এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • দিগ্বিদিক - অরিত্র আহমেদ 

    Aritra Ahamed লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৯৩ বার পঠিত
  • ১.

    ঘোর বিপদ। স্নানের জন্য সমুদ্রে যাচ্ছি।
    বই ভালো লাগে না। লেখাও না। কিন্তু বাঁচা তো চাই।
    ঘোর বিপদ। বাঁচার বিপদ। বাঁচাই বিপদ। স্নানের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।
    সমুদ্রের জন্য পাগল হ'য়ে আছি। সাধুরা পাগল হয় সত্যের জন্য। সমুদ্রই সত্য।

    ২.

    মায়ের টুকরো টুকরো কথা। রান্নাবান্না। কান্নার স্মৃতি।
    মুখ ধুইয়ে দিচ্ছে। বাড়ি-পালানো ছেলের পেছনে ছুটছে। মা ছুটছে। মা ছোটে।
    এখন মা মরছে আস্তে আস্তে। আর আমি মাকে জিইয়ে রাখছি নিজের ভেতরে।
    মা কাঁদছে। মা আমাকে খুঁজছে। আমি নেই। থাকবো না। মা আমাকে পাবে না।
    আমি আমার স্মৃতির মতো গভীর আর অদৃশ্য হয়ে গেছি, আমি মরে গেছি,
    তবে যাবার আগে নিজের ভেতরে, নিজের একটি কোণে জিইয়ে রেখেছি মা'কে!

    ৩.

    কারো চোখে ছুরি চালিয়ে দিচ্ছি। সহ্য হচ্ছে না। শাস্তি হচ্ছে না।
    কারো কানের ভেতরে শিক দিয়ে গুঁতো দিচ্ছি পরকে পর। শান্তি হচ্ছে না।
    কারো মুখের ভেতরে পিস্তল ঢুকিয়ে গুলি করছি। সে চুরমার হ'য়ে যাচ্ছে। শান্তি হচ্ছে না।
    কারো নখের ভেতরে, নখের নিচে মাংসের ভেতরে সুচ ঢুকিয়ে দিচ্ছি, দশটা আঙুলে দশটা সূচ।
    শাস্তি হচ্ছে না। চোখ দিয়ে চোখ খুবলে খাচ্ছি, মুখ নিয়ে থেতলে দিচ্ছি মুখ।
    দুধের বোতল ভাঙলে যেভাবে শিশুরা কাঁদে, সেইভাবে কাদছে ওরা, ওইভাবেই কাঁদে,
    যারা ধ্বংস হয়, চূর্ণ হয়, নিঃস্ব হয়! কিন্তু আর ধ্বংস করে আমার শাস্তি হচ্ছে না, শাস্তি হচ্ছে না!

    8.

    পেছনে প্রফুল্ল মাংস। পথ যতো বেশি, ততো ভালো কারণ ততো বেশি মাংসের উল্লাস দেখি।
    পথ যতো বেশি, ততো দুধের মতো গলে পড়ে সৌন্দর্য! আমি অস্বীকার করি যে, আমি দেখছি।
    আমি তো দেখছিই। দেখা লাগে। আজ কার বাবা মারা গেছে। আমার ভাইয়ের জাহাজ আটকে আছে সমুদ্রে,
    ছোটো ছোটো জাহাজের পেছনে। আমি ওই জাহাজের মতো। মাংস দেখছি। সুন্দর জাহাজের মাংস।
    জলের মাংস। জলের মতো মানুষ আর মানুষের মতো নারীর মাংস। কিন্তু অস্বীকার করি যে, আমি দেখছি!

    ৫.

    যাকে ভালোবাসি, তাকেই চিবিয়ে চিবিয়ে খাই সবার আগে। সমস্ত দেহ। সমস্ত অনুরাগ।
    পিতলের পুতুলের মতো ধরে আছাড় মারি, চুমো খাই, বুকে বুক ঠেকাই;
    আর পুতুলটা সাঁতরায় আমার বুকে; যেনো আমার বুক সাগর; যেনো আমার বুকে নোংরা নেই;
    শ্যাওলা নেই, পানা নেই; কেবল জল, আর জল; জলে মাছ, মাছ আর মাছ: মাছের প্রেমে পড়ে
    নিজেকে ভাবি সমুদ্র; আর যা কিছু কাদার মতো লেপ্টে থাকে, যেমন নারী, মাংস, যেমন প্রেম,
    সব ছুঁড়ে ফেলি- যাকে ভালোবাসি, তাকেই সর্বপ্রথমে চিবিয়ে খাই। চিবিয়ে খাই। চিবিয়ে খাই!

    ৬.

    প্রচুর ধাঁধা। মা একটা ধাঁধা। বাবা একটা ধাঁধা। আমার ভাই আর ভাইয়ের সমুদ্র একটা ধাঁধা।
    উর্বি একটা ধাঁধা। আমি কোনো ধাঁধার কোনো উত্তর পাচ্ছি না। হয়তো আমার ভেতরে উত্তর নেই;
    উত্তরও একটা ধাঁধা। আমি নিজেকে চিরে ফেলছি আঁশ বটি নিয়ে। নিজেকে কুরে খাচ্ছি পিঁপড়ের মতো।
    কারণ উত্তর আমার দরকার। কিন্তু পাবো কোথায়? আকাশ একটা ধাঁধা, আর ঈশ্বরও যদি ধাঁধাই হয়,
    তো আমি অধম বান্দা নিজে একটা ধাঁধা হবো না কেনো? আমি আমার নিজের উত্তরও তো খুঁজে পাই না!

    ৭.

    দু'লক্ষ মানুষের মধ্যে যদি একটা আংটি ছুড়ে দিই, আর বলি, দু'লক্ষ মানুষের মধ্যে যাও, আংটিটা আনো;
    হতে পারে, ওটা কারো জামার পকেটে আছে। কোনো মেয়ের বুকের ভেতরে আছে। হতে পারে
    ওই আংটিটা লুকিয়ে ফেলেছে কেউ, কারণ আংটিটা দামি, আর সুন্দরও; আর যদি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করো,
    সে মিথ্যে বলবে। সে মিথ্যে বলবে, কারণ তারও আংটির দরকার আছে। সুতরাং তাকে খুন করা, এবং তার হাত থেকে
    আংটিটা কেড়ে নাও, যদি তাকে পাও অবশ্য! কারণ ওটা আমার নিবিড় নিঃসঙ্গতার আংটি, ভালোবাসার আংটি!

    ৮.

    তাকে কোলে করে আনো। এনে ছুঁড়ে ফেলো সমুদ্রে।
    ঢেউ তাকে খেয়ে নিক। কারণ ঢেউ মাংসাশী। আর আপাতত
    সে, তুমি ও আমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। এই জলের ধারে। তাকে ছুঁড়ে ফেলো।
    সে হয় ফুল হবে, নয়তো কাদা, নয়তো নুন। তাকে তার মতো করে দংশিত হতে দাও!

    ৯.

    বাইরে থেকে ভেতরে যদি তাকায়, যদি দেখতে পায়! ভয় লাগে!
    কারণ আমি প্রার্থনা করছি না! চোখ বুজে ভাবছি না! আমি পাগলের মতো কাঁদছি,
    বা বিড়বিড় করছি, বা স্বপ্ন দেখছি দেয়ালের দিকে চোখ রেখে; গর্ভিণী নারীর মতো
    নিজ বাচ্চার নড়াচড়া দেখছি, কিন্তু ঘরটা তো আমার একার না!
    বাইরে থেকে কেউ যদি দেখে, ভয় হয়, বাইরে থেকে দেখে যদি হাসে!
    ভেতরে এলে দেখতে পেতো ভ্রূণ, যন্ত্রণা, ভয়; ভেতরে এলে দেখতে পেতো ফুল!

    ১০.

    সংসারী চোখ বুজে থাকে বিষাদের দিকে। যেমন, আমার বাবা।
    কিন্তু আমার ভেতরে এতো শ্যাওলা, এতো বিষাদ, এতো ঘুণ জমে গেছে যে
    আমি না হতে পারি ছেলে, না হতে পারি বাবা; অথচ দিকে দিকে ছেলেরা বাবা হচ্ছে;
    মেয়েরা মা: দিকে দিকে সংসার উঠছে, নামছে; অথচ আমি স্থির: আমি নিঃসঙ্গ:
    আমার বাবার কুকুরও সংসারী; ছেলেটা নয়; ছেলেটা এখন মাথায় ভর দিয়ে হাঁটছে, হাঁটতে হাঁটতে কাঁদছে!

    ১১.

    দুই চোখে দুই দিকে দেখছি। এক চোখে কেউ আসছে, এক চোখে কেউ যাচ্ছে;
    যতো পাতালের দিকে যাচ্ছি, ততো কুকুরের মতো গন্ধ পাচ্ছি কামনার!
    এক চোখে সে সুন্দর; আরেক চোখে সে পঙ্গু; তার সারা গায়ে বর্ষা, সারা গায়ে দুধ,
    আর আমার সারা চোখে আগুন, সারা মাথায় যুদ্ধ; দুই চোখে দুই দিকে দেখছি;
    এক চোখে সে জীবিত, আরেক চোখে লাশ; ইচ্ছে হচ্ছে তাকে ডাকি, তাকে ভেদ করে যাই কথায়:
    ইচ্ছে হচ্ছে তার বর্ষা, তার আনন্দ দেখতে দেখতে দশ তলার জ্যোৎস্নার গভীরে ঝাঁপিয়ে পড়ি!

    ১২.

    ঈশ্বরের চোখে চোখ: কথা বলি, কেমন যেনো লাগে:
    জড়তা, সংকোচ লাগে।
    ভয় লাগে। অথচ যখন ধর্ম ছিলো, শান্তি ছিলো, শৈশব ছিলো,
    তখন নুড়ি পাথরের মতো পায়ে দলে চলে গেছি ঈশ্বরের ছবি; তার ঘরে যেতে শঙ্কা লাগেনি!
    আরে বাহ! এ-ই ভালো! স্বাধীনতা যতো, ততো ভয়, আর ততো অবিশ্বাস!

    ২৯.০৯.২০২২

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Sera Murkha | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:২৮742477
  • বাহ।
    অপেক্ষা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন