সাভারের ঘটনাটা ইতোমধ্যে সকলের জানা শেষ। সাত বছরের একটা ছেলে শিশুকে প্রথমে মাদ্রাসার অন্য ছাত্র, পরে মাদ্রসার শিক্ষকেরা দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে। সাত বছর! বয়সটা শুধু চিন্তা করেন। আপনি আমি কী দেখলাম এই ঘটনার পরে? ঘটনাটা কী তার বর্ণনা দিয়ে কিছু ফেসবুক পোস্ট (আসলে কিছুও না, একটা পোস্টই কপি পেস্ট হয়ে ঘুরছে সব জায়গায়!), কিছু তীব্র নিন্দা জানানো পোস্ট, তীব্র প্রতিবাদ জানানো পোস্ট! এরপরে? এরপরে এই ঘটনার যবনিকা পতন! দেশে নানা কিছু ঘটেই চলছে, ভেসে যেতে সমস্যা কী?
শুধু যে এই ব্যাপারেই এমন তা না, মাদ্রাসায় ছেলে শিশু ধর্ষণ নিয়ে প্রতিটা ঘটনাতেই এমনই ঘটে এরা এতই হতভাগা যে এদের নিয়ে কেউ চোখের পানি ফেলে না, কেউ রাস্তায় নামে না, কারো পদত্যাগ চায় না, মানব বন্ধন করে না, মিছিল করে না, সেমিনার করে না, সুষ্ঠু তদন্ত পর্যন্ত করে না। এরা এতই কপাল পোড়া যে এদের জন্য ন্যূনতম সমবেদনাটা পর্যন্ত জুটে না। একটু জোরে আহপর্যন্ত করবে নাকেউ, পাছে আবার ধর্ম অবমাননা হয়ে যায়! তখন? সাধের বেহেশত যদি চলে যায়? পাকা দাড়িওয়ালা, আজানুলম্বিত জুব্বা পরা হুজুরের বিরুদ্ধে বলে ৭০টা হুর কেউ হারাইতে চায় না। তাই প্রতিবাদ হয় নীরবে, পাপ ঢেকে রাখতে হয় ফর্মুলায়। মুসলমানের পাপ ঢেকে রাখলে কিয়ামতের দিন আল্লায় আপনার পাপ ঢেকে রাখবে, তাই এগুলা নিয়া অত আওয়াজ তুলা ঠিক না! এই, এমন করেই চলছে কাওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন।
কাওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে কিছুই লাগে না। আজকে আমার ইচ্ছা হইল আমি সরকারি একটা খাস জমি দেখে দখল করে কাওমি মাদ্রাসা দিয়া দেই? দেখি কে তুলে আমাকে? বেহেশত লোভী লোকজন পাওয়া যাবেই, তাই ছাত্রের অভাব হবে না। নিজেরা নানান পাপ করবে, একটা সন্তানকে পাঠাবে মাদ্রাসায়, তার অছিলায় চ্যালচ্যালায়া বেহেশত! এদিকে যে আসল তার আর কোন বক্তব্য নাই। সে মাদ্রাসায় থাকতে চায় না মানে হচ্ছে শয়তানের প্ররোচনায় পড়েছে! যে শিশু ধর্ষণের শিকার হয় না সেও যে পরিমাণ নির্যাতনের শিকার হয় তা লিখে বুঝানো কষ্টকর। অমানুষের মত মারে এই বাচ্চাদের। পশু মনে করে বেত চালায় এরা। এখন ডিজিটাল যুগ। তাই সমানেই সামনে আসে এমন কঠিন বেত্রাঘাতের ভিডিও। চোখে দেখা যায় না এমন সব দৃশ্য। বেহেশতের লোভে বাবা মা এগুলা দেখে না। কানা হাফেজ হয়ে আসে। কোরানে কী আছে, অর্থ কী কিছুই না জেনে ঝাড়া মুখস্থ করে হাফেজ হয়ে বের হয়। বের হয়ে এদের পেশা কী? সেই বিদ্যাও শিখায় এখানেই। ধান উঠার সময় গৃহস্থের বাড়ি যায়, ধান তুলে! রাস্তার পাশে মাইক নিয়ে দান খয়রাত তুলে! উস্তাদেরা ওয়াজ করা শেখায়, ওয়াজ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। এই পরম্পরা চলে আসছে, কোন পার্থক্য হয় নাই আজ পর্যন্ত। গরীব ঘরের সন্তানেরা আসে, এদের বাঁচার কোন উপায়ই রাখা হয় না এখানে। ভয়াবহ মানসিক রোগী হয়ে বেঁচে থাকে। আল্লার নামে দিয়ে দেওয়া হইছে এদেরকে। আর এরা আল্লার নামেই আকাম গুলো করে।
এই সব কাওমি মাদ্রাসায় সবচেয়ে বেশি পড়ে কারা? গরীব এতিম বাচ্চারা। এখন একবার ভাবেন, একটু মাথাটা চুলকিয়ে চিন্তা করেন কবে আপনি শুনছেন মাদ্রাসায় ছেলে শিশু ধর্ষণ হয়েছে আর সে এতিম ছিল? মনে পড়ে? কোনদিন শুনছেন এমন ঘটনা? তার মানে কী? এতিম বাচ্চাদের কেউ ধর্ষণ করে নাই আজ পর্যন্ত? উত্তরটা চিন্তা করে কি এখন শিউরে উঠছেন? ঠিক তাই! এতিম বাচ্চাদের ধর্ষণের খবর প্রকাশই হয় না। এদেরকে নিকট আত্মীয় যারা আছে তারা দায় সারার জন্য এগুলা মাদ্রাসায় দিয়ে যায়। এদের দেখার কেউ নাই, শোনার কেউ না। এদের মত অসহায় কেউ নাই। যাদের মা বাবা আছে তারা একটা সময় ধরতে পারে যে তার বাচ্চার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে, আদরেই হোক যেভাবেই হোক তারা শেষ পর্যন্ত ধরতে পারে। যদিও এদের মধ্যেও অনেক গল্পই প্রকাশ পায় না। আর এতিম বাচ্চাদের ক্ষেত্রে? কে প্রকাশ করবে? রক্ষক হচ্ছে ভক্ষক সেখানে, রক্ষা করবে কে? এখন একবার চিন্তা করেন তাহলে, মাদ্রাসায় নির্যাতনের শিকার শিশুর পরিমাণ কত তাহলে? কত শতাংশ প্রকাশ পায়? কত বড় একটা কুৎসিত দিক আমরা দেখেও না দেখার ভান করে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছি? লজ্জা ঘৃণায় বমি আসে আমার এই সব চিন্তা করলে।
আর এগুলা করছে ধর্মের নামে! এরাই তৌহিদি জনতা। এরাই নিছক সামাজিক একটা সিনেমা সহ্য করতে পারে না, এরাই নৌকা বাইচ বন্ধ করে, গান বন্ধ করে, মাজার ভাঙে, কবর থেকে তুলে লাশ আগুন দিয়া জ্বালায় দেয়, নিজেদের রায়ে জ্যান্ত মানুষ আগুনে পুড়িয়ে মারে! আপনি একটা শব্দ করতে পারবেন না, একটা জোরাল পদক্ষেপ নিতে পারবেন না। বছরের পর বছর ধরে এরা শক্তি অর্জন করেছে। এখন মনে হয়েছে তাদের সময় তাই এখন কিছুতেই কিছু মানে না আর। পুলিশ লাইনে আক্রমণ করে কনসার্ট বন্ধ করে।
আমি অন্য নারী নির্যাতন, ধর্ষণের প্রতিবাদের বিপক্ষে বলছি না। শুধু বলছি আপনেরা তো প্রতিবাদ করেন সেই সব ঘটনায়, মাদ্রাসায় ঘটে যাওয়া এই কুৎসিত ধর্ষণ সম্পর্কে কেন নীরব হয়ে জান? রামিশার ঘটনার কথা মনে আছে? বনশ্রীতে এক মাদ্রাসায় ঠিক একই দিনে ১০ বছর বয়সের শিশু আব্দুল্লাহকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন আব্দুল্লাহর পরিবারের কাছে? কোনদিন কোন প্রধানমন্ত্রী, কোন মন্ত্রী গিয়েছিল মাদ্রাসায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে এমন কোন পরিবারের কাছে? এদের শোক নাই? কষ্ট নাই? আপনি কী করছেন? কোন খোঁজ জানেন কেউ সেই মামলা, আসামির কী হয়েছে? সেই তদন্ত কবে আলোর মুখ দেখবে? কেন জানেন না? কেন ওইটার প্রতিবাদ হল না? আমি রামিশার সাথে তুলনা করছি না। কিন্তু তবুও বলছি কারণ শুধু আব্দুল্লাহ না, প্রতিবারই এমনই হয়। মাদ্রাসায় বাচ্চা বাচ্চা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, মানুষ একটু উহ আহ করে, এরপরে শেষ।
এখন সময় হয়েছে একটা কমিশন গঠন করে এর তদন্ত করার। সারা দেশের সমস্ত মাদ্রাসাকে এই কমিশনের আওতায় এনে সত্যকে সবার সামনে আনা হোক। আমরা কতটা নিচে নামছি তা জানতে হবে আমাদের। জানা হলে, সমস্যাকে সমস্যা বলে স্বীকার করলেই তার সমাধান সম্ভব। বোস্টনের ঘটনা মনে আছে? ক্যাথলিক চার্চের ঘটনা? বিখ্যাত স্পটলাইট সিনেমা? চার্চের একজন যাজককে নিয়ে তদন্ত করে গ্লোব পত্রিকার সাংবাদিকেরা। আস্তে আস্তে বের হয়ে আসে চার্চের ভিতরে আমাদের মাদ্রাসার মত কুৎসিত কাণ্ডের গল্প। এক বোস্টন শহরেই পাওয়া যায় ৭০ জন যাজক যারা শিশুদেরকে ধর্ষণ করত। পুরো ক্যাথলিক চার্চ নেটওয়ার্কের কী অবস্থা? সেই সময় এগুলা প্রকাশ পাওয়ায় চার্চে এগুলা বন্ধ হয়। আমাদের এখানেও তাই, আগে বের করতে হবে, সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হবে, তাহলেই সমাধান পাওয়া যাবে। না হলে যদি দেখেও না দেখার ভান করে যাই তাহলে এদের থেকে রক্ষা নাই।
ধর্মের নামে যারা সবচেয়ে বড় অধর্ম করতে পারে তাদের হাতে ধর্মের দায়িত্ব দিয়ে কোন স্বর্গে যাইতে চান আমার জানা নাই। সম্ভবত সেই স্বর্গে আমার আর যাওয়া হবে না। এই সব ভণ্ডদের নিয়ে আপনেরাই থাইকেন সেই স্বর্গে। যতক্ষণ শ্বাস আছে ততক্ষণ এই ভণ্ডদের বিরুদ্ধে বলেই যাব।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।