কারণ এই রোগ ধনী দুনিয়াতেও দিব্যি বাসা বেঁধে আছে, কেবল তার চেহারাটা একটু ভদ্রস্থ।
রাশিয়ার কথাই ধরুন যেখানে চুরির প্রধান কায়দা পাইপে ছিদ্র করে সাইফন করা, মস্কো আর লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে যার রমরমা। চেচনিয়া আর দাগেস্তানের মতো অশান্ত এলাকায় তো আস্ত অবৈধ শোধনাগারের শিল্পই গড়ে উঠেছিল, কেবল দাগেস্তানেই ২০০৯ সালে চুরি গিয়েছিল সাতাশ হাজার টন তেল। যুদ্ধের সময় চেচনিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনে বারবার হামলা আর চুরি হত বলে, শেষে ২০০০ সালে চেচনিয়াকে পুরো বাইপাস করে দিনে তিন লক্ষ ব্যারেল ক্ষমতার আলাদা পাইপলাইনই বানিয়ে ফেলা হয়েছিল।
ওদিকে তথাকথিত সৎ, সম্পন্ন দেশগুলো? যুক্তরাষ্ট্রে বছরে জ্বালানি চুরির অঙ্ক আটশো কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। যার একটা বড় অংশ, প্রায় ২১০ কোটি ডলার, নাকি সরাসরি গাড়ির ট্যাঙ্ক থেকেই হাপিস হয়। আয়ারল্যান্ড সরকারের দাবি, ভেজাল তেলের কারবারে তারা বছরে দেড়শো থেকে আড়াইশো মিলিয়ন ইউরো রাজস্ব হারায়। মানে, চোরের ধরন আলাদা হতে পারে, কিন্তু চুরি সর্বত্রই আছে।
এই গোটা লোকসানের বোঝাটা শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে চাপে? এর উত্তর আপনারা সবাই জানেন - ঘুরেফিরে সেই সাধারণ মানুষেরই। কোম্পানির লোকসান পুষিয়ে নিতে দাম বাড়ে, সরকারের রাজস্ব কমলে হয় কর বাড়ে নয় জনকল্যাণে টান পড়ে, আর ভেজাল তেলে আমাদেরই গাড়ি-যন্ত্র বসে যায়। চোর হয়তো দূরের কেউ, চেনা-অচেনা; কিন্তু তার ছিদ্রের মাশুল আমরা সবাই একটু একটু করে গুনি - পেট্রল পাম্পের বিলে, সরকারি বাজেটের হিসেবে, আর বাতাসের বিষে।
চোর-পুলিশ: পাইপ পাহারার নতুন হাতিয়ার
এত সব শুনে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, কোম্পানিগুলো তাহলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে নাকি? যদি না ঘুমায়, তাহলে করছেটা কি তারা? হাজার হাজার কিলোমিটার পাইপ পাহারা দেওয়া তো এক অসম্ভব কাজ। এখানেই শুরু হয়েছে এক অন্তহীন চোর-পুলিশ খেলা, আর তাতে দিন দিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি।
সবচেয়ে চালু কায়দাটা হল চাপ মেপে চোর ধরা। পাইপে হঠাৎ ছিদ্র হলে ভেতরের চাপ একটু কমে যায়, আর সেই চাপ-কমার ঢেউ (যাকে বলে নেগেটিভ প্রেশার ওয়েভ) দুরন্ত গতিতে পাইপ ধরে ছুটে যায় যে ঢেউ ধরতে পারলেই বোঝা যায় কোথায় ফুটো। আরেকটা কায়দা হল নিছক হিসেব মেলানো (মাস-ভলিউম ব্যালান্স): একদিক দিয়ে যত তেল ঢুকল, অন্যদিক দিয়ে ঠিক তত বেরোল কিনা। না মিললেই বুঝতে হবে মাঝপথে কেউ ভাগ বসিয়েছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রযুক্তিটা হল অপটিক্যাল ফাইবার। পাইপের গা ঘেঁষে মাটির নিচে একটা সরু কাচের তন্তু পুঁতে দেওয়া হয়, যা আসলে টানা কয়েকশো কিলোমিটার জুড়ে একটা অতিসংবেদনশীল কান আর থার্মোমিটার একসঙ্গে। কেউ পাইপের কাছে মাটি খুঁড়লে, ড্রিল চালালে, এমনকি হেঁটে গেলেও তার কম্পন ওই ফাইবার টের পেয়ে যায় (একে বলে ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যাকুস্টিক সেন্সিং)। আবার তেল চুইয়ে পড়ে ঠান্ডা বা গরম দাগ তৈরি হলে তাপমাত্রার সেই হেরফেরও সে ধরে ফেলে। এর সঙ্গে জুড়েছে ড্রোন দিয়ে আকাশ থেকে টহল, ইনফ্রারেড ক্যামেরায় অদৃশ্য গ্যাসের ছোপ চিহ্নিত করা, পাইপের ভেতর দিয়ে ঘুরে আসা রোবট (‘স্মার্ট পিগ’), এমনকি তেলের গন্ধ চিনতে শেখানো প্রশিক্ষিত কুকুরও।
কিন্তু চোরও বসে নেই। মনে আছে তো সেই ‘ধৈর্যশীল চোর’? প্রযুক্তি যত সূক্ষ্ম হচ্ছে, চুরিও তত সূক্ষ্ম হচ্ছে। আধুনিক চোরের কেরামতি শুনলে চমকে যেতে হয়। কেউ মাটির নিচে রীতিমতো গোপন বাংকার খুঁড়ে, পাইপ থেকে একশো থেকে হাজার মিটার দূরে হোস টেনে নিয়ে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে তেল তোলে, ধরা পড়ার ভয় নেই। কেউ পাইপ বসানোরও আগে সেখানে কল-ছিপি পুঁতে রাখে, তারপর অপেক্ষা করে যতক্ষণ না তার উপর ঘাস-জঙ্গল গজিয়ে সব ঢেকে যায়। কেউ চুরি করে ঠিক সেই সময়টায়, যখন পাইপ সবে চালু হচ্ছে আর এমনিতেই চাপ ওঠানামা করছে, যাতে অ্যালার্ম গুলিয়ে যায়। কেউ আবার পাইপের ফুটোয় ছেঁড়া কাপড় গুঁজে দেয়, যাতে তেলের বওয়ার শব্দটাই কমে যায় আর শব্দ-সংবেদী যন্ত্র কিছু টের না পায়। এ যেন এক অস্ত্র-প্রতিযোগিতা - এক পক্ষ নতুন সেন্সর বসায়, অন্য পক্ষ নতুন ফাঁকি বের করে। আর এই খেলায় জিত-হার কখনও পাকাপাকি হয় না।
ঘরের কাছের গল্প: জাহাজ, তাপমাত্রা আর বিজ্ঞান-জানা চোর
এতক্ষণ বিদেশের গল্প শুনে যদি ভাবেন আমরা নিরাপদ, তাহলে ভুল করবেন। শুরুতে মিরসরাইয়ের যে ঘটনা বলেছিলাম, সেটা তো নেহাত সাম্প্রতিক একটা উদাহরণ। আমাদের উপমহাদেশেও তেল চুরির নিজস্ব চেহারা আছে - কিছুটা মামুলি, কিছুটা আশ্চর্যরকম চতুর।
একটা কায়দার কথা শুনলে অবাক হবেন, কারণ এখানে চোরের সবচেয়ে বড় সহায় খোদ পদার্থবিজ্ঞান। তেল গরম হলে আয়তনে বাড়ে, ঠান্ডা হলে কমে - স্কুলে পড়া সেই তাপীয় প্রসারণ। বাংলাদেশে বিপিসি যখন বিদেশ থেকে তেল কেনে, তখন তা মাপা হয় পনেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়; কিন্তু দেশের ভেতরে সরবরাহের সময় মাপা হয় ত্রিশ ডিগ্রিতে। এই তাপমাত্রার ফারাকেই তিরিশ হাজার টন তেল ‘বেড়ে’ হয়ে যায় তিরিশ হাজার তিনশো টন - কাগজে-কলমে বাড়তি তিনশো টন। শীতের কয়েকটা মাস বাদ দিলে বছরের বাকি সময় এই বাড়তিটুকু থেকেই যায়। বিজ্ঞানের এই সহজ সূত্রটা চোরদের বিলক্ষণ জানা। এই বাড়তির আড়ালেই সরে যায় আসল তেল, হিসেব দিব্যি মেলে, অথচ গরমিল ধরা পড়ে না। ভাবুন একবার, স্কুলের পদার্থবিজ্ঞানের বইয়ের একটা লাইনও কেমন করে চুরির হাতিয়ার হয়ে যায়!
তারপর আছে জাহাজের গল্প। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকা তেলবাহী জাহাজ থেকে সংঘবদ্ধ চক্র বছরের পর বছর তেল সরিয়েছে, কখনও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, কখনও কর্মীদের যোগসাজশে। হোস, ছোট নৌকা, রাতের অন্ধকার - কায়দাটা প্রায় নাইজার ডেল্টার এক ছোট সংস্করণ। মানে গল্পটা মোটেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের নয়, একেবারে আমাদের ঘরের কাছের। আমাদের আর ভারতেও এই রোগ কম নয় বরং ইদানীং যেন বেড়েছে। এই তো সদ্য, ২০২৬ সালেই আসামের গোলাঘাট জেলার সরুপথারে ওএনজিসি-র (তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কর্পোরেশন) একটি পাইপলাইন ফুটো করে অপরিশোধিত তেল চুরির এক চক্র ধরা পড়ল। তদন্তে বেরোল, চুরি-করা সেই তেল পাচার হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গে। সবচেয়ে অস্বস্তিকর তথ্যটা হল এই যে এই চক্রকে মদত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন খোদ এলাকার এক সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার, আর সন্দেহের তালিকায় উঠে এল কয়েকজন ওএনজিসি কর্মীর নামও। মনে আছে নাইজার ডেল্টার সেই ‘ভেতরের লোকের মদত’-এর কথা? এ যেন তারই এক দেশি সংস্করণ।
একই ছবি রাজস্থানেও। ২০২৫ সালে ইন্ডিয়ান অয়েলের সালায়া-মথুরা পাইপলাইন ফুটো করে প্রায় আট লক্ষ লিটার অপরিশোধিত তেল, টাকার অঙ্কে সাড়ে চার কোটির কাছাকাছি, হাতিয়ে নিয়েছিল একটা সংঘবদ্ধ দল। আর কী কায়দায়! পাইপলাইন থেকে পৌনে তিনশো মিটারেরও বেশি লম্বা একটা গোপন সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তার ভেতর দিয়ে চোরা-পাইপ বসানো হয়েছিল, যাতে মূল লাইন থেকে তেল টেনে নিরাপদ দূরত্বে ট্যাঙ্কারে ভরা যায়। তদন্তকারীরাই বলছেন, এমন নিখুঁত খননকাজ পরিকল্পনা, কারিগরি জ্ঞান আর দল বেঁধে খাটুনি ছাড়া অসম্ভব—দেশের সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় পাইপলাইন-চুরিগুলোর একটি। নাইজেরিয়ার সেই প্রায় চার কিলোমিটার সমুদ্রতলের গোপন পাইপের কথা মনে পড়ে যায়, তাই না?
এমনকি সেই মিরসরাইয়ের টিনশেড-ঘরের কায়দাটাও নতুন নয়। ২০১৯ সালে জয়পুরের কাছে শাহপুরাতেও ধরা পড়েছিল হুবহু একই ছক। একটা ভাঙাচোরা মালপত্রের (স্ক্র্যাপ) দোকানের টিনের চালার আড়ালে মাটির নিচে প্রায় তিনশো মিটার লম্বা সুড়ঙ্গ, আর তার তলা দিয়ে ইন্ডিয়ান অয়েলের চাকসু-পানিপথ পাইপলাইনে বসানো চোরা-ভালভ ও পাম্প। মূল লাইনের চাপ একটু একটু করে কমছে দেখেই কোম্পানির লোকজন সন্দেহ করেছিল। অর্থাৎ নাইজার ডেল্টা থেকে মেক্সিকো, রাজস্থান থেকে চট্টগ্রাম—চিত্রনাট্যটা সত্যিই এক সুতোয় গাঁথা।
শেষ কথা: মাটির তলার সেই নিঃশব্দ নদী
লেখাটা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেই মিরসরাইয়ের টিনশেড ঘরে আরেকবার ফিরি। বাইরে থেকে নিরীহ একটা ঘর, ভেতরে দশ ফুট গভীর গর্ত, আর তার তলায় বয়ে চলা ইস্পাতের ধমনী থেকে চুপিচুপি টেনে নেওয়া তেল। ভারতের কিছু তেল চুরির ঘটনাও লিখলাম। মাপে ছোট, কিন্তু চিত্রনাট্য একই - সেই নাইজার ডেল্টা থেকে মেক্সিকোর ত্লাউয়েলিলপান হয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই পর্যন্ত এক সুতোয় গাঁথা।
প্রশ্নটা তাই শেষে এসে দাঁড়ায় - মানুষ চুরি করে কেন? লোভ, নিশ্চয়ই। সংগঠিত অপরাধ, জঙ্গি তহবিল, মাফিয়ার মুনাফা - এসব তো আছেই। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, পাইপে ছিদ্র করা হাতগুলোর অনেকই আসলে দরিদ্র, বেকার, জমি-জল হারানো মানুষের। যে সম্পদ তাদের পায়ের তলা দিয়ে বয়ে যায় অথচ ছুঁতে দেয় না, সেই সম্পদেই তারা ভাগ বসাতে চায় - কখনও লোভে, কখনও নিছক টিকে থাকার তাগিদে। আর সেই ছিদ্রের মাশুল শেষমেশ গোনে সবাই: কোম্পানি গোনে টাকা, সরকার গোনে রাজস্ব, প্রকৃতি গোনে বিষ, আর সাধারণ মানুষ, ত্লাউয়েলিলপানের মতো, কখনও কখনও গোনে নিজের প্রাণ।
এ কথা বলে অবশ্য চুরিকে সাফাই দেওয়া যায় না। যে অপরাধী-চক্র বা জঙ্গি গোষ্ঠী কোটি কোটি ডলার হাতায়, তাদের সঙ্গে পেটের দায়ে পাইপে ছিদ্র করা বেকার তরুণকে এক পাল্লায় মাপা অন্যায়। কিন্তু গল্পটা যদি নিছক ‘চোর বনাম পুলিশ’ বলে দেখি, তাহলে আসল সত্যিটা এড়িয়ে যাই। তেল চুরি আসলে একটা আয়না যাতে ধরা পড়ে বৈষম্য, ধরা পড়ে অবহেলা, ধরা পড়ে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে কারও পায়ের তলার সম্পদ অন্য কারও পকেটে চলে যায়। ছিদ্র বন্ধ করতে হলে শুধু সেন্সর বসালে হবে না, ওই আয়নার ছবিটাও বদলাতে হবে।
ভাবলে অদ্ভুত লাগে যে সম্পদ একটা দেশকে রাতারাতি বড়লোক করে দিতে পারে, সেই একই সম্পদ কী করে একটা গোটা অঞ্চলকে অভিশাপের মতো গ্রাস করে। অর্থনীতিবিদরা এর একটা নামও দিয়েছেন, ‘সম্পদের অভিশাপ’ (resource curse)। যে দেশের পায়ের তলায় তেল, সেই দেশেই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি, দ্বন্দ্ব আর বৈষম্য। নাইজার ডেল্টার তেলে-বিষিয়ে-যাওয়া মানুষগুলো সেই অভিশাপের সবচেয়ে কাছের সাক্ষী।
আমরা যখন নিশ্চিন্তে গাড়িতে তেল ভরি, চুলা জ্বালাই, প্লেনে চড়ি - তখন মাটির অনেক নিচে দিয়ে নিঃশব্দে বয়ে চলা সেই তেলের নদীটার কথা ভুলেও মনে পড়ে না। অথচ তার ধারে ধারে বসে আছে অসংখ্য অদৃশ্য ছিপ ফেলা মানুষ, কেউ ধৈর্যশীল, কেউ বেপরোয়া, কেউ মরিয়া। পরেরবার পেট্রল পাম্পে দাঁড়িয়ে দামের অঙ্কটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলার সময় একবার ভেবে দেখবেন যে এই তেলটুকু এতটা পথ পেরিয়ে আপনার কাছে পৌঁছেছে, তার মাঝপথে কোথাও হয়তো কেউ একজন প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে একটা পাইপে ছিদ্র করছিল। মাটির তলার সেই নিঃশব্দ নদীটা আসলে আমাদের ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি রক্তাক্ত।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।