এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • জোছনায় তোমার সঙ্গে ভিজবো বলে

    ছুটি রায়চৌধুরী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬৯ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    ১৩


    খাওয়া শেষে চূর্ণীকে ট্যাক্সিতে তুলে দিতে গেল ইমু। ট্যাক্সিতে উঠে বলল, আপনি যাবেন না?
    — না। আমার একটু কাজ আছে।
    — ওহ। বলে পকেট থেকে পার্স বার করে তিনটে দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে চূর্ণী ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিল।
    — তুমি গেলে না?
    — আমার ইচ্ছে।
    — আমার সত্যি কাজ আছে।
    — বেশ তো, করে আসুন। আমি দাঁড়াচ্ছি।
    — আচ্ছা নাছোড়বান্দা মেয়ে তো।
    ইমুর ঘাম হতে লাগল।

    ইমু ভাবতে লাগল কোথায় যাওয়া যায়? বাসায় ফিরলে বাড়িওয়ালা এবং বাড়িওয়ালি ভুল বুঝবে। কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে এল একটা ফোন।
    অচেনা নম্বর।
    — নমস্কার, কে বলছেন?
    — দাদা, আমি সম্বিতি।
    — সম্বিতি, কোথায় আপনি?
    — আমি তো বাড়ি চলে এসেছি। দিলীপদার জন্য মন খারাপ সবার। মেলা ভেঙে গেল।

    ইমু জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল।
    কিছু বলবে?
    — দাদা, আজ রাতে কী করছেন?
    — কেন?
    — আজ তো পূর্ণিমা নয়। কাল গেছে। তবু চাঁদ থাকবে। ভাবছি, চাঁদনি রাতে দিলীপদাকে অনেক গান শুনিয়েছি।
    আজও শোনাতে ইচ্ছে করছে।

    কী বলবে? চুপ ইমু।
    — শোনাও।
    — শোনাব, যদি আপনি একটু পায়ের ধুলো দেন, আপনি শুনলে দিলীপদার শোনা হবে।একটা উপলক্ষ্য লাগে মানুষের কাছে পৌঁছাতে।

    ইমু শিয়ালদহ স্টেশনে এসে টিকিট কাটল। দুটো। তার আর চূর্ণীর। বারাসত লোকাল চলে গেছে। বনগাঁ লোকাল ভরসা। প্রচণ্ড ভিড়। চূর্ণীকে বলল, তুমি লেডিসে ওঠো। নেমে দাঁড়াবে।
    — কেন আমি মেয়ে বলে?
    এই এক স্বভাব হয়েছে আজকালকার মেয়েদের। তারা যে মেয়ে নয়, সেটা জানান দিতে মরিয়া।
    চুপ মেরে গেল ইমু।
    কোনও কামরায় পা রাখা যাচ্ছে না।

    অবশেষে ভেন্ডার কামরায় উঠে পড়ল। একটা বিশ্রি বোঁটকা গন্ধ। ছানার জল আর বাঁধাকপির পচা পাতার মিশেলে তৈরি।
    চূর্ণীকে দেখে একজন জায়গা ছেড়ে দিল।
    চূর্ণী বসল না।
    ইমুর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল।

    স্টেশন থেকে সম্বিতির বাড়ি যেতে ধরতে হল একটা ভ্যান। পঞ্চাশ টাকা ভাড়া চাইল।
    — এত কেন?
    — খালি ফিরতে হবে বাবু।
    কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না।
    ভ্যানে চড়ে বসল পা ঝুলিয়ে। চূর্ণী মাঝখানে উঠে বসেছে। যেতে একটা মিষ্টির দোকান দেখে থামতে বলল।
    — মিষ্টি ভালো হবে?
    কেন যে লোকে জিজ্ঞেস করে। দোকানদার কখনও বলবে, মিষ্টি খারাপ? কোন মিষ্টিটা আপনার দোকানের সেরা?
    — সব মিষ্টি বাবু। একটা খেয়ে দেখুন।
    একজন খদ্দের চোখে ইশারা করল, ইমুকে। আঙুল দিয়ে দেখাল। রসগোল্লা।
    বেশ বড় বড় সাইজ। ধবধবে সাদা।
    — কত করে দাম?
    দাম শুনে অবাক। মাত্র সাত টাকা করে পিস। রাজভোগের সাইজ।
    — দিন ২০ টা।

    রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে নিতেই তার মনে হল, এ তো পুরানো দিনের লোকের মতো রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া।
    হাঁড়ি দেখে চূর্ণী হাসল এক দফা। পারেনও বটে।

    আলো-আঁধারি পথ। রাস্তার সব আলো জ্বলছে না। যেতে যেতে লোডশেডিং হয়ে গেল। ব্যাগে হাত দিয়ে টর্চ বার করল ইমু। জ্বালল।
    — বাবু জ্বালাবেন না, অসুবিধা হচ্ছে।
    — অন্ধকারে অসুবিধা হবে না?
    — না বাবু, আলো কোথায়? অন্ধকারই তো মানুষের আসল ঠিকানা। আলোয় নয়, আঁধারেই তো মানুষ নিজেকে খোঁজে।

    দার্শনিক কথাবার্তা।
    কার মধ্যে যে কী থাকে!

    যেতে যেতে ফোন এল সম্বিতির নম্বর থেকে।
    — দাদা কতদূর?
    — এই কোথায় এসেছি আমরা? রিকশাওয়ালা জায়গার নাম বলল।
    — ও তাহলে, আরে বেশি দূর নেই। আসুন সাবধানে, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি হ্যারিকেন নিয়ে।

    ১৪


    মোরাম বিছানো সরু পথ। অল্প হেঁটেই সামনে বাড়ি। পাকা একতলা ঘর। সিঁড়ির ওপরে ছাদে আরেকটা ঘর।
    ইমুর কাছ থেকে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে সম্বিতি আলো দেখিয়ে বলল, হাত-পা ধুয়ে নিন।
    — বোন, তুমিও এসো।
    মেয়েরা মেয়েদের কত সহজ করে নিতে পারে।

    ইমুর হাত-পা ধুয়ে বের হতে একটু সময় লাগল। বাথরুমে হালকা আলো জ্বলছে। পরে জেনেছে সোলার লাইট। বের হওয়ার পরে একজনকে ডাকল সম্বিতি।
    বছর ষোলো বয়স।
    — অনিল, জ্যেঠুকে উপরের ঘরে নিয়ে যা।

    ইমু ঘরে ঢুকে দেখে চূর্ণীর প্রসাধন সারা।
    একটা মিষ্টি গন্ধ ভাসছে বাতাসে।
    এ যেন অন্য মেয়ে। একটা লালপেড়ে শাড়ি পরেছে। কার? সঙ্গে ছিল? না সম্বিতি দিয়েছে। সঙ্গে লাল ব্লাউজ। কপালে লাল টিপ। সোলার লাইটের আলোয় চূর্ণীকে দেখে কেঁপে উঠল ইমু।

    অনিলের ডাকে সম্বিত ফিরল।
    — জ্যেঠু আমি নিচে গেলুম।

    — কী দেখছেন?
    — কিছু না।
    — বলুন, ভয় নেই। দাবি করে বসব না।
    ইমু ভাবল, এর চেয়ে নিজের ভাড়া বাড়িতে যাওয়া ভালো ছিল। দুটো আলাদা ঘর। আলাদা শুতে বলতে পারত।
    এখানে যে একটাই খাট। যদিও চওড়া। তবু এক খাটে!
    ঘাম দিতে লাগল, স্নানের আরাম ঘুচে গেছে। চলুন ছাদে যাই। নরম করে বলল চূর্ণী।
    সেই ভালো। ছাদে বেরিয়ে দেখে, শতরঞ্চি পাতা। সেখানে একটা হারমোনিয়াম রাখা, আর তবলা।
    গানের আসর বসেছিল না বসবে?

    সম্বিতি উঠে এল ছাদে। হাতে অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি। সঙ্গে একটা মেয়ে। অবিকল কিশোরী সম্বিতি। দু-জন। তার হাতে দুটো মুড়ির বাটি।
    — ভাবলুম, লুচি করি। তারপর ভাবলুম, যদি না খান। সম্বিতি বলে। আজকাল অনেকেই তেল খেতে চায় না। ডায়েটিং না কি করছে। খেলে কাগজে মুছে নিয়ে খায়।
    — না করে ভালোই করেছো। আসার আগেই খেয়েছি ভরপেট।
    — না বললে হবে নি মামা, খেতেই হবে।
    মামা। ছেলে বলল জ্যেঠু। মেয়ে মামা।
    — আমি মেখেছি, খেয়ে দেখুন।

    সত্যি চমৎকার মাখা। আমতেল মাখা মুড়ি। সঙ্গে ছোট ছোট শসা ও পেঁয়াজ কুচি। দু-একটা কাঁচালঙ্কার আলতো ছোঁয়া। আর কাঁচা বাদাম ভাজা।
    সে যে খাবে না বলেছিল, ভুলেই গেল। জ্যোৎস্নার চরাচরে শুধু মুড়ি খাওয়ার আওয়াজ। চূর্ণী শুধু চা খেল। একমুঠো মুড়ি নিয়ে আর নিল না।
    — পারছি না।
    মেয়েরা কি মেয়েদের ঈর্ষা করে? অকারণ?

    সম্বিতির মেয়ে নীলা, এতক্ষণে জানা হয়ে গেছে নাম। নীলার মুড়ি মাখার প্রশংসা করতেই কি খেল না?
    অবশ্য বড়লোকের মেয়েরা মুড়ি খায় না হয়তো।

    রাতে গানের আসর। তবলা বাজাল অনিল, মায়ের পরে গাইল মেয়ে, বাঁশিতে স্বামী।

    চূর্ণী ততক্ষণে নেমে গেছে নিচে।
    — দাদা, ভাতটা একটু গালিয়ে নিয়ে আসছি। বলল সম্বিতি।

    সম্বিতি ফিরল একটু দেরিতে। লাল পাড় ঘিয়ে রঙের তাঁতের শাড়ি। পূজারিণী বেশ। হলুদ ব্লাউজ। কপালে একটা মস্ত লাল টিপ। হাতে তিনটে জুঁই ফুলের মালা। একটা চূর্ণীর দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, নাও পরে নাও।
    চূর্ণী স্মিত হেসে নিল মালাটা।
    আরেকটা নিজের মেয়েকে দিল।

    ছেলে অনিল ততক্ষণে তবলায় বোল ঠোকা শুরু করেছে।
    ইমুর তন্দ্রা মতো এসে গেছিল, ঢুলছিল। চূর্ণীর আলতো ঠোকায় জেগে উঠে চোখ কচলে নিল সলজ্জ মুখে। চোখ খুলতেই সে শুনল সম্বিতি গাইছে তার প্রিয় গান—

    জীবন ছাইড়্যা যাইও না মোরে
    তুই গেলে বাঁচবো ক্যামনে করে।

    সম্বিতির গানের গলা বেশ ভালো। কিন্তু ইমু অবাক হয়ে গেল সম্বিতির বরের বাঁশি বাজানো শুনে।
    মেয়ের অনুরোধে সবশেষে সম্বিতির বর বাঁশিতে বাজাল—

    কী সাপ কামড়াইলো আমারে
    ওরে ও সাপুড়িয়া রে
    জ্বলিয়া পুড়িয়া মরলেম বিষে...

    কী অপূর্ব সুর! কী অসামান্য বাজনা—জ্যোৎস্নায় যেন ঝরে ঝরে পড়ছে কান্না—

    বনের বাঘে খাইত না যারে,
    মনের বাঘে খায়—
    বললে
    বিজয় সরকারের বিচ্ছেদ গান। আগে শোনেনি ইমু।

    এরপর আর কেউ কোনও কথা বলল না। চুপচাপ উঠে সবাই রাতের খাওয়া সেরে ঘুমোতে গেল।

    ইমু খাওয়া শেষে ছাদে উঠে এল। একটু পরে যাবে। ভাবলো সে। চূর্ণী ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়ুক। ঘণ্টাখানেক পরে ঘরে ফিরে দেখে চূর্ণী বসে। দেওয়াল পিঠ ঠেকিয়ে অপেক্ষা করছে।
    — ঘুমোওনি তুমি?
    — না।
    — ঘুমোও।
    — কোথায়?
    — তুমি—খাটে শোও। আমি নিচে চাদর পেতে নিচ্ছি। গরমকাল। অসুবিধা হবে না।

    একটু থেমে যোগ করল--

    মেঝেতে শোয়া আমার অভ্যাস আছে।
    — আমার সঙ্গে শোবেন না বলুন?
    — তা বলিনি।
    — আপনি খাটেই শোবেন।
    — না।
    — আমি তাহলে ছাদে চলে যাবো।
    — ছেলেমানুষি করো না।
    — একটা দিন রক্ত-মাংসের মানুষ হোন না। খুব কি ক্ষতি হবে একটা দিন পাথরের দেবতা না হলে?
    — যা হওয়ার নয়, তা একদিনও হওয়া উচিত নয়।
    চূর্ণী আর জোর করল না।
    মেঝেতে শুয়ে পড়ল ইমু। ভোরে উঠে দেখে তার পায়ের কাছে শুয়ে আছে চূর্ণী।
    — ছি ছি কী করেছো তুমি?
    চূর্ণী কোনও কথা বলল না। শুধু চুপ করে শুনল। শেষে বলল, আপনার কৌমার্য তো নষ্ট হয়নি!

    কথা না বলে নেমে এল ইমু। নেমে দেখল সম্বিতির বর মাথায় টোকা, কোদাল-খুরপি নিয়ে মাঠে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে।
    ইমুও তার পিছু নিল।
    পিছন থেকে সম্বিতি বলল, চা না খেয়ে!
    চূর্ণী শুধু বলল, উনি কিছুই খান না। সাত্ত্বিক পুরুষ।
    গলায় কি একটু শ্লেষ!

    আলপথ বেয়ে চলেছেন দুজনে। কিছুটা পথ পার হওয়ার পর সম্বিতির বর বলল, এইটা আমাদের জমি।
    টমেটো গাছের পাতার একটা সুগন্ধ আছে। এটা ইমুর চেনা। তাকাল।
    — না দাদা, ওটা আমাদের জমি না। এইটা।
    ইমু দেখে, শুধু মুলো আর বাঁধাকপি।
    মুলোগুলোর সাইজ বেশ বড়। বাঁধাকপিগুলো নারকোলের ধরনের।
    — শুধু মুলো আর বাঁধাকপি।
    — আমার মুলো ফলাতে খুব ভালো লাগে। লম্বা লম্বা মুলোর মধ্যে একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে।
    — আর বাঁধাকপি?
    — সম্বিতির পছন্দ।

    ইমুর বুক ফেটে একটা কথা বের হয়ে আসতে গেল। ভাবল জিজ্ঞেস করে। রুচিতে বাধল।
    কিন্তু কী যেন ভেবে সম্বিতির বরই মুখ খুলল—
    — দাদা, আপনি কি সম্বিতির প্রেমে পড়েছেন?
    — চুপ করে রইল ইমু। কী বলবে?
    — ওর প্রেমে যে পড়েছে সেই মরেছে দাদা। আমিও।
    ওর বাবার কাছে আমি মানুষ। আমার বাপ-মা ছিল না। মেদিনীপুরের বানের জলে ভেসে যায়। এক গানের আসরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওর বাবা তুলে নিয়ে এসে মানুষ করেন। পড়াশোনা শেখান। গান শেখান। বাঁশিও। কত জায়গায় গেছি গাইতে। সম্বিতি, ওর বাবা। আমি। ওর মা। ওর বাবা খুব গুণী মানুষ। দার্শনিক কথাবার্তা। বামুনদের খুব বিরোধী। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের সাক্ষাৎ শিষ্য। কত অনুরাগী যে আসতো। আমি পরে বুঝতে পারি, তারা যত না বাবাঠাকুরের জন্য আসছে, আসছে সম্বিতির জন্য। সম্বিতি আর আমি পাশাপাশি বড় হয়েছি। সম্বিতি আমাকে মানুষ বলে গণ্যই করতো না।

    লোক প্রেমে পড়ল। প্রেমে পুড়ে হারল। কিন্তু কেউ মন পেল না। শেষে এক বিবাহিত পুরুষের প্রেমে পাগল হয়ে ঘর ছাড়ল। ওর বাবা ওকে বকে বকে ফিরিয়ে এনে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
    আমি না করতে পারিনি।

    একটানা কথা বলছিলেন—সুরদাস।
    সম্বিতির বরের নাম সুরদাস। ঘরে ঢোকার মুখে নাম দেখেছিলাম।
    — আচ্ছা, সুরদাস, আমাকে এত কথা বলছেন কেন?
    — আমার আসল নাম সুরদাস নয়, খোকন শেখ, খোকন। মেদিনীপুরের পটুয়াপাড়ার পটুয়াঘরের ছেলে আমি। আমি এ সব জানতামও না। বাবাঠাকুর মরার আগে বলে গেছেন। আমার বাবা ছিলেন বাবাঠাকুরের বন্ধু। সেটা জেনেই গ্রামের লোক আমার দেড় বছর বয়সে বাবাঠাকুরের গানের আসরে ছেড়ে যান। মা আমার নাম দেন সুরদাস। বাবাঠাকুর শেখ খোকনই রাখতে চেয়েছিলেন। মা-ঠাকুরানী দেননি। বলেন, তোমরা পুরুষ মানুষ বাইরে বাইরে ঘোরো। মানুষের বাইরেটাই দেখো। এদের মধ্যে কত হিংসে জানো না। সুরদাসের আসল পরিচয় জানলে সবাই দূরছাই করবে।
    আমার ছেলেকে লোকে দূরছাই করবে! আমি সইতে পারবো না।
    — সম্বিতি একথা জানেন?
    — না।
    — আশ্চর্য।
    — আশ্চর্যের কিছু নাই। সম্বিতি আমার শরীর কখনও দেখেনি।
    — সেকী? এ কী সম্ভব?
    — সম্ভব দাদা। আমি ভয় পেয়েছি। ভয় ওকে হারানোর। যদি ওকে সুখ দিতে না পারি? যদি ও জেনে যায় আমার জন্মপরিচয়?
    — কীভাবে?
    — আমায় খতনা দিয়েছিল গাঁয়ের লোকে।
    — সম্বিতিকে যতটুকু জানি, উনি খুব উদার মনের মানুষ। জানলেও কিছু হতো না।

    — কে জানে বাবু। আমার ভয় করে। বড় ভয়। অফিসে কত কথা শুনি। দু-একজন ছাড়া বাকিদের কেমন অচেনা লাগে তখন। এমনিতে এত ভালো। কিন্তু মুসলমানদের প্রসঙ্গ এলেই এমন বলে। মনে হয়, সব মুসলমান চোর-ডাকাত আর খুনি।
    — ওসব ভুল ধারণা।
    — সে তো জানি বাবু। শুনতে শুনতে আমার মনেও হীনম্মন্যতা জন্মে গেছে।
    আমি সিঁটিয়ে থাকি। খালি চাষ আর বাঁশিতে মুক্তি।

    বেলা বাড়ছে। ফিরতে হবে। পা বাড়াই।
    সুরদাস এগিয়ে এসে হাত ধরে।
    — বাবু, একটা কথা বলবো—
    — বলুন।
    — মেয়েটা আপনাকে খুব ভালোবাসে। কষ্ট দেবেন না বাবু।

    সুরদাসকে কী করে বোঝাই আমাদের বয়সের দুস্তর ব্যবধান। ওর বয়স ২৫ আমি ৪৫। আজ ও উন্মাদের মতো করছে, তারপর উন্মাদনা চলে গেলে আক্ষেপ করবে, কেন বিয়ে করলুম? তার চেয়ে না-পাওয়ার বেদনাটুকু থাক।

    সব কি পেতে আছে?
    ~~~


    শেষের আগে অল্প কথা

    বাড়ি ফিরি। সম্বিতি খুব যত্ন করে খেতে দেয়। এরপর বের হয়ে পড়ি। স্টেশনে আসি।
    শিয়ালদহে নামি। সারা পথ কথা হয় না। ওকে বাসে তুলতে যাই।
    ও হঠাৎ আমার হাত ধরে বলে, একটা অনুরোধ করছি। না করবেন না!
    — বলো।
    — তোমার সঙ্গে একটা গোটা রাত জোছনায় ভিজতে চাই। দেবে ভিজতে? খোলা আকাশের তলায়।

    একথার কী জবাব দেব, পাঠক?
    ~~~


    পুনশ্চ:

    ইমুর কথা:

    আমি স্বপ্ন দেখি, আজ না হয় কাল বিপ্লব হবে। রোগশয্যায় শুয়ে মরতে চাই না। লড়াইয়ের ময়দানে।
    সেই জীবনে কাউকে জড়ানো কি ঠিক?
    ***

    ছুটির কথা:

    বিপ্লব কি কেবল পুরুষের জন্য সংরক্ষিত?
    মেয়েদের কোনো জায়গা নেই?
    লড়াইয়ের খোলা মাঠেও তো জোছনা আসে। না হয় পাশাপাশি শুয়ে থাকতো দুটি মরদেহ?
    খুব অন্যায় হতো, ইমু, ইমুদা?


    সমাপ্ত
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • যে বৃষ্টিতে ভেজেনি | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:১১742449
  • heart
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন