
.jpg)
দেশের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র আইআইএসইআর (IISER), পুণে। সম্প্রতি সেখানকার একটি ঘটনা শিক্ষামহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সমাজমাধ্যম ‘রেডিট’-এ একটি পোস্ট ঘিরে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অভিযোগ, সেমেস্টার পরীক্ষার সময় পড়ুয়াদের চরম যৌন ও মানসিক হেনস্থা করা হয়েছে। খোদ ডিন-এর নির্দেশেই এই কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনা প্রতিষ্ঠানের অন্দরে ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
কী ঘটেছিল? (মূল পোস্টের সারাংশ): রেডিটে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে প্রথম বর্ষের সেমেস্টার পরীক্ষা চলছিল। সেই সময় একাধিক পড়ুয়াকে তল্লাশি করা হয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁদের সম্মতি ছাড়াই গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ভয়াবহ হেনস্থার শিকার হন এক ছাত্রী। তাঁকে নকল করার সন্দেহে হল থেকে বের করে আনেন রঞ্জন সাহু নামের এক অশিক্ষক কর্মী।
ছাত্রীর হাতে কিছু লেখা ছিল। এরপর তাঁকে সিসিটিভি-বিহীন একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক মহিলা সাফাইকর্মী তাঁকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে তল্লাশি করেন। ছাত্রীটির প্রবল অসম্মতি এবং বাধা দেওয়া সত্ত্বেও জোরপূর্বক তাঁর পোশাক খোলা হয়। তাঁর গোপনাঙ্গেও হাত দেওয়া হয়। রেডিট পোস্টের দাবি, এই জঘন্য কাজ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ৭৪ এবং ৭৬ নম্বর ধারা এবং ‘পশ’ (POSH) আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
শুধু ওই ছাত্রী নন। এক ছাত্রকেও শার্ট খুলতে বাধ্য করা হয়। তাঁর গোপনাঙ্গেও হাত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অন্য এক ছাত্রীকে শৌচালয়ে আটকে তল্লাশি করা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়ুয়াদের ভয় দেখানো হয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা এবং গাফিলতি: এই ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আরও বেশি হতাশাজনক। রঞ্জন সাহু জানান, ডিন অফ অ্যাকাডেমিকস, অধ্যাপক শ্রাবন্তী চৌধুরীর নির্দেশেই এই তল্লাশি হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, অধ্যাপক শ্রাবন্তী নিজেই প্রতিষ্ঠানের ‘ইন্টারনাল কমিটি’ বা আইসি (IC)-র প্রধান। ফলে তাঁর বিরুদ্ধেই কমিটিতে অভিযোগ জানানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
কমিটির অন্য এক সদস্যের কাছে গেলে তিনিও বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি জানান এটি অ্যাকাডেমিক বিষয়। নিরুপায় হয়ে ওই ছাত্রী পুলিশের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সেখানেও তাঁকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। পুলিশ শুরুতে অভিযোগ নিতে চায়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রতিষ্ঠানের এক নিরাপত্তারক্ষী একটি চিঠি নিয়ে থানায় আসেন। তাতে অ্যাসোসিয়েট ডিন ডঃ নীনা মানি এবং রঞ্জন সাহুর সই ছিল। চিঠিতে ছাত্রীর সমস্ত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করা হয়।
অভিযোগ, থানায় বসেই ডঃ নীনা মানি ওই ছাত্রীকে হুমকি দেন। অভিযোগ তুলে না নিলে তাঁর ‘অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার’ শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ কোনো এফআইআর (FIR) দায়ের করেনি। শুধুমাত্র একটি বয়ান রেকর্ড করে ছেড়ে দেয়। পরে অন্যান্য ডিনদের সাথে বৈঠকে বসেও কোনো সুরাহা হয়নি। কর্তৃপক্ষ নিজেদের দোষ ঢাকতে উল্টে পড়ুয়াদেরই চরিত্র হনন করেছেন।
অন্যান্য সূত্র ও মন্তব্য: রেডিটের মন্তব্য (comments) অংশেও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নেটিজেনরা। অনেকেই বলেছেন, এই ঘটনাটি সিসিটিভি-হীন ঘরে ঘটানো হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। ফলে কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ নেই। এটি পূর্বপরিকল্পিত। প্রথম বর্ষের পড়ুয়ারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে খুব একটা সচেতন থাকেন না। তাঁদের ভয় দেখাতেই এই নির্দিষ্ট ঘরগুলি বেছে নেওয়া হয়েছিল। সাফাইকর্মীদের দিয়ে এই কাজ করানোটাও কর্তৃপক্ষের একটি সুপরিকল্পিত চাল। প্রতিষ্ঠানের এমন স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ নিয়ে অনেকেই সরব হয়েছেন।
সম্পাদকীয় অভিমত: এই ঘটনাগুলি একটি বৃহত্তর এবং ভয়াবহ প্রশ্ন তুলে ধরে। দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়ারা কি আদৌ সুরক্ষিত? ক্ষমতার অলিন্দে বসে ডিন বা অধ্যাপকরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?
সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের শারীরিক স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। ইউজিসি-র (UGC) সুস্পষ্ট নিয়মও রয়েছে। তা সত্ত্বেও নকল ধরার অজুহাতে পড়ুয়াদের মৌলিক অধিকার এভাবে খর্ব করা যায় না। সিসিটিভি-হীন ঘরে সাফাইকর্মীদের দিয়ে পড়ুয়াদের বিবস্ত্র করা কোনোমতেই সুস্থ বা স্বাভাবিক নিয়মের অঙ্গ হতে পারে না।
কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা। কিন্তু তার বদলে তাঁরা অভিযোগকারিণীকেই হেনস্থা করেছেন। ভয় দেখিয়ে কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছেন। এটি অপরাধীদের আড়াল করারই সামিল।
এই ঘটনার একটি দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। পড়ুয়াদের নিরাপত্তা এবং সম্মান সুনিশ্চিত করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক কর্তব্য। নাহলে দেশের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার উপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।