এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বাংলায় মোঘল-ব্রিটিশ যুদ্ধ 

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬৬ বার পঠিত
  • মোঘল সুবেদার দেওয়ান নবাব সিরাজ সত্তর হাজার ফৌজ নিয়ে বেয়াড়া ব্রিটিশদের প্রেসিডেন্সি কলকাতা দখল করলেন সতেরশো ছাপান্নর বিশে জুনে। ফৌজ মুনাদি হেঁকে ড্রাম পিটছে দ্রিমি দ্রিমি তাতে নৈঃশব্দ্য নেমে এলে শোনা যায় …
    - কী?
    - খালকে খুদা, মুলুক এ বাদশাহ হুকুম সিরাজ উদ দউলা বাহাদুরররর (খোদার সৃষ্টি বাদশার মুলুক সিরাজের হুকু্মে) …
    - সবাই শুনেছিল?
    - শুনতে তারা বাধ্য!
    - কী যেন বলছিলে।
    - দখল আর ঝেঁটিয়ে লুট করে কলকাতার নাম দেওয়া হচ্ছে আলিনগর আর সেখানকার কেল্লার ফৌজদার হচ্ছেন রাজা মানিকচাঁদ।এর মধ্যে আহমদ শাহ আব্দালি দিল্লী আক্রমণ আর দখল করতে সিরাজকে আজিমাবাদে-পাটনায় ফৌজ মোতায়েন করতে হয়। ওদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রচুর শলা করে অবশেষে রবার্ট ক্লাইভের মতে সায় দিয়ে কলকাতা পুনরুদ্ধার করতে নামে। প্রচুর সৈন্য আর যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে ক্লাইভ আর এডমিরাল ওয়াটসন দক্ষিণ ভারত থেকে এগিয়ে আসেন।প্রথমে রাজা মানিকচাঁদকে চিঠি লিখে হুমকি দিচ্ছেন ক্লাইভ। কে আর পাত্তা দেয় ব্রিটিশ বানিয়াদের! ওরা করবে মোঘল ফৌজের সঙ্গে যুদ্ধ! তাই ফৌজদার ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন সে চিঠি।
    - আর নবাব?
    - নবাব পর্যন্ত খবর গিয়েছিল নিশ্চয়ই কিন্তু সিরাজ এসবে পাত্তা দেওয়ার বান্দা কি ?
    - তারপর?
    - হুগলি নদীর বাঁকে বজবজ দুর্গের মোঘল ভারী কামানের পাহারা এড়িয়ে, মাঠঘাট নারকেল গাছের সারি আর শ্বাপদসংকুল ম্যানগ্রোভের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে বুকজল ঠেলে, ষোল ঘণ্টায় কোম্পানির ফৌজ রাতের অন্ধকারে এখনকার বিনয় বাদল দীনেশ বাগ - ডালহৌসি স্কোয়ারের জিপিওর পাশে পুরনো ফোর্ট উইলিয়ামের কাছাকাছি পৌঁছতেই ফৌজদার রাজা মানিকচাঁদ যেন জঙ্গল ফুঁড়ে হঠাৎ সম্পূর্ণ অভাবিত দিক থেকে বেরিয়ে এসে চকিতে এমন আক্রমণ করেন যে ক্লাইভ খানিকটা চমকে গিয়ে পেছোনোর কথা ভাবেন। কিন্তু বাঁচিয়েছিল পার্কশন ক্যাপ লাগানো ব্রাউন বেস মাস্কেটের অভ্রান্ত নিশানা আর কাস্ট আয়রনের বহনযোগ্য কামানের গোলা। মোঘলরা ভাবতেই পারেনি যে ব্রিটিশরা কামান নিয়ে এতটা পথ আসতে পারবে। দু পক্ষেরই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। একটা গুলি রাজা মানিকচাঁদের পাগড়ি উড়িয়ে দিলে উন্নত ব্রিটিশ কামান বন্দুকের জাদুর খেলা এমন ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে যে রাজা আর প্রতিরোধই করতে পারেন নি।
    - সেকি !
    - ক্লাইভ সাতান্নর জানুয়ারিতে কলকাতা পুনর্দখল করলেন।
    - এখানেই শেষ।
    - শুরু। দুপক্ষে বেশ কিছু যুদ্ধ হচ্ছে ক্লাইভ আর ওয়াটসন হুগলীর মোঘল বন্দর আক্রমণ করে লুটপাট করেন। দুহপ্তার মধ্যে চৌঠা ফেব্রুয়ারি ক্ষিপ্ত সিরাজ ষাট হাজার ফৌজ নিয়ে আবার কলকাতা দখল নিতে এলেন। ব্রিটিশরা সন্ধি চেয়ে দূত পাঠালে তাদের ফুটিয়ে দিচ্ছেন নবাব। পরদিন ভোর চারটের সময় ক্লাইভের রাতেরবেলার গেরিলা আক্রমণের মুখে পড়ে ঘুমিয়ে থাকা মোঘল শিবির যার মতলব ছিল স্বয়ং নবাবকে জীবিত বা মৃত হেপাজতে নেওয়া।
    - পেরেছিল?
    - না। ভাগ্যিস ভোরের ঘন কুয়াশা নবাবের শাহী শিবিরকে আড়াল দিয়েছিল তাই কোনো রকমে নৌকোয় পালিয়ে বেঁচেছিলেন তিনি। সেনা শিবির সরিয়ে দেওয়া হয় দশ মাইল দূরে। প্রধান মোঘল সেপাইসালার, সিরাজের একান্ত অনুগত,দোস্ত মুহম্মদ খান সেই লড়াইয়ে মারাত্মক আহত হয়ে পঙ্গু হলেন, মারা যান অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেপাইসালার। নবাবকে দেড় হাজার পদাতিক আর ছশ সওয়ারের সঙ্গে ছটা হাতি হারাতে হয়।
    - আর ব্রিটিশদের।
    - ওই কম সময়ের তীব্র আক্রমণ করতে গিয়ে ইংরেজদেরও শ দেড়েক ফৌজি মারা যাচ্ছে। রবার্ট ক্লাইভকে তাঁর এইড ডে ক্যাম্প আর সেক্রেটারি দুইজনকেই খোয়াতে হয়েছিল। আসল কাজ না হাসিল হতে তিনি বিষণ্ণ বোধ করতে থাকেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না …
    - কী?
    - ব্রিটিশ ইনফ্যান্ট্রির দাপট ভয় ধরিয়ে দেয় সিরাজের মনে। তাতে ক্লাইভের জিত। সেদিনের গুঁতো খেয়ে সিরাজ নমনীয় হচ্ছেন। আলিনগরের চুক্তি হচ্ছে। সেই চুক্তি বলে, ক্লাইভের চাপে, ইংরেজদের খুশি করতে তাড়াহুড়ো করে কাশিমবাজারের কুঠি থেকে ফরাসি ফৌজকে বিহারে পাঠানো উচিত হয়নি সিরাজের। তবুও শেষ মুহূর্তে …
    - শেষ মুহূর্তে?
    - মানে পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে, নবাবের বিপদ দেখে সাহায্যের জন্য ফরাসি জেনারেল ল তাঁর বিখ্যাত গোলন্দাজদের নিয়ে ফিরে আসছিলেন। হয়ত তাদের জন্য অপেক্ষা না করে, মীরজাফরের ওপর নির্ভর করে পলাশীতে নবাব হেরে গেলেন।
    - হয়ত?
    - হ্যাঁ, হয়ত ফরাসিদের জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল তাঁর। কে না জানে নবাবের মোঘল বাহিনীতে সামান্য কিছু মানে চল্লিশ পঞ্চাশ জন ফরাসি গোলন্দাজ মসিয়েঁ সিনফ্রের নেতৃত্বে পলাশীর যুদ্ধে দম ছুটিয়ে দিচ্ছিল ব্রিটিশদের, গোটা ফৌজে সবচেয়ে তাকতদার ছিল তারা। পরাজিত সিরাজও জানতেন বাঁচতে গেলে তাঁকে মিলিত হতে হবে মসিয়েঁ লর সঙ্গেই। তাই তিনি উত্তর, উত্তর-পশ্চিম মুখো হয়েছিলেন। কিন্তু ধরা পড়ছেন। তাঁকে মারা হয়।
    - জানি। সবাই নবাবের কথা বলে।
    - সবাই নবাবের কথাই বলবে।
    - আর মসিয়েঁ সিনফ্রেদের কথা, মির মদনদের কথা।
    - শহীদ মির মদন শুয়ে আছেন রেজিন গরের ফরিদপুর গ্রামে ফরিদ শাহের মকবরার এক পাশে। আর মসিয়েঁ সিনফ্রে পালিয়ে বীরভূমে যাচ্ছেন। সেখানকার জমিদার তাঁকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়।
    - তারপর?
    - জানি না। বড় ইতিহাস জানি।
    - শুধু বড়?
    - না মহাবিদ্রোহের বাগীরা সে ভেঙে দেবে।তারা সকলে মিলে বাগী হবে। তাদের দলে বড়দেরও নাম লেখানো হচ্ছে যেমন সিরাজ।

    উপল মুখোপাধ্যায়ের বেগম রানী কম্যান্ডার ডকুফিকেশনের অংশ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন