রিনি অংক পড়ায় একটা হাইস্কুলে l সে হতে চেয়েছিলো ডক্টর, কিন্তু তালেগোলে হরিবোলে জীবনের শেlরগোলে হয়ে গেলো টিচার.. তাও আবার অংকের l খুব ছোটবেলায় জেলার একটি পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছিল সে, তখন তো আর social media ছিল না, কিন্তু এখনও মনে পড়ে খবরের কাগজের লোক এসেছিল তার বাড়িতে ইন্টারভিউ নিতে l “একটি কাকু খুব হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করেছিলো, “ খুকি, তুমি কি হতে চাও বড়ো হয়ে? রিনি বলেছিলো, “ আমি ডাক্তার হতে চাই l” “খবরের কাগজের কাকুটা আবার জিজ্ঞাসা করেছিলো, “ কেনো তুমি ডাক্তার হতে চাও? “ রিনির সlফ উত্তর ছিল, “ আমি গরিবদের সেবা শুশ্রূষা করতে চাই l” ছেলেমানুষ বয়সের ছেলেমানুষী উত্তর l রিনির বাবা কিন্তু খুব খুশি হয়েছিলেন উত্তর শুনে l মেয়ে প্রাইমারী স্কুলের ছাত্রী.. তাই এত গুছিয়ে কথা বলছে.. বড় হয়ে এ নিশ্চয়ই সমাজের কেউকেটা হবে l কিন্তু রিনির ভাগ্যে ছিল অন্যরকম l তারপর তো কতো বছর কেটে গেছে l রিনির বিয়ে করে আমেরিকাতে আসার পরও কেটে গেছে দশ দশটি বছর l বলাই বাহুল্য রিনির ডাক্তার হওয়া হয় নি.. রিনি হয়েছে হাইস্কুলের টিচার l
রিনির জীবন এখন সকাল থেকে মেশিনের মত ছোটে l সকাল 8:15 থেকে ক্লাস শুরু হয় l প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে এক একটা ক্লাস, তিনটে ক্লাস সারাদিনে, মাঝখানে দেড় ঘন্টা অফ, সেই সময়টা রিনির প্ল্যানিং পিরিয়ড, কত খাতা দেখা বাকি থাকে, প্রশ্ন উত্তর, কুইজ কত কিছু তৈরী করতে হয় পরের দিনের ক্লাসের জন্য l একটা ক্লাস তার আলজেব্রা ১, আরেকটা আলজেব্রা ২ আর আরেকটা ত্রিকোণমিতি র | তারপর সেদিন আবার হেডমাস্টার ডেকে বলে দিলেন, “ Rini, I need your help sometimes, if Geometry teacher did not show up. “ রিনি হাসি হাসি মুখে বলে, “ yes, of course, no problem. “ মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকে, “ ধুর বাবা, তার মানে অফ পিরিয়ড এর রেস্টটাও গেলো l “ তবে হ্যাঁ, রিনি পড়ানোটা খুবই উপভোগ করে l সকাল থেকে slope, quadratic, sin, cos নিয়ে বসে থাকতে তার সত্যি ভালো লাগে l রিনির বাবাও পড়াতেন, তাই পড়ানো রিনির অস্থিমজ্জl তে l
তবে রিনির সবচেয়ে ভালো লাগে স্কুল ছুটির পর খুব মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে ম্যাথ কাউন্ট এর ক্লাস করাতে l এতে রিনি একেবারেই ক্লান্ত হয় না l তার তখন রকেটের গতির মত মাথা চলে, বিদ্যুতের মত মাথায় বুদ্ধি ঝিলিক দিয়ে যায়, এই অংক গুলো সমাধান করতে পারলে রিনির ভীষণ আনন্দ হয় l রিনির টেবিলে চারজন ছাত্রছাত্রী বসে একসাথে, ওই দিকে স্কট - আরো একজন টিচার - তারও টেবিলে আরো চারজন l স্কট ছেলেটি বেশ ভালো… বেশ বুদ্ধিমান … চেহারাতে বেশ একটা পড়াশোনা করার ছাপ l রিনির খুব ভালো সহকর্মী সে, খুব ভালো পড়ায় l রিনির টেবিল এর একদিকে রিনি শিক্ষকের আসনে.. অন্য দিকে আরও চারজন ছাত্রছাত্রী l এই ব্যাপারটাই ভীষণ মজার.. চারজনের মধ্যে একজন ভারতীয়, একজন চাইনিজ, একজন কালো আমেরিকান আর একজন সাদা আমেরিকান, জাত বর্ণ নির্বিশেষে এদের পরিচয় একটাই.. এরা অংকের পড়ুয়া… রিনির মাঝে মাঝে মনে হয় এই অংকটারই আসলে কোনো জাত নেই, এ ভারতেও যা, চিনেও যা, আমেরিকাতেও তাই l রিনির মনে হয় ছবি তুলে সে দেশে বন্ধুদের দেখায়.. এই দেশে অবশ্য অনেক আইন.. এরকম হুটহাট ছবি তোলা যায় না l
আজ sin cos এর একটা দুর্বোধ্য জটিল অংক নিয়ে সমাধান চলেছে টেবিলে l প্লেন আর ভূমির মাপ জোক নিয়ে চলছে সমাধান, প্লেন উপরে কত angle এ আছে, কোনো একটা অসুবিধা দেখা দিয়েছে landing এর, প্লেনটা কি ওপরে উঠবে, আরো কিছুক্ষণ ঘুরবে, সেখানে কি আকাশের পথগুলো খোলা আছে নাকি নিচে নেমে আসবে? কিন্তু সেখানে ও runway ফাঁকা নেই, তাহলে প্লেন কতক্ষণ উপরে থাকবে? রিনি চোখ বন্ধ করে চিন্তা করে.. হঠাৎ করে কলেজের এক মাস্টারমশাই এর কথা মনে পড়ে যায়, আরে এটা তো সেই অংকটা, রিনি মানসচোখে দেখতে পায়.. বিধান বাবু.. যাঁকে সবাই অংকের গুরু বলে চিনত.. হাতে একটা চক, গড়গড় করে লিখে চলেছেন বোর্ড এ, ও পাশে মন্ত্রমুগ্ধ ছাত্রীদের দল কপি করে চলেছে বোর্ড থেকে l বিধান বাবু মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর, তাও মনে মনে প্রণাম করলো রিনি l “ma'am you are just fantastic… “ পৃথিবীর চার জায়গা থেকে চারটি স্বর ভেসে আসছে.. রিনির খুব আনন্দ হচ্ছে… সে যথাসম্ভব উচ্ছাস দমন করে বললো.. “ its ok dear.. I am glad that you got helped.. “ সাদা ছেলেটা পকেট থেকে ছোট একটা চাবির রিং বের করলো, তাতে পৃথিবীর globe আটকানো l “Ma'am, this is for you… Please don't say no.. “ “ No dear, it's okay, I can't take anything from you.. “ দেখাদেখি অন্য পড়ুয়াগুলো রিনিকে জোর করতে লাগলো চাবির রিংটা নেওয়ার জন্য…. রিনির ঝট করে মনে পড়ে যাচ্ছে.. আজ 5th সেপ্টেম্বর, ভারতে শিক্ষক দিবস…. কিন্তু আমেরিকায় কিছুই নয় l কিন্তু এরা কি করে এটা বুঝলো.. অংক কি সব কিছুই বুঝিয়ে দেয়?
* আমার গল্পে রিনি বারবার নানা চরিত্রে ফিরে আসে
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।