

- দীঘা উপকূল হল আধখানা চাঁদের মত বাঁকা। সেই বাঁকের এমন বিন্দুতে গোবিন্দবসান দাঁড়িয়েছিল যে সাগরের সরাসরি জোয়ারের অভিমুখ সেখানে আঘাত করতনা, পাশ কাটিয়ে কিছুটা সমান্তরালে চলে যেত। যে বিন্দুতে গিয়ে জোয়ারের জল ধাক্কা খেত, সেখান থেকে পলি বালি এসে আরও সমৃদ্ধ হত গোবিন্দবসানের সৈকত। সেই কারণেই অত বড় বালিয়াড়ি তৈরি হয়েছিল। ঝাউ বনও ছিল। কিন্তু কালক্রমে জোয়ারের অভিমুখের জমিটি গেল রাজ্যের তৎকালীন এক উচ্চ আধিকারিকের পুত্রের হাতে। তাঁর ভেড়ি তৈরি হল। জোয়ারের অভিঘাত থেকে বাঁচাতে সেই ভেড়ির সীমানা কংক্রিটে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের কাজ হলো উপকূলরেখায় আঘাত করে নিজের গতিশক্তিকে (Kinetic Energy) নিঃশেষ করা। কিন্তু যখন ভেড়ির সীমানায় উঁচু ও শক্ত কংক্রিটের পাড় বাঁধাই (Concrete Sea Wall) করা হলো, তখন ঢেউ সেখানে আছড়ে পড়ে আর শক্তি হারাল না। বরং কংক্রিট থেকে প্রতিফলিত হয়ে আরও বেশি শক্তিমান হয়ে উঠলো এবং রিফ্লেক্টেড ওয়েভ (Reflected Wave) হিসেবে কোনাকুনি সৈকতের অন্য অংশের দিকে ধাবিত হলো। আর সেইখানেই রয়েছে গোবিন্দবসান। ভূগোলে একে বলা হয় "কাস্টমাইজড হার্ড আর্মারিং-এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া" (Adverse Effects of Hard Armor Stabilization) বা "হাইড্রোডাইনামিক ডিফ্লেকশন" (Hydrodynamic Deflection)। এবারে বালিয়াড়ির রিজ লাইনে, ওপরে সাজানো ভিউ পয়েন্ট, নিচে আন্ডারকাট - ঐ জায়গায় শাল্লরী দাঁড়িয়ে গল্প করছে - এই ভয়ানক সত্য তাদের অজানা। এবারে ঐ দৈত্যাকার ঢেউ আরও একটু লম্বা হয়ে তাদের নিচে আছড়েও ফেলতে পারতো। সিকি শতাব্দী আগেই দুটি ভৌগোলিক জীবনের ইতি হতে পারতো।
সেদিনের গোবিন্দবসান গ্রাম যেমন প্রাকৃতিক এবং কিছুটা প্রশাসনিক মিসম্যানেজমেন্টের জন্য হয়ে উঠেছিল ইকোলজিকাল ভিক্টিম, সেই একইভাবে, একই কারণে আজ দীঘা সংলগ্ন সমগ্র উপকূলটিই মরতে বসেছে। দীঘার সমুদ্র পঁচিশ বছর আগেও যথেষ্ট শান্ত ছিল, খুব ছোট ছোট ঢেউ আর বিস্তৃত মহাসাগরীয় সোপানের জন্য। গোবিন্দবসানের ঐ ঢেউ ছিল ব্যতিক্রম। কিন্তু এখন রোজ অন্তত একটা মানুষের প্রাণ যায় ঐ সাগরে। গোবিন্দবসানে গিয়ে ভৌগোলিক পরিবর্তনের যে প্রাথমিক রূপ আমরা দেখে এসেছিলাম, গত পঁচিশ বছরে পুরো এলাকায় তা এক মারাত্মক আগ্রাসী রূপ নিয়েছে।
যে দীঘা একসময় শান্ত, চওড়া এবং ঢালু সৈকত হিসেবে পরিচিত ছিল, তা আজকের এই উত্তাল, বিপজ্জনক গভীর খাদে পরিণত হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটা বিজ্ঞানসম্মত কারণ রয়েছে:
বালিয়াড়িগুলো ঝড়ের ধাক্কা শোষণ করত এবং সমুদ্রে বালির সঠিক জোগান বজায় রাখত। কিন্তু দীঘা এবং আশেপাশের অঞ্চলে পর্যটন ও তথাকথিত উন্নয়ন থুড়ি সংশ্লিষ্ট নির্মাণের তাগিদে ঝাউবন আর বালিয়াড়িগুলো সম্পূর্ণ কেটে সমতল করে দেওয়া হয়েছে। অথচ ঐ দুটোই স্পঞ্জের মত নোনা জলের শক্তি শোষণ করে নিত। ফলে এখন সমুদ্রের ঢেউ সরাসরি উপকূলরেখায় আঘাত হানতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগে ‘ইয়াসের’ মত ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় গ্রামগুলো তছনছ হয়েছিল ঠিক এই কারণে।
আবার দীঘাকে ক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে সমুদ্রতীর বরাবর শত শত টন কংক্রিট ও পাথরের বড় বোল্ডার ফেলে সি-ডাইক তৈরি করা হয়েছে। আগে যখন দীর্ঘ বালুকাবেলা ছিল, তখন ঢেউ ধীরে ধীরে সৈকতে ছড়িয়ে পড়ে তার শক্তি হারিয়ে ফেলত। কিন্তু বোল্ডার বা কংক্রিটের সোজা বাঁধে ঢেউ আছড়ে পড়ার পর তার পুরো শক্তি প্রতিফলিত হয়ে ঠিক উল্টো দিকে ব্যাকওয়াশ (Backwash) হিসেবে নেমে যায়। এই ক্ষিপ্র ব্যাকওয়াশ তলার সমস্ত বালি ধুয়ে নিয়ে সাগরের দিকে টানে, যার ফলে সৈকতের স্বাভাবিক ঢাল খাড়া ও গভীর হয়ে গেছে। যে ‘ঝুলন্ত বারান্দা’ বা নেগেটিভ ঢাল আমরা গোবিন্দবসানে দেখেছিলাম, সেটা এখন সমগ্র দীঘা সৈকতের তলাতেই ঘটছে। কংক্রিটের বাঁধের ঠিক নিচেই সমুদ্রের জলের তোড়ে ভয়ানক আন্ডারকাটিং হচ্ছে। তাসের ঘরের মতো বালি সরে যাওয়ার ফলে জলের তলায় হঠাৎ গভীর গর্ত বা খাদের সৃষ্টি হয়। পর্যটকেরা যখন হাঁটু জলে নামেন, ওপর থেকে সমুদ্রকে শান্ত মনে হলেও পায়ের তলার বালি সরে গিয়ে বলশালী রিপ কারেন্ট (Rip Current) তাদের একমুহূর্তে গভীর খাদে টেনে নিয়ে যায়।
পাশেই সুবর্ণরেখা নদীর মোহনা। তার আবার উজানে বাঁধ তৈরির জন্য মোহনায় আগের মত বালি পলি আসেনা, কাজেই সেদিক দিয়েও দীঘা সৈকতের রসদ পাওয়া বন্ধ। অন্যদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বঙ্গোপসাগরের জলস্তর বছরে প্রায় ৩ থেকে ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে, যার ফলে সমুদ্র দ্রুত ডাঙার আরও ভেতরে ঢুকছে, জমি কমে যাচ্ছে।
এবারে যদি মাঠাবুরুর কথা ভাবি, দেখব সেখানেও ব্যাপার খানিকটা একই রকম। মালভূমির পাহাড়ি ঢালকে ধসে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতো তার অরণ্য ও প্রাচীন শিলা। পাহাড়ের বুক থেকে যখন নির্বিচারে গাছ কেটে সাফ করা হয় আর পাথর খাদান বানিয়ে ডিনামাইট দিয়ে পাথর ফাটানো হয়, তখন পাহাড় তার স্বাভাবিক ঢাল-ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মাঠাবুরুর বনাঞ্চল ও পাথুরে খাঁজের গাছপালাগুলোর কাজ হল বর্ষার জলকে ধরে রাখা, পাহাড়ের গায়ে মৃত্তিকা স্তরের ক্ষয় রোধ করা এবং স্থানীয় ভূগর্ভস্থ জলস্তরের ভারসাম্য রক্ষা করা। গাছ কাটলে আর সঙ্গে পাথর ভাঙলে সেই পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র তার ‘শোষণ ক্ষমতা’ হারিয়ে জলপ্রবাহকে পাহাড় ধসানো প্রলয়ে রূপান্তর করে। দীঘা আর পুরুলিয়াতে এখানেই মিল - দুটোই মানুষের লোভ ও অবিমৃশ্যকারিতার এক ও অভিন্ন গল্প। এক জায়গায় সমুদ্র ফুঁসে উঠে মানুষ গিলছে, অন্য জায়গায় রূপসী পাহাড় পরিণত হচ্ছে শ্রীহীন, ন্যাড়া, বিপদসংকুল পাথরের স্তূপে। মানুষ যখনই নিজের স্বার্থে এই দুই প্রাকৃতিক বর্ম ছেঁটে ফেলে, তখনই প্রকৃতি তার প্রতিরক্ষামূলক রূপ ছেড়ে পরিণত হয় ভয়াল ধ্বংসকারীতে।
অথচ বছর বছর পরিবেশ দপ্তরে সরকার বরাদ্দ কমায়। পাহাড়, নদী বন রক্ষা করার বদলে ঐ দপ্তর হয়ে ওঠে কেবল উন্নয়নের ছাড়পত্র সরবরাহকারী।
যাক এবারে চট করে তালসারির গল্পটা বলে নিই, কথা দিচ্ছি বলেই পট করে আবার মাঠাবুরুতে ফিরে আসব।
দীঘায় সার্ভে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়ায়, আমরা ভাবলাম, একটা বেলা ফাঁকা পাওয়া গেছে, যাই তালসারি ঘুরে আসি। যেমন ভাবনা - সঙ্গে সঙ্গে দুপুরে আফটার লাঞ্চ গাড়ি বুক। জায়গাটা দীঘা থেকে কাছেই, উড়িষ্যা সীমান্তে সুবর্ণরেখা নদীর মোহনায়। অনেক কথা শুনেছিলাম জায়গাটা নাকি বালেশ্বর জেলায় অবস্থিত এক অপরূপ, শান্ত ও ভৌগোলিক বিচারে অত্যন্ত মনোহর উপকূলীয় এলাকা। ভৌগোলিক বিচারে মনোহর - কারণ এখানে এমন এক বিশেষ ভূপ্রকৃতি এবং বাস্তুতন্ত্র রয়েছে - তা সাধারণ তো নয়ই, বরং ব্যতিক্রমী ও বিরল। তালসারির মূল ভূখন্ড সংলগ্ন যে তটরেখা, সেখানে অপার সমুদ্রের দৃশ্য দেখা যায়না, মনে হয় সমুদ্র নয় যেন একটা ঝিলের শান্ত জল। কারণ সুবর্ণরেখা নদীর মোহনায় অন্য নদীর মতই ব-দ্বীপ তৈরি হতে পারতো - কিন্তু হয়নি। এখানে পলি বালির সম্ভারকে মৌসুমী বাতাস, মহীসোপানের উঁচু নিচু ঢাল আর ত্যারচা বা কোনাকুনি তরঙ্গের অভিমুখ মিলে তটরেখার সমান্তরালে টেনে নিয়ে যায়। তাই মোহনার বদ্বীপটা রূপ পরিবর্তন করে লম্বাটে হুকের মত "এস্টুয়ারাইন স্পিট" (Estuarine Spit) বা "ব্যারিয়ার বার" (Barrier Bar) এ পরিণত হয়ে গেছে। স্পিটের যে অংশটা হুকের মত মূল ভূখন্ডের সঙ্গে জুড়ে আছে জোয়ারের সময়ে সেটা জলে ডুবে গেলে স্পিটটা হয়ে যায় যেন একটা আড়াআড়ি লম্বা দ্বীপ আর ভাঁটার সময়ে যখন বেরিয়ে পড়ে তখন যেন উপদ্বীপ। কোস্ট আর স্পিটের মাঝখানের খাঁড়িটায় সমুদ্র যেন একটা শান্ত ঝিল। নৌকো করে স্পিটের চরে পৌঁছলে তবেই বঙ্গোপসাগরের অপার বিস্তার দেখা যায়। সাদা বালির চরে বিস্তীর্ণ ঝাউবন, আর অজস্র লাল কাঁকড়ার উপনিবেশ। তালসারির টোপোশীট নম্বর হল 73 O/6। এম.এস.সি পার্ট ওয়ান পড়ার সময়ে সুভাষরঞ্জন বসু স্যার আমাদের এই টোপোশীট থেকে সব প্র্যাকটিকাল কাজ করিয়েছিলেন। সেই থেকে জায়গাটার ওপরে আমার আকর্ষণ। মাঝিদের সঙ্গে দরাদরি করে আমরা চড়ে বসলাম নৌকোয়। মাঝি দাদা বললেন আধঘন্টা সময় ওনারা চরের ওপরে থাকার জন্য দেবেন, তারপর আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তখন সবে দুপুরবেলা। আধঘন্টায় ভৌগোলিকের চলে নাকি? অন্তত দু ঘন্টা তো লাগবেই। সেই শুনে মাঝিরা বললেন, এখন ভাঁটা শুরুর সময়। দুঘন্টা পরে এখানে ডাঙা বেরিয়ে যাবে, আপনারা হেঁটে ফিরে আসবেন। আমরা পরম নিশ্চিন্তে সেই আশ্বাস বাণী বিশ্বাস করলাম, এবং জীবনে যত বড় বড় ভুল করেছি, তার মধ্যে এই ভুলটা প্রথম তিনের মধ্যেই থাকবে।
প্রথমে চলল রুপোলি বালির চরে লাল কাঁকড়ার দলের সঙ্গে লুকোচুরি। তারপর সেই বিশাল সমুদ্রের রূপ। আমরা স্পিট বারের অক্ষ বরাবর পশ্চিম অভিমুখে অজান্তে মোহনার দিকে হেঁটে যেতে লাগলাম - আনন্দে উদ্বেল মন, ঝুঁকি সম্পর্কে অসচেতন, মন্ত্রমুগ্ধ। এক কিলোমিটার মত যাবার পর, ছোট্ট ছোট্ট সদ্যোজাত শিশুর মত নিচু নিচু অর্ধচন্দ্রাকৃতি বার্খান বালিয়াড়ি দেখতে পেলাম। তরুণী প্রফেসরের সামনে জিওমরফলজির বইয়ের পাতা যখন প্রথমবার জীবন্ত হয়ে ওঠে, কী হতে পারে? যা হতে পারে, শাল্লরীরও তাই হল। তারা বালিয়াড়ি পেরিয়ে এগিয়ে চলল আরও দূরে, যেন কোন হ্যামলিনের বাঁশির টানে।
তারপর সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে একটু ঢলে পড়লেন, সম্বিৎ ফিরে আমরা ভাবলাম, ফিরব যে ডাঙা কই? ভাঁটা কই? আলো কমে আসছে, কোথায় সেই নৌকো ভেড়ার পার? কোথায় মাঝি? কোথায় আলো - আমরা ছাড়া জনমনিষ্যি কোথাও কেউ নেই। তখন মোবাইল ফোন আসেনি যে কাউকে খবর দেব। হায় মোহনার কাছে যেখানে সুবর্ণরেখার মত একটা বড় নদী জল এনে ঢালছে সেখানে ভাঁটাতেও কি ডাঙা বেরোতে পারে? দলে একটি ছাত্রী মাত্র সাঁতার জানত, আর কেউ নয়। এদিকে বালি পেরিয়ে আমরা টাইডাল মাড ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছেছি। কোর্স স্যান্ড নয়, মিহি ক্লে কণা। একটা পাথরকে দশ টুকরো করলে তার সারফেস এলাকা বেড়ে যায়। আবার পাথরটাকে এক কোটি কণায় ভাঙলে তার সারফেস আগের তুলনায় মিলিয়ন গুণ বেড়ে গেল। সারফেস যত বাড়ে সারফেস টেনশনও তত বাড়বে। কণা গুলো পস্পরকে প্রচন্ড আকর্ষণ করবে, ছাড়ানো যাবেনা। এই কারণেই কাপড়ে বালি লাগলে ঝেড়ে ফেলা যায়, কিন্তু মিহি কাদা লাগলে হাজার ঘসলেও দাগ যেতে চায়না, কামড়ে বসে থাকে। জুতো পরে হাঁটার চেষ্টা করে দেখা গেল হাঁটা অসম্ভব। জুতোয় চুম্বকের মত ক্লে আটকে গদার মত ভারি হয়ে যাচ্ছে। আর জলে ভেজা একেবারে সম্পৃক্ত কাদা, ভীষণ পিচ্ছিল, কোন ঘর্ষণ বল কাজ করছেনা। কোন অবলম্বন ছাড়া নিরালম্ব ভাবে দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল। এদিকে এখানে ওখানে ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল উঠে আছে। ছোট, ছোট কাদায় ঠিক বোঝা যায়না, শহুরে পা তার ওপরে পড়ে গেলে ফুটে যাচ্ছে, বেশ ধারালো - সে এক অবর্ণনীয় কষ্ট, সেইসঙ্গে উদ্বেগ - ছেলেমেয়েগুলোর কী হবে? জল অগভীর কিনা পরীক্ষা করব কীভাবে? জলের কিনারায় পৌঁছতেই পারছিনা। প্রচন্ড জোরে হাওয়া বইছে, জুতো খুলে হাতে নিলাম। জুতোর কাদাগুলো হাওয়ায় লুটোপুটি কামিজের ওড়নায় লেপে মুখে গায়ে সর্বত্র মাখামাখি হতে লাগলো। আমি বল্লরীদিকে ধরে এগোতে লাগলাম। বাকিরা কে কী করছে দেখার উপায় ছিলনা। যে মেয়েটি সাঁতার জানতো সে জল কোথায় কম খুঁজে খুঁজে সাঁতার দিয়ে বেড়াতে লাগলো। তারপর এক জায়গায় একটা ‘শোল’ লাইন পাওয়া গেল। মানে জলের নিচে ডুবে থাকা বালি বা নুড়ির প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পলিচর। হেঁটে গেলে ম্যাক্সিমাম আমার বুক জল হবে। তখন সকলে মিলে হাত ধরাধরি করে লম্বা লাইন করে সেই জায়গা দিয়ে ধীরে ধীরে খুব সাবধানে একের পর এক ঐ অত জল পেরিয়ে মূল ভূখন্ডে ফিরে আসা হল। ফিরে এসেও বিশ্বাস করতে পারছিলামনা, যে আমরা বেঁচে গেছি। সম্প্রতি অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় এই তালসারিতেই দুর্ঘটনায় জলে ডুবে মারা গেলেন। ভাগ্যের ফের। আমরাও পুরো ভূগোল বিভাগ সেদিন নিশ্চিত সলিল সমাধি থেকে কীকরে যে বেঁচে ফিরেছিলাম, তা আমরা নিজেরাও জানিনা।
ভৌগোলিক তত্ত্বের দিক থেকে আজ আমি ঐ ঘটনা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, কিন্তু সেদিন সক্ষম ছিলামনা। কারণ ক্লাসে বসে টোপোশীট থেকে আঁকতে শিখলেই বাস্তবে প্রাণ বাঁচানো যায়না। সেদিন মোহনার ওরিয়েন্টেশন কোন দিকে আমরা তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলাম। তখন তো ইন্টারনেট, গুগল ম্যাপ এসব ভবিষ্যতের গর্ভে, তাই ভৌগোলিক কাণ্ডজ্ঞান অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। সম্পূর্ণ সমতল টাইডাল ফ্ল্যাটে খালি চোখে কোনো উচ্চতার তারতম্য বোঝা যায় না। স্পিট বারের অক্ষ বরাবর পশ্চিম দিকে (মোহনার দিকে) হেঁটে যাওয়ার সময় ভূমিরূপের সূক্ষ্ম ঢাল বোঝা সম্ভব হয়নি, কারণ পুরো এলাকাটিই আমরা সমতল ভেবে নিয়েছিলাম। সেদিনের সেই সাঁতার জানা ছাত্রীটি ডুবে থাকা বালির শিরাটিকেই (Submerged Ridge) খুঁজে বের করতে পেরেছিল বলেই সকলে প্রাণে বেঁচেছিলাম। "হাত ধরাধরি করে লম্বা লাইন" তৈরি করা হল 'ফ্রিকশনাল ওয়েট ডিস্ট্রিবিউশন', যাতে একা একজন ভেসে গেলেও দলের বাকিদের সম্মিলিত ভরকেন্দ্র তাকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
মাঠাবুরুর সঙ্গে এই তালসারির একটা বেসিক পার্থক্য আছে। পাহাড়ের বিপদ গোপন নয়। সে তার প্রকাণ্ড উচ্চতা, তীব্র ঠান্ডা, পাতলা বাতাস, আলগা পাথরের ধস এবং খাড়া ঢাল দিয়ে শুরুতেই জানিয়ে দেয় যে, এখানে সামান্য অসাবধানতার মাশুল হতে পারে মৃত্যু। তাই পাহাড়ে পা রাখার আগে মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়, দড়ি, ক্যারাবিনারের মতো যান্ত্রিক সরঞ্জাম বাঁধে, ঢাল ও ভারসাম্যের নিয়ম মেনে চলে। কারণ, সেখানে ভুল করার কোনো অবকাশ পাহাড় নিজেই রাখে না।
অন্যদিকে, সমুদ্র উপকূল—বিশেষ করে তালসারির মতো জোয়ার-প্রভাবিত সমতল তটভূমি মানুষের সামনে এক ‘নিরাপত্তার মায়াজাল’ বিছিয়ে রাখে। বিস্তীর্ণ শান্ত সমুদ্র, কোনো গর্জন নেই, চোখের সামনে কেবল এক ধূ-ধূ সমতল শান্ত বালুচর। মানুষ মনে করে, ‘এখানে আর বিপদের কী থাকতে পারে!’ এই আপাত শান্ত রূপটাই আসলে ঘাতক, মানুষকে অসচেতন করে তোলে। মানুষ তার সুরক্ষাবর্ম বা প্রতিরক্ষার সমস্ত নিয়ম দূরে সরিয়ে রেখে বিবশ হয়ে সমুদ্রের গভীর থেকে গভীরে এগিয়ে যায়। বিপদটা আসে অলক্ষে। কোনো প্রকাণ্ড আছড়ে পড়া তরঙ্গ নয়, বরং নিচ দিয়ে নীরবে এসে চেপে বসা কাদা কণার কোহেসিভ টান পা টেনে ধরে, লুকানো খালের (Hidden Channels) জোয়ার আর দৃষ্টিসীমার বাইরে তৈরি হওয়া অদৃশ্য জলবেষ্টনী। যখন মানুষ টের পায়, ততক্ষণে পালানোর সমস্ত পথ জল ও কাদায় রুদ্ধ হয়ে গেছে।
ছোটবেলায় তো অতশত বুঝতামনা, সমুদ্র থেকে পাহাড়ই বেশি টেনেছে আমায় বারবার। পরে বুঝলাম, আমার নির্বাচন একেবারেই সঠিক ছিল। পাহাড়ের কোন ছলনা নেই। সে উন্মুক্ত তরবারি হাতে সামনে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছোড়ে—তাই মানুষ সেখানে সর্বক্ষণ সজাগ ও আত্মরক্ষায় প্রস্তুত থাকে। আর উপকূল বন্ধুবেশে ডেকে এনে পায়ের তলার মাটিটুকু নীরবে কেড়ে নেয়, সুরক্ষার কুহক রচনা করে মানুষকে অমোঘ মৃত্যুর ফাঁদে টানে!
মাঠে ঘাটে কাজ করতে গিয়ে ঘটনা, দুর্ঘটনা, অনিচ্ছাকৃত ভুল ভ্রান্তি হয়ে গেছে অনেক। একে একে স্বীকার করতে সাহস জোটাতে হয়। তবু গেয়ে যাই প্রকৃতির কথকতা - আসছে দিনের অভিযাত্রীর কিছু কাজে লাগে যাতে।
হীরেন সিংহরায় | ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১৫:২৯742141
হীরেন সিংহরায় | ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১৮:৩১742145
kk | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ২০:১৩742167
অরিন | ১০ আগস্ট ২০২৬ ০২:১৯742173