এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা   সমাজ

  • প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিতে বর্তমান বাংলাদেশ

    দীপ
    আলোচনা | সমাজ | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩ বার পঠিত
  • প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি।
    আগ্রহী হলে পড়তে পারেন।
    -------------------------------------------------------------------
     
    নব্বইয়ের দশকেও বাংলাদেশে এত ভয়াবহ নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় ছিল না। আমাদের দাদা, বাবা ও আমরা ধর্ম পালন করলেও আজকের মতো এত সাম্প্রদায়িকতা ও নৈতিক অবক্ষয় ছিল না। মানুষের প্রতি মানুষের ন্যূনতম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল।
    ধর্ম মানুষকে উন্মাদ বানিয়ে দেয়। মনুষ্যত্ববোধ ও বিবেক হারিয়ে যায়। ধর্ম নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায়, অন্যদের নীচু দেখায়। ‘আমার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ’—এমন ভাবতে ভাবতে একদল মানসিক উন্মাদ তৈরি হয়। এই উন্মাদরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলে। এসব ধর্মান্ধতা দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
     
    আমার বন্ধু রুবেল ছোটবেলায় তেমন ধর্মান্ধ ছিল না। কলেজ জীবনেও আমি তাকে প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে দেখতাম। হঠাৎ তার মধ্যে অসংখ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। হাঁটুর উপর পায়জামা পরা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ও ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে লাগল। এভাবেই একদিন সে পৃথিবীর অন্য সব ধর্মকে খাটো প্রমাণে উঠেপড়ে লাগল।
    ধর্ম একটি অন্ধবিশ্বাস। অলৌকিক এসব গল্পের বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কিছুই নেই। কিন্তু রুবেল ড. জাকির নায়েককে অলৌকিক ভাবত। তার অপকর্ম সম্পর্কে সে কখনো জানার চেষ্টা করেনি। ২০১১ সালে পিস টিভি চালু হওয়ার পর থেকে আমার চিরচেনা বন্ধু বদলে যেতে লাগল। একটা সময় সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলে বড় হওয়া রুবেল এখন ধর্মের জন্য মানুষ পর্যন্ত হত্যা করতে পারে। আজ তার কাছে বন্ধুত্বের চেয়েও ইসলাম বড়।
    তার এসব অপকর্ম দেখে আমি নিজেই তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। আমি বুঝতে পারলাম, আমার বন্ধুটি একদিন জঙ্গি হয়ে যাবে। ধর্মের নামে সে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে জান্নাতে যেতে চাইবে। ২০১৩ সালে জিহাদে গিয়ে শহীদ হওয়ার নেশা থেকেই সে ভণ্ড হেফাজতের সমাবেশে গিয়েছিল। ভণ্ডদের পক্ষে কথা বলতে তার এতটুকুও লজ্জা হচ্ছিল না।
     
    ২০১৩ সালে দেশ ছাড়ার এক মাস আগে, রুবেলের সাথে আমার শেষ দেখা হয়। বন্ধুকে বললাম, পিস টিভির মতো একটা চ্যানেল খুলতে মিলিয়ন ডলারের অর্থ প্রয়োজন হয়। জাকির নায়েকের পরিবার বংশগতভাবে বিপুল সম্পদের মালিক ছিলো না।২০০৬ সালে জাকির নায়েক যখন পিস টিভির কাজ শুরু করলেন, তখনই এই পিস টিভির অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।এসব অর্থের উৎস পর্যন্ত আজ পর্যন্ত জাকির নায়েক সদুত্তর দিতে পারেননি।
     
    ২০০৫ সালে হারমোনি মিডিয়া খুলে মাত্র একবছরে ২২ কোটি টাকা অনুদান ! সত্যি একটা অস্বাভাবিক বিষয়।
    ২০১৬ সালে এই হারমোনি মিডিয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল ভারত। এরপর এই পিস টিভির জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নামে ২০০৮-২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার অনুদান আজ পর্যন্ত পরিস্কার নয়। এভাবেই ধর্মের নামে দোকানদারি খুলে বসেছিল একদল ভণ্ড। আমার বলা এসব কথাগুলোতে সে খুব কষ্ট পেলো। আমাকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে আমাকেও হত্যা করতে চাইলো।
    বিদেশের মাটিতে বসেও আমি বন্ধুটির কথা ভাবছিলাম। সে যখন ঝুমার সাথে প্রেম করতো, তখন বারবার আমার কাছে ছুটে আসতো।তার যখন একটা চাকরির খুব প্রয়োজন ছিল, থাকার জায়গা ছিলোনা, তখনও বারবার আমার দরজায় কড়া নেড়েছে।তখনও সে জানতো, আমি নাস্তিক। আমার এসব ধর্মে অবিশ্বাসে তার তখন কোন সমস্যাই হয়নি। তাহলে হঠাৎ একটি দেশের মানুষ এত ধর্মান্ধ হয়ে গেল কেন
     
