

‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’-অস্ত্রে কায়েম সন্ত্রাসের শাসন
মুর্শিদাবাদের সুতি অঞ্চলে করা তথ্যানুসন্ধানের প্রতিবেদন
মুর্শিদাবাদ জেলার রাঢ় অঞ্চলে গঙ্গা ও পদ্মা নদীর মাঝের এলাকার নাম সুতি, প্রায় ২৫৫ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে তা বিস্তৃত। পদ্মা নদী অনেকাংশেই এখানে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে কাজ করছে: এপারে ভারত, ওপারে বাংলাদেশ। প্রশাসনিকভাবে এই অঞ্চল দুটি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকে বিভক্ত: সুতি-১ ও সুতি-২। সুতি-১ ব্লকের জনসংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজারের কাছাকাছি, যার মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে ৫৮.১ শতাংশ মুসলমান ও ৪১.৬ শতাংশ হিন্দু; আর সুতি-২ ব্লকের জনসংখ্যা ২ লাখ ৭৯ হাজারের কাছাকাছি, যার মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে ৭২.৫ শতাংশ মুসলমান ও ২৭.২ শতাংশ হিন্দু (২০১১ জনগণনার প্রতিবেদন অনুযায়ী)। প্রায় আশিটি গ্রামে এই মানুষরা বাস করেন। গ্রামগুলি অধিকাংশই ঘনবসতিপূর্ণ। এখানকার মাটি ল্যাটেরাইটযুক্ত এঁটেল মাটি, কৃষিকর্মের সহায়ক। ধান ও পাট দুটি প্রধান ফসল, এছাড়াও ডাল, সবজির ফলন হয়। গ্রামগুলোর প্রধান কাজ এই কৃষিকাজই। কিন্তু তা মানুষের জীবনকে সচ্ছলতা দিতে পারে না। কারণ, এখানকার সিংহভাগ মানুষই ভূমিহীন কৃষক বা প্রান্তিক চাষী। কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মধ্যে সুতি-১ ব্লকে ৪৮ শতাংশ ও সুতি-২ ব্লকে ৫৩ শতাংশ মানুষদের কোনো জমি নেই, তাই চাষের মরশুমে অন্যের জমিতে কৃষিমজুর হিসেবে খাটার মধ্য দিয়েই তাঁদের যা রোজগার। সেই মজুরির প্রকৃত মূল্যও দিন-কে-দিন কমছে। বাকিদের সিংহভাগও ১ বা ২ হেক্টরের কম কৃষিজমির মালিক। কৃষিকাজের খরচ বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে এঁদের অনেকেই নিজেরা চাষ করার ক্ষমতাটুকু হারাচ্ছেন, ঋণ-বন্ধকী-কর্জ-এর পাকে পড়ে ধনীদের কাছে জমি লিজ দিয়ে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তাই গঙ্গা-পদ্মার আশীর্বাদে মাটি উর্বর হলেও চাষের কাজ দিয়ে বেশিরভাগ মানুষের পেট চালানো দুষ্কর হয়ে উঠেছে অনেকদিন। এই সুযোগে বিড়ি-বাঁধার শ্রম সেঁধিয়েছে ঘরে-ঘরে। বিড়ি কোম্পানিগুলোর মালিকরা বিশাল ধনী ও প্রভাবশালী। বিস্তৃত কন্ট্রাক্টর-জালিকার মধ্য দিয়ে বিড়ির পাতা ও মশলা পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে-ঘরে, কন্ট্রাক্টররা দিন-প্রতি কতগুলো বিড়ি বেঁধে দিতে হবে তার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিচ্ছেন, অতি কম পিস-রেট মজুরী, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করতে পারলে সে মজুরীতেও কোপ পড়বে, তাই প্রায় প্রতিটি বাড়ির দরজার সামনে, উঠোনে বা রাস্তার ধারে, একা বা কয়েকজন একসাথে, মহিলারা মশলা ও বিড়িপাতার কুলো কোলে নিয়ে বিড়ি বেঁধে চলেছেন একটানা। সুতি-১ ব্লকে মোট শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং সুতি-২ ব্লকে মোট শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ এমন বিড়ি-বাঁধা শ্রমিক (২০১১ জনগণনা প্রতিবেদন অনুযায়ী)। হ্যাঁ, এই বিড়ি-বাঁধা শ্রমিকদের প্রায় আশি শতাংশই গেরস্থ মহিলা। তবু তো দিন চলে না। তাই দূরের শহরে বা অন্য রাজ্যের শহরে পাহারাদার-মিস্ত্রি-মজুর-ফেরিওয়ালা-র কাজের সন্ধান যখন আসে আড়কাঠিদের মারফত, তখন ঘর ছেড়ে শক্ত-সমর্থরা পাড়ি দেয় খাটনি-করার শক্তির শেষ বিন্দুটিকেও নিঙড়ে করকরে কিছু টাকা রোজগারের জন্য, সে টাকা তারা ঘরে পাঠায়, বাড়িটা হয়তো পাকা হয়, দেওয়ালে নতুন রঙের পোঁচ পড়ে, আর সেই পরিযায়ী শ্রমিকটির দূর প্রবাসে গতর-নিঙড়ানো খাটনি আর ক্লান্তি-অবসাদে মোবাইলের নীল আলোর মধ্যে ডুব-সাঁতার, এভাবেই দিন কাটে। এঁদের সংখ্যা বেশ কয়েক লাখ হবে।
কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুঝতে-যুঝতে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলোর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান গরিব মানুষরা হঠাৎই কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমান হওয়ার কারণেই এক ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কবলে পড়েছেন এ রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী সরকার কায়েম হওয়ার পর থেকে। সুতি ব্লকের কিছু গ্রাম ঘুরে এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের যে নিদর্শন আমরা চাক্ষুষ করেছি এবার তার কথায় আসি।
ইব্রাহিম শেখ গায়েব
নুরপুর গ্রাম পঞ্চায়েত-এর অধীন রমাকান্তপুর কানোপাড়ায় ইব্রাহিম শেখ-এর বাড়ি। তাঁর বয়স সত্তরের কাছাকাছি। দীর্ঘদিন এই এলাকার সবচেয়ে বড়ো বিড়ি-কোম্পানি ‘পতাকা বিড়ি’-তে কাজ করেছেন। শরীর ভেঙে যাওয়ায় এখন বাড়িতে বসা। শুধু শরীরই ভাঙেনি, স্নায়ুতন্ত্রের রোগও তাঁকে কব্জা করেছে, ফলে সারাক্ষণ তাঁর হাত কাঁপে, শরীর কাঁপে, চলাফেরায় ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন না। তাঁর জন্ম এখানেই, সত্তরটা বছরও কেটেছে এখানে। তাঁরা এখানকার বাসিন্দা কয়েক পুরুষ ধরে, ১৯৪৬ সালের পারিবারিক দলিল এখনও তাঁদের কাছে আছে। তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন, ছেলে সোহান শেখ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই কলকাতার ধারেকাছে কাজ করেন। ছেলের বউ পারভিন খাতুন এবং ছোটো-ছোটো দুই নাতি-নাতনি ঘরে থাকে।
জুলাই মাসের ২৯ তারিখে রাত তখন একটা। ইব্রাহিম শেখ ঘুমিয়ে পড়েছেন অনেক আগেই। তাঁর ছেলের বউ, নাতি-নাতনিও ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রায় ষোলো-সতেরো জনের পুলিশবাহিনি এসে তাঁদের বাড়ি ঘিরে ফেলল, তারপর দরজা ধাক্কাতে লাগলো। পারভিন খাতুন সচকিত হয়ে দরজা খুললেন, আশপাশের বাড়ির লোক পাড়া-প্রতিবেশীরাও বেরিয়ে এলো। পুলিশবাহিনিতে কোনো মহিলা-পুলিশ ছিলো না, তারা পারভিনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে এলো এবং গালাগালের বন্যা ছুটিয়ে ইব্রাহিম শেখের খোঁজ করতে লাগলো। হকচকিয়ে উঠে ঘুম-ভেঙে-যাওয়া ইব্রাহিম শেখের দুর্বল স্নায়ুরোগে-কাঁপতে-থাকা দেহটাকে তারা টেনে-হিঁচড়ে বিছানা থেকে তুলে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলো। পারভিনের প্রশ্নে তারা সেই গালাগালির ফোয়ারা ছুটিয়েই উত্তর দিলো যে ইব্রাহিম বাংলাদেশী বলে তারা পাকা খবর পেয়েছে, তাই তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পারভিন ও অন্য পাড়া-প্রতিবেশীরা নানাভাবে বলে বোঝানোর চেষ্টা করে যে ইব্রাহিমের জন্ম ভারতেই, তার আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সবই আছে, তাতে পুলিশ কোনো কানই দেয়নি। চোখ রাঙিয়ে কেবল বারবার হুঙ্কার ছেড়েছে: ‘চোপ্! এখন থেকে তোরা আমাদের পায়ের তলায় থাকবি!’ অসুস্থ ভারসাম্যহীন ইব্রাহিম বাড়ির সামনের সিমেন্ট-বাঁধানো রাস্তায় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান, পুলিশরা তখন নির্মমভাবে তার পড়ে-যাওয়া দেহটাকে হেঁচড়াতে-হেঁচড়াতে টানতে-টানতে পুলিশের গাড়ির দিকে নিয়ে যায়। রাস্তার দুধারে দাঁড়ানো প্রতিবেশীরা বলে ওঠে: ‘ওভাবে হেঁচড়ে নিয়ে গেলে তো মানুষটা মরেই যাবে’। পুলিশ তাদের দিকে ঘুরে উত্তর দেয়: ‘মরুক, ওর বেঁচে হবে কী?’
ইব্রাহিম শেখ-কে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই গোটা বর্ণনাটা আমরা ইব্রাহিম শেখ-এর বাড়িতে দাঁড়িয়ে তাঁর ছেলের বউ পারভিন খাতুন এবং অন্যান্য পাড়া-প্রতিবেশীদের মুখ থেকে শুনেছি। তাঁদের কথাই আমরা হুবহু লিখলাম, আমাদের কোনো কল্পনা এখানে যোগ করিনি। পুলিশ যেভাবে এখানে দুর্বল অসুস্থ একটা মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে গেলো, তাতে স্পষ্ট যে ইব্রাহিম শেখ-এর সঙ্গে তারা বলি-দিতে-টেনে-নিয়ে-যাওয়া-পশু-র মতো ব্যবহার করেছে, মানুষের মতো ব্যবহার করেনি, অর্থাৎ, মানুষ হিসেবে প্রাপ্য ন্যূনতম সম্মানটুকুও দেয়নি। আর শুধু ইব্রাহিম শেখ নয়, তার ছেলের বৌ এবং পাড়া-প্রতিবেশীদেরও যেভাবে তারা গাল দিয়েছে, পায়ের নিচে পিষে রাখার হুমকি দিয়েছে এবং বেঁচে থাকার চেয়ে তাদের মরে যাওয়াই ভালো বলে নিদান ঘোষণা করেছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কেবল ইব্রাহিম শেখ-কে তুলে নিয়ে যাওয়া নয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিলো পাড়ার সমস্ত বাংলাভাষী মুসলমান মানুষদের মনেই ভয়-আশঙ্কা-হীনমন্যতা ঢুকিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ নিখাদ সন্ত্রাসের বাতাবরণ প্রতিষ্ঠা করা। কোনো মহিলা-পুলিশ না-থাকা এক বাহিনি যেভাবে পারভিন খাতুনকে গালাগালি ও নিগ্রহ করেছে তা চূড়ান্ত লিঙ্গ-বৈষম্য-পূর্ণ আচরণেরও পরাকাষ্ঠা। বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে তীব্র দ্বেষ ও হিংসাত্মক মনোভাব এই পুলিশকর্মীরা প্রদর্শন করেছে তা দেখায় যে পুলিশের অন্তত একাংশ এখন কী তীব্র মাত্রায় বাঙালি-মুসলমান-বিদ্বেষী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

পারভিন খাতুন
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হওয়া ভোটার-তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এস.আই.আর.)-এ পশ্চিমবঙ্গের যে ৯১ কোটি নাম ছেঁটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, তার মধ্যে ইব্রাহিম শেখ-ও একটি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের গোড়ার দিকেই তার ছেলে সোহান শেখ এই নাম-বাদ-দেওয়ার প্রতিবাদ করে ও পুনরায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানিয়ে ট্রাইবুনালে আবেদন করেছিলো। কিন্তু এক ভোট চলে গিয়ে আরো সব ভোট চলে এলেও সেই ট্রাইবুনাল তো এখনও ৯৯ শতাংশ আবেদনের কোনো ফয়সালাই করে উঠতে পারেনি, ফলে ইব্রাহিম শেখের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির আবেদনেরও কোনো ফয়সালা এখনও হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট তার একটি রায়ে সম্প্রতি বলে দিয়েছে যে এস.আই.আর.-এ নাম বাদ যাওয়া মানেই নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া নয়। তাই ইব্রাহিম শেখ-এর ক্ষেত্রেও এর ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চয়ই তার নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে না। নাগরিকত্বের অন্য নানা প্রমাণ, যেমন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, ১৯৪৬ সালের পারিবারিক দলিল সহ যাবতীয় কাগজপত্র পুলিশ বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলো। তা সত্ত্বেও পুলিশ কীভাবে, কীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে ইব্রাহিম শেখ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী? কোনো যুক্তিতেই এমন সিদ্ধান্ত হতে পারে না। কিন্তু সন্ত্রাস কায়েম করাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে তার যুক্তি তো আবার আলাদা।
ইব্রাহিমকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরদিন সকালে তার পরিবারের লোকজন সুতি থানায় খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ আর কোনো খোঁজ দেয়নি। তার পরিবারের লোকজনরা তখন হন্যে হয়ে চারপাশের বি.এস.এফ. শিবিরগুলোয় খোঁজ নিতে থাকে। এইসব বি.এস.এফ. শিবিরগুলোয় কয়েকটা ঘরে ঠেসে-পুরে বাংলাদেশী সন্দেহে ধরে আনা মানুষজনকে রাখা হয়েছে, এগুলোই নিত্য গজাতে থাকা হোল্ডিং সেন্টার। কিন্তু কোনো বি.এস.এফ. শিবিরের হোল্ডিং সেন্টারেই ইব্রাহিম শেখ-এর খোঁজ তাঁর পরিবারের লোকেরা পাননি, বারবার সুতি থানায় গিয়েও পাননি। পারভিন খাতুন বারবার বি.এস.এফ. এবং পুলিশ কর্তাদের অনুরোধ করেছে যে তাঁর শ্বশুরের স্নায়ুতন্ত্রের রোগ সহ বিবিধ রোগ আছে, তাঁর নিয়মিত ওষুধগুলো না খেতে পেলে তিনি জান-এ বাঁচবেন না, তাই তাঁর আনা ওষুধগুলো অন্তত যেন ইব্রাহিম শেখের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কোনো পুলিশ বা বি.এস.এফ. কর্তাই তাঁর অনুরোধে কান দেননি, তাঁর হাত থেকে ওষুধগুলো নেননি। ফলে এখানে একটা গুরুতর প্রশ্ন উঠে যায়: হোল্ডিং সেন্টার-এ যাঁদের আটকে রাখা হচ্ছে, তাঁদের পূর্বচিহ্নিত রোগ-চিকিৎসার ন্যূনতম দায়ও যদি এভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে এটাই কি মনে হয় না যে ধরে-নিয়ে-যাওয়া মানুষদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার কোনো ব্যবস্থাই হোল্ডিং সেন্টারগুলোয় করা হচ্ছে না?
ইব্রাহিম শেখ-এর ছেলে সোহান শেখ এরপর আর কোনো উপায় না দেখে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল মহম্মদ নুর হোসেন জামদার-এর মাধ্যমে কলকাতা হাইকোর্টে একটা রিট পিটিশন দাখিল করেন। সেই পিটিশনে ইব্রাহিম শেখ-এর ভারতীয় নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ দাখিল করে অনুযোগ করা হয় যে পুলিশ ইব্রাহিম শেখ-কে কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশী বলে তুলে নিয়ে গিয়ে বেআইনীভাবে আটকে রেখেছে, সুতরাং কোর্ট যেন এই অন্যায়ের প্রতিকার করে ইব্রাহিম শেখ-কে পরিবারের লোকজনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে। সেই মামলার প্রথম শুনানিতে বিচারক রাষ্ট্র-কে ২২ শে সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিনের মধ্যে এফিডেভিট করে ইব্রাহিমকে ধরার ও তারপর তাকে নিয়ে কী করা হয়েছে তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হাজির নির্দেশ দেন।
২২শে সেপ্টেম্বরের আগেই তার ফল ফলতে শুরু করে রমাকান্তপুর কানোপাড়ায়। পঞ্চায়েত সদস্যা মুজকেরা বিবি ও অন্যান্যরা এসে পারভিন খাতুনকে জোরাজুরি করতে থাকেন যাতে পারভিন-রা নিজেরাই হাইকোর্ট থেকে মামলা প্রত্যাহার করে নেন। ইব্রাহিম শেখ-এর বাড়িতে দাঁড়িয়ে পারভিন খাতুন নিজে আমাদের একথা বলেছেন এবং তার সঙ্গে চোখে আগুনের ঝিলিক নিয়ে টানটান মুখে দৃঢ় কণ্ঠে সংকল্প ঘোষণা করেছেন যে এই মামলা তাঁরা কখনোই প্রত্যাহার করবেন না। প্রত্যাহার করানোর জন্য চাপ তৈরির নানা কৌশল এখনও চলছে, রটিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ইব্রাহিমের ছেলে সোহানকে এবার ধরা হবে বাংলাদেশী বলে। সোহান এখন বাড়িতে থাকেন না, তিনি অজ্ঞাতবাসে। পারভিন খাতুন-এর বৃদ্ধ বাবা রোজ রাতে মেয়ের বাড়িতে এসে থাকেন, দিনেও নজর রাখেন। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যুবতী পারভিন-এর কথা-বার্তা-মেজাজে আমরা যে হার-না-মানা লড়াকু দৃঢ়তার স্ফুলিঙ্গ দেখে এসেছি, তা আমাদেরকেও ভিতর থেকে সাহসী করে তুলেছে, কিন্তু পুলিশ-বি.এস.এফ.-পঞ্চায়েত-এর ত্রিফলা আক্রমণের বিরুদ্ধে কী অসম এক লড়াই লড়ার প্রতিজ্ঞাই না সে নিয়েছে!
আমরা চারজন তথ্যানুসন্ধানকারী সুতি-২ থানার বড়বাবু, অর্থাৎ আই.সি (ইন্সপেক্টর-এন-চার্জ)-এর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম পুলিশের বক্তব্য জানতে। তাঁর ঘরের সামনে ঝকঝকে ফলকে তাঁর নাম লেখা: অভিজিৎ বসু মল্লিক। খানিক্ষণ অপেক্ষার পর তাঁর ঘরে ঢোকার অনুমতি মিললো। বেশ প্রশস্ত সাজানো-গোছানো ঝকঝকে ঘর। লম্বা একটা টেবিলের ওদিকে সাদা-তোয়ালে-মোড়া গদির চেয়ারে তিনি উর্দি পড়ে বসে আছেন। গোঁফ-দাড়ি-কামানো ঝকঝকে মুখ। টেবিলের এপারে সার দিয়ে সাজানো লোহার চেয়ারের সারিতে চারটে চেয়ারে আমরা বসলাম। দামী অ্যানড্রয়েড ফোনে আঙুল চালাতে চালাতে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। আমরা প্রশ্ন করলাম, পুলিশ যাদের বাংলাদেশী সন্দেহে অ্যারেস্ট করছে, তাদের অ্যারেস্ট মেমো দিচ্ছে কি? তাঁর মুখে একটা মসৃণ হাসি ভেসে উঠলো, অত্যন্ত নিঃসংশয়ী ভঙ্গিতে যেন আমাদের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন এভাবে ওই ফোনে আঙুল চালাতে চালাতেই তিনি বললেন: পুলিশ কাউকে ‘অ্যারেস্ট’ করছে না, পুলিশের কাছে থাকা নির্দিষ্ট তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে ‘ডিটেইন’ করছে, ফলে ফরেনার্স অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী এটা কোনো আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে না, এদের বি.এস.এফ.-এর অধীনে হোল্ডিং সেন্টার-এ রাখা হচ্ছে যতদিন পুলিশের লাগে সব ‘ভেরিফিকেশন’ সাঙ্গ করতে, ভেরিফিকেশন সাঙ্গ হলে বা ধৃতরা এক মাসের মধ্যে নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে প্রমাণ করতে না পারলে, পুলিশ তাদের রিপোর্ট বি.এস.এফ.-এর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে, এরা সবাই বাংলাদেশী, বি.এস.এফ. তখন এদের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কোনো এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে ‘ডিপোর্ট’ করে দিচ্ছে। ইব্রাহিম শেখ-এর কথা জানতে চাইলে একইরকম নিঃসংশয়ে আই.সি.-মহাশয় বলে দিলেন যে ইব্রাহিমও বাংলাদেশী, তার ভেরিফিকেশন হয়ে গেছে, এখন হয়তো তাকে বাংলাদেশে ডিপোর্ট-ও করা হয়ে গেছে। তারপর তাঁর মুখের হাসিটা বঙ্কিম রূপ ধারণ করলো, তিনি বললেন, এগুলো যে কোনো আইন-আদালতের বিষয় নয়, তা না বুঝেই কেউ ভুল বুঝে বা ভুল বোঝানোর শিকার হয়ে কোর্টে কেস করে বসছে, তারপর আবার জাজ-দের হাতে-পায়ে ধরে বলছে যে কেস করা ভুল হয়ে গিয়েছিলো, কেসটা যেন উইথড্র করে নেওয়া হয়। আমরা প্রশ্ন করলাম, সেকি! ইব্রাহিম শেখ-এর কেস উইথড্র হয়ে গেছে নাকি! মুখের হাসিটা আরেকটু বঙ্কিম করে আই.সি.-মহাশয় বললেন, হ্যাঁ, হাতে-পায়ে-ধরে উইথড্র করেছে।
আমরা বেরিয়ে এলাম সুতি-২ থানা থেকে। আই.সি.-মহাশয়ের শেষ কথাগুলোয় একটু ধন্দে পড়ে গিয়েছিলাম। তাই থানার সামনে রাস্তাতে দাঁড়িয়েই ইব্রাহিম শেখের মামলার উকিল মহম্মদ নুর হোসেন জামদার-কে ফোন করলাম, মামলাটির হাল-হকিকত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। জামদার বললেন যে ২২ তারিখ পরবর্তী শুনানি, দেখা যাক রাষ্ট্রের পক্ষে এফিডেভিট জমা পড়ে কিনা, পড়লে কী পড়ে। অর্থাৎ, মোটেই কেউ ‘উইথড্র’ করেনি, কেউ কারও হাতে-পায়েও ধরেনি। পুলিশের বড়কর্তা মহাশয় সজ্ঞানে সচেতনভাবে একটা ডাহা মিথ্যা কথা বলেছেন। যে পুলিশকর্মী গালাগাল করতে করতে সিমেন্টের রাস্তা দিয়ে অসুস্থ বৃদ্ধকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় আর যে পুলিশকর্তা সত্য-কথা-বলা-র এতো নিখুঁত অভিনয়ের সঙ্গে ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারে, এই দুইয়ের মধ্যে কে বেশি বিপজ্জনক, কে বেশি ভয়ঙ্কর, তা এক ভাবার বিষয় বটে! আর পঞ্চায়েত সদস্যাও যে কেস তুলে নেওয়ার জন্য পারভিন খাতুন-কে চাপ দিচ্ছে, তাও যে পুলিশের গুঁতোর ফলেই, সে নিয়েও আর খুব সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে না।
পুলিশকর্তা পুলিশি-কর্মের আইনী ভিত্তি হিসেবে যে ‘ফরেনার্স অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’-এর কথা উল্লেখ করলেন, তা নিয়েও কয়েকটা কথা এখানে বলা দরকার। ‘ফরেনার্স অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’ ভারতের লোকসভা-রাজ্যসভা-য় আইন হিসেবে পাশ করানো হয় ২০২৫ সালে এবং তা আইন হিসেবে লাগু হয় ২০২৫ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে। এই আইন পাশ হওয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী চারটে আইন অকার্যকরী হয়ে যায়, তার জায়গা নেয় এই নতুন আইন। অকার্যকরী হয়ে যাওয়া এই পূর্ববর্তী চারটে আইন হলো: 1) The Passport (Entry into India) Act, 1920, 2) The Registration of Foreigners Act, 1939, 3) The Foreigners Act, 1946, 4) The Immigration (Carrier’s Liability) Act, 2000। পূর্ববর্তী এই আইনগুলো অনুয়ায়ী, পুলিশ বা বি.এস.এফ. ভারতে থাকা কোনো বিদেশী মানুষকে ধরলে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে নিকটবর্তী ফৌজদারী আদালতে হাজির করাতে হতো, বিচারকের সামনে সেই ব্যক্তি অভিযোগ খণ্ডন করে নিজের বক্তব্য রাখতে পারতেন, আদালতের বিচারে দোষ প্রমাণিত হলে সেই দেশের কনস্যুলেট-এর সঙ্গে ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার দেশে ফেরত পাঠানো হতো। উপরোক্ত চারটি আইনকে ২০২৫ সালে বাতিল করার আগেই, কেন্দ্রের বি.জে.পি.-নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৩-২০২৪ সালে বিভিন্ন রাজ্যে কর্মরত বাংলাভাষী মুসলমান পরিষায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশী/রোহিঙ্গা বলে দাগিয়ে দিয়ে উপরোক্ত আইনী প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে বাংলাদেশে পাঠাতে শুরু করে। কাউকে কাউকে সুন্দরবনের নির্জন দ্বীপে, কাউকে বঙ্গোপসাগরের মাঝে, কাউকে আসাম সীমান্ত থেকে গুলতি টেনে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো করে বাংলাদেশে নিক্ষেপ করা হয়। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার সোচ্চার হয়। তারপর থেকে বি.এস.এফ. কাঁটাতারের গেট খুলে রাতের অন্ধকারে ধৃত মানুষদের বাংলাদেশের সীমানায় ছেড়ে দিতে শুরু করে। এমন কয়েকটা ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে ও দিল্লির সুপ্রিম কোর্টে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু ওপারে-ঠেলে-দেওয়া মানুষকে আবার ফেরত আনতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার। এভাবে নিজের মুখ পুড়লেও হিন্দুত্ববাদী সরকার তার বর্বর অভিসন্ধি ত্যাগ করেনি, তার সমর্থকদের মুসলমান-ঘৃণাকেও আরো বিষাক্ত করে তোলার ইন্ধন নিরন্তর যুগিয়ে এসেছে। এই জায়গা থেকেই তারা আইনী বাধার সম্ভাবনা নির্মূল করতে উপরোক্ত চারটে আইনকে বাতিল করে ২০২৫ সালে ‘অ্যামেন্ডমেন্ট’ আনতে উদ্যোগী হয় সংসদে। ‘ফরেনার্স অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাবিত হয়। কোর্টে বিচারের পুরো প্রক্রিয়াটিকেই উড়িয়ে দিয়ে সেখানে পুলিশের হাতেই সম্পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয় কে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী তা নির্ধারণ করার এবং অন্য দেশের কনস্্যুলেটের মাধ্যমে মানুষটিকে ‘রিপ্যাট্রিয়েশন’-এর বদলে বি.এস.এফ.-এর মাধ্যমে জোর করে ঠেলে অন্য দেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার বর্বরতাকেই মান্যতা দেওয়া হয়। অবাক কথা যে বি.জে.পি.-বিরোধী সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংসদরাও এই ‘আ্যামেন্ডমেন্ট’ পাশ হওয়ার সময় কেউ এর বিরুদ্ধে একটাও ভোট দেয়নি। এর মাধ্যমেই আইনী মোড়ক পেয়েছে বাংলাভাষী মুসলমানদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েমের প্রক্রিয়া, হিন্দুত্ববাদী নেতারা গলা ফুলিয়ে ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ হাঁকছে সর্বত্র, আর ইব্রাহিম শেখ-এর মতো মানুষরা উবে যাচ্ছে।
আবদুল জব্বার ও তার দুই ছেলের অন্তর্ধান
নুরপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ি থেকে ৩৭ বছর বয়স্ক আবদুল জব্বার এবং তাঁর দুই ছেলেকে (৮ বছর বয়সী আবদুল আহাদ ও ৬ বছর বয়সী আবদুল জিহাদ) বাংলাদেশী বলে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে, এখন আর তাঁদের কোনো সন্ধান নেই, পুলিশ বলছে যে তাদের ‘ডিপোর্ট’ করা হয়ে গেছে। এই ব্যাপারে আরো বিশদভাবে জানার জন্য আমরা আবদুল জব্বার-এর বাড়ি যাই।
নুরপুর গ্রামের যে পাড়ায় আবদুল জব্বার-এর বাড়ি তার অনতিদূরেই পদ্মা বয়ে চলেছে। পদ্মা এখানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে কাজ করছে। বেশ ঘনবসতিপূর্ণ পাড়া। পাড়ায় ঢোকার গলির মুখেই বাঁপাশে একটা মাদ্রাসা। গলির দুপাশের বাড়ির দরজার মুখে মহিলারা মশলা ও পাতার কুলো নিয়ে বসে বিড়ি বাঁধছে। গলি ধরে কিছুটা এগিয়েই ডানহাতে আবদুল জব্বার-এর বাড়ি। তার বাড়ির সামনে এসে যখন আমরা দাঁড়ালাম, পাড়ার বেশ কিছু মানুষ, পুরুষ ও মহিলা, আশপাশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘিরে দাঁড়ালো। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হতে হতে জানা গেলো যে এই পাড়ার অধিকাংশই ওপারে পদ্মার ভাঙনে ঘর-ভিটা-জমি হারানো মানুষদের নদী পেরিয়ে আবার ভিটে খুঁজে ঘর গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিলো, সে প্রায় ষাট-সত্তর বছর আগে, এপার-ওপার যাতায়াতে তখন এতো বাধা ছিলো না, দুপারের বাঙালিরাই উৎসবে-অনুষ্ঠানে-কুটুম্বিতায় একে অপরের কাছে এপার-ওপার যেতো-আসতো। বাপ-ঠাকুরদারা হয়তো এখানে এসে বসত বেঁধেছিলো, এখন এখানে যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্ম এই পারেই, বেড়ে-ওঠা এপারে, রাষ্ট্রীয় সীমানারক্ষী বাহিনির ক্রমশ-বাড়তে-থাকা দাপাদাপিতে তাঁরা এখন ওপারের সঙ্গে সমস্ত যোগ হারিয়েছেন। এইসব কথা হতে হতেই আবদুল জব্বার-এর পালকপিতা জামিরুল শেখ এসে উপস্থিত হলেন।
জামিরুল শেখ ও অন্যান্য পাড়া-প্রতিবেশীদের কথার মধ্য দিয়ে এরপর যা জানা গেলো তা এখন বলি। আবদুল জব্বারের মা-র বাড়ি ছিলো এপারেই, জন্মেছেনও এপারে। তাঁর বিয়ে হয় ওপারে। অর্থাৎ, আবদুল জব্বার-এর বাবা ছিলেন বাংলাদেশ (তার আগে পূর্ব পাকিস্তান)-এর মানুষ। আবদুল জব্বার যখন মায়ের পেটে আসে, তখন মা প্রসবকাল কাটানোর জন্য এপারে তাঁর বাপের বাড়িতে আসেন। তাই আবদুল জব্বারের জন্ম ভারতে, তাঁর মামাবাড়িতে। মা-বাবার সংসার ছিলো অভাব-অনটনে ক্লিষ্ট, আবদুল জন্মানোর পর তাই তাঁর বাবা-মা আরেকটি সন্তান পালনের দায় না নিয়ে আবদুলকে তার মামাবাড়িতেই রেখে চলে যায়। আবদুলের বেড়ে-ওঠা ও লালনপালন তাই ভারতে তার মামাবাড়িতেই। প্রকৃত সম্পর্কে আবদুলের মেসো হন জামিরুল শেখ, তিনিই তাঁর পালকপিতার দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে আবদুল বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতো। রমাকান্তপুর কানোপাড়ার ঝুমা বিবির সঙ্গে তার বিয়ে হয় এবং ক্রমে তাদের তিন সন্তান হয়। আবদুল আহাদ ও আবদুল জিহাদ ছাড়াও সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের বয়স এখন এগারো মাস।
হঠাৎই এই বছরের ৮-ই আগস্ট গভীর রাতে পুলিশ তাদের বাড়ি চড়াও হয়। পাড়াপ্রতিবেশীরা বলেছেন যে পুলিশের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনির জওয়ানরাও ছিলো বলে তাঁরা দেখেছেন। পুলিশ কারো কথা না শুনে আবদুল জব্বার ও তার তিন সন্তানকেই ঘুম থেকে তুলে টেনে-হিঁচড়ে ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশী বলে। পরদিন সকালে ঝুমা বিবি স্বামী ও সন্তানদের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, জন্ম-শংসাপত্র সব নিয়ে সুতি-২ থানায় হাজির হন, বারবার বলেন যে এবারের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এস.আই.আর.)-এও তাঁর এবং আবদুল জব্বার কারও নাম বাদ পড়েনি, তাঁরা দুজনেই ২০২৬-এর নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। পুলিশ তাঁর নিয়ে যাওয়া কাগজপত্র জমা নেয় কিন্তু স্বামী-সন্তানদের কোনো খোঁজ তাঁকে দেয় নি।
জামিরুল শেখ, ঝুমা বিবি ও পাড়া-প্রতিবেশীরা চারদিকে খোঁজ করতে করতে নিকটবর্তী বি.এস.এফ.-শিবিরের মধ্যে হোল্ডিং সেন্টারে আবদুল জব্বার ও তার সন্তানদের রাখা হয়েছে বলে দেখতে পায়, যদিও তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে দেওয়া হয়নি। এরপর বি.এস.এফ. থেকে এগারো মাসের বাচ্চাটিকে ঝুমা বিবির কাছে ফেরত দিয়ে যাওয়া হয়, বাকিদের সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। তারপর থেকেই আর আবদুল জব্বার ও তার দুই ছেলের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
সুতি-২ থানার আই.সি.-কে আবদুল জব্বারের ব্যাপারেও আমরা প্রশ্ন করেছিলাম। পালিশ-করা নিস্পৃহতার ভঙ্গিতে তিনি বলে দিলেন যে ওরা সবাই বাংলাদেশী বলে ‘ভেরিফাইড’ হয়ে গেছে, বি.এস.এফ, ওদের বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ করে দিয়েছে। ঝুমা বিবির জমা দেওয়া ভারতীয় নাগরিকত্বের নিদর্শনগুলো (আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, জন্ম-শংসাপত্র)-র তাহলে কী হলো? আবদুল জব্বার তাহলে অতো-ঢাক-ঢোল-পিটিয়ে-করা এস.আই.আর.-এও ভোটার হিসেবে রয়ে গেলো কী করে? কোন প্রমাণের জোরে এইসব নাকচ করে আবদুল জব্বার-কে বাংলাদেশী বলে ‘ভেরিফাই’ করা হলো? কোথায়, বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হয়েছে আবদুল জব্বার ও তার দুই শিশু সন্তানকে? কোন যুক্তিতে এগারো মাসের সন্তানটি বাংলাদেশী হয় না, অথচ তার দুই দাদা বাংলাদেশী হয়ে যায়? এইসব প্রশ্নের মুখে নিরেট নিস্পৃহ নিস্তব্ধতা বজায় রাখছে পুলিশ ও বি.এস.এফ. কর্তারা--- তাদের যেন নাগরিকদের পক্ষ থেকে ওঠা কোনো প্রশ্নেরই কোনো জবাব দেওয়ার দায় নেই। পুলিশ-রাজ বুঝি একেই বলে।
ডাবলু শেখ-এর বদমেজাজ ও তারপর
নুরপুর-এ ঘুরতে ঘুরতেই আমরা বিভিন্ন জনের মুখে শুনতে পাই যে উমরাপুর পঞ্চায়েত-এর এক গ্রাম থেকে ডাবলু শেখ ও তাঁর তিন ছেলেকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে বাংলাদেশী বলে এবং তারপর থেকে তাঁদের আর কোনো হদিশ মিলছে না। উমরাপুর-এর বাসিন্দা, পেশায় ডাক্তার, সাদিকুল ভাইয়ের ফোন নম্বর আমরা পাই, বলা হয়, তিনি আমাদের ডাবলু শেখ-এর বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন। সাদিকুল-কে ফোন করলে তিনি আমাদের উমরাপুর-এর কাছে বালিয়াঘাটি গঙ্গার ঘাটে আসতে বলেন, সেখানে তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন। নুরপুর-এর রমাকান্তপুর থেকে এই উমরাপুর বেশ অনেক দূর, সুতি ব্লকের প্রায় অপর প্রান্তে বলা যায়। গঙ্গা পেরিয়ে গঙ্গার তীর বরাবর সোজা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দুপাশে একের পর এক গ্রাম। রাস্তার দুপাশেই প্রায় গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে কিছুটা-উঁচু-করে-টাঙানো বাঁশের উপর সদ্য-ছাড়ানো পাট ঝুলছে শুকানোর জন্য। কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাওয়া পাটের বাণ্ডিল পড়ে আছে। আর দুদিকেই রাস্তার ধারে ঘাসের উপর বা বাড়ির উঠোনে ছোটো-ছোটো দলে মহিলারা বসে মশলা ও পাতার কুলো নিয়ে বিড়ি বেঁধে চলেছেন। অবশেষে বালিয়াঘাটি গঙ্গার ঘাটে এসে আমরা পৌঁছলাম, ওপার থেকে লোক-বোঝাই এক স্টিমার তখন ঘাটে এসে লাগছে। কিছুক্ষণ পর সাদিকুল এসে পৌঁছলেন, প্রাথমিক আলাপের পর আমাদের ডাবলু শেখ-এর বাড়ি নিয়ে গেলেন।
যে পাকা রাস্তা ধরে আমরা এসেছি, তাই ধরে ঘাট থেকে অল্প একটু পিছিয়ে এলে রাস্তার একদম ধারেই ডাবলু শেখ-এর বাড়ি। বাড়ির একদিকে এই পাকা রাস্তা, অন্যদিকে গঙ্গা নদী। সরু একফালি উঠোনের দুদিকে ঘর, তারপর দু-একটা গাছ, তার ফাঁক দিয়ে গঙ্গাকে দেখা যায়। বাড়িতে ছিলেন ডাবলু শেখ-এর বউ জাহানারা বিবি। তাঁর সঙ্গেই আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো, ক্রমে আশপাশের পাড়া-পড়শি কয়েকজন পুরুষ ও মহিলাও এসে জড়ো হলেন। তাঁদের সবার টুকরো-টুকরো কথাগুলো জুড়ে ঘটে-যাওয়া ঘটনার একটা আদল গড়ে উঠলো।
সেইদিন (এক মাস মতো আগে হবে, ঠিক তারিখ কেউ মনে করতে পারলেন না) ডাবলু শেখ ও জাহানারা বিবির মধ্যে দাম্পত্য কলহ লেগেছিল। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে কেউই বাড়ি ছিলো না। ডাবলু শেখ-এর বয়স ষাট বছর, একদিকের হাত সে পুরোটা স্বাভাবিকভাবে নাড়াতে পারে না, কথাবার্তাও জড়িয়ে যায়। কিন্তু সে বদমেজাজের তাড়নায় ঝগড়ার মাঝে জাহানারা বিবিকে মারধোর করে, আঘাতে জাহানারা বিবির চোখের নিচে ফুলে কালসিটে পড়ে যায়। জাহানারা বিবিরও মাথায় রাগ চড়ে যায়, তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কিছুদূরের পুলিশ-ক্যাম্প-এ গিয়ে হাজির হন এবং তাঁর মুখে আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে স্বামী ডাবলু শেখ-এর বিরুদ্ধে নালিশ জানান, তাঁর মাথায় তখন চরকি-পাক খাচ্ছে যে-কোনো-ভাবে-হোক ডাবলু শেখ-কে উচিত শিক্ষা দেওয়ার ভাবনা। পুলিশরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে যে তাঁর স্বামী বাংলাদেশী কিনা। রাগের মাথায় স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগটা জোরালো করার তাড়নায় জাহানারা বিবি বলে বসেন যে ডাবলু শেখ-এর নানা-নানী তো বাংলাদেশে থাকে, তাই ডাবলু-ও বাংলাদেশে গেছে-এসেছে। পুলিশদের পাতা ফাঁদে এভাবে জাহানারা বিবি ফেঁসে গেলেন। সকাল দশটায় উর্দিহীন সাধারণ পোষাকের একদল পুলিশ ডাবলু শেখ-এর বাড়িতে হানা দিয়ে ডাবলু শেখ-কে তুলে নিয়ে গেলো, তারপর জাহানারা বিবি ও তাঁদের তিন ছেলেকেও (২৯ বছর বয়সী কায়েম শেখ, ২০ বছর বয়সী রেজাউল শেখ এবং ১৬ বছর বয়সী আসমাউল শেখ) ধরে নিয়ে গেলো। জাহানারা বিবি-র রাগ ততক্ষণে পড়ে গেছে, কী ভুল যে তিনি করে বসেছেন তা বুঝতে পেরেছেন। তিনি তাঁদের কাছে থাকা সমস্ত কাগজপত্র দেখিয়ে বারবার পুলিশদের সামনে প্রমাণ করতে চাইলেন যে ডাবলু শেখ-এর জন্ম ভারতে, তাঁর বাবা-মা-ও ভারতের নাগরিক ছিলেন, ডাবলু শেখ-এর ছেলেদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এখানেই, তাঁরা কেউ বাংলাদেশী নন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের এইসব কাগজপত্রকেও কোনো গুরুত্ব দিলো না, কোনো অনুনয়েও কান দিলো না। জাহানারা বেগম-এর হোল্ডিং সেন্টার-এ থাকার অভিজ্ঞতা মারাত্মক: অপরিসর অপরিচ্ছন্ন জায়গায় ঠেলে-গুঁজে এক দঙ্গল মানুষকে পুরে রাখা হয়েছে, ওখানে অসুস্থ ডাবলু শেখ আদৌ বাঁচবে কিনা, এই দুশ্চিন্তায় তার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। একদিন পর জাহানারা বেগমকে ছেড়ে দেওয়া হলো, কিন্তু ডাবলু শেখ আর তার তিন ছেলে পাকাপাকিভাবে হোল্ডিং সেন্টার-এর অন্ধ-গহ্বরে হারিয়ে গেলেন। বারবার খোঁজ করেও জাহানার বেগম বা অন্য পরিজনরা তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাননি। পুলিশ কেবল বলেছে যে তারা বাংলাদেশী, তাই তাদের বি.এস.এফ. বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।

আসমাউল শেখ ও ডাবলু শেখ
জাহানারা বিবির চোখ থেকে নামা কান্নার জলে সারা মুখ ভিজে উঠেছিলো, তাঁর গলা বারাবার রুদ্ধ হযে আসছিলো, তার মধ্যেই তিনি বারাবার আউড়ে যাচ্ছিলেন যে তিনি আর কিছু চান না, কেবল তাঁর স্বামী ও তিন ছেলে যেন ঘরে ফিরে আসে। আমাদের হাতে তিনি গোছা করে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী ও সন্তানদের ভারতীয় নাগরিকত্বের নিদর্শনস্বরূপ কাগজপত্রগুলো। সেই গোছায় তাঁদের প্রত্যেকের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড রয়েছে, ডাবলু শেখ-এর বাবা ও মায়ের নাম যে ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিলো তার প্রমাণ রয়েছে, জন্ম শংসাপত্র রয়েছে। তা থেকে নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ হয় যে ডাবলু শেখ সুতি-২ ব্লকের মাহেশহিল-২ অঞ্চলের বামুহা গ্রামে জন্মেছিলেন, তাঁর পিতা সানজানি শেখ-ও নিশ্চিতভাবেই ভারতের নাগরিক। আবার সেই একই প্রশ্নগুলো ওঠে: এইসব কাগজপত্র দাখিল হওয়ার পরেও কোন যুক্তিবলে পুলিশ ডাবলু শেখ ও তার তিন ছেলেকে বাংলাদেশী বলে ‘ভেরিফাই’ করলো? এই জায়গায় যেখানে নদী পেরোলেই বাংলাদেশ, সেখানে বাংলাদেশে কারও নানা-নানীর বাড়ি থাকা বা কখনও সেই নানা-নানীর বাড়িতে যাওয়া কি অপরাধ, নাকি তার জন্য কাউকে ভারতের নাগরিক নয় বলে সাব্যস্ত করা যায়? ডাবলু শেখ ও তার তিন ছেলে যদি পুলিশের যুক্তিতে ‘বাংলাদেশী’ হয়, তাহলে একই যুক্তিতে ডাবলু-র বাকি দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ‘ভারতীয়’ হয় কী করে, আর এস.আই.আর.-এর অতো দফা ভেরিফিকেশনের পরও তাঁদের নাম ২০২৬-এর ভোটার লিস্টে থেকে যায় কীভাবে? প্রশ্নগুলো ক্রমশ এই ভাবনার দিকেই ঠেলে দেয় যে যুক্তি, ভেরিফিকেশন কথাগুলো শুধু কথার কথা, আসলে পুলিশ-বি.এস.এফ.-এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র বাংলাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ত্রস্ত-সন্ত্রস্ত করে রাখার জন্য ক্রূর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জাল পেতে চলেছে। এতোটাই শিকারী মনোভাব তাদের যে দাম্পত্য হিংসার বলী এক মহিলার অভিযোগের মীমাংসা করার চেষ্টা না করে সেই মহিলার অভিযোগকেই তারা সুকৌশলে ‘বাংলাদেশী শিকার’ করার কাজে লাগায়, সেই মহিলাকেই আরো বিপদের অথৈ জলে এনে ফেলে।
গতরবেচিয়েদের সর্বনাশ
সুতি-২ ব্লকের মধ্যে সাহাবাদ ও কুমারপাড়া প্রায়-পাশাপাশি দুটি গ্রাম। আমরা যখন গেলাম, তখন গ্রামের গরিব মুসলমান পাড়াগুলোর পরিবেশ থমথমে, কারণ এই পাড়াগুলোর বেশকিছু মানুষ ছত্তিসগড়ের রায়পুরে ডিটেইনশন সেন্টারে বন্দী হয়ে রয়েছে। এমন মানুষের সংখ্যা সাহাবাদে সাতজন: ইসলাম শেখ (বয়স: ৬৯ বছর) ও তার তিন ছেলে ইব্রাহিম শেখ (বয়স: ৩৮ বছর), ইজাজুল শেখ, কিরণ শেখ এবং এনজামুল শেখ, মসিকুল খাঁ, সফিকুল আলম। আর কুমারপাড়ায় এঁদের সংখ্যা নয়জন: নাসিকুল শেখ (বয়স: ৩৩ বছর), আলাউদ্দিন শেখ (বয়স: ৩৮ বছর), আসগর শেখ (বয়স: ৫৬ বছর) ও তার পুত্র সানিউল শেখ (বয়স:১৭ বছর), মাতিন শেখ (বয়স: ৪৫ বছর), সেন্টু শেখ (বয়স: ৪২ বছর), রাহুল খান (বয়স: ৩২ বছর), লালটু শেখ (বয়স: ২৮ বছর), মুকিম শেখ (বয়স: ১৬ বছর)। এঁরা সবাই ছত্তিসগড়ের বিলাসপুরে গিয়েছিলেন হাঁড়ি-পাতিল ফেরি করে বিক্রি করার কাজে। এই ষোলোজনের মধ্যে বয়স্করা এ কাজ করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে, কেউ কুড়ি বছরের উপর, কেউ বছর-পনেরো, খুব বেশি যাঁদের বয়স তাঁরা তাঁদের পুত্রদের নিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েক বছর ধরে কাজটি তাদের শিখিয়ে-পড়িয়ে দিতে, আর একদম কিশোর কয়েকজন গিয়েছিলেন এই প্রথম। তাঁদের পরিবারে তাঁরাই প