

ছবি: রমিত
আমস্টারডাম; একান্ত ব্যক্তিগত
আগমন
- আগে কখনো এদেশে এসেছেন?
- হ্যাঁ, হল্যান্ডে এসেছি আগে।
- আমস্টারডামে কখনো এসেছেন?
- হ্যাঁ।
- কতদিন আগে?
- তা এই ধরুন পঞ্চাশ বছর হবে, আপনার জন্মের অনেক আগে। তার
পরেও অনেক বার, কাজে। বেশির ভাগ সময় গাড়িতে।
এককালে ইমিগ্রেশন অফিসারের নাকের ডগায় ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেখিয়ে কয়েক সেকেন্ডে সীমানা পার হয়েছি, সব সময়ে সঠিক পাতা খুলে আত্ম পরিচয় প্রদর্শন করতে হয়নি, কখনো কোন স্ট্যাম্প পড়েনি পাসপোর্টে।এখন দিনকাল বদলেছে। স্বেচ্ছায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিত্যাগ করে আমরা হয়েছি ব্রাত্য, অবাঞ্ছিত। নানান দেশের ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পাসপোর্ট উলটে পালটে দেখেন, একান্ত অব্রিটিশ মুখচন্দ্রিমা অবলোকন করেন, সাত সতেরো প্রশ্ন তোলেন। হাসিমুখে তার জবাব দিতে হবে জানি, তবু আজ এই স্কিফোল এয়ারপোর্টে মনে হল এই তরুণ অফিসারকে কি বোঝাতে পারি ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসের এক শীতল সন্ধ্যায় কলকাতা হতে ফ্রাঙ্কফুর্ট যাবার পথে আকাশে কোথাও সুটকেস হারিয়ে এই আমস্টারডাম পৌঁছেছিলাম? আবার অনেক বার এসেছি টুরিস্টের বেশে - একদিন ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে মাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি, ছোট্ট ঐন্দ্রিলা সমুদ্রের জলে প্রথম পা ডুবিয়েছে এদেশের বিচে, কিনডারডাইকে দেখেছে প্রথম হাওয়া কল, কয়কেনহোফে আমরা দেখেছি মে মাসের অন্তবিহীন টিউলিপের মেলা। একদিন পালা বদল; হল্যান্ড আমার অন্যতম কর্মক্ষেত্র। লন্ডন থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে ডেন হাঘ, হোফডর্প বা উটরেখটের হোটেলে রাত্রিবাস, আবার অতি বিশ্বস্ত সময়নিষ্ঠ ডাচ ট্রেন ধরে আমস্টারডাম, রটারডাম, ডেন হাঘ, নেইমেঘেন শহরে বাণিজ্যের সন্ধানে ঘুরেছি। এসব গল্প নিজেরই বিশ্বাস হয় না, এঁকে আর কি বলি।
লাইনে আমার পেছনে কেউ নেই, হাওয়াই জাহাজের আরও অনেক যাত্রীর মত আমার বউ মেয়ে তাদের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপত্রের বাইওমেট্রিক ছাপ দিয়ে স্বতন্ত্র পথে হল্যান্ডের সীমানায় ঢুকে পড়েছে।
আমার শেষ মন্তব্যটি শুনে ইমিগ্রেশন অফিসার মৃদু হাসলেন
- কী করেন?
- করতাম, ব্যাঙ্কিং। মাঝের তিরিশ বছর কাজের চাপে এখানে এলেও দেশটা ঠিকমত দেখা হয়ে ওঠেনি। তাই আমার জীবনের তৃতীয় পরিচ্ছেদে একেবারে পাক্কা টুরিস্ট বনে গেছি।
- দেখার কিছু বাকি আছে? এবারের কোন বিশেষ কারণ?
- আছে, দু দিন আমস্টারডাম আর তারপর আপনাদের দেশের শেষ ফরমুলা ওয়ান রেসিং, জানডফোরট।
যুবক হেসে ছাপ মেরে পাসপোর্ট ফেরত দিলেন।

নদীর নামে নাম
রাবোব্যাঙ্কের মারটেন বলেছিলেন, ডিমান্ড সাপ্লাই থিওরির প্রকৃষ্ট ব্যতিক্রম কোনটা জানেন? ছ’দিনে দুনিয়া তৈরির কাজ শেষ হলে পর ঈশ্বর নতুন জমি সাপ্লাই রুটে কুলুপ মেরে দিয়ে বললেন ডিমান্ড যতোই বাড়ুক না কেন, নদী সমুদ্রের এখানে ওখানে দুটো চর জেগে উঠতে পারে, জমির সরকারি সরবরাহ আর বাড়বে না। কিন্তু তিনি আমাদের মানে নেদারলানডারদের চিনে উঠতে পারেননি। আমরা সমুদ্র থেকে মাটি উদ্ধার করেই চলেছি। তবে খাটনি আছে, জলের গতি ও মাত্রাকে সব সময়ে চোখে চোখে রাখতে হয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশে জল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেউ এত মাথা ঘামায় না।
নিঃসন্দেহে তার মোক্ষম উদাহরণ এ দেশের হাওয়াই আড্ডা।
রবীন্দ্রনাথের গল্পে সাত বাঁও মেলে না পড়েছি কিন্তু তার মানে কতোটা জল জানি না। তবে জানি এককালের হারলেম লেক বুজিয়ে স্কিফোল বিমান বন্দর বানানো হয়েছিল, সেটির অবস্থান আজ সমুদ্রস্তরের প্রায় পাঁচ মিটার নিচে। আশে পাশের বাঁধে ফুটো হলে এই বিশাল এলাকা জলে ডুবে যাবে মুহূর্তের মধ্যে এই সব বলে রোদিকার আতঙ্ক বর্ধন করি।
আমস্টেল নদী হল্যান্ডের উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে এসে পৌঁছয় আই উপসাগরে, যেটি মিশেছে তার অন্তিম লক্ষ, উত্তর সাগরে। আটশো বছর আগে একদিন কিছু মেছুরে সেই নদীর জলে বাঁধ (ডাম /ড্যাম ) দিয়ে খানিক বাসযোগ্য জমি উদ্ধার করলেন, তাকে বললেন আমস্টেলরেডাম। তা থেকে একদিন বসতির নাম হয়ে গেল আমস্টারডাম।
সেই শুরু।
স্প্যানিশ শাসনের অবসানের পরে সতেরশো শতাব্দীর গোড়ায় ডাচ স্বর্ণযুগের প্রারম্ভ - তাঁরা পাল তোলা জাহাজ পাঠালেন সোনার দেশ ভারত পানে যেখানে আকবর, জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যে পৃথিবীর প্রায় তিরিশ শতাংশ ধন উৎপন্ন হয়। স্প্যানিশদের প্রাথমিক লক্ষও ছিল সেই দেশ কিন্তু কলোম্বাসের গুগলে গোলমালের দরুন তাঁরা গিয়ে পৌঁছুলেন অন্য মহাদেশে। একমাত্র পর্তুগিজ গেলো সঠিক নিশানায়, তার পেছনে এলেন ডাচ। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্লু প্রিন্ট বানাবার একশো বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ফেরআইনিগডে ওস্টইনডিশে কোম্পানি) -এটি ইউরোপের প্রথম জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী ডাকাতির লাভের অংশ পাওয়া সম্ভব ছিল। বাকি ইউরোপকে পিছনে ফেলে নেদারল্যানডসে (হল্যান্ড নামের কোন দেশ নেই, সেটা দুটো মাত্র প্রদেশের নাম) গড়ে উঠলো প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাঙ্কিং সিস্টেম, ডাচ গিলডার বেজায় তাগড়া, দুনিয়ার প্রথম রিজার্ভ কারেন্সি, আমস্টারডাম ফাইনানশিয়াল ক্যাপিটাল অফ ইউরোপ। জাহাজ না হয় পাল তুলে দূর দেশের পানে চলে গেলো, তাদের মালিকদের চাই অফিস (কানটর) এবং বাসস্থান। আমস্টারডামে ঠাঁই কম। জমি সৃষ্টির কর্তা ঈশ্বরকে হাস্যমুখে উপহাস আমস্টারডামের ধনী ব্যবসায়ীরা আরও জমি উদ্ধার ও খাল কাটানো শুরু করলেন। জাহাজ থেকে নামানো দ্রব্য সামগ্রী ছোট নৌকা বা বজরায় চড়ে পৌঁছে যাবে ব্যবসায়ীদের ভাঁড়ার ঘরে, সেখান থেকে বাকি ইউরোপে। সেই খাল বরাবর তৈরি হবে শ্রেষ্ঠীদের বাসভবন।
আমস্টারডামের স্বর্ণ যুগে একটি আইন প্রণীত হয় – বাড়ির ট্যাক্স নির্ধারিত হবে তার সদরের মাপ অনুযায়ী, যে বাড়ির সামনের দেউড়ি যতো চওড়া, তার কর ততো বেশি। ফলে এমনকি ধনী ব্যক্তিরাও কোন পেল্লায় ম্যানশন বানাননি। বহুতল বাড়ির আকাশ পথ যাত্রাতেও বাধা, ৫৫ মিটার ম্যাক্সিমাম! সেই কারণে আমস্টারডামের অট্টালিকার দেহ ক্ষীণ, উচ্চতা মাঝারি; সিঁড়ি অসম্ভব সরু। যে কারণে পিয়ানো বা আসবাব পত্র বাড়িতে ওঠানো নামানো হয় সেই তিনশো বছর আগে বাড়ির মাথায় লাগানো আংটায় দড়ি বেঁধে! একেবারে অনন্য, ইউনিক!

স্বর্ণযুগের বাড়ি
চার বছরের মধ্যে কাটা হল তিনটি প্রধান খাল – কাইজারসঘ্রাঘট, প্রিন্সেনঘ্রাঘট, হেরেনঘ্রাঘট (সম্রাট কানাল, পবিত্র রোমান সম্রাট প্রথম মাক্সিমিলিনের নামে; রাজকুমার কানাল, ভদ্রমহোদয় কানাল), প্রতি কানালের দৈর্ঘ্য মোটামুটি আড়াই কিলো মিটার, তাদের সেতুর সংখ্যা বারো থেকে চৌদ্দ। জল নিয়ন্ত্রণের বা রেগুলেশনের জন্য কাটা হল রেঘুলিয়েরসঘ্রাঘট; অর্ধচন্দ্র আকৃতির কানাল জুড়ে তৈরি হল একটি জলশৃঙ্খলা – কানালবেল্ট (ঘ্রাঘটেনগরডেল)। সম্রাটের সম্মানে কাটানো কাইজারসঘ্রাঘট সবচেয়ে চওড়া, তিরিশ মিটার; রাজকুমার এবং ভদ্রমহোদয় কানাল এই একটু মানে দু পাঁচ মিটার সরু, তাদের সঙ্গে জুড়ে গেলো আরও জলপথ।
আলব্যের কামুর শেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘পতন’ (লা শুত / দি ফল) প্যারিসের এক সফল উকিল জ ব্যাপতিস্ত ক্ল্যামঁসের কাহিনী; নিজের চমৎকার সাজানো গোছানো জীবনটি ভেঙ্গে চূরে গেলে জঁ ব্যাপতিস্ত আসেন আমস্টারডামে, দিন, সন্ধ্যে কাটান রেড লাইট ডিসট্রিক্টের মেক্সিকো পাবে (৯১ ওয়ারমোসস্ট্রাট, বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেক দিন), নিজের জীবন কীভাবে যেন তলিয়ে যাচ্ছে এক কোন অতলে, দান্তের ইনফারনোতে বর্ণিত নরকের বৃত্ত মনে পড়ে তাঁর। কানালের শৃঙ্খলাকে মনে হয়েছে কনসেনট্রিক সারকলস অফ হেল।
নাগরিকের বাহন, শহরের শোভা
আমস্টারডাম শহরের লোকসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ, সাইকেল সম সংখ্যক। যতটুকু মনে আছে, ১৯৭৭ সালের প্রথম দর্শনে সরু সরু রাস্তায় যানজট দেখেছিলাম; অ্যাকসিডেন্টে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা অকল্পনীয়, বিশেষ করে স্কুলে আসা যাওয়ার পথে শিশুমৃত্যু। আওয়াজ উঠেছিল শিশুবধ থামাও, স্টপ ডে কিনডারমরড। গাড়ি বন্ধ বা কমানোর প্রকল্প নেওয়া হলো। পরের পর দশকে দেখলাম কেমন স্বচ্ছন্দে চার চাকাকে সরিয়ে দু চাকার বাই সাইকেলের পথ ক্রমশ তার দখল বাড়িয়েছে।
তার মাঝে ট্রাম চলে মৃদু মন্দ গতিতে; চলার পথের টুং টাং আওয়াজ শুনলে আমার আরেক শহরের ট্রামের কথা মনে পড়ে যায়। কলকাতা যাকে মিউজিয়ামে পাঠিয়েছে আমস্টারডামে সেই ট্রাম দৈনন্দিন জীবনের আবশ্যিক অঙ্গ। শহরের কোথাও কোথাও ট্রাম চলে সিংগল লাইনে, ক্যানাল সেতুর ওপরে বা সুবিধে মতন একে অপরকে পাস কাটায়, ঠিক যেমন দেশে থাকতে ট্রাকের পিছনে লেখা দেখেছি, জগহ মিলনে পর পাস দেঙ্গে!
‘অনুগ্রহ করে এখানে আপনার সাইকেল রাখুন বা বেঁধে রাখতে পারেন’ এমন কোন সাদর সম্ভাষণ কোথাও দেখিনি – তেমনি কানালের ওপরে এমন কোন ব্রিজও দেখিনি যার রেলিঙে অন্তত ডজন চারেক বাই সাইকেল বাঁধা নেই। আমার মতে দ্বিচক্র যান বাড়ায় সেতুর শোভা, একেবারে লজঝরে বাইকের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ফুলে ফুলে ঢাকা, কোথাও সুচারু শিল্পকর্মে মণ্ডিত বাই সাইকেল।


শহরের শোভা
বাই সাইকেল শুধুই একটি জন বাহন নয়, সেটি এই শহরের শোভা। জনশূন্য আমস্টারডাম দেখতে আমি রাজি, কিন্তু বাই সাইকেল বিবর্জিত আমস্টারডাম নয়, সে হবে এক সাই ফাই দুঃস্বপ্ন।
যেখানে খুশি সেখানেই তালা মেরে সাইকেল রেখে যাওয়ার চিরাচরিত প্রথাটি সকলেই ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখেন না, ফ্যাশনেবল দোকানিরা তো নয়ই। সেদিন খুব পশ দোকান এলাকায় চোখে পড়ল কড়া নির্দেশ ‘এখানে সাইকেল পার্ক করা মানা ‘- তার সামনেই বেশ কিছু সাইকেল আরামে জিরুচ্ছে।


সাইকেল পারকিং ফাইনের আইন নেই আমস্টারডামে; তবে সেটি নিতান্ত বাধা বন্ধ সৃষ্টি করলে তিতিবিরক্ত হয়ে পুলিস সেই আইন ভঙ্গকারী সাইকেলটি তাদের পিঁজরাপোলে তুলে নিয়ে যায়, ছাড়ানোর স্ট্যান্ডার্ড খরচ পঁচিশ ইউরো। ইউরোপের যে কোন শহরের তুলনায় অবশ্য আমস্টারডামের পথে পুলিশের দর্শন দুর্লভ।
পৌর পিতাদের আরেকটি কাজ কানালের তল থেকে বেওয়ারিশ বাই সাইকেল উদ্ধার করা। বললে পেত্যয় যাবে না, মাসে নিদেনপক্ষে এক হাজার সাইকেলকে তাদের সলিল সমাধির শান্তি বিঘ্নিত করে ডাঙ্গায় তুলে আনা হয়, নইলে জলযানের সঙ্গে তাদের টক্করের সম্ভাবনা। সেই বিশাল দাঁতালো সাঁড়াশি আমস্টারডামের নিস্তরঙ্গ জনজীবনে একটি অবাঞ্ছিত আলোড়ন।

নাইন স্ট্রিটস – দোকানের বাণী
প্রিনসেন, কাইজার,এবং হেরেন ঘ্রাঘট -পাশাপাশি এই তিনটে কানালের সমান্তরাল তিনটে রাস্তা, তিনেক্কে তিন - তাদের একত্রে বলা হয় নেঘেন স্ত্রাযে (নটি পথ ); সারি সারি দোকান, আমস্টারডামের অক্সফোরড স্ট্রিট বা ফিফথ এভেনিউ। তবে এখানে গ্লোবালাইজড ব্রান্ড আপনার চোখে পড়বে কম, প্রত্যেকের একটা স্বতন্ত্র চেহারা, উপস্থিতি আছে। এখানে এলে বহুকাল আগে পড়া ও হেনরির ‘শহরের বাণী’ গল্প মনে পড়ে যায় - এই নাইন স্ট্রিটসে ছোট ছোট দোকানের জানলায়, দেওয়ালে, সাইনবোর্ডে বাঙময় হয়ে ওঠে তারা।













আমস্টারডামের এক উঠোন - লিডসেপ্লেইন
দক্ষিণ হল্যান্ডের লাইডেন শহরে দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় (১৫৭৫ ); সেখান থেকে যে রাস্তাটি একদিন রাজধানীতে এসে শেষ হতো, যেখানে ঘোড়া বাঁধা হতো তার নাম আজকের লিডসেপ্লেইন, আকারে ছোট কিন্তু সব সময় গমগম করছে বিশেষ করে রেতের বেলা; এই স্কোয়ারের শুচিতা রক্ষার কারণে আমস্টারডামের পৌর পিতারা একটি নোটিস টাঙ্গিয়ে রেখেছেন, ডাচ এবং ইংরেজি দুই ভাষায়, মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!

একুশে আইন
স্রোতের বিরুদ্ধে - হাতে রাখো হাত
অনেক বছর যাবত ডাচ সমাজের নানান অপরাধ বিশেষ করে ড্রাগ, গ্যাংল্যান্ড দৌরাত্ম্য, সংখ্যালঘু এবং ইমিগ্রান্টদের প্রতি বৈষম্য এবং উঁচু সমাজের দুর্নীতির তদন্ত করেছিলেন অকুতোভয় সাংবাদিক পিটার দে ফ্রিজ (হাইনেকেন বিয়ার গ্রুপের বিলিওনেয়ার মালিক ফ্রেডি হাইনেকেনের অপহরণকারীকে খুঁজে বের করতে তাঁর সহযোগিতা স্মরণীয় )। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের পরে লিডসেপ্লেইন দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন, অজ্ঞাত আততায়ীর পাঁচটি বুলেটে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন পিটার। সেদিন ৬ জুলাই ২০২১। ন দিন বাদে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পিটারের জীবনজোড়া সংগ্রামকে সম্মান জানাতে আমস্টারডাম নগর সমিতি একটি স্মারক স্থাপনা করেছেন লিডসেপ্লেইনে, যেখানে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তার কয়েক মিটার দূরে। রিনি হুরকমানসের এই স্থাপত্যের নাম ‘স্রোতের বিরুদ্ধে’ (টেঘেন আলে স্ট্রোমেন ); উদ্বোধনের সময়ে মেয়র ফেলকে হালসেমার পাশে দাঁড়ালেন এমন কয়েকজন মানুষ যারা পিটারের সাহসী সাংবাদিকতার কারণে উপকৃত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ইরিত্রিয়ার ইওসেফ টেকেসটে ইয়ামানে; চৌদ্দ বছর ধরে প্রত্যাখ্যাত হবার পরে পিটারের মৃত্যুর দু দিন আগে স্টেটলেস ইয়ামানে পেয়েছিলেন ডাচ পাসপোর্ট।
স্রোতের বিরুদ্ধে স্মারকে একচল্লিশটি ভাষায় লেখা আছে পিটারের শেষ কথাগুলি যা তিনি তাঁর মেয়ে কেলিকে বলেছিলেন;
ইংরেজিতে
Stay true to yourself. When necessary, stand up for the weak and minorities, speak your mind honestly and listen to your sense of justice. And pass it on to your children. Then everything will be fine.
বাংলায়
নিজের প্রতি সব সময়ে সৎ থাকুন। প্রয়োজনের সময়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ান,দুর্বল এবং সংখ্যালঘু মানুষের পাশে। সততার সঙ্গে আপনার মনের কথা বলুন বিবেকের কাছে সৎ থাকুন। এগুলি আপনার সন্তানদেরও করতে বলুন। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।


স্রোতের বিরুদ্ধে
হেরেনঘ্রাঘট ৫৪৫
তিনটি মেয়ে সিঁড়িতে বসে গল্প করছিলো। তাদের বললাম ‘যদি কিছু মনে না করো এখানে একটা ছবি তুলতে চাই। প্রায় চার দশক আগে এই বাড়িতে বাণিজ্য উপলক্ষে আমার আসা যাওয়া ছিল’। তারা সসম্ভ্রমে উঠে গিয়ে সিঁড়িটা খালি করে দিলো। মায়া আমাকে খানিকটা জনান্তিকে বলল, বাবা ইজ দিস ইয়োর রেবেকা মোমেন্ট এগেন?
মাঝে মাঝেই ছেলে মেয়েরা ওটা মনে করিয়ে দেয়! দাফনি দু মরিয়েরের রেবেকা উপন্যাসের প্রথম লাইন - লাস্ট নাইট আই ড্রেমট আই ওয়েনট টু ম্যানডারলে!
আমার ছেলে মেয়েদের কোন দোষ নেই, ইউরোপের যেখানেই যাই তাদের শুনতে হয় ওই যে বাড়িটা দেখছ এক সময়ে ওখানে আমাদের অফিস ছিলো, এই বাড়িতে ব্যবসার ধান্দায় আসতাম, ওইখানে আড্ডা দিয়েছি। অন্য কিছু স্মৃতি চারণ অব্যক্ত থেকে যায়।
গেব্রাউ স্টালের বাড়িতে সিটি ব্যাঙ্ক আমস্টারডামের প্রথম অফিস; দু’শো বছরের পুরনো এই বাড়ি কোন ধনী মানুষের বাস ভবন ছিল, সেটি মোটেই অফিসের জন্য বানানো হয়নি। বেন ফন রুইয়ানের কেবিন থেকে হান্স ফেরদোসের অফিস যেতে তিনটে সিঁড়ি টপকাতে হতো। এই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আজ এক ঝটকায় দেখতে পাই অনেককে- এরিক লেমেন্স, রোমিও ফন ডের লরখ, আনো কাম্পহাউস, রুডি, ওয়াউটারস, ক্রিস দে ভ্রিজকে। হান্স ফেরদোস, পাউলি কবে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে। একবার স্কিফোল থেকে ট্যাক্সিতে চড়ে বসেছি, পকেটে কোন গিলডার নেই, ড্রাইভার ক্রেডিট কার্ড নেবে না। ৫৪৫ হেরেনঘ্রাঘটের সিঁড়িতে আনো আমার অপেক্ষায় আছে, কাস্টমার মিটিঙে যাবো, ট্যাক্সি থেকে নেমেই তাকে বললাম ৩০ গিলডার দাও দিকি, ট্যাক্সির ভাড়া মেটাতে হবে!
এখান থেকে দু পা গেলেই রেমব্রান্ডটপ্লেইন।


হেরেনঘ্রাঘট ৫৪৫
রেমব্রান্ডটপ্লেইন - রাতের প্রহরা / নাইট ওয়াচ
অফিসের পরে কতো যে সময় কেটেছে এইখানে। এক গ্রীষ্ম সন্ধ্যায় আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়ে গুলতানি করছি, হান্স চুরুট খাচ্ছেন। হঠাৎ পাব থেকে হই হই করে বেরিয়ে এক দঙ্গল মহিলা আমাদের ঘিরে ধরলেন; তাঁদের কারো একজনের বিয়ে হবে আগামী শনিবার, আজ তাঁদের হেন পার্টি। ঠিক করেছেন এই চত্বরের সকল পুরুষ মানুষকে তাঁরা চুমু খাবেন! এমন ঘটনা বিরল তাই মনে থেকে যায়!
রেমব্রান্ডটপ্লেইনের মাঝখানে স্ট্যাচু -তিনি স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন চত্বরের মাঝে। এক প্রান্তে বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত পেনটিং, নাইট ওয়াচ ( নাখট ওয়াখট ); বারো ফুট বাই পনেরো ফুট, ঠিক যেমনটি আপনারা দেখেন রাইকমুজিয়ামে। চারিদিকে সুখী জনতা মৃদু কলরব।
হেরেনঘ্রাঘটের দিকে এগুলে চোখে পড়ে ডাচ পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের পুরোহিত এবং ১৮৪৮ সালের সংবিধান প্রণেতা ইওহান থরবেক স্ট্যাচু। তাঁকে ছাড়ালেই রেঘুলিয়েরসঘ্রাঘট। কানালগুলির জলকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য বানানো হয়েছিল, আজ এইখানে দাঁড়ালে চোখে পড়ে সাতটি সেতু। এই ত্রিবেণী তীর্থের সঙ্গমে সেই রেস্তোরাঁ এখনো আছে যেখানে এক সময়ে বাঙ্ক মিজ অ্যান্ড হোপের আনেমিক বেরেনড এবং লুই রয়টারের সঙ্গে আড্ডা হয়েছে। মনটা কোথায় কোথায় যে চলে যায়।

রেমব্রান্ডটপ্লেইনে রেমব্রাঁর স্ট্যাচু

নাইট ওয়াচ (নাখট ওয়াখট)
দেবতাদের ভোজনালয়
ইন্দ্র গণেশ শিব দুর্গা নামের রেস্তোরাঁ কলকাতায় চোখে পড়েনি, হল্যান্ডে আকছার দেখেছি। ভারতীয় নয়, এগুলি এনেছেন ইন্দোনেশিয়ানরা যে দেশে ডাচ তিনশ বছর রাজত্ব করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় অর্থের নাম রুপিয়া, রুপিয়ার ওপরে গণেশের ছবি, বিমান পরিবহনের নাম গরুড়। তাই আমস্টারডামে আমাদের হোটেলের উলটোদিকের রেস্তোরাঁর কার্তিক নাম দেখে অবাক হই না।

কার্তিকের নামে ভোজনালয়
আসলে নকলে
সুরিনামপ্লাস থেকে সতেরো নম্বর ট্রাম ধরে আমস্টারডাম সেন্ট্রাল স্টেশনের সামনে নেমেছি। মায়া ও আমি যাবো জানডফোরট; ঘুরে ফিরে আবার ইতিহাসে চলে যাই – ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে জানডফোরট এসেছিলাম আমাদের এক বছরের মেয়ে ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে, এখানেই সে সাগরের জলে প্রথমবার পা ডুবিয়েছিল চার দশক আগের একদিন!
আজকের প্রসঙ্গ অন্য; ছোট মেয়ে মায়ার আবদারে যাবো গাড়ির দৌড় দেখতে! ১৯৩৯ সালের মে মাসে টুরিস্টদের আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে একটি সাদাসিধে ট্র্যাকে মোটর রেসিং আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় মেয়র। মাস চারেক বাদে সেখানে হাজির হলেন কয়েক হাজার অনাহুত জার্মান সৈন্য। যুদ্ধের পরে ১৯৪৮ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল রেসিং শুরু, ১৯৫১ সাল থেকে ফরমুলা ওয়ান। জিম ক্লার্ক, নিকি লাউদা তাঁদের নাম এখানে খোদাই করে গেছেন, তবে সিলভারস্টোন বা মোনাকোর মতন সেটি বার্ষিক অনুষ্ঠান ছিল না। মাঝে মাঝেই বাদ পড়েছে।
হঠাৎ কি খেয়াল হল, মায়াকে বললাম এখানে দাঁড়িয়ে স্টেশনের বাড়িটা ভালো করে দেখো দিকি। মায়া বললে আগে অনেকবার তো দেখেছি। কেন? বললাম, রেমব্রান্ডপ্লেইনে নাইট ওয়াচের কপি দেখলে তো, এই আমস্টারডাম ট্রেন স্টেশনের বাড়িটা মনে রেখো। যদি কখনো উদিত সূর্যের দেশে যাও, দেখবে টোকিও মেন স্টেশনের আদলটা একই রকমের!

আমস্টারডাম সেন্ট্রাল স্টেশন

টোকিও মেন স্টেশন
এবার যাবো জানডফোরট – জানা গেছে সেখানে আগস্ট ২০২৬ সালের গাড়ির দৌড়টাই হবে হল্যান্ডের শেষ এফ ওয়ান রেসিং।
দেশের রাজা স্বয়ং আসবেন পুরস্কার দিতে। গোটা হল্যান্ড তাদের হিরো মাক্স ফেরস্টাপেনের বিজয়ের অধীর অপেক্ষায় আছে।
আমস্টারডাম
আগস্ট ২০২৬