    আমার ধর্ম মানুষকে হিংসা করতে শেখায়। নারীদের মানুষ না ভেবে যৌন বস্তু ভাবতে শেখায়। এই ধর্মের মানুষ আবার কাদিয়ানীদের মুসলমান ভাবে না। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের মানুষ ভাবতে তাদের কষ্ট হয়। সবকিছুতে তারা হালাল ও হারাম খুঁজে। এভাবে ১৯৪০ এর দশক থেকে বাংলাদেশ অঞ্চলে ধর্ম হয়ে উঠলো একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। নিজের প্রমোদ বিলাসে বসে বসে জিন্নাহ ১৯৪৭ সালে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জীবন নরক বানিয়ে দিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর হলেও আজও সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের একটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা গেলো না।
     
    ২০২৪ সাল না এলে আমার বন্ধু জামায়াত শিবির নামক জান্নাতের দেখা পেতো না। একদিন তাকে দুই মিনিটের জন্য কল করে বললাম, " তোদের ক্ষমতায় যাওয়ার পর জান্নাত আমার বাড়ি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। আমার ছোটবেলার জমানো স্মৃতিগুলো পুড়ে গেছে।"
    তখনও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা দেখিনি।আজ যখন নিজের গড়া নতুন বাংলাদেশে সে তার নিজ শিশু আইরিনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত, তখন বন্ধুর জন্য আমার করুণা ছাড়া আর কিছুই অনুভব হচ্ছে না।
    গত আড়াই বছর ধরে রুবেল বিএনপি ও জামায়াতের জান্নাতের সরকার দেখছে। পাবনার দশ বছরের শিশু কলিকে নামাজ পড়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী কলি নিখোঁজ হয়েছিল।
    বাড়ির পাশে ডোবা থেকে তার টুকরো টুকরো করা বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মাগরিবের নামাজের জায়নামাজ থেকে উঠার পর কলিকে ধর্ষণ করে ১৫ মিনিটের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়।হত্যায় সম্পৃক্ত মোস্তফা ও ইয়াসিন দু'জনেই মুসলমান। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। কলি নামে যে মেয়েটির বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার হয়েছে সেই মেয়েটি মুসলমান।
    আমার বন্ধু রুবেলের চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া মেয়ে আইরিনের কথা আমার মনে পড়লো। জন্মের পর থেকেই আইরিন আমাকে দেখেনি।দশটি বছর আমি দেশের বাইরে ছিলাম। কিন্তু আমার দেশটা আজ মসজিদ ও মাদ্রাসা নামক নরকে পরিণত হয়েছে। আজ বাংলাদেশে মানুষের চেয়ে ধর্মান্ধ মানসিক রোগীর সংখ্যা বেশি। একদিন হয়তো আইরিনের লাশও পাওয়া যাবে।
     
    আমাদের ছোটবেলায় এই বয়সের মেয়েরা মাঠে ছেলেদের সাথে একসাথে খেলতো। বাবাদের কাছে প্রতিবেশীদের সন্তান নিজেদের সন্তানের মত ছিল।আজ দেশে নামাজি মানুষের সাথে পাল্লা দিয়ে অমানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আমার যে বন্ধুটা ধর্মান্ধ হয়ে জঙ্গী হতে চেয়েছে, আজ সে নিজের চোখে বিএনপি ও জামায়াতের জান্নাত দেখছে।ন্যাম ফ্ল্যাটের মরিয়মের লাশের কথাও সে জেনেছে। এরপরও তার বিবেক এখনও পচে আছে।তার ছোট্ট মেয়ে আইরিনের ভবিষ্যতের কথা সে আদৌ কি ভাবছে?
     
    ধর্মান্ধতা একটা দেশের মানুষের জন্য ভয়ানক অভিশাপ। বাংলাদেশের মানুষ যখন এত ধর্মান্ধ ছিলো না, তখন দেশে এত ভয়াবহ ধর্ষণ ও হত্যা ছিলো না। আজ ঘরে ঘরে নামাজি, কিন্তু মানুষ নেই।সমাজ পরিবারে বড়দের সম্মান নেই। নারীদের শরীরের উপর বোরকা উঠিয়ে দিয়ে নারীদের যৌন বস্তু বানিয়ে ফেলা হয়েছে।এই দেশে ৮ বছরের শিশু আছিয়াও নিরাপদ নয়।
     
    ধর্মান্ধদের দেশে আইনের শাসন থাকে না। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা থাকে না।ধর্ম যেই দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হয়ে যায়, সেই দেশে মানুষ আর মানুষ থাকে না।ধর্মান্ধ দেশে শিশুদের নিরাপত্তা থাকে না।কোন ধর্মান্ধ দেশ নারীদের বসবাসের উপযোগী নয়।
    ধর্মান্ধদের দেশে অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার থাকে না।একই দেশে বসবাস করেও এক মুসলমান আরেক মুসলমানের কাছে পর্যন্ত নিরাপদ নয়।তাই ধর্মান্ধ দেশ ও ধর্মান্ধ মানুষ সমগ্র মানবজাতির শত্রু।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন