এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মৃত শহরের পথে

    Somnath লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত
  • বি ব্লকটা সম্ভবতঃ উচ্চবেতনের কর্মচারীদের থাকার জন্যে ছিল। ঢোকার মুখেই বিশাল বাংলো বাড়ি- জেনারেল ম্যানেজারের বাংলো। এখন পোড়োবাড়ি হয়ে আছে। পুরো কমপ্লেক্সটাই জংলি গাছে ছেয়ে গেছে। সুন্দরবনে কিছু পুরোনো প্রাসাদ দেখা যায় এরকম, সে ফেসবুকে ছবি দেখেছে। সে এগিয়ে চলে থার্ড লেনের খোঁজে। এখানে রাস্তাগুলোর গায়ে আর কোনও দিকনির্দেশ নেই। শুধু রাস্তার ডানদিক দিয়ে গলি ঢুকে গেছে। একটা গলিতে ঢুকে সে দেখে সার সার জনহীন দোতলা বাড়ি। সব বাড়ি একরকম প্রায়। সবার সামনে একটু বাগান, কারুর কারুর বাগান তারের বেড়ায় ঘেরা, কোনও বাড়ির বেড়া টেড়া সব চুকে গেছে। বেশির ভাগই তালা বন্ধ, আবার দরজা হাট করে খোলা কোনওটায়। কোনটা থার্ড লেন কে বলে দেবে তাকে? শমিতার বাড়ির গলির উল্টোদিকে ছিল বাসস্টপ। এ ব্লকে ঢোকার মুখে, চার্চের পরে সে একটা বাসস্টপ দেখেছিল। তাহলে বি ব্লকেও একটা বাসস্টপ আছে। বাস স্টেশন থেকে ছেড়ে বাঁদিকেই তো থামত। শমিতার বাড়ি তার উলটো গলিতেই। ভাঙা পিচের রাস্তা পড়ন্ত বেলার রোদে ধুলোয় মাখামাখি- তার মধ্যে কিছু দূরে এক প্রাচীন বাসস্টপের কংক্রিটের কাঠামো ঠাহর করতে পারল সে। শমিতা এখানে নামত। হয়ত এর উল্টোদিকের স্টপটাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত সকালে, স্টেশন যাওয়ার বাসের। যেদিন অবরোধের দিন সে আর কলকাতা পৌঁছতে পারল না, সেদিন কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল শমিতা এই স্টপে? কেঁদেছিল কি? সে কিন্তু হাউ হাউ করে কেঁদেছিল সেদিন, ফোনে। এখন এই জনশূন্য নির্জন কলোনির মোড়ে সে যদি আবার কেঁদে ফেলে শমিতা কি শুনতে পাবে না?

    বাসস্টপের উল্টোদিকের গলি ধরে সে এগিয়ে গেল। এইটা যে থার্ড লেন তা যদিও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। বি ব্লকে ঢোকার পরে অনেকগুলো গলি ছেড়ে এগিয়ে এসেছে সে। অবশ্য উল্টোদিক থেকেও লেনের নাম্বারিং শুরু হয়েছে এমনটা হতেই পারে। এমন প্ল্যানড টাউনশিপে রাস্তার নম্বর র‍্যান্ডমলি বসানো হবে না। শমিতার বাড়ির নম্বর ২১০। কোনও বাড়ির গায়ে কিছু লেখা নেই আর। হয়তো ক্রমিক সংখ্যা বসানো ছিল, রোদ জলে মুছে গেছে সে-সব। তবে শমিতা যখন এখানে ডাকলো, লোকজন কারুর কারুর তো থাকার কথা। যদিও সে কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। কোনও বাড়িতে মানুষ আছে, এরকম সংকেতও কিছু পড়ে নেই এই গলিপথে। বিকেলের আগের রোদ এসে পড়েছে গলির মধ্যের বাড়িগুলোতে। সেই তেরছা রোদে মনে হচ্ছে বাড়িগুলো ঝুলে আছে খাদের ধারে। সব বাড়ির সামনে খানিকটা জায়গা নিয়ে উঠোন। কিছু বড় বড় গাছ আছে,গাছের পাতা ছড়িয়ে আছে গলি থেকে বাড়িতে ঢোকার পথে। পাতা পরিস্কার করে না কেউ। কোনও কোনও উঠোনে টবের সারি পাতা আছে, খালি কোনও গাছ নেই সেসব টবে। গলিটা বেঁকে যাচ্ছে ডানদিকে। কোনটা যে ২১০ বোঝার উপায় নেই, আর এইটা যে থার্ড লেন তারও তো নিশ্চয়তা নেই। তাও, এই গলিতে ঢুকেছেই যখন একবার দেখে নেওয়া ভালো শেষটা অবধি। বাঁকের মুখে একটা বাড়ির সামনেটা কিছুটা পরিস্কার লাগল, হয়তো লোকজন চলে এই পথে। সে ঢুকে দেখল- উঠোনের পরে বাড়িটার সবুজ রঙের দরজা, চাপ দিতে খুলে গেল। ভেতরে বসার ঘর। শেষ দুপুরের আলো কাঁচের জানলা বেয়ে ঢুকছে বসার ঘরে, কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছে না সে। একটু কথা বলে দেখলে কেমন হত কে জানে। হয়তো নিজের গলার স্বরে নিজেরই ভয় লেগে যেত তার। বসার ঘর থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায় আর সোজা তাকালে খুব অন্ধকার। আলোর সুইচ কোথায় ঠাহর হল না। সে বেরিয়ে এল- বাইরের দেওয়ালে যে একটা লেটারবক্স আছে সে খেয়াল করেনি ঢোকার সময়ে। সেখানে কিছু কাগজ জমে আছে। একটা ফুল ফুল ছাপ খামে কোনও চিঠি এসেছে। আশে পাশে কেউ দেখছে না সে ঘাড় তুলে দেখে নিল। কে-ই বা দেখবে এইখানে! চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখল, ওপরে প্রাপকের নাম লেখা- নাবিলা আফরোজ। মানে, এইটা শমিতাদের বাড়ি ছিল না। তাছাড়া শমিতার তো বাড়িতেই থাকার কথা, ও থাকলে বাড়িটা এরকম পোড়ো বাড়ি হয়ে থাকত না। বাড়িটা থেকে বেরোনোর সময়ে সে খেয়াল করল, উঠোনটা যেমন পরিস্কার মনে হয়েছিল গলির থেকে দেখে, আসলে সেরকম না। পুরু ধুলোর আস্তরণ পড়ে, তার ওপরে তার জুতোর ছাপ আঁকা হয়ে গেছে।

    গলিটা ডানদিকে এগিয়ে গেছে, সেই দিকে কিছুটা এগিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। একটা বাড়ির গায়ে সিমেন্টে খোদাই করা আছে ২০০ সংখ্যাটা। মানে, এইটা ২০০ নম্বর থার্ড লেন। থার্ড লেনই হবে, বাসস্ট্যান্ডের উল্টোগলি যখন। এখান থেকে দশটা বাড়ি এদিক বা ওদিকে শমিতা থাকে। সে কি একবার খুব জোরে ডাক দেবে? তবে অন্য কিছু বাড়িতে যদি লোকজন থাকে, ব্যাপারটা ভালো হবে না। শমিতা যদি দরজা বন্ধ করে থাকে, শুনতেও পাবে না হয়তো। ২০০ নম্বর বাড়ি থেকে গুণে গুণে দশটা বাড়ি দেখলেই তো হয়। ডানদিকের দশটা বাড়ি ছেড়ে এগিয়ে গেল। একই রকম প্যাটার্ন সব বাড়ির। এগুলো আসলে কোয়ার্টার, একই ডিজাইনে বানানো হয়। বসার ঘরে ডাঁই করে জামাকাপড় রাখা। কেউ নেই মনে হচ্ছে। হতে পারে বাড়ির ক্রমিকসংখ্যাগুলো রাস্তার এদিক ওদিক করে বসানো। তাহলে পাঁচটা বাড়ি পেছনে রাস্তার কোনও এক দিকে হবে। পিছিয়ে গিয়ে দেখল,ডানদিকের বাড়িটার দরজায় তালা আঁটা,বাইরে থেকে। উলটোদিকের বাড়িটাতে ঢুকল সে। খুব অন্ধকার ভেতরটায়। মোবাইলের আলোতে দেখল স্কুলব্যাগ, ট্রাইসাইকেল, পুরোনো দিনের ঢাউস টিভি-সেট, কোনার দিকে একটা ক্রিকেট ব্যাটও পড়ে- বাচ্চারা ছিল এই বাড়িটাতে। এইটাও নয়। সে তাহলে ভুল দিকে এগিয়েছে। গলির ভেতর থেকে নম্বর শুরু হয়েছে। ২১০ ফেলে এসেছে ২০০-এ আগে। পিছিয়ে গেল সে- এর পরে যে বাড়িতে ঢুকল, সেখানে একটু ভালো করে দেখতে চাইল ভেতরটা। শমিতার বাড়ি এটা না হলেও এরকমই একটা বাড়িতেই তো ও থাকে। একইরকম কাঠামো সবগুলোর। এই বাড়িতে তালা দেওয়া নেই দরজায়, বেলও নেই, কড়া নাড়ল সে। তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে গেল। জানলা দিয়ে অনেকটা আলো ঢুকছে। বসার ঘর থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে। শমিতার সঙ্গে একবারই তার ভিডিও কল হয়েছিল। শমিতা তার কোন প্রতিবেশির ওয়েবক্যাম ধার করে এনেছিল একদিনের জন্য। তারা স্কাইপ কল করেছিল। ঘরে মনে হয় আলো জ্বলছিল না। ডেস্কটপের স্ক্রিনের আলোয় খুব উজ্জ্বল লাগছিল শমিতার চোখজোড়া। যদি এটাই শমিতার বাড়ি হয়, এই বাড়ির দোতলায় যদি শমিতা ঘুমিয়ে থাকে, সে গায়ে হাত দিয়ে ডাকবে। ও কি ওরকম উজ্জ্বল চোখ মেলে তাকাবে তখন? নাঃ, কাউকেই সে পেল না দোতলায়। কাগজপত্র ছিল কিছু, ছিল কিছু হিন্দি আর ইংরিজি বই। একটা কাগজে ইংরিজিতে লেখা নাম পেল- প্রীতম কুমার। সে বেরিয়ে এল বাড়ির থেকে। উল্টোদিকের বাড়িটাতে ঢুকতে গিয়ে দেখে অবাক ব্যাপার, ধুলোর ওপর তার জুতোর ছাপ পড়ে আছে সেই উঠোনে। ঐটা কি সেই নাবিলা আফরোজের বাড়িটা? নাকি পাশেরটা, সেখানেও তো ধুলোর ওপর জুতোর ছাপ পড়ে আছে। সে খেয়াল করে দেখল- আশেপাশের অনেকগুলো বাড়ির উঠোনেই টাটকা জুতোর ছাপ। এতগুলো বাড়ির ভেতর অবধি ঢুকে শমিতাকে খুঁজে এসেছে নাকি সে!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • . | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:০৮742567
  • ঘোর লাগানো নেশা ধরানো লেখা। স্বপ্নের মতো লাগে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন