

ছবি: রমিত
চলে গেলেন কেতকী কুশারি ডাইসন। এই যাওয়াটা বিধিনির্ধারিত। ফলে কষ্ট হলেও মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমরা একজন কেতকী কুশারি ডাইসনকে পেয়েছিলাম, এই যে একটা গর্ব করার জায়গা তৈরি হয়েছিল, সেটা কেতকী কুশারি নিজেই তৈরি করেছিলেন। তাঁর অসম্ভব মেধা, গবেষণা, জীবনের নিত্যনতুন খোঁজ সবমিলিয়ে তাঁর রচিত সাহিত্য যেমন সমৃদ্ধ ছিল, তেমনি তাঁর আবিষ্কারের নেশা, গবেষণার দ্বারা আমাদের সামনে উন্মোচিত হল, এক বিরাট পরিসর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের পরিচিত রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে, নতুন করে পেলাম আমরা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছাড়িয়ে বিশ্ববাসীর কাছে এক আবেগের নাম। এক দর্শনের নাম এটা আর আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না। তাঁর লেখা আমাদের প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছে, আকাশের রং চিনিয়েছে, বসন্তের ফুল, শরতের আলো, বর্ষার মেঘ, সন্ধ্যার অন্ধকার কিংবা ভোরের সূর্যোদয়কে দিয়েছে নতুন ভাষা। কিন্তু যে মানুষটি বাংলা ভাষাকে রঙিন করে তুলেছিলেন, তিনি নিজে পৃথিবীর রং ঠিক কীভাবে দেখতেন? লাল তাঁর চোখে কেমন ছিল? সবুজ? নীল? সূর্যাস্তের আকাশ? রক্ত? পলাশ? কৃষ্ণচূড়া? বসন্তের রাঙা আবির?
এই জিজ্ঞাসাগুলোই কেতকী কুশারী ডাইসনের সামনে খুলে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে দেখার, আবিষ্কারের এক নতুন দরজা। আর সেখানে প্রবেশ করে তিনি পৌঁছে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, চিঠি, গল্প, উপন্যাস, নাটক এবং চিত্রকলার সেই রঙিন অথচ রঙহীন জগতে। শিল্পী-গবেষক সুশোভন অধিকারীর সঙ্গে দীর্ঘ গবেষণায় তুলে আনলেন ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ / রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে ও চিত্রকলায় রঙের ব্যবহার’। প্রায় আটশো পৃষ্ঠার এক ব্যতিক্রমী গবেষণাগ্রন্থ। এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অ্যাড্রিয়ান হিল ও রবার্ট ডাইসন। কেতকী কুশারি তাঁর গভীর গবেষণায় সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন চক্ষুবিজ্ঞান, colour vision, শিল্প-ইতিহাস, চিত্রকলা, অনুবাদ এবং নন্দনতত্ত্ব।
ঘটনার শুরু ১৯৮৯ সালে। শান্তিনিকেতনে। কেতকী তখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন। সেই সময় একদিন দেখা হয় চক্ষুবিশেষজ্ঞ ড. জ্যোতির্ময় বসুর সঙ্গে। তিনি কেতকীকে পড়তে দেন R. W. Pickford-এর সঙ্গে যৌথভাবে লেখা একটি গবেষণাপত্র, যেখানে রবীন্দ্রনাথের colour vision এবং তাঁর ছবির নান্দনিক সমস্যার আলোচনা ছিল। তখনই কেতকীর সামনে প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি সম্ভাবনা—রবীন্দ্রনাথের হয়তো protanopia, অর্থাৎ লাল রঙের প্রতি বিশেষ ধরনের colour-vision deficiency ছিল। এটি কোনও রোগ নয়। জন্মগত colour perception-এর একটি বৈশিষ্ট্য, যার ফলে লাল ও সবুজের পার্থক্য স্বাভাবিক colour vision-এর মানুষের মতো অনুভূত নাও হতে পারে।
এই আবিষ্কার কেতকীকে চমকে দিয়েছিল। কারণ তিনি ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন, তাঁর গান শুনেছেন, তাঁর কবিতার রং দেখেছেন; কিন্তু কখনও ভাবেননি যে সেই রং হয়তো কবির চোখে আমাদের চোখের মতো ছিল না। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, তাই বুঝি রবীন্দ্রনাথ কোনও কোনও রংকে এত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেন? কেন ‘লাল’ বা ‘সবুজ’-এর সরাসরি প্রচলিত শব্দের বদলে তিনি অনেক সময় ব্যবহার করেন অন্যতর, অস্পষ্ট বা সম্পূর্ণ অন্য অর্থে? কেন ‘শ্যামল’ তাঁর কাছে কখনও পাতার সবুজ, কখনও মাটির রং, কখনও মানুষের গায়ের রং হয়ে ওঠে? কেন তাঁর লেখায় লালের সঙ্গে এতবার ব্যথা, লজ্জা, রক্ত, ক্রোধ, মৃত্যু বা অন্ধকারের সম্পর্ক তৈরি হয়? আর তাই বুঝি নীল তাঁর কাছে এমনভাবে আনন্দ, অস্তিত্ব ও সৌন্দর্যের রং হয়ে ওঠে?
কেতকী এখানেই থামেননি। তিনি রবীন্দ্রনাথের ত্রিশ খণ্ডের রবীন্দ্র রচনাবলী প্রায় গোয়েন্দার মতো খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলেন আবার। যাচাই করতে লাগলেন, রবীন্দ্রনাথ রংকে কীভাবে দেখেছেন, কীভাবে লিখেছেন, কী করে অনুভব করেছেন! তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন শান্তিনিকেতনের শিল্পী সুশোভন অধিকারী, যিনি রবীন্দ্রভবনের বিপুল চিত্র-সংগ্রহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। সঙ্গে visual scientist অ্যাড্রিয়ান হিল এবং কেতকীর স্বামী বিজ্ঞানী রবার্ট ডাইসন। গবেষণা চলল। সাহিত্য থেকে চিত্রকলায়, চিত্রকলা থেকে বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান থেকে আবার সাহিত্যে ফিরে আসতে লাগল সেই গবেষণা।
এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেল রবীন্দ্রনাথের নিজের চিঠিতেই। ছিন্নপত্রাবলী-তে তিনি রসিকতা করে নিজেকে বলেছিলেন, ‘a celebrated colour-blind person’। এতদিন এই মন্তব্যকে নিছক রসিকতা হিসেবেই দেখা হত। কিন্তু কেতকী খুঁজে দেখলেন, রবীন্দ্রনাথের colour vision নিয়ে তাঁর সমসাময়িক কয়েকজন মানুষের মন্তব্যগুলো। রানি চন্দ, রোম্যাঁ রোলাঁ, স্টেলা ক্রামরিশ, রানি মহলানবিশ প্রমুখের লেখায় বা স্মৃতিতে এই বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর একটি চিঠি কেতকীর হাতে আসে। সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের colour perception নিয়ে আলোচনা ছিল। আর তখনই তিনি ‘বর্ণান্ধ রবীন্দ্রনাথ’ এই সম্ভাবনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়-ছিটিয়ে থাকা পুরনো সূত্রগুলিকে এক জায়গায় এনে তিনি একটি গবেষণা পত্র তৈরী করলেন।
কেতকী কিন্তু আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেননি যে রবীন্দ্রনাথ protanope ছিলেন। বরং তাঁর নিজের ভাষায়, গবেষণাটি শুরু হয়েছিল open mind নিয়ে। প্রশ্ন ছিল, যদি রবীন্দ্রনাথের colour vision-এ বিশেষত্ব থেকে থাকে, তার ছাপ কি তাঁর লেখায় পাওয়া যাবে? তাঁর উপমা, রূপক, প্রকৃতিবর্ণনা, চরিত্রের মুখের বর্ণনা, আলো-অন্ধকারের ব্যবহার, এমনকি তাঁর চিত্রকলায়ও কি তার কোনও ধারাবাহিক চিহ্ন রয়েছে?
এরপর যে বিপুল তথ্যভাণ্ডার তৈরি হল, সেটা বেশ আকর্ষণীয়। তা হল রবীন্দ্রনাথের colour vocabulary। কেতকীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রচলিত বাংলা ‘লাল’ ও ‘সবুজ’ শব্দের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ অনেক সময় ‘রাঙা’ ও ‘শ্যামল’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করতে বেশি স্বচ্ছন্দ। ‘শ্যামল’ তাঁর লেখায় কখনও সবুজ পাতা, কখনও মাটি, কখনও মানুষের ত্বকের বর্ণ অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট colour-এর বদলে বিস্তৃত visual field তৈরি করে। কেতকীর মতে, এই অস্পষ্টতা তাঁর colour perception-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
লাল রঙের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে লাল কখনও উৎসবের, প্রেমের, আবার কখনও ঋতুবৈচিত্র বোঝাতেও ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে লাল রং বারবার তাঁর লেখায় হয়ে উঠছে রক্ত, হিংসা, লজ্জা, ক্রোধ, মৃত্যু ও যন্ত্রণার প্রতীক হিসেবে। কেতকী লক্ষ করেছেন, রবীন্দ্রনাথের লেখায় লাল রঙের ব্যবহার অনেক সময় সরাসরি visual description না হয়ে অন্য কোনও অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাঁর বিখ্যাত ‘রক্তকরবী’ নাটকে সেই ইঙ্গিত মেলে। লাল করবীফুল হয়ে ওঠে রহস্য, আকাঙ্ক্ষা, বিপদ, সৌন্দর্য ও মৃত্যুর বহুস্তরীয় প্রতীক।
কেতকী ব্যাখ্যা করে দেখান, রবীন্দ্রনাথ যখন রঙকে সরাসরি ধরতে সমস্যায় পড়েছেন, তখন তিনি অনেক সময় শব্দ, ছন্দ, সুর ও ধ্বনির সাহায্যে সেই visual experience-কে পুনর্গঠন করেছেন। অর্থাৎ চোখ যেখানে থমকে গেছে, কান সেখানে পথ খুলে দিচ্ছে। রঙকে তিনি ধ্বনির সাহায্যে অনুভব করাচ্ছেন। রঙকে শব্দ এবং ছন্দে ধরতে চাইছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ বর্ণান্ধতা থেকে ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা কীভাবে অন্য ইন্দ্রিয়ের সৃজনশীলতাকে আরও সক্রিয় করতে পারে — কেতকী সেটাই তুলে ধরলেন বিশ্ববাসীর কাছে।
নীল রং নিয়ে কেতকী তুলে আনলেন আরও চমকপ্রদ কিছু তথ্য। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে নীল রং অস্তিত্ব, আনন্দ এবং সৌন্দর্যের এক বিশেষ ভাষা তৈরি করছে। আকাশ, নীল, অনন্ত, রূপ, লাবণ্যকে তুলে ধরছেন। কিন্তু তাঁর ছবিতে নীলের ব্যবহার সেভাবে আসছে না। কেতকী এই বৈপরীত্যকেও colour perception-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, যে রং রবীন্দ্রনাথের চোখে সবচেয়ে স্পষ্ট ও উজ্জ্বল ছিল, সাহিত্যে তিনি হয়তো সেটিকেই সবচেয়ে বেশি উদযাপন করেছেন। কিন্তু চিত্রকলার ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল অন্যান্য রঙগুলির সীমা ও সম্ভাবনাকে পরীক্ষা করে দেখার। যেমন তাঁর অনেক ছবিতে সীমিত colour range, অন্ধকার ও আলোর প্রবল বৈপরীত্য, বাদামি ও গাঢ় রঙের আধিক্য, কখনও monochromatic composition— এসব বিষয় কেতকী কুশারি ও সুশোভন অধিকারী colour vision-এর সম্ভাব্য প্রভাবকে পরীক্ষা করেছেন। ১৯৯১ সালে অ্যাড্রিয়ান হিল ও রবার্ট ডাইসন শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু ছবির colorimetry-ও করেন। তাঁদের গবেষণায় তখন protanopic perception-এর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের এক্ষেত্রে একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, এটি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় করা clinical colour-vision test নয়। শুধু তাঁর লিখিত ও চিত্রিত কাজ, archival evidence এবং colourimetry-র উপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি গবেষণামূলক hypothesis।
এই গবেষণার আরও একটি চমকপ্রদ বিষয় উঠে আসে, তা হল রবীন্দ্রনাথের শিল্পী হয়ে ওঠার ইতিহাস। কেতকী কুশারি এবং সুশোভন অধিকারীর গবেষণা দেখায়, রবীন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তার বিকাশের ক্ষেত্রে primitive art, African art, Asian artefacts এবং বিশেষত German Expressionism-এর প্রভাব আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু museum ও gallery ঘুরে, art album, archival collection এবং শিল্প-ইতিহাসের নানা উপাদান পরীক্ষা করেন তাঁরা। তাঁরা রবীন্দ্রনাথের কিছু কাজের সঙ্গে Haida, Malanggan, African, Peruvian এবং অন্যান্য শিল্প-ঐতিহ্যের দৃশ্যগত সাদৃশ্যও তুলে আনেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথের নিজের নকশা করা signature seal-এর সঙ্গে Haida শিল্পের একটি salmon-trout head motif-এর আশ্চর্য মিল তাঁদের নজরে আসে।
German Expressionism-এর প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেতকী ও সুশোভনের গবেষণা অনুযায়ী, Expressionist art-এর বিকৃত form, সরলীকৃত colour plane, woodcut-এর texture, অপ্রচলিত colour-use—এসব রবীন্দ্রনাথের শিল্পের বিকাশ বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই কেতকী কুশারী ডাইসনের রবীন্দ্রচর্চা এক বৃহত্তর অর্থ পায়। রবীন্দ্রনাথকে তিনি কখনও শুধু ‘বিশ্বকবি’ বলে পূজা করেননি। তাঁকে তিনি পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাঁর কবিতা পড়েছেন, চিঠি পড়েছেন, ছবি দেখেছেন, রং আবিষ্কার করেছেন, বিদেশি শিল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তাঁর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের archival documents খুঁজেছেন। এবং তিনি সাহিত্যকে বিজ্ঞানের সঙ্গে, ব্যক্তিগত স্মৃতিকে ইতিহাসের সঙ্গে এবং বাংলাকে বিশ্বের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।
আবার তিনি রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে তুলে আনলেন ভিন্নভাবে। In Your Blossoming Flower-Garden: Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo ১৯৮৮ সালে সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশিত হয়। প্রায় ৪৭৭ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটিও তাঁর গভীর গবেষণার ফল। বইটিতে রবীন্দ্রনাথ-ওকাম্পোর সম্পর্কের পাশাপাশি লিওনার্ড এলমহার্স্টের ভূমিকা, বিপুল archival material এবং তাঁদের পরিচিত রবীন্দ্র-ওকাম্পো correspondence-এর বিস্তারিত টীকা-সহ ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
এই গবেষণা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝার জন্য ১৯২৪ সালের আর্জেন্টিনার পর্বটির দিকে একবার তাকানো দরকার। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্য ও লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু কেতকীর কাজের বিশেষত্ব ছিল এই সম্পর্ককে কেবল ‘কবি ও এক বিদেশিনী অনুরাগিণীর গল্প’ হিসেবে না দেখে তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরকে তুলে ধরা। ওকাম্পো ছিলেন লেখক, সম্পাদক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং পরবর্তীকালে Sur পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাই একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাতের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ইতিহাসও।
কেতকীর তাঁর গবেষণায় গুরুত্ব দেন, রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর চিঠিপত্রগুলোকে। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর পারস্পরিক আকর্ষণ, বৌদ্ধিক আদানপ্রদান, দূরত্ব, আবেগ এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য সবকিছুকেই archival evidence-এর ভিতরে রেখে দেখিয়েছেন তিনি। বইটির প্রকাশ-পরিচিতিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে এতে Tagore-Ocampo correspondence সম্পূর্ণভাবে annotations-সহ ব্যাখ্যা করেছেন। বহু archival material -কে প্রথমবার তুলে আনছেন গবেষণার মধ্য দিয়ে। কেতকী দেখাব, রবীন্দ্রনাথ- ওকাম্পোর সাক্ষাৎ আসলে বাংলা, ভারত, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ইতিহাস।
কেতকী ছিলেন দুই ভাষার লেখক। এবং তিনি বাংলা তথা ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির মধ্যে যাপন করতেন। কেতকীর অনুবাদ-চর্চার গুরুত্ব এখানেই। তিনি রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিভাষী পাঠকের জন্য সরল না করে, পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেছেন রবীন্দ্রনাথের জটিল ও ইন্দ্রিয়সমৃদ্ধ জগতের দিকে নিয়ে যাওয়ার তাঁর ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে।
তাঁর অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ বাংলা থেকে ইংরেজিতে যাত্রা করেন; ওকাম্পো-গবেষণায় রবীন্দ্রনাথ ভারত থেকে আর্জেন্টিনায় পৌঁছন; আর ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এ তিনি মানুষের স্বাভাবিক colour perception-এর সীমা ভেঙে প্রবেশ করিয়ে দেন এক আশ্চর্য ইন্দ্রিয়জগতে। আর বিপুল রবীন্দ্রচর্চা এবং সাহিত্যচর্চা কেতকী কুশারী ডাইসন হয়ে ওঠেন ভাষা-সীমানা অতিক্রমকারী, সংস্কৃতির মধ্যে সেতু নির্মাণকারী এক আশ্চর্য গবেষক। বিধিনিয়মে তাঁর পার্থিব শরীর এই মাটির পৃথিবীতে মিশে যায় ঠিকই, কিন্তু তাঁর কাজ কালের সীমানার সমস্ত গণ্ডিকে ভেঙে ফেলে অমরত্ব লাভ করে।