

অলংকরণ: রমিত
সে বছর আষাঢ় এসেছিলো বেশ তেড়েফুঁড়ে। দিন কতক একটানা বৃষ্টি। একটু থামতো। থমথমে হয়ে যেতো দিন। কিন্তু আহ্নিক গতির হিসেব ভুলে হঠাৎ ডেকে ওঠা ঝিঁঝিঁ পোকার ইচ্ছেপূরণে আকাশে আবার জমতো জলমেঘ।
ধূসর, কালচে, কালো।
মেঘের ছায়ায় ঢাকা আবছা আলোর দিন। আলটপকা বাতাসে উড়ে আসা জলমেঘ খসে পড়তেই আবার ঝিরিঝিরি, টুপটাপ, ঝমঝম।
বিরামহীন। একঘেয়ে। ঝমঝম। ঝিরিঝিরি। টুপটাপ।
নদীর শহর। বিলের শহর। তাই মনে হয়ে জলের সঙ্গে সম্পর্কও ছিল আত্মিক। একবার আষাঢ় এলেই নদী ছুঁয়ে উঠে আসা বাতাসে জমতো ভেজা ঘ্রাণ। আর সে বাতাসে চুল উড়িয়ে চিলেকোঠার ছাদে দাঁড়িয়ে আরেকটু ভিজে যাওয়া, এই ছিল আমার মফস্বলি আষাঢ়।
সময়টা আশির শেষ আর নব্বইয়ের শুরু। বছর দু’য়েক আগে শহর ভেসেছিলো শতাব্দির ভয়াবহ বন্যায়। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি নদীর শহর। তাই যমুনার সঙ্গে যার দিনরাত বাঁধা, ভাঙনের কাল যে তাকে বশীভূত করতে পারবে না এতো স্বত:সিদ্ধ।তাই বন্যার স্যাঁতস্যাঁতে দিন ভুলতে শহরের খুব বেশী সময় লাগেনি।
যেটুকু চাঁদের কলঙ্ক তা ওই তীরের কালভার্ট ভেসে যাওয়া জেলখানা ঘাটে কিংবা শ্মশান ঘাটের পাকুর গাছের তলিয়ে যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ।
আর সেই ভেঙে পড়া পাড় কিংবা নদীর জল থেকে উঠে আসা দিন দেখতে নিয়ম করে নদীতে যাবার আমার সেসবদিনের ইচ্ছাকে জেদও বলা যায় নির্দ্বিধায়। সেই একরোখা জেদের পেছনে কিন্তু সুক্ষ্ম ফাঁকিবাজিও ছিল। প্রতিদিন ভোরের আযান শেষ হতেই সুইচ নেমে যেতো সিলিং ফ্যানের। খুলে যেতো মাথার দিকে থাকা জানালা। কাছেপিঠের মন্দিরে জাগরণের ঘন্টা ভেসে আসতেই মশারির কোনা খুলে দিনশুরুর আহবান,
মনি ওঠো…হারমোনিয়াম নিয়ে বসো…
সে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা! পড়াশোনায় ছুটি থাকলেও রেওয়াজে কোনো অজানা কারণে বিরাম থাকতো না একদিনও। তাই নিদানও ছিল আগে থেকেই ঠিক করা,
পূজার ফুল নিয়ে আসি…এরপর রেওয়াজে বসবো…
সুকুমারের গলি…কালিবাড়ি রোড…গয়লা মাঠ…চক্ষু হাসপাতাল…পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিস…নদীর পাড়…
কখনো মৃদূ পায়ে হেঁটেছি বলে মনে পড়ে না।
দৌড়…ভো দৌঁড়…একছুটে পুরোনো রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে…
ওখানে কাঠটগরের এক বহু প্রাচীন গান। এঁকেবেঁকে কাঁধ ছুয়েছে কোনো বাড়ির ছাদ। নাগালের বাইরে সবকিছুর হাতছানিকে সেই শৈশব থেকেই গ্রাহ্য করার অদ্ভুত নেশা আমার।
লম্ফ…উলম্ফন…ঝম্প…
সবকিছুতেই কাঠটগরের ঠোঁট বাঁকানো হাসি। হেরে যাচ্ছি। দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। তবুও লম্ফ কিন্তু একচ্ছত্র হাতছানি তখনও নাগালের বাইরে।
আবার লম্ফ…
সদ্য গায়ে ঝোলানো জেলা শহরের খেতাব মানুষগুলোকে অবশ্য মফস্বলি আদবকেতায় অনভ্যস্ত করতে পারেনি তখনো। তাই কেউ একজন এগিয়ে এসে নামিয়ে আনতো একখানা ডাল। নাগালের ভেতর। কাঠটগরের সকল জারিজুরি শেষ। বোঁটার বন্ধন খুলে একে একে সবাই ফুলের সাজিতে।
এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা কাঁঠালি চাঁপার থোকায় হাত লাগাতেই অক্লেশে ভুলে যেতাম রেওয়াজ, হারমনিয়াম, গান সবকিছু। আকাশের পুব কোণে অন্ধকার কাটতে শুরু করে দিতো তখিন।এক পা দু’পা। পৌঁছে যেতাম জেলখানা ঘাটে। আরেকটু আগালেই লঞ্চ ঘাট। সেঁতু হয়নি তখনো।মাইকে হরদম ডাকাডাকি,
ভুয়াপুর…ভুয়াপুর…ভুয়াপুর…
সেসব কোলাহল ভুলে নদীর বুকে নিমগ্ন চোখ আমার। একদম মাঝ বরাবর। প্রথমে গনগনে লাল। এরপর ঝলকে ওঠা কমলা। গাঢ়। আরেকটু গাঢ়। জলডুব থেকে ভেসে ওঠা একটা সূর্য।
এই জলভাসা রঙ ফেলে কীভাবে ফিরি আমি হারমনিয়ামের কাছে! কিন্তু ফিরতে হতো। হয়তো জলের বুকে ভেসে যাওয়া আরোও কিছু রঙ দেখাবে বলেই আষাঢ় ফিরিয়ে আনতো আমাকে ঘরে।
এরপর ঘড়ির কাঁটা মেপে সময় যাপন। স্কুল শুরু হতো দশটায়। রেওয়াজ, পড়া শেষ করে সোজা স্নানের ঘরে। এরপর দু’বেণীতে সাদা ফিতার ফুল, নীল স্কুল ইউনিফর্ম, সাদা কেডস আর পিঠে ব্যাগ।
ততদিনে আমি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে।
রিকশার হুড তুলে যতটা আষাঢ় থেকে বাঁচা তারচেয়েও বেশী বাঁচিয়ে চলা উটকো উড়ে আসা কোনো চিঠি কিংবা শিসে বেজে ওঠা কোনো গান থেকে। তবে সেসবকে ইভটিজিং বলে একঘরে করে দিতে চাই না, বরং কৈশোরের নিখাদ উন্মাতাল সময় বলে জীবনানুসঙ্গ নাম দিতে চাই তার।
কড়ইতলা…রনি আইসক্রিমের ফ্যাক্টরি…নীলা সিনেমা হল…
আকাশে মেঘের গায়ে জমা মেঘে উড়ুক্কু বাতাসের টোকা। ঝমঝম…ঝরঝর…ঝমঝম…
আষাঢ় আসলে সবসময়ই অপ্রতিরোধ্য। তাই ভেজা বাতাসের সবটুকু দাপট সহ্য করেই নামতে হতো স্কুলগেটে। ততক্ষণে ভিজে ওঠা দুই বিনুনিতে জমতে শুরু করেছে বাদল দিনের সোঁদা ঘ্রাণ।
স্কুল মাঠ। ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। বার্ষিক অনুষ্ঠানের অস্থায়ী মঞ্চ। পুকুরের বুকে লাল শাপলা।
আবার দৌড়। একছুট। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় করিডর। খোলা ছাদ। আর দিনের সঙ্গে আড়ি দিয়ে আবছা আলোর ক্লাশরুম। খড়খড়ি তোলা জানালা সপাটে খুলে দিলেও ইউক্যালিপটাসের প্রাচীর পেরিয়ে যেটুকু আলো তাতে বন্ধুদের মুখ চেনা বলেই নজরে আসতো।
পাঁচগুটি, চোরডাকাত আর কাটাকুটি খেলা। আফরোজা আপার হাজিরা খাতায় মোটে কয়েকটা টিক পড়তেই বৃষ্টির তোড় বেড়েছিলো আরোও সেদিন। অফিসরুমে যাবার আগে সরল অঙ্কের সময় বেঁধে দিলেও আষাঢ় পেরিয়ে সে জটিল সময়ের কাছে ফেরার ইচ্ছা কিংবা আগ্রহ কোনোটাই ছিল না আমাদের।
গলা ছেড়ে সদ্য বাজারে আসা কোনো হিন্দি ক্যাসেটের গান কিংবা হারমনিয়ামে তোলা কোনো সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যার গল্প—সবকিছুতেই তখন উচ্চ বিদ্যালয়ের কিশোরীসূলভ চপলতা আমাদের জড়িয়ে রাখতো আস্টেপৃষ্ঠে।
ওদিকে আষাঢ়ে দিনের অনবদ্য জলঝরা দুপুর।
ঢং…ঢং…ঢং…ঢং
টিফিন পিরিয়ড। রসগোল্লা আর পাউরুটি। মাথা গুনতিতে স্বচ্ছতা রাখার দায়ও কিন্তু ওই আষাঢ়েরই। নয়তো হাতেগোনা কয়েকজন ছাত্রীর হিসেবে গড়মিল হলে সোজা হাজিরা বড়দিদি মানে জ্যোৎস্নাদিদির ঘরে। তাই বাড়তি টিফিনের লোভ ভুলে একপিস পাউরুটি আর রসগোল্লায় খুশি মনে আরেকপ্রস্ত হৈ চৈ।
ঝম ঝম ঝম…বিদ্যুতের ঝলকানি…মেঘের গুরুগুরু…আষাঢ়ের ভাবলেশহীন ঝরে যাওয়া…
করিডর পেরিয়ে খোলা ছাদ। অবিচ্ছিন্ন আষাঢ়ের ঝরে পড়া জলে ভাসতে থাকা ইউক্যালিপটাসের পাতা। অকালে খসে পড়া পাতার ঘ্রাণ অমন মিষ্টি হয় এটা মনে হয় কোনো আষাঢ় দিনেই জানা। ভেসে যাওয়া পাতার পিঠে জমতে থাকে আষাঢ়, জমতে থাকে সময়।
অলক্ষ্যে ভেসে যাবার অজুহাতও মনে হয় জমে ছিলো সেই ভেসে যাওয়া পাতার পিঠেই।
বৃষ্টির আড় পেরিয়ে চোখ পড়েছিলো মাঠের ওপাড়ে পুকুরে। শাপলা পুকুর। কচুরিপানার পুকুর।
কিন্তু চোখ মজেছিলো জারুলে।
পুকুরজলে ভাসছিলো জারুল। আগে অনেকবার জারুল দেখেছিলাম। স্কুলের একপাশে পুকুরের ধার ঘেঁষে ছিল জারুল গাছ। বোশেখ ফুরাতেই জ্বলজ্বলে রোদের সঙ্গে সহাবস্থানের সকল চুক্তি ভেঙে ফুটে উঠতো জারুল। অমন কোমল রঙের ফুল স্বভাবতই গনগনে দিনে একমাত্র স্নিন্ধ সময়ের ডাক নিয়েই হাজির হতো।
তাই জারুল চিরকালই বোশেখে বেমানান। আর সেই বৈপরীত্য পুষিয়ে দিতেই মনে হয় আষাঢ় এলেই জারুল হয়ে ওঠে সমদর্শী। আর কোনো না কোনো ভাবে আজও জারুল আমার বালিকা বিদ্যালয়ের সমদর্শী।
আমি দেখেছিলাম পুকুরজলে অক্লেশে ভেসে বেড়ানো জারুল। দেখেছিলাম আষাঢ়। আর দেখেছিলাম নিজেকে।