এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মিশির ডাঙার মাঠ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৪ বার পঠিত
  •  

    অন্ধকার কাঁপিয়ে আওয়াজ উঠল ঘাঁ-উ..র ঘ্রা..ম। গ্রাম শুদ্ধু লোকের বুকের রক্ত ছলকে ওঠে ভয়ে। প্রতিদিন রাতে বাঘ বেরোয় মিশির ডাঙার মাঠের দিকে। প্রায় একমাস ধরে এমন হচ্ছে। দলবল জুটিয়ে লাঠি সোঁটা, টর্চ মশাল, নাইলনের জাল এইসব নিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে বার করা যায়নি। বনদপ্তরেও খবর দেওয়া হয়েছিল। ভর দুপুরে দু তিনদিন গুলি বন্দুক সহ তারা তল্লাশি চালিয়েছিল। না :, কোথাও কিছুর দর্শন পাওয়া গেল না। দপ্তরের কর্তা রমাকান্তবাবু বললেন, ‘ ও আপনাদের মনের ভুল। এখানে বাঘ আসবে কোথা থেকে। কোন ভয় নেই। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন। ও কোন ঝড়ো বাতাসের ঝটকার শব্দ হবে নিশ্চিত, বুঝলেন কিনা.... তেমন কিছু দেখলে খবর দেবেন নিশ্চয়ই। ‘
    অঘ্রাণ মাস পড়ল। কুসুম কুসুম ঠান্ডা লাগে বিকেল পেরোলে। কলকাতা থেকে এত দূরে গাছগাছালি পুকুর জলাভরা জায়গায় ঝাঁঝ আর একটু বেশি।
    এই সবে কালীপুজো গেল। বাতাসে এখনও পুজোর ঘ্রাণ। আজ শনিবার। কালীপদ প্রতি শনিবার বাড়ি ফেরে— তমলুকে। ফের সোমবার ভোরে রওয়ানা লাগায়।
    কালীপদ কলকাতায় কোন পোস্টাপিসে যেন কাজ করে। একটু আলাভোলা টাইপের আছে। কালোয়াতি গান বাজনার বিস্তর সখ। তার সবচেয়ে প্রিয় রাগ বেহাগ। প্রিয় খাদ্য বড়ি আর বেগুন দিয়ে ট্যাংরা মাছের ঝোল আর ভাত।
    কুসুমপুরে মিশির ডাঙার বিশাল মাঠে যখন আঁধার নামে চারপাশের ঝোপ থেকে শেয়াল ডাকে, জোনাকিরা আলোর চুমকি ছড়িয়ে উড়ে বেড়ায় সারা মাঠে, তখন কালীপদ দিগন্ত বিস্তারী নির্জনতার মধ্যে মাঠের মাঝে একা একা দাঁড়িয়ে থাকে আকাশের পানে তাকিয়ে।খালি চোখের তারায় তারায় বোধহয় অন্ধকার আকাশের তল মাপে।
    কালীপদ আপন মনে কথা বলে, হাসেও আপনমনে। এক সময়ে কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে টর্চের আলোয় অন্ধকার ছিঁড়ে সুধীর বেরা এসে হাজির হয়। বিরক্ত গলায় বলে, ‘ আ:, কালীপদ তোমায় নিয়ে আর পারা গেল না।এসব পাগলামি ছাড়। তুমি তো আমাদের পাগল করে ছাড়বে এবার। চল চল .... রোজ রোজ ভাল লাগে না এইসব ঝামেলা।
    সুধীর বেরা গজ গজ করতে করতে কালীপদর নড়া ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলে। একহাতে নীচু করে ধরা টর্চের রশ্মি মেঠো পথে গোত্তা খেয়ে পড়ছে। কালীপদ এতক্ষণে ধাতে এসেছে। ছটফট করে বলে, ‘আরে ছাড় ছাড়, যাচ্ছি তো....ছাড় না— এ:, বগলে কাতুকুতু লাগছে যে ....। ’
    গহন রাতে কালীপদর ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ। তার মন কি এক আবেশে যেন ভরে থাকে।
    মাঠের পশ্চিমদিকে বাঁশবন। হেমন্তর ঝুরো মৃদুল হাওয়ায় বাঁশের ঝাড়ে টকর টক টকর টক আড় খেয়ে আড়ামোড়া ভাঙে কাঁচা বাঁশ। জোড়া জামরুল গাছে এখন ফল নেই, ডালে শুধু ভীমরুলের চাক।

    ঠিক একবছর আগে কালীপুজোর পরদিন অনন্ত কামারের বউ বাসবী গায়েব হয়ে গেল। শেষরাতে একবার বেগ আসে। পেছনের মাঠে গিয়েছিল হাল্কা হতে। আর ফেরেনি। অনন্ত তখন ঘুমে অচেতন। সারাদিন হাড় ভাঙা খাটনি যায়। ছেলেপুলে নেই ওদের। সকালে উঠে দেখে বাসবী নেই। তারপর তার সারাদিনের উদ্বেগ উৎকন্ঠা এবং প্রানান্তকর হয়রানি ভাষায় বর্ননা করার নয়। বাসন্তী ছাড়া তার আর তেমন কেউ নেই। তেমনি বাসন্তীরও সেই ছিল একমাত্র ভরসা।
    গেরামের জনা কয়েকের পরামর্শে তাদের সাথে করেই পঞ্চায়েতে গিয়ে ব্যাপারটা জানাল অনন্ত। তখন বেলা প্রায় দশটা।অনন্ত জনা চারেক গ্রামবাসীসহ ওখানে গিয়ে দেখে আরো জনা চারেক— মহেন, রামানন্দ, অক্ষয় আর সফিকুল প্রধানের ঘরে বসে আছে। পাঁচজনে মিলে কি একটা ব্যাপার নিয়ে চাপা স্বরে কথা বলছিল। অনন্তদের ঢুকতে দেখে চুপ হয়ে যায়। ঘটনা জানাবে কি, প্রবল মানসিক চাপে অনন্তর বিধ্বস্ত কাঁদ কাঁদ অবস্থা। যারা সঙ্গে গিয়েছিল তারাই গ্রামপ্রধান সত্যসাধন হালদারকে ঘটনাটা যথাসম্ভব বিবৃত করে।
    প্রধান গম্ভীর মুখে বলল, ‘ তাই তো, ভারি চিন্তার ব্যাপার।সব জায়গায় ভাল করে খুঁজে দেখেছ ?’
    অনন্ত কিছু বলবার আগেই অক্ষয় বলে উঠল, ‘ বউয়ের বাপের বাড়ির, ওদিকের গ্রামের কাউকে —মানে, কোন পুরুষ মানুষকে কোনদিন নজরে পড়েছে ? না... দিনকাল তো ভাল না.... সোমত্ত মেয়েছেলের মতিগতি বোঝা তো সোজা নয়। তাই বলছিলাম.... খোঁজ নাও ভাল করে খোঁজখবর কর... দ্যাখ এখন কোন ডালে চড়ে বসে আছে।’ শুনে মহেন বলে, ‘ এটাই হল মোদ্দা কথা।মেয়েমানুষকে বিশ্বাস কিছু নেই।’
    গ্রাম প্রধান কোন উচ্চবাচ্য না করে চুপচাপ একটা বিড়ি ধরায়।
    রামানন্দ আর সফিকুল সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়িয়ে মুচকি হাসতে লাগল।
    এ সব চতুর বাগবিস্তার শুনে অনন্ত বিস্ময়ে একেবারে বোবা মেরে গেল। তার মুখ দিয়ে কোন কথা সরল না। তার সঙ্গী গ্রামবাসীদের একজন গৌরাঙ্গ কয়াল রুখে দাঁড়াল।
    — ‘ ফালতু কথা বলতেছ কেন ? মানুষের উপকার না করতে পার অপকার কোর না।’
    মহেন তেতে যায় এতে— ‘তোমাদের এত্ত গরজ কেন বল তো, আর কোন কাজকম্ম নেই নাকি ? আমাদের তো বাপু তোমাদেরকেই সন্দেহ হচ্ছে...’
    গৌরাঙ্গ ক্ষেপে যায়। ‘ কি.... কি বললে... যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। মুখ সামলে কথা বল বলে দিচ্ছি। ‘ বাকি তিনজন গৌরাঙ্গকে ধরে কোনরকমে শান্ত করল কারণ তারা মহেন, সফিকুলদের চরিত্র ভালরকম জানে।ওরা পারে না হেন কাজ নেই। গত দেড় বছর ধরে ওদের এমন বাড় বাড়ন্ত হয়েছে সত্যসাধন হালদার গ্রামপ্রধান হবার পর থেকে।
    বিষাদ জর্জরিত, কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ়
    অনন্তকে নিয়ে অত:পর গৌরাঙ্গরা বাইরে বেরিয়ে এল। একজন বলল, ‘ চল, ফাঁড়িতে যাই দারোগার কাছে। ’
    গৌরাঙ্গ বলল, ‘ না:, কিস্যু লাভ নেই। ভেতরে ভেতরে সব সাঁট আছে, বুইতে পারলেনি, ভেতরে ভেতরে সব সাঁট আছে। তার চে চল আমরাই সব জায়গায় ভাল করে খুঁজে দেখি। তোমরা কি বলবে জানিনা। আমার কিন্তু ওই চারটে হারামখোরের ওপরই সন্দেহ হতিছে....’
    ওদের মধ্যে একজনের নাম সনাতন। সে বলল, ‘ দেখ গৌরাঙ্গ কথাটা তুমি ঠি কই বলতেছ কিন্তু ওদের এতটা ঘাঁটানো ঠি ক হয়নি। ওরা ভীষণ শয়তান...’
    — ‘ তবে আর কি... ঘরে খিল দিয়ে বসে থাক। আমি ওসব ভয় পাই না। মরতে তো একদিন হবেই। আর আমার মাগ নেই ছাওয়াল নেই, আমি মরলে কাঁদার কেউ নেই। আমার ভয়টা কি ?’
    —- ‘ ওটা কোন কথা হল ? তুমি একটু সাবধানে থেক বাপু। দিনকাল ভাল না। মানুষ খালাস করা এখন কোন ব্যাপারই না। সাবধানে থেক। সবচেয়ে শয়তান ওই অক্ষয়টা। জাত হারামি। একেবারে কেউটে সাপ। ‘

    অনন্ত কামারের বউ বাসবীর বিবস্ত্র মৃতদেহ দুদিন পরে আধ মাইল দূরের বাঁওড়ের জলে ভেসে উঠল। পুলিশ এসে বডি সোনাঝুরিতে পোস্ট মর্টেমে পাঠাবার পর অনন্তকেই বোধ হয় আসল আসামী ঠাউরে জেরায় জেরায় অস্থির করে তুলল। একদিন নয়, দুদিন নয়। দিনের পর দিন। গোসাবা পুলিশের এটা যেন প্রাত্যহিক কর্ম হয়ে দাঁড়াল। প্রতি একদিন অন্তর নিয়ম করে অনন্তকে ফাঁড়িতে ডেকে পাঠায় আর নানারকম বিষাক্ত ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে বেচারিকে জর্জরিত করে তোলে। সঙ্গে অবশ্য প্রত্যেকদিনই গৌরাঙ্গ এবং আরো কেউ যেত। কিন্তু তারা তো আর ভেতরে ঢুকতে পেত না। বাইরে বসে থাকত তেঁতুলগাছ তলায়।
    ফরেনসিক রিপোর্টে গণধর্ষনের পর শ্বাসরোধ করে মারার নমুনা পাওয়া গেছে। শরীরে আরও নানারকম পাশবিক অত্যাচারের চিহ্ন আছে। নীরিহ নিষ্পাপ মেয়েটা কি কষ্টই না পেয়েছে যতক্ষণ না মৃত্যুর কোলে ঠাঁই পেয়েছে।
    এদিকে বাসবীর স্বামী অনন্ত কামার চারিদিক দিয়ে ধেয়ে আসা ভয়ঙ্কর মানসিক চাপের সুনামি আর প্রতিরোধ করতে না পেরে একদিন রাতে গলায় দড়ি দিয়ে এ ভব যন্ত্রনা সাগর পার হয়ে অন্য দুনিয়ায় চলে গেল।
    আসল অপরাধীরা মৌজ মস্তি সহ পরমানন্দে দিন কাটাতে লাগল।

    ়়়়়় ়়়় ়়়়়়
    প্রায় মাস খানেক পরের ঘটনা। সফিকুল ফিরছিল নলকোঁডায় তার শ্বশুরবাড়ি থেকে। বাস রাস্তায় বাস থেকে নেমে শর্টকাট করার জন্য মাঠের পথ ধরল। রাত প্রায় দশটা। রাস্তায় আলো থাকলেও মাঠ অন্ধকার। সফিকুলের হাতে অবশ্য টর্চ আছে। ঝিঁঝিঁ ডেকে যাচ্ছে একটানা। এ মেঠো রাস্তা সফিকুলের একেবারে হাতের তালুর মতো চেনা। জোর পায়ে হাঁটতে লাগল সে সামনে টর্চের আলো ফেলে। হঠাৎ কেমন দমকা হাওয়া উঠল। শিরশির করে উঠল ঝাউগাছের পাতা। বাঁ পাশে খৈকুঁড়োর ঝোপে আচমকা একপাল শেয়াল ডাকতে লাগল। আমগাছের ডালে বাদুড় সরসর করছে। সফিকুলের বুকটা কেমন ধুকপুক করতে লাগল। এতদিন ধরে এ রাস্তায় যাতায়াত করছে, কখনও তো এমন বুক ছমছম করেনি। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ এক ঘূর্ণি বাতাস উঠল এবং কে যেন তার টর্চটা নিভিয়ে দিল। সফিকুল ভাবল, আরে শালা, এ তো মহা হ্যাপা হল। এমন হ্যাপা হবে জানলে কে এ রাস্তা মাড়াত।সে টর্চটা ডানহাতে ধরে বাঁ হাতের তালুর ওপর বাড়ি মারতে লাগল। ভাবল, ব্যাটারীতে বোধহয় ড্যাম্প ধরে গেছে শালা। কোন লাভ হল না। পথ তার চেনা জানা। সে চলার গতি বাডিয়ে দিল। চাঁদনি রাত, তাছাড়া রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকে কিছুটা বিকিরন ছিটকে আসছে। দেখতে খুব অসুবিধে হচ্ছিল না।
    সেই আবছা আলোয় সফিকুল দেখল একটা জন্তু বেঁটে খাটো বাবলা গাছটার তলায় দাঁডিয়ে আছে। কুকুর বোধহয়। ওটার দিকে নজর রেখে গতি একটু কমিয়ে হাঁটতে গিয়ে তার পা কিসে যেন হোঁচট খেল। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে যেতে সামলে নিল। ছিটকে আসা আবছা আলোয় দেখল....
    চোখ বুজে শুয়ে আছে বাসবী। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, সারা দেহ এখানে ওখানে খোবলানো। প্রবল বেগে বাতাস বইছে। সফিকুল চলৎশক্তিহীন উদ্ভিদের মতো হয়ে গেল।মেরুদন্ড বেয়ে হিমশীতল প্রবাহ নামছে। বাবলা গাছের তলা থেকে ঠিকরে এল ঘাঁ..উ..র ঘ্রা..মম্ ঘাঁ..উ..র ঘ্রা..মম্। নিশুত রাতে একমাইল দূরের গ্রামবাসীরাও শুনতে পেল সেই ভয়াবহ হাঁকার। বুক কেঁপে উঠল তাদের।

    সকালবেলায় লোকজন এল, পুলিশ এল, এমনকি বনদপ্তরের কর্মীরাও এল। দেখল, ঠিক হালাল করা বকরির মতো পড়ে আছে সফিকুলের লাশ। বনদপ্তরের লোকেরা বিশেষজ্ঞের মতামত দিল— একমাত্র বাঘই
    ঠিক এইভাবে টুঁটি ছেঁড়ে, আর কেউ নয়।
    কিন্তু সেই আগের বারের মতোই বাঘের কোন হদিশ পাওয়া গেল না। এমনকি পায়ের ছাপও না।
    কৌতূহলী জনতার মধ্যে মহেন, অক্ষয় আর রামানন্দও ছিল। তারা আশঙ্কামিশ্রিত অপার বিষ্ময়ে নির্বাক দৃষ্টিতে পরষ্পরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।

    এক সপ্তা পরে এমনি চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটল আরো দুবার। বহুদূর গ্রামের লোক পর্যন্ত কেঁপে উঠল আকাশ বাতাস কাঁপানো ভয়াল বাঘের গর্জনে। একবার রামানন্দ ভটচাজ আর একবার মহেন শিট— একজন বাড়ির পেছনে পুকুরঘাটে, ভর সন্ধেবেলায়, আর একজন নিজের বাড়ির কুয়োতলায় নির্জন দুপুরবেলায়, সেই হালাল করা বকরি হয়ে পড়ে রইল। শুধু মুহুর্তের অসাবধানতা এবং আকাশ বাতাস কাঁপানো নিনাদ ঘাঁ..উ-র ঘ্রা..মম্ ঘাঁ..উর ঘ্রা..মম্।

    গৌরাঙ্গ সনাতনকে বলল, ‘ব্যাপারটা কেমন হচ্ছে ? আন্দাজ করতে পারছ কিছু ? ‘
    — ‘ কিছুই বুঝতে পারছি না। ভয় পাচ্ছি খুব। এতো ভৌতিক ব্যাপার মনে হচ্ছে।’
    — ‘ তুমি ভয় পাচ্ছ কেন খামোখা ! কারা মরছে দেখছ তো।বাকি রইল শুধু অক্ষয়।’
    — ‘ওটাই তো সবচেয়ে বড় শয়তান।’
    — ‘ দেখ কি হয় ওর। ওরও যদি একই হাল হয় তা’লে বুঝব....’
    কাছেই সুধীর বেরা আর কালীপদ দাঁডিয়ে ছিল। তারা দুজনেই মাথা নেড়ে বলল, ‘ ঠিক ... ঠিক।’

    অক্ষয় সকাল নটা নাগাদ হন্তদন্ত হয়ে গ্রামপ্রধান সত্যসাধনের বাড়ি এসে হাজির। সত্যসাধন বারান্দায় বসে অন্যমনস্কভাবে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছিল। কাগজের খবরে তার মন ছিল না। অন্য কিছু চিন্তা করছিল সে। অক্ষয়কে দেখে সে বেশ বিরক্ত বোধ করে।
    — ‘ কি ব্যাপার এই সময়ে ? ‘
    সত্যসাধনের প্রশ্নে অক্ষয় একটু থতমত খায়। এই ধরনের প্রশ্নে সে অভ্যস্ত নয়। তবে সামলে নেয় তাড়াতাড়ি।
    — ‘ কেন আসতে নেই ?’
    — ‘ না, তা না। তবে আমার কাছে এসে কোন লাভ হবে না। কৃতকম্মের ফল তো ভোগ করতেই হবে। ‘
    — ‘ তার মানে ? কি বলতে চাও তুমি ?’
    — ‘ কি বলতে চাই তা তো তোমার না বোঝার কোন কারণ নেই। তুমি এতদিন ধরে কী কী করেছ, কটা গরীব মেয়ের সব্বনাশ করেছ সবই তো আমার জানা। অনন্তকে কেন মরতে হল আমি জানি না ? দারোগাকে পয়সা খাইয়ে.....’ সত্য সাধন বিনা ভূমিকায় সরাসরি সত্যের সাধনা করতে উদ্যোগী হয়ে পড়ে।
    — ‘ বা বা বা ....’ অক্ষয় হাততালি দিয়ে বলে ওঠে। ‘গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে গেলে একেবারে। সব কিছু যদি ফাঁস করি একবার, মস্ত ফাঁসান ফাঁসবে বলে দিলাম। এখন আমি কাদায় পড়ে গেছি বলে হ্যাঁ ....’
    অক্ষয়ের গলার স্বর বেশ মিইয়ে পড়েছে।
    — ‘ আমাকে ফাঁসাবে ? সে তুমি যা খুশি কর গে যাও। তোমাদের পাপের ফল... আমি এসবের মধ্যে নেই। ’
    অক্ষয় স্তম্ভিত হয়ে দাঁডিয়ে রইল।
    সত্যসাধন একটু চুপ করে রইল। তারপর যেন আপনমনেই বলল— ‘কিন্তু এটা হচ্ছে কি করে ? কোথাও বাঘ নেই অথচ বাঘের কামড় ..... বিশ্বেস হয় না.... বিশ্বেস হয় না... ‘

    অক্ষয় আর কি করবে ? সে যতটা সম্ভব সাবধানে থাকতে লাগল। গেরামের বহু মেয়ের শরীর সে লুঠ করেছে, খুন করেছে কিন্তু এমন আতান্তরে সে কখনও পড়েনি। টাকার জোরে এ অঞ্চলে সর্বত্রই তার প্রভাব বিশাল। কিন্তু এ কি গাড্ডায় পড়ল সে ? ছায়ার সঙ্গে তো কুস্তি করা যায় না। সে যতটা সম্ভব সাবধানে থাকতে লাগল। মাথায় ঘুরতে লাগল সফিকুল মহেন রামানন্দের বাঘের দাঁতে হালাল করা গলার নলী।

    গহন রাতে কালীপদর ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ। বিশ্ব চরাচরের নির্জন অন্ধকার, নিরাবয়ব অনাদি অনন্ত স্রোতের বিপুল চক্র তার সমস্ত চেতনায় কোন এক উন্মাদ ঝড়ের মতো নাচতে থাকে। সৃষ্টি ও লয়ের যুগযুগান্তের পরম্পরা তার রক্তের অনুতে পরমাণুতে পাক খেতে থাকে। সে বেরিয়ে পড়ে কুসুমপুরের আঁধার পথে। মিশির ডাঙার মাঠে গিয়ে অনন্ত মহাকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে হাঁ করে। তার না আছে বাঘের ভয়, না আছে ভূতের ভয়। কোন বিষ্ময় নয়, ভক্তিও নয়, তার মন কি এক আবেশে যেন ভর করে থাকে। অতল গভীর বেহাগ রাগ শেষ হবার পর বুকের ভেতর যেমন বিবশ হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি ধরণ।

    অক্ষয় রাত্তিরবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে দোতলার ঘরে খাটের ওপর বসে জর্দা পান চিবোচ্ছিল। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। গন্ধরাজ ফুলের মাতাল বাস ভেসে আসছে। সন্ধের পর থেকে অক্ষয় একেবারেই নীচে নামে না। খুব সাবধানে থাকে ইদানীং। তার বৌ ছেলেমেয়েরা সব নীচে খাওয়া দাওয়া সারছে বোধহয়।
    তার খাটের ডানদিকে দরজাটা ভেজানো ছিল। হঠাৎ হাল্কা ধাক্কায় দরজার পাল্লা দুটো ফাঁক হয়ে গেল। অক্ষয় ভাবল বৌ এসেছে খাওয়া সেরে।
    ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতেই হৃদপিন্ড বন্ধ হয়ে গেল। চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল তার।পরিষ্কার দেখল মাত্র পাঁচ হাত দূরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে অনন্ত কামার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনন্তর শরীর গোল হয়ে পাক খেতে খেতে হয়ে গেল একটা ভয়ঙ্কর সুন্দর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।
    এরপর আকাশ বাতাস গেরাম গঞ্জ থরথরিয়ে কাঁপিয়ে হাঁকার উঠল ঘাঁ..উ-র ঘ্রা..মম্ ঘাঁ..উ-র ঘ্রা..মম্।

    ওদিকে পাগলা কালীপদ মিশির ডাঙার মাঠের দিকে রওয়ানা দিল অনন্ত মহাকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনবে বলে। তার না আছে বাঘের ভয়, না আছে ভূতের ভয়।

    ******★********★*********★***********★******

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন