এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মৃত শহরের পথে

    Somnath লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৬৬ বার পঠিত
  • |
    তার বাঁদিকে এখন একটা মাঠ পড়ছে, ডানদিকে বাগান ঘেরা একটা বাড়ি- মার্টিন নগর শহর পরিচালনার দপ্তর- দেওয়ালের রঙ চটে গেছে তার। বাগানটাও জঙ্গল হয়ে গেছে এখন। মাঠটা খুব বড়ো। প্রমাণ সাইজের ফুটবল মাঠের থেকে বড়োই। দুটো গোলপোস্ট আছে,মাঠের পরিধি বরাবর অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাক কাটা- একদিকে গ্যালারিও আছে। কিন্তু লোকজন নেই। ছেলেরা হয়তো স্কুল ছুটির পরে খেলতে আসে, এখন কেউই নেই। শমিতা খুব চিন্তিত ছিল ওর দাদাকে নিয়ে। দাদা ভালো ছাত্র আবার ওদিকে স্কুল লেভেলে সুব্রত কাপও খেলেছে। যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বাড়িতে ফিরে এল। সকালে মাঠে এসে বাচ্চাদের খেলার কোচিং দিত, আর তারপর সারাদিন বাড়িতেই বসে থাকত। শমিতা বলত ওর বাবার চাকরির ওখানে সমস্যা চলছে, তাছাড়া ওঁদের পেনশনও নেই। দাদা একটা চাকরি বাকরি করলে বাবা-মার মার্টিন নগর ছাড়ার পাসপোর্ট জুটে যেত। শমিতা নিশ্চয়ই নিজের পাসপোর্টের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। তাছাড়া শমিতা নিজেও তো চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছিল এদিকে ওদিকে।
    গোলচক্করটা থেকে ডান দিকের পথ ধরে সে। বেশ চওড়া রাস্তা, রাস্তার দুধারেই ফুটপাত, ফুটপাথের পাশে বড়ো বড়ো গাছ পথচারীকে ছায়া দেওয়ার জন্যে। কত ঝরাপাতা জমে আছে গাছের নীচে। রাস্তার উল্টোদিকে একটা স্কুল বাড়ি- শিশুবিকাশ উদ্যান। খুব পুরোনো মন্তেসরি স্কুল এটা। শমিতা বলেছিল, ও আর ওর দাদাও নাকি এখানে পড়েছে ছোটোবেলায়। মানে, ছোট্ট শমিতা ফ্রক পড়ে গলায় বোতল ঝুলিয়ে মায়ের হাত ধরে ঢুকত এই বাড়িটাতে। হতে পারে বাড়িটা তখন অন্যরকম ছিল, দেওয়ালে হয়তো মিকিমাউস, বাঁটুল দি গ্রেট আঁকা থাকত। সে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ স্কুলবাড়িটার দিকে। একদম জনশূন্য। বাচ্চাদের স্কুল এইসময়ে অবশ্য এমনিও ছুটি থাকার কথা। দেওয়ালে একটা একঘেয়ে হলদেটে রঙ, সবুজ দরজা। এখনকার কচিকাঁচাদের এমন স্কুলবাড়ি খুব ভালো লাগে কি? সামনের রাস্তা ধরে অনেকটা যেতে হবে মনে হয়, এর পরের বাঁকটা বাঁ-দিকে, সেখানে মার্কেট কমপ্লেক্সকে বাঁ-হাতে রেখে এগোলে রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, সেখানে কিছু দূর গিয়ে বি ব্লক। ফাঁকা রাস্তার ওপর একদলা পিচ পড়ে আছে। পিচ গলাতে মেশিন এসেছিল কখনও, রাস্তার কাজ হচ্ছিল, সেই কাজ যে আর শেষ হয়নি তা রাস্তার অবস্থাতেই প্রত্যয় হয়। গলা পিচের তাতে ফুটপাথের একটা অংশের ইটগুলো কালো হয়ে আছে, তার ওপরে বর্ষার শ্যাওলা জমেছিল হয়তো। এখন সবই শুকিয়ে আছে। কোনও পুরোনো অভ্যেসে জুতোর অগ্রভাগ দিয়ে খুঁটে তুলতে যায় সে। ইটের চোকলাসুদ্ধ উঠে আসে। বহুদিন মেনটেনেন্স নেই এইসব রাস্তার। কাগজে যখন মার্টিন নগর নিয়ে লেখা হত, সে পড়েছিল যন্ত্রাংশের কারখানাটা মালিক আর খুলছে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা নাকি কো অপারেটিভ করে কারখানা আবার চালু করেছিল। কো অপারেটিভ আবার মুনাফা করতে শুরু করলে মালিক নাকি কোর্টে কেস করে। অনেকদিন ধরে টানাপোড়েন চলত। তবে মূল ফ্যাক্টরি বাদ দিলেও আরও অনেককিছু ছিল তো। এই তো, কালো গেট বন্ধ একটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সামনে এসেছে সে। গেটের গায়ে সাদাকালিতে লেখা নাম এখনও পড়া যাচ্ছে। ভেতরে ছ-সাতটা গাড়ি বা গাড়ির কঙ্কাল, ঘাসে ঢেকে আছে গাড়িগুলোর তলদেশ। আসল কারখানাগুলো না চললে সেখানে ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা চলবে না এই তো স্বাভাবিক। উল্টোদিকে রাস্তার ওপর একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। এই বাস শেষ কবে চলেছিল বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে স্কুলবাস ছিল এটা। শমিতা বলেছিল, ও ছোটোবেলায় স্কুলবাসে করে স্টেশন ছাড়িয়ে কনভেন্ট স্কুলে যেত। বাস মিস হয়ে গেলে ওর বাবা খুব জোরে স্কুটার চালিয়ে মেনগেটের কাছে বাসটাকে ধরে ফেলতেন।
    বন্ধ দোকানপত্রকে পাশে রেখে ফাঁকা রাস্তা ধরে সে এগিয়ে চলে পরের ল্যান্ডমার্কের দিকে। শমিতার সঙ্গে কখনওই দেখা হয়নি তার। খুব অদ্ভুত শোনায় ব্যাপারটা। সে ব্যাংগালোরে চাকরি করত তখন, তারপর পুনেতে গেল, মাঝে বেশ কয়েকবার অনসাইটেও গিয়েছে। শমিতা তো ছিল এইখানেই। শমিতা অবশ্য কলকাতা যেত না এমন নয়, প্রায় রোজই যেত- ইউনিভার্সিটিতে যেত, তারপর কম্পিউটার শিখতে যেত, টিউশনিও তো করত কিছু উল্টোডাঙার দিকে। কিন্তু সে যখনই কলকাতা এসেছে কিছু একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। একবার হল শমিতার বাবার স্ট্রোক, হাসপাতাল থেকে ফিরবার পর তাঁকে ছেড়ে বেরোতেই পারল না শমিতা। একবার ঠিক ওইসময়েই ওরা ভুটান ঘুরতে গেল। এরকমই কিছু না কিছু লেগে থেকেছে। একবার তো একদিনের ছুটি নিয়ে সে এসেছিল শুধু তারা দেখা করবে বলে। সেদিন জমি অধিগ্রহণে আন্দোলনের ওপর গুলি চলল। সব ট্রেন বাস বন্ধ হয়ে গেল। শমিতা বলত- ‘একেবারে পাকাদেখা দেখতে এসো, বাবা মা-কে নিয়ে। লুচি মাংস আর পায়েস খাওয়াবো তোমাদের। মাংস আমি রান্না করব। তবে পায়েসটা মা-কে করতে বলব। আমার মায়ের হাতের পায়েস খেলে তোমার বাবা কোনওভাবেই এ-বিয়ে বাতিল করতে পারবেন না।‘ সামান্য রসিকতা, কিন্তু এতেই শরীর উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল তার। উল্টোদিকের রাস্তায় একটা বেকারি, বন্ধ হয়ে আছে। শমিতা হয়তো এইটার কথা বলেছে, এদের কাপ কেক ওর মা কিনে আনত ইউনিভার্সিটির টিফিনের জন্য। শপিং কমপ্লেক্সটার সামনে এসেছে। তিনতলা বিল্ডিং। মনে হয় একটু আগেই চাঙড় ভেঙে পড়েছে কার্নিশ থেকে- ধুলো উড়ছে। একদিন সে শমিতাকে যখন ফোন করেছিল, শমিতা বলল এই শপিং কমপ্লেক্সেই এসেছে, অন্তর্বাসের দোকানে। সে বলল ট্রায়াল করে তাকে ছবি তুলে পাঠাতে। শমিতা বলেছিল কত শখ বাবুর! শমিতা আরও বলেছিল, দোকানের জানলা দিয়ে একটা ফোয়ারা দেখা যাচ্ছে, সেখানে প্রেমিক প্রেমিকারা বসে আছে। এখন মনে হয় এই বাড়ি বিপজ্জনক, ভেতরে ঢোকা যাবে না, যদিও কাঁচের গেটটা ঠেললে খুলবে না চিরতরে বন্ধ বোঝা যাচ্ছে না তা। খুব সাজানো গোছানো প্ল্যানড একটা টাউনশিপ ছিল এইটা। আজ এক পরিত্যক্ত পুরীর মতন পড়ে আছে- শপিং কমপ্লেক্সের উল্টোদিকে বাস স্ট্যান্ডের শেড। সেই ১৭-র বি বাস এইখানে দাঁড়াত নিশ্চিত। সে হেঁটে বাস স্ট্যান্ডটার দিকে গেল- মানুষজনের শেষ চিহ্ন ওখানে থাকতে পারে- বসার সিটে কোনো ছেঁড়া টিকিট, কিম্বা রাস্তার ধুলোর ওপরে বাসের চাকার দাগ, এরকম কিছু। বাস স্ট্যান্ডের পাঁচিলের ওপর দিয়ে দেখা গেল পেছনে একটা নালা বইছে। মার্টিন নগরের তোরণ দিয়ে ঢুকবার পর প্রথম কোনও চলমানতা, কোনও প্রবাহ দেখতে পেল সে। নর্দমার জল নোংরা, কালো বয়ে চলেছে- এতটা দূর থেকেও নর্দমার দুর্গন্ধ আসছে। অথবা, এই নর্দমাই একটা সংকেত হতে পারে, কাছে কোথাও কোনও মানুষের বসতি আছে, বর্জ্য জলের উৎস সেইখানেই। কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু আবাসনে হয়তো লোক এখনও আছে। হতেই পারে, তারা অন্যত্র চাকরিবাকরি করে, এইখান থেকে যাতায়াত করে। হয়তো তারা অল্প কজনই আছে। শমিতার দাদা হয়তো কলকাতার কোনও কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে, এখান থেকে নিজের গাড়িতে যায়। শমিতাও মনে হয় এতদিনে চাকরি পেয়ে গিয়েছে। শমিতা কি এখনও এখানে থাকে? নিশ্চয়ই থাকে, কারণ ঠিকানাটা তো শমিতাই পাঠিয়েছে নিজের মোবাইল থেকে। সে আসবার আগে ওই নাম্বারে শমিতাকে ফোন করতে চেয়েছিল। কত বছর পরে কথা হত তাদের, ঐ নম্বরটা, ঐ দশটা সংখ্যাই ক্রমানুসারে তার এখনও মনে আছে- কিন্তু কানেক্ট হয়নি, কুঁক কুঁক করে কেটে যাচ্ছিল লাইন।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন