সবচেয়ে দুর্দান্ত লেগেছে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভরসা দেখে। চব্বিশ সালের পরে যখন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অপমান স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি নিয়মিত এই সব অন্যায়ের সংবাদ প্রকাশ করেছেন। যখন সবাই হাত ছেড়ে দিচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, তখন তিনি প্রকাশ করেন তিন খণ্ডের বিশাল এক বই, নাম—‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’। তিন খণ্ড মিলিয়ে এর আয়তন হলো ১ হাজার ৪৯৬ পৃষ্ঠা! মুক্তিযুদ্ধের ওপরে দারুণ একটা কাজ। প্রথম খণ্ডে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির সংগ্রাম, গৌরব, বেদনা এবং শিকড়ের ইতিহাস। দ্বিতীয় খণ্ডে করা হয়েছে ‘শেষ রণক্ষেত্র’ স্মরণে রেখে বাঙালির বহুমাত্রিক জনযুদ্ধের ইতিহাস। তিন নম্বর খণ্ডে আছে ছবি। দুর্লভ সব ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে এই খণ্ড। এমন একটা বই এই সময়ে প্রকাশ করা যে কত বড় সাহসের কাজ এইটা যারা এই বাংলাদেশে থাকছে তারাই সম্ভবত একটু আধটু বলতে পারবে, বুঝতে পারবে। ... ...
এগুলো কেন লিখলাম তাই বলা হয় নাই আসলে। লিখলাম এই কারণে যে, লালনসংঘ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় মিলে কবীর-লালন উৎসব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ ২৫ সেপ্টেম্বর শেরপুর শিল্পকলা একাডেমিতে ময়মনসিংহ বিভাগের আয়োজন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গা থেকে। নানান রঙের যে ভণ্ড আছে দেশে, তারা প্রশ্ন তুলছে কেন লালন উৎসব কবীরকে সাথে নিয়ে করতে হবে? এর মধ্যে তারা ভারতীয় আধিপত্য দেখছে, আগ্রাসন দেখছে, দেশ নিয়ে গেল ইন্ডিয়া দেখছে! কিছু কুযুক্তি তোলা হয়েছে। দেশের এত এত বাউল সাধক রয়েছেন, তাহলে কেন তাঁদেরকে বাদ দিয়ে ভারতের কবীরকে নিয়ে উৎসব করতে হবে? এগুলো হচ্ছে কুযুক্তি। মনে হবে, তাই তো, এ আবার কোন কথা? কিন্তু প্রশ্নটাই যে ভুল, তা আর কেউ বলবে না। প্রশ্নটা কেন এইটা হচ্ছে, তা না হয়ে হওয়া উচিত ওগুলো কেন হচ্ছে না! সেগুলো কেন হচ্ছে না তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলেন, তোলা উচিত। কিন্তু এটা কেন হচ্ছে, এইটা গোলমেলে আলাপ। আমি যতদূর জানি, এইটা হওয়ার জন্য দেশের লালনভক্তরা বেশ লম্বা সময় ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিল। লালন বিশ্বসংঘের সাথে খুব ভালোভাবে জড়িত অনেকেই আমার কাছের বন্ধু হওয়ায় এইটা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। এতদিন পরে তাদের চেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল। ... ...
এই সব কাওমি মাদ্রাসায় সবচেয়ে বেশি পড়ে কারা? গরীব এতিম বাচ্চারা। এখন একবার ভাবেন, একটু মাথাটা চুলকিয়ে চিন্তা করেন কবে আপনি শুনছেন মাদ্রাসায় ছেলে শিশু ধর্ষণ হয়েছে আর সে এতিম ছিল? মনে পড়ে? কোনদিন শুনছেন এমন ঘটনা? তার মানে কী? এতিম বাচ্চাদের কেউ ধর্ষণ করে নাই আজ পর্যন্ত? উত্তরটা চিন্তা করে কি এখন শিউরে উঠছেন? ঠিক তাই! এতিম বাচ্চাদের ধর্ষণের খবর প্রকাশই হয় না। এদেরকে নিকট আত্মীয় যারা আছে তারা দায় সারার জন্য এগুলা মাদ্রাসায় দিয়ে যায়। এদের দেখার কেউ নাই, শোনার কেউ না। এদের মত অসহায় কেউ নাই। যাদের মা বাবা আছে তারা একটা সময় ধরতে পারে যে তার বাচ্চার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে, আদরেই হোক যেভাবেই হোক তারা শেষ পর্যন্ত ধরতে পারে। যদিও এদের মধ্যেও অনেক গল্পই প্রকাশ পায় না। আর এতিম বাচ্চাদের ক্ষেত্রে? কে প্রকাশ করবে? রক্ষক হচ্ছে ভক্ষক সেখানে, রক্ষা করবে কে? এখন একবার চিন্তা করেন তাহলে, মাদ্রাসায় নির্যাতনের শিকার শিশুর পরিমাণ কত তাহলে? কত শতাংশ প্রকাশ পায়? কত বড় একটা কুৎসিত দিক আমরা দেখেও না দেখার ভান করে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছি? লজ্জা ঘৃণায় বমি আসে আমার এই সব চিন্তা করলে। ... ...
অডিসিয়াস কিন্তু আমাদের পরিচিত না। আমাদের পরিচিত নাম হচ্ছে ইউলিসিস। গ্রীক থেকে যখন রোমানরা ল্যাটিন ভাষায় ইলিয়াড, অডিসি অনুবাদ করে তখন তারা নিজেদের মত করে অডিসিয়াসের নাম দেয় ইউলিসিস! ল্যাটিন থেকে ইংরেজিতেও ইউলিসিসই প্রচলিত হয়। আমাদের এদিকেও ইউলিসিস বেশি পরিচিত। ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা একটা বইও আছে সম্ভবত। ইংরেজিতে ইউলিসিস এতই জনপ্রিয় যে জেমস জয়েস তার বিখ্যাত উপন্যাসের নাম রাখেন ইউলিসিস। এগুলাও পরে জানা আমার। আমাদের বা আমাদের বড় ভাই বোনদের পাঠ্য ছিল সম্ভবত ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা, মোবারক হোসেন খানের লেখা। তখন থেকেই ইউলিসিসিই মাথায় রয়ে গেছে। অনেক পরে ইলিয়াড অডিসি যখন পড়ি তখন মূল নাম জানি অডিসিয়াস! ... ...
ঘটনাবহুল বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ শেষ হচ্ছে আজকে। ফুটবল বিশ্বকাপ সব সময়ই অন্য এক আমেজ। এই ভূগোলকে এর সাথে তুলনা হয় এমন আর কিছুই সম্ভবত নাই। পুরো বিশ্ব এক সময়ে, এক দিকে তাকিয়ে থেকে কাঙ্ক্ষিত দলের জয় কামনা করে। এ এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড না? আমাদের ছোট্ট শহর শেরপুর, এখানে এই মধ্য রাতে খেলা দেখার কত আয়োজন! বিশাল বড় স্ক্রিন লাগান হয়েছে। যার যার দলের সমর্থকেরা এসে হাজির হচ্ছে। খেলা দেখতে গিয়ে তুমুল ঝগড়াও হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে এক এক বিশাল আয়োজন। ঢাকার আয়োজন তো ইতোমধ্যেই সারা পৃথিবীর বুকে আলোড়ন তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনা থেকে আর্জেন্টিনাবাসি আসছে ঢাকায় খেলা দেখার জন্য! অবিশ্বাস্য না? ব্রাজিলের চ্যানেল লাইভ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মাঠ থেকে। সবাই অবাক হয়ে দেখছে এ কেমন উম্মাদনা! গতকাল দেখলাম এক আর্জেন্টাইন টুরিস্ট কাপল থাইল্যান্ড ঘুরতে আসছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে গেছে ভিসার জন্য, ফাইনালটা তারা ঢাকায় দেখতে চায়! এই সবই বিশ্বকাপ ফুটবলকে এমন এক মাত্রা দেয় যা অন্য কোনকিছু দ্বারা সম্ভবই না। ... ...
আজকে এই যে গা ঝাড়া দিয়ে নিজের জাতি পরিচয়কে ফেলে দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছেন, তা করে কী রক্ষা হবে? কালকে ধর্ম পরিবর্তন করলে বা ধর্মের প্রতি বিশ্বাস হারায় ফেললেই তো সব শেষ। ধরেন কেউ "বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি" বলে বুদ্ধের শরণ নিয়ে নিলো তখন? জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক বলে মাংস খাওয়া বাদ দিয়ে দিলো, তখন? ধর্ম পরিচয় বদলে যাবে না? রাগ কইরেন না। আমি বলতে চাচ্ছি ধর্ম পরিচয় পরিবর্তন করা যায়, করে মানুষ। বহু মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করছে। কিন্তু আপনার জাতি পরিচয়? ওইটা কীভাবে মুছবেন? এই দুনিয়ায় বেঁচে আছেন যতদিন, যদি এই ভূখণ্ডেই বিয়ে শাদী করে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন তাহলে আপনি তো অবশ্যই এবং আপনার সন্তানও কোনদিন নিজের জাতি পরিচয় মুছতে পারবে না। এখন আপনি যতই ঘাউরামি করেন আর যাই করেন। ... ...
চোখের সামনে একজন শহীদের কথা শুনলাম, আমি রীতিমত ধাক্কা খেলাম একটা। এমন করেই গেছে কিন্তু কেউ আর ফিরেনি। হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের মধ্যে মিশে গেছেন হোসেন কাকাও। এমন সত্য চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে ছিল আর আমরা বেখাল হয়ে থাকলাম। কত বড় একটা সুযোগ নষ্ট হল। এত বছর সুযোগ ছিল তাঁকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি এনে দেওয়ার। এখন? এখন সম্ভবত এই গল্প লুকিয়ে রাখতে পারলেই ভালো হবে সবার জন্য। ... ...
সিনেমাটার ভয়ংকর দিক হচ্ছে সিনেমায় হিন্দ রজবের আসল ফোন কল রেকর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। বাচ্চাটার নিষ্পাপ কণ্ঠস্বর যে কাওকে স্তব্ধ করে দিবে। একটা সময় হিন্দ রজবকে অন্য দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য রানা তাঁকে কোরান তেলয়াত করতে বলে। কোরান পাঠ করতে তাঁকে সাহায্য করে রানা, ওই ছোট শিশু যখন বোমার ভয়ে গাড়ির সিটের নিচ থেকে রানার কণ্ঠের সাথে সাথে সুরা ফাতিহা থেকে পাঠ করতে থাকে, - "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আর-রাহমানির রাহীম" - অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা। যিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু! তখন আর মাথা কাজ করে না। সুরা ফাতিহা কত সহস্রবার পড়ছি কিন্তু এমন, কোনদিন এমন মনে হয় নাই। মনে হচ্ছিল কই? কোথায় দয়ালু? কোথায় করুণা? ধর্ম বিশ্বাস এমনেই টান পরে মানুষের? ধর্মকে এমনেই পাত্তা দেয় না বিচক্ষণ মানুষেরা? ... ...
আন্তর্জাতিক সিনেমা বিভাগের একটা সিনেমা নিয়ে একটু বলি। ছবির নাম দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব। হিন্দ রজব হচ্ছে ফিলিস্তিনের এক ছোট্ট মেয়ের নাম। সে ইজরাইলের বোমা হামলায় জীবন নিয়ে টানাটানির মধ্যে রেড ক্রিসেন্টের হেল্প লাইনে ফোন দেয়। তাঁকে বাঁচাতে বলে, সাহায্য চায়। এইটা নিয়াই সিনেমা। সিনেমায় হিন্দ রজবের সেই ফোন কলের রেকর্ড এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে অস্কারে মনোনয়ন পাওয়ার পরেও এই সিনেমার অভিনেতা Motaz Malhees কে আমেরিকা ভিসা দেয় নাই! তিনি ফিলিস্তিনের অভিনেতা, ফিলিস্তিনের জন্য ভিসা ব্যান! দারুণ না? মহান আমেরিকা! ... ...
যারা জানেন না তাঁদের জন্য জানিয়ে রাখি বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি আমার খালাত বোন। খালাত বোন বললে যেমন মনে হয় তেমন না কিন্তু আমাদের সম্পর্ক। জ্যোতির বড় হওয়া আমাদের উঠানে। খালা তখন আমাদের বাড়িতেই থাকে। আমাদের সাথে খেলতে খেলতেই জ্যোতি আজকের তারকা। আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কোলেপিঠে করেই ওর বেড়ে উঠা। বাড়িতে মেয়ে শিশু আর না থাকায় জ্যোতির বড় হওয়াটা হয় আমাদের সাথে ক্রিকেট খেলে। আমাদেরও একটা বল বয় দরকার ছিল, বল মেরে কারো বাড়িতে পাঠিয়ে দিছি, জ্যোতি দৌড়… বলার আগেই জ্যোতি তুফান বেগে ছুটে যেত। সবার শেষ ব্যাট দিতাম, ওইটার জন্যই বসে থাকত। লাস্ট ব্যাটার হিসেবে ওকে বলা হত তুই শুধু দাঁড়ায় থাকবি, উইকেট পড়তে দিবি না। ও দাঁত চেপে দাঁড়ায় থাকত। পায়ে বল লাগলেও একটু উশ আস করে আবার দাঁড়ায় থাকত। ব্যথায় যদি কান্না করে তাহলে তো আর আমরা ওকে খেলায় নিব না, তাই ব্যথা চেপে দাঁড়ায় থাকত। এই হল ওর শুরু। এরপরে বিকেএসপিতে ক্যাম্প, এরপরে ধীরে ধীরে শুধু ওর উত্থান। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া, এশিয়া কাপের ফাইনালে জ্যোতির দারুণ সেই ইনিংস, যাতে ভর করে প্রথম কোন বড় টুর্নামেন্ট জেতার স্বাদ পায় বাংলাদেশ। এর আগে পরে এখন পর্যন্ত নারী পুরুষ দল মিলিয়ে আর কোন কাপ জিততে পারে নাই। এরপরে অধিনায়কত্ব। প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া, প্রথম বিশ্বকাপেই নজরকারা পারফর্ম করা, এরপরে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সুযোগ পাওয়া। দেশের মাটিতে সিরিজ জেতা পাকিস্তানের সাথে, ভারতের সাথে সমতায় সিরিজ শেষ করা, দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে তাদেরকে হারানো, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তাদের মাটিতে হারানো এমন কত কত অর্জন। সবগুলার পিছনে জ্যোতির অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নাই। এমন করে জ্যোতি নিজেকে নিয়ে গেছে আলাদা উচ্চতায়। এবার ওর তারকা খ্যাতির বিপরীত চিত্র দেখার সুযোগ আসছে। দেখছে কত কুৎসিত হতে পারে দুর্বল বুদ্ধিমত্তার মানুষের হাতে প্রযুক্তি থাকলে কী করতে পারে তারা! ... ...