

ছবি: রমিত
শাপমোচন
রবিবার, ২৬শে জুলাই
সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ এডমান্ডের ফোন। কথা বোঝা যায় না প্রায়, পেছনে প্রচুর কলরব। অত্যন্ত জড়িত কণ্ঠে এডমান্ড বললে, হীরেন, ক্ল্যাপহ্যামের পাব থেকে ফোন করছি। পঁচাত্তর বছর বাদে মেয়ো কাউন্টি অল আয়ারল্যান্ড ফুটবল কাপ জিতেছে। দি কার্স ইজ ব্রোকেন।
বিশ বছর আগে একটি বাণিজ্যিক রোড শোতে আমি এডমান্ডকে প্রথম দেখি, অন্য ব্যাঙ্কের প্রতিভূ হয়ে এসেছিল। তখন আমার ব্যবসায় কাজ করার জন্য লোক খুঁজছি; সেদিনের শেষে এডমান্ডকে বললাম, কমারতসব্যাঙ্ক ছেড়ে আমাদের ব্যাঙ্কে এসো। আমার দীর্ঘ কর্ম জীবনের সম্ভবত অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। অবসর নেওয়ার পরেও যোগাযোগ আছে, একসঙ্গে লর্ডসে ক্রিকেট দেখি।
গেলিক ফুটবলের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে কিন্তু আজ যে অল আয়ারল্যান্ড ফাইনাল তা মনে ছিল না। বুঝলাম বারোটা গিনেসের পরে এডমান্ডের বাকশক্তি থাকতে পারে, চিন্তাশক্তি আপাতত শূন্য। পরে জেনে নেওয়া যাবে।
মেয়ো

কাউন্টি মেয়ো (লাল সাদা লাইন ঘেরা অংশ)
অবিভক্ত আয়ারল্যান্ডের চারটে প্রদেশ; আলস্টার, মানস্টার, লাইনস্টার এবং কনট (Connacht ইংরেজি উচ্চারণে Connaught, যা থেকে দিল্লির কনট প্লেস)। আলস্টার এখন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্যের অংশ। স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের তিনটে প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি একেবারে পশ্চিমের, ইউরোপের অন্তিম ভূখণ্ড, কনট; তার পাঁচটি জেলা বা কাউন্টি; গলওয়ে (ইউরোপের মাটি ত্যাগের আগে যেখানে কলম্বাস শেষবার প্রার্থনা করেছিলেন), রসকমন, স্লাইগো, লাইটরিম এবং মেয়ো। আইরিশরা যে সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে শুধু তাই নয়, সঙ্গে নিয়ে গেছে অজস্র আইরিশ নাম- কনট প্লেসের মতন মেয়ো ক্লিনিক! কাউন্টি মেয়ো আকারে আমাদের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার অর্ধেক, জনসংখ্যার হিসেবে মাত্র এক শতাংশ। এক লক্ষ তিরিশ হাজার মানুষের বাস, আটলান্টিক উপকূল বরাবর এবড়ো খেবড়ো পাহাড়, জলা ভূমি কোথাও, বেশির ভাগ বাসযোগ্য নয়। সদর শহর কাসলবারে মাত্র তেরো হাজার লোক বাস করেন। মেয়োর গর্ব মেয়োর আশা তাদের গেলিক ফুটবল টিম। সারা বছর জনগণ অল আয়ারল্যান্ড ফুটবল প্রতিযোগিতার দিকে চেয়ে থাকেন। আমাদের যেমন ক্রিকেট, আমেরিকার যেমন বেসবল, আয়ারল্যান্ডের তেমনই গেলিক ফুটবল। কত লোক কোন দেশে সেটা খেলে, কে বা কারা সেটা বোঝে তাতে আইরিশদের কিছু যায় আসে না। ফুটবল এবং তার ফাইনালে বিজেতার হাতে এস এ ম্যাকগুয়ারের নামাঙ্কিত ট্রফি যার মুখচলতি নাম স্যাম (SAM) অলিম্পিকের গোল্ড মেডালের চেয়েও বেশি মূল্যবান। অল আয়ারল্যান্ড ফুটবলে খেলে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের পঁচিশটি এবং যুক্তরাজ্যের অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের ছটি কাউন্টি। স্কটল্যান্ডের সেলটিক বা রেঞ্জার্স ইংলিশ ফুটবল লিগে খেলে না কিন্তু আয়ারল্যান্ড দ্বীপের দুটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম দেশ এই ফুটবলের মাঠে এক হয়ে যায়।

গেলিক ফুটবলের মাঠ
গেলিক ফুটবলের নিয়ম কানুন আমাদের চেনা ফুটবলের চেয়ে অনেকটাই আলাদা; এটি ফুটবল, রাগবি ও বাস্কেটবলের সমন্বয়। গোলকিপার কেবল নয়, প্রত্যেকে হাত ও পা দুই ব্যবহার করতে পারেন, তবে খেয়াল খুশি মতো নয়। হাতে বল নিয়ে চার স্টেপের বেশি যাওয়া মানা, দৌড়ানোর সময়ে বল একবার ড্রিবল করা যায়, সে সময়ে বলটি এক হাত থেকে অন্যহাতে নিয়ে সব্যসাচী সাজা মানা। দুই প্রান্তের গোলপোস্ট দোতলা, নিচের অংশ আমাদের চেনা ফুটবলের গোল, ওপরের অংশ রাগবির মতন এইচ আকৃতির। ওপরের গোলে বল ঢুকলে এক বা দুই পয়েন্ট নিচের গোলে দুই পয়েন্ট। দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে মাঠের সাইজ আমাদের চেনা ফুটবল মাঠের চেয়ে সামান্য বড়ো। রাগবির মতন এক দলে পনেরো জন এবং খেলা চলে দুই পর্বে মোট সত্তর মিনিট। হাত ও পায়ের যৌথ ব্যবহারের ফলে খেলার গতি অতি দ্রুত; তিন রঙের কার্ড বিতরিত হতে পারে - হলুদ মানে সাবধানবানী, কালো মানে কিছুক্ষণের জন্য মাঠ ছেড়ে যেতে হবে ( আইস হকির, বাস্কেটবলের সিন বিন মনে করুন), লাল মানে লাল, বিদায় বন্ধুগন। ঠিক ফুটবলের মতো পাঁচজন পরিবর্ত খেলোয়াড় আনা যায়, কোন ব্রেকের সময় এবং নির্ধারিত এলাকা দিয়ে।
আইরিশরা যে যেখানেই থাকুন, নিজে খেলুন নাই খেলুন, গেলিক ফুটবলকে ধর্মের মতন মাথায় করে রাখেন। সে খেলায় জয় পরাজয়ের সুখে দুঃখে দিশা হারান আয়ারল্যান্ডের পঞ্চাশ লক্ষ শুধু নন সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে থাকা আট কোটি আইরিশ।
ডায়াস্পোরা বলতে আমরা বুঝি দু-তিন পুরুষে আপন দেশত্যাগী মানুষ, এই যেমন ধরুন আথেন্স ও থেসালোনিকির পরেই মেলবোর্ন তৃতীয় বৃহৎ গ্রিক শহর, সিডনি দ্বিতীয় ক্রোয়েশিয়ান শহর, ডারবানে সাত লক্ষ ভারতীয় মূলের মানুষ বাস করেন কিন্তু তাঁদের মাতৃভূমির অধিবাসীর তুলনায় এই সব সংখ্যা অতি নগণ্য। ব্যতিক্রম আইরিশ ডায়াস্পোরা। তাদের সংখ্যা মাতৃভূমি আয়ারল্যান্ডের বহু গুণ, পৃথিবীর একমাত্র উদাহরণ। নির্দ্বিধায় বলতে পারি আজ অবধি এমন কোন শহর দেখিনি যেখানে অন্তত একটি আইরিশ পাব নেই।
অভিশাপ
শনিবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৫১ ডাবলিনের ক্রোক পার্ক স্টেডিয়ামে সত্তর হাজার দর্শকের সমর্থকের সামনে আয়ারল্যান্ডের অন্যতম ক্ষুদ্র কাউন্টি মেয়ো অল আয়ারল্যান্ড সিনিয়র ফুটবল ফাইনালে কাউন্টি মিথকে হারিয়ে পরপর দ্বিতীয় বার বিজয়ী হয়। পরের দিন কাউন্টি মেয়োর খেলোয়াড় এবং কিছু কর্মকর্তা একটি খোলা ট্রাকে ডাবলিন থেকে কাসলবার যাত্রা করেন। ঘণ্টা দেড়েক বাদে চার্লসটাউনে বাস ঢুকে পড়ল কাউন্টি মেয়োর সীমানায়। সে ট্রাকে হইহল্লা ও গিনেস বিয়ার পান আরও বাড়ল। আরও খানিক এগিয়ে পথে পড়ে হাজার খানেক মানুষের একটি নগণ্য গ্রাম ফক্সফোর্ড। রীতিমত ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলে সে ট্রাক যখন গ্রামের মেন স্ট্রিটে ঢুকছে, রাস্তার ধারে চার্চের সমাধিক্ষেত্রে সবে এসে পৌঁছেছে একটি শবযাত্রা। কফিন ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন শোকার্ত পরিজন প্রিয়জন। পাদ্রি ক্যানন কুরনিন শেষ বচন পাঠ করবেন। মৃতের প্রতি সম্মান দেখানোর চিরকালীন সৌজন্য অনুযায়ী বাসটির অন্তত ক্ষণকালের জন্য থেমে যাওয়ার কথা; শুধু কট্টর ক্যাথলিক আয়ারল্যান্ড কেন, বিশ্বের সর্বত্র এমনটি তো করা হয়ে থাকে। রামনাম সত্য হ্যায় শুনলে আমরাও দাঁড়িয়ে পড়ি। কিন্তু জয়ের আনন্দে উন্মত্ত কাউন্টি মেয়োর টিম সেটি করলেন না, তাঁদের ডিজেল চালিত ট্রাক সগর্জনে এগিয়ে চলল অন্তিম লক্ষ্য, বিশ মাইল দূরের কাসলবার শহরের ম্যাকহেল পার্কের দিকে। সেখানে তাদের সম্বর্ধনার জন্য জড়ো হয়েছে কাউন্টি মেয়োর অর্ধেক মানুষ। কফিনের সামনে ছিলেন ক্যানন টমাস কুরনিন, কলরব মুখরিত বাসের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতি বর্ষিত হোক ঈশ্বরের রোষ। মৃতের প্রতি সম্মান জানালে না আজ; যতদিন অবধি তোমাদের একজনও বেঁচে থাকবে, কাউন্টি মেয়ো অল আয়ারল্যান্ড ফুটবল ফাইনাল জিতবে না।’
উনিশশো একান্নর পরে কাউন্টি মেয়ো এগারোটি ফাইনালে ওঠে এবং পরাজিত হয়। *
বিগত সাত দশকে এ শাপ বা কার্সের সত্যতা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক চলেছে; সত্যি কি শবযাত্রা দেখেও বাস থামেনি? সেই জয়যাত্রায় ট্রাকের আরোহীরা আজীবন তার প্রতিবাদ করেছেন, বলেছেন এটি মিথ্যা গুজব, কোন শবযাত্রা তাঁরা দেখেননি সেদিন ফক্সফোর্ড গ্রামে। সেদিন যারা মাঠে নেমেছিলেন সেই পঞ্চদশের শেষ মানুষ প্যাডি প্রেনডারগাস্ট বলেছিলেন, চার্চের সামনে কিছু লোক সেদিন দাঁড়িয়েছিলেন বটে তবে সেটা যে কারোর শেষকৃত্য সেটা আমার কেউ বুঝিনি। বুঝলেও সেই প্রাচীন লজঝরে ট্রাক থেকে নেমে মৃতকে সম্মান জানানোটা সহজ হতো না। ২০২১ সালে প্যাডি প্রেনডারগাস্ট মৃত্যুশয্যায়, কাউন্টি মেয়ো অতি পরাক্রমশালী ডাবলিনকে হারিয়ে আবার ফাইনালে উঠেছে; তিনি বলেছিলেন, ফক্সফোর্ডের শাপকে তোমরা যদি এতোটাই বিশ্বাস করো, আমি এখুনি মরে যেতে রাজি আছি (রোল ওভার অ্যান্ড ডাই), কাউন্টি মেয়ো জিতুক। হাসপাতাল বেডে শুয়ে রেডিওতে তিনি শুনলেন তাঁর অতি প্রিয় কাউন্টি মেয়োকে হারিয়ে একটা এলে বেলে মাঝারি গোছের টিম টাইরোন কাউন্টি অল আয়ারল্যান্ড ফুটবল ফাইনালে বিজয়ী হয়েছে। ১৯৫১ সালের পর এগারবার পরাজয়।
দু সপ্তাহ বাদে পঁচানব্বুই বছরের প্যাডি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন।
১৯৫১ সালের পঞ্চদশের বিজয় রথের শেষ আরোহী, সাবস্টিটিউট বেঞ্চের মিক লফটাস বিগত হয়েছেন ২০২৩ সালে। বয়েস হয়েছিল তিরানব্বুই। তাঁদের জীবৎকালে অল আয়ারল্যান্ড কাপ অধরা রয়ে গেল।
মোহনবাগান দু-বছর লিগ না জিতলে হা হুতাশ করেছি। এ বছর আর্সেনাল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতল বাইশ বছর বাদে, সেটাও দীর্ঘদিন, তবু এক প্রজন্মের মানুষ অন্তত দু বার সেই আনন্দে উদ্বেলিত হলেন। কিন্তু ট্রফি শূন্য পঁচাত্তর বছর? কাউন্টি মেয়োর অনেক মানুষ জন্মে থেকে ১৯৫০/৫১ পর পর দু বার ফাইনাল জেতার গল্প শুনেছেন, সারা জীবন স্বপ্ন দেখেছেন, তারপর অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা বুকে রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
একি সত্য, সকলই সত্য?
এই নাটকীয় ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম তুঙ্গে ওঠে; আইরিশ স্টেট টেলিভিশন আর টি ই (রাদিও তেলিফিস এয়রান) খোঁজ খবর করে জানিয়েছে ২৪শে বা ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯৫১ ওই ফক্সফোর্ড গ্রামে কারো দেহাবসান হয়েছে বা কেউ কবরস্থ হয়েছেন বলে জানা যায়নি। দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সংবাদপত্র আইরিশ টাইমস ক্যাথলিক চার্চের অনুমতি নিয়ে জন্ম মৃত্যুর রেজিস্টার তন্ন তন্ন করে ১৯৪৯- ১৯৫২ অবধি সকল মৃতের অন্তিম সৎকারের দিন দেখেছে; সোমবার ২৪শে সেপ্টেম্বর গ্রামের গোরস্থানে কেউ সমাধিস্থ হননি।
কাউন্টি মেয়োর প্রবীণ নাগরিক জন গানিগান (জন্ম ১৯৬২) মেয়ো ফুটবল টক পডকাস্ট পরিচালনা করে থাকেন। তিনি এই ঘটনার অন্য ভার্শন শুনেছিলেন - কাউন্টি মেয়োর জয়রথ নাকি শবযাত্রা প্রোসেশনের মুখোমুখি হয়ে তৎক্ষণাৎ পথ ছেড়ে দেয়নি, শোকার্তদের গিরজেয় পৌঁছুতে বিলম্ব হয়, ক্যানন কুরনিন রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে সেই ট্রাকের দিকে উদ্দেশ্য করে শাপ দিয়েছিলেন, চার্চ ইয়ার্ড থেকে নয়। এইসব নানান অসঙ্গতির কারণে গানিগান ওই দুর্বাসা সুলভ কার্স থিওরি মানতে ঠিক রাজি নন। কিছুদিন আগেও গানিগান বলেছিলেন, আমাদের বাল্যকালে এই অভিশাপের কথা শুনিনি। তাছাড়া কোনো ক্যাথলিক, অর্থোডক্স এমনকি প্রটেস্টান্ট পাদ্রির পক্ষে এমন শাপ দেওয়াটা খ্রিস্টধর্ম সম্মত কিনা সে প্রশ্নও ওঠে। গানিগান আরও বলেছেন শেষ জয়ের পর প্রায় চল্লিশ বছর কাউন্টি মেয়ো এমন কিছু আহামরি টিম ছিল না, কোন ফাইনালে অবধি ওঠেনি। এই শাপশাপান্তের গুজব চালু হয়েছে নয়ের দশক থেকে, যখন তারা বারবার ফাইনালে হেরেছে; এ দুটো কাকতালীয় হতে পারে।
ডাবলিন ক্রোক পার্ক স্টেডিয়াম
বিকেল পাঁচটা, ২৬শে জুলাই, ২০২৬
মেয়ো ২০- কেরি ১৭


রণক্ষেত্র ক্রোক পার্ক ডাবলিন
খেলায় হার জিত আছে। পরাজিত পক্ষ ম্লানমুখে রণস্থল পরিত্যাগ করে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে হেরে যাওয়া দলের কিছু লোক স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ অকারণ আক্রোশে দোকানের কাঁচের জানলা ভাঙে, পাবের চেয়ার টেবিল ছোঁড়ে, জয়ী দলের জার্সি পরা মানুষকে অকারণে দু ঘা দেয়। রবিবার ছাব্বিশে জুলাই দেখা গেল মেয়োর জয় কারো একার নয়। রেফারির শেষ বাঁশি বাজলে সমবেত বিরাশি হাজার মানুষ এক হয়ে গেছেন– মাঠের সকল মানুষ, দুনিয়ার আট কোটি আইরিশ, সমস্ত মৃতেরাও জেগে উঠে মেয়োকে জানাচ্ছেন আপ্লুত অভিনন্দন। আবেগে অভিভূত ধারাভাষ্যকার বললেন, দুর্ভিক্ষের দিন শেষ, চুলোয় গেলো অভিশাপ।

SAM ট্রফি হাতে অধিনায়ক জ্যাক কয়েন
এডমান্ডের শ্যালক মাইকেল মিনাঘান মাঠে ছিলেন পুত্র জামাতা ভ্রাতুষ্পুত্র সহ, ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন চল্লিশ বছর যাবত ক্রোক পার্ক আসছি, আমি এতো মানুষকে একসঙ্গে কাঁদতে দেখিনি। পরের দিন আইরিশ টাইমস লিখেছে, “আকাশের গায়ে, সব সমাধির পাথরে লেখো ‘মেয়ো ২০ - কেরি ১৭’; লেখো ক্রোক পার্ক আজ বাঁধন মুক্ত, মাঠ ভেসে গেছে হাজার হাজার মানুষের অবাধ অশ্রুজলে।” বিজয়ী ক্যাপ্টেন জ্যাক কয়েন SAM ট্রফি উঁচু করে ধরে বললেন, ‘মেয়োর সকল মানুষ, সব ছেলে মেয়ে, দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আইরিশ ডায়াস্পোরা, স্বপ্ন দেখার অভ্যাস ছেড়ো না, বুক চিতিয়ে দাঁড়াও, গর্বের সঙ্গে বলো তোমার বাড়ি মেয়ো। অপেক্ষার শেষ, স্যাম (SAM) বাড়ি এসেছে।’

জয়ের আনন্দে সমর্থকরা

ডানদিক থেকে দ্বিতীয় মাইকেল মিনাঘান
অ্যানড্রু জ্যাকসন থেকে রুজেভেলট, উইলসন, কেনেডি, নিক্সন, রেগান সহ কুড়ি জনের বেশি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের পরিবারের আদি ঠিকানা আয়ারল্যান্ড। আজ এই উচ্ছ্বাসে ভাসলেন মেয়োর সদর কাসলবারের অদূরে বালিনা শহর থেকে একশো সত্তর বছর আগে ভাগ্য সন্ধানে আমেরিকার উদ্দেশ্যে সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন যে প্যাট্রিক, তাঁর পঞ্চম পুরুষ, আমেরিকার পূর্ব রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন। ভাসলেন কানাডার প্রধান মন্ত্রী মার্ক কারনি, ঠিক একশো বছর আগে যার পিতামহ এসেছিলেন কাউন্টি মেয়োর আরেক গ্রাম আগাহাউয়ার থেকে। তাঁর এক্স (একদা টুইটার) খাতায় লিখলেন, ‘শাপ মুক্তি! ধন্য আমি, মেয়ো আমার মাতৃভূমি।’

আয়ারল্যান্ডে বাইডেনের সমর্থনে পোস্টার

মেয়োতে মার্ক কারনি, কানাডার প্রধানমন্ত্রী
শুধু একটা দেশকে, তার কোটি কোটি প্রবাসী মানুষকে নয় গেলিক ফুটবলের আইন কানুন না জানা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে কান্না হাসির দোল দোলানোর খেলায় দুলিয়ে দিয়েছে মেয়ো- মাঠের এবং বাইরের অজস্র মহিলা সানন্দে জানিয়েছেন তাঁরা সকলে কেঁদেছেন অনাবিল আনন্দে। প্রতিদ্বন্দ্বী কেরির কোন ফ্যান মাঠ ছেড়ে যাননি, তাঁরাও সকলে কেঁদেছেন এদিন, হেরে যাবার দুঃখে নয়, কাউন্টি মেয়োর বিজয়ের সুখে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়েছে অনেক চিঠি। লিখেছেন কেবল আইরিশ ডায়াস্পোরা নন, জার্মান, ডেনিশ, ম্যাসিদোনিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, সাউথ আফ্রিকান, গ্রিক, বেলজিয়ান। তার কিছু-
আমার বাবা চলে গেলেন আজ সকালে, সারা জীবন তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাকে নিয়ে একদিন কাসলবার যাবেন, অল আয়ারল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন কাউন্টি মেয়ো দলকে স্বাগত জানাবেন। আমি জানি আকাশ থেকে হাসিমুখে আজ সেইদিকে তিনি তাকিয়ে আছেন। গড ব্লেস ড্যাড।
মার্ক, ক্লিভল্যান্ড
ডেনমার্কে জন্ম, এখানেই বড়ো হয়েছি। গেলিক ফুটবল এখানে অচেনা। কোপেনহাগেনের আইরিশ পাবে স্ট্রিম হচ্ছিল, যেমন যেমন খেলা এগোচ্ছে, পাবের মানুষজন সেখানে মন দিলেন, শেষ অবধি এই ম্যাচ অনেক ডেনিশের হৃদয় জয় করেছে।
জন, কোপেনহাগেন
জীবনে কখনো গেলিক ফুটবল দেখিনি, এমন উন্মাদনা কখনো দেখিনি। আমরা সবাই মেয়োর ফ্যান।
জশুয়া, অকল্যান্ড
গেলিক ফুটবলের নামও শুনিনি, তবে আমি কাঁদছি কেন?
মারকো, সাঁও পাউলো
এ খেলার নাম শুনিনি কোনদিন, শুধু চোখ জলে ভরে যাচ্ছে।
খুয়ান, বারসেলোনা
https://youtube.com/shorts/wbtmOhuxjoQ?is=Emazs-_v3WlOFQcw
লিংকে ক্লিক করলে দেখতে পাবেন এই ম্যাচের শেষ ৩০ সেকেন্ড
ইন্টারনেটে এক জার্মান লিখেছেন নিজের ভাষায়
দু-বছর আগে যখন আয়ারল্যান্ডে আসি, ভেবেছি গেলিক ফুটবলের গোল বড়ো বিচিত্র, ফুটবল রাগবি মেশানো। দু বছর বাদে আজ ডাবলিনের স্টেডিয়ামে বুক চিরে চিৎকার করছি মেয়োর সমর্থনে যদিও আমি ডাবলিনের বাসিন্দা।**
আইরিশ এক্সামিনার পত্রিকায় কলিন শেরিডানের লেখাটি পেলাম এডমান্ডের সূত্রে। তিনি শুরু করেছেন আইরিশ কবি পল ডুরকানের কবিতা দিয়ে
Leaving behind us the alien, foreign city of Dublin
My father drove through the night in an old Ford Anglia,
His five-year-old son in the seat beside him,
The rexine seat of red leatherette,
And a yellow moon peered in through the windscreen.
'Daddy, Daddy,' I cried, 'Pass out the moon,'
But no matter how hard he drove he could not pass out the moon.
Going home to Mayo, 1949
আজকে জয়ের দিন, ছেলের হাতে সেই চাঁদ তুলে দেবার দিন।
শেরিডান এই বিজয়কে উৎসর্গ করেছেন সেই সব পরিযায়ী আইরিশ শ্রমিককে যারা মেয়ো থেকে অনেক দূরে গিয়ে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের টানেল কেটেছেন, নির্মম নগ্ন দারিদ্র্য সয়ে বিংহ্যামটাউন বা ইনিশবিকেলে দু-শিলিং পাঠিয়েছেন যাতে ছেলে মেয়ের মুখে অন্ন জোটে। তাঁরা চলে গেছেন কবে, তাঁদের পরের প্রজন্ম আজ পার্থ হংকং বসটন ক্লিভল্যান্ড ব্রুকলিনে ডাক্তার প্রফেসর নার্স হয়েছেন কিন্তু তাঁরা জানেন তাঁদের মেয়ো আজও তেমনই আছে, বদলায়নি। শুধু শাপ মুক্তি হয়েছে।
জয়ের ঘোর কাটে না। দু দিন বাদে, মঙ্গলবার এডওয়ার্ড রাটিগান তাঁর আট বছরের ছেলেকে নিয়ে মেয়োর বিশ্বরূপ দেখবার জন্য আড়াই হাজার ফিট উঁচু প্যাট্রিক পাহাড়ে চড়েছেন। আকাশ অন্ধকার, মেঘে দশদিক আছন্ন, সমতলের কিছুই দেখা যায় না। তিনি ছেলেকে বললেন, জো আমাদের আর কিছু দেখার নেই। রবিবারে আমরা আমাদের প্রতিশ্রুত দেশ দেখে নিয়েছি।

জয়ের আনন্দে ডাক্তার ম্যাকগুয়েরের নিদান- তাবৎ মেয়োবাসীর পাঁচ দিনের ছুটি
*মেয়ো এগারো বার ফাইনালে হারে - ১৯৮৯, ১৯৯৬, ১৯৯৭, ২০০৪, ২০০৬, ২০১২, ২০১৩, ২০১৬, ২০১৭, ২০২০, ২০২১।
**Als ich vor 2 Jahren nach Irland gezogen bin dachte ich dass die Tore einfach nur Multifunktionstore sind, für Fußball oder Rugby, je nachdem was gerade gespielt wird. Und 2 Jahre später sitze ich im Stadion und schreie mir die Seele aus dem Leib für Maio obwohl ich in der Nähe von Dublin wohne.
ইতি গজ?
কোন শাপ নয়, একি কাকতালীয় মাত্র? তাহলে সেদিন, ১৯৫১ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর সেই জয়রথের ট্রাকের কোন আরোহী তাঁদের জীবৎকালে মেয়ো কাউন্টিকে স্যাম (এস এ ম্যাকগুয়ার ট্রফি) জিততে দেখলেন না কেন? শেষ বিজয়ী দলের শেষ খেলোয়াড় প্যাডি প্রেনডারগাস্ট বেঁচে ছিলেন বলেই কি ডাবলিনের মতো দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষকে হারিয়েও ২০২১ সালের ফাইনাল হারল মাঝারি দল টাইরোন কাউন্টির কাছে?
Debanjan | ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১৩:১৭742137
MANJIRA | ১০ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৩২742189