এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মৃত শহরের পথে

    Somnath লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৮৫ বার পঠিত
  • |
    স্টেশন থেকে বেরিয়ে প্রথমে টোটোর স্ট্যান্ডে গেল। এখান থেকে সাড়ে তিন কিমির মতন দূরত্ব দেখাচ্ছে। অবিশ্বাস্য বেশি ভাড়া হাঁকলো টোটোওলা। দরদাম করতে বলল ওদিক থেকে ফেরার প্যাসেঞ্জার জোটে না, দু-সাইডের ভাড়া দিতে হবে। ১৭-র বি রুটের বাসে পৌঁছনো যাবে এরকমটা সে জানত। শমিতার সঙ্গে যখন কথা হত, অনেকবারই স্টেশন থেকে বেরিয়ে শমিতা ওই বাসে উঠেছে। বাসে উঠে বসতে পেলে শমিতা আবার ফোন করেছে। বলেছিল বাস স্টপে নেমেই উল্টোদিকের রাস্তায় ওদের বাড়ি। স্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে আজ। ১৭-র বি-এর দেখা নেই। বাস স্ট্যান্ডে একটা চায়ের দোকান। দোকানের পাশে দুটো দরমার ঘর আছে ফাঁকা। এক কাপ চা নিল সে, গ্লাসের কাঁচটায় একটা ফাটা দাগ। দরমার ফাঁকা ঘরদুটোর একটায় দরজা নেই, ভেতরে একটা কাঠের বেঞ্চি মত করা। সেখানে বসে বসে উল্টোদিকের নির্মীয়মাণ বহুতলটি দেখা যায়। নির্মাণের প্রকোপে পুরো রাস্তাই ধুলোধুলো, চায়ের কাপে মুখ দিলেও হয়তো ধুলোকণা পেটে চলে যাচ্ছে। কয়েকটা বাস চলে গেল, ১৭-র বি নয় কোনওটাই। নদীয়ার দিকে যাচ্ছে বাসগুলো। একটা বাসের গায়ে লেখা ছিল- মার্টিননগর হইয়া। ৩১৮ নং বাস সেটা, সে উঠে দাঁড়াল। চায়ের দোকানদার বলল ১৭-র বি আর চলে কিনা সন্দেহ, বহুদিন চোখে পড়েনি সেই বাস। আবার একটা ৩১৮ দেখে উঠে পড়ল সে। কন্ডাক্টর বলল মার্টিননগরে বাস যায় না তো, গেটে নামিয়ে দেবে।

    বাসে বেশ কম লোক, সকলেই বসে। বাসটাও পুরোনো দিনের মতন, জানলার গা দিয়ে বসার সিট। এদিকে রাস্তার অবস্থা ভালো না। খুব ঝাঁকুনি হচ্ছিল। ব্যাকপ্যাকটাকে কোলের ওপর নিল সে। খুব আলতো করে ভর দিল সামনে। কন্ডাকটরকে টিকিটের জন্য ডাকল কুড়ি টাকার নোট বাড়িয়ে। কন্ডাকটর হাত দেখাল। সে বলল মার্টিন নগরের গেটে নামিয়ে দিতে। আগে সে কখনো আসেনি এই পথে। যদিও এই পথের অনেককিছুই তার চেনা- শ্যামসুন্দরী স্কুল, সাঁইবাবার মন্দির, সেবাব্রতী নার্সিং হোম এইসব পরপর পড়ে এই পথে। তাদের যখন রোজ কথা হত, এই ল্যান্ডমার্কগুলোর কথা শমিতা বলেছিল। এই তিনটেই পেরিয়ে গেল বাস, মানে উঠতে হবে। কন্ডাকটর ছেলেটি হাত নেড়ে ডাকল। সে নেমে দেখল বিশাল তোরণ, মার্টিন নগরের- একসময়ে মনে হয় চাকা লাগানো লোহার গেট ছিল, রেল পাতা আছে মাটিতে এখনও। গেটে কেউ নেই, সিকিউরিটি বা ওরকম কেউ। আগে হয়তো বসত। গেটের পাশে সিকিউরিটি বসার খোপ আছে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। একটা রঙচটা বোর্ড আছে, সেখানে ভেতরের একটা ম্যাপ আছে- কোন দিকে কোন রাস্তা, কোথায় অফিস, কোথায় ফ্যাক্টরি, কোথায় মার্কেট, কোথায় রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স- এই সব। তার কাছে এই দু-লাইনের ঠিকানা আছে- ২২০ থার্ড লেন, বি ব্লক, মার্টিন নগর। তার এই ফোন সেটে শমিতার কাছ থেকে শুধু এই একটা মেসেজই এসেছে। এই ফোনটা নয় নয় করে চারবছর ধরে চলছে। করোনার পর দেশে ফিরে আমাজন থেকে কিনেছিল। তার আগের একদশকেই বা শমিতা কটা মেসেজ করেছিল- দু-তিনটে হবে!

    কিন্তু, শমিতা ডাকলে তাকে আসতেই হত। এরকমই চুক্তি হয়েছিল তাদের মধ্যে, একবার নয় বারবার। যখন ঝগড়া করে ব্লক করে দিত, ব্লক তোলার পরে এই কথাটাই হত- আর যাই হোক, একজন ডেকে পাঠালে আরেকজন যাবেই। কিম্বা রাতভর চ্যাট যখন প্রায় শরীরী অবয়ব নিয়ে ফেলত, শমিতা ফোন করে ফেলত তাকে- বলত, কখনও ডেকে পাঠালে সে যেন চলে আসে। একবার, এক অলস রবিবারের দুপুরে, তাও আবার লং উইকেন্ডের রবিবার- সে ব্যাংগালোরের ফ্ল্যাটে, আর শমিতা ফোনে, তার সাথে। শমিতা তাকে আনন্দবাজারের পাত্রচাই থেকে মেয়েদের প্রোফাইল পড়ে পড়ে টিজ করছে, এদিকে তার চোখ জড়িয়ে যাচ্ছে ঘুমে। শমিতা কোন এক কলেজের অধ্যাপিকার প্রোফাইল পড়ে বলছে, এর সঙ্গে তার বিয়ে হলেই বেশ হয়। তারপর বলল- বিয়ে টিয়ে হয়ে গেল, সুখের সংসারে দশবছরের অ্যানিভার্সারি, সেদিনও যদি শমিতা তাকে ডেকে পাঠায়, সে যেন চলে আসে। সেদিন ফোনের মধ্যেই চুমু খেতে শুরু করেছিল সে। কিন্তু, তখন থেকেই সে জানে, ডেকে পাঠালে তাকে আসতেই হবে। এইবার সেই ডাক এসেছে।

    শমিতার পাঠানো ঠিকানাটা গুগল ম্যাপের লোকেশন পিক করছে না। মার্টিন নগর অবধিই পাওয়া যাচ্ছে ম্যাপে। স্যাটেলাইটের ছবি দেখলে সেখানে বাড়ি, রাস্তা, জঙ্গল, মাঠ এইসব দেখা যাচ্ছে। ফলে নোটিশবোর্ডে টাঙানো ম্যাপের নির্দেশ মেনেই এগোতে হবে। রাস্তায় কোনও যানবাহন চোখে পড়ছে না তার। দু-দিকে ঝোপঝাড়, ঝোপের থেকে উঁকি মেরে দূরে মনে হয় চাষের জমি, আর পিচ ওঠা এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ধরে সে এগিয়ে চলেছে। ভেতরের বসতির শুরু মনে হয় আরেকটু পরে। দূরে, অনেকটা দূরে সম্ভবতঃ লোকের চলাচল দেখা যাচ্ছে, আবার না-ও হতে পারে, পাতায় রোদের আলো আঁধারির খেলা হয়তো। জনবসতি হয়তো আরও কিছুটা পর থেকে শুরু হত। শমিতা বলেছিল বড়ো রাস্তা থেকে সাইকেলে করে আসে অনেকে- যারা ঘরের কাজ-টাজ করতে আসে আর কি। ফ্যাক্টরির লেবাররাও নাকি সাইকেলেই যাওয়া আসা করত। গেটের কাছে সাইকেল জমা রাখার দোকানের কথা বলেছিল- চোখে পড়ল না। অবশ্য মার্টিননগরের সে-দিন গিয়েছে। কারখানাটা একসময়ে রোজ খবরে আসছিল, লক আউটের জন্য। যখন কলকাতার বাইরে থাকত, ব্যাংগালোর না, তার পরে যখন পুনেতে থাকত, টাইমস অফ ইন্ডিয়া রাখত, পুনের এডিশন- সেখানেও এই কারখানার স্ট্রাইক লক আউটের গল্প আসত। একবার টিভি ডিবেট শুনেছিল সে, লিবারেলাইজেশনের পরে দেশীয় শিল্প কীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানে একজন মার্টিন নগরের স্পেয়ার পার্টসের ফ্যাক্টরির কথা বলেছিলেন। আরও অনেকগুলো কারখানা ছিল এখানে। হয়তো সেগুলোও টিম টিম করে টিকে আছে, বা উঠে গেছে। ঝোপঝাড় পার হয়ে মার্টিন নগরের ভেতরটায় ঢুকে এসেছে সে। কিন্তু, একদম শুনশান সব কিছু, সামনের মোড় থেকে ডান দিকে যেতে হবে। ম্যাপবোর্ডে তেমনই বলেছিল।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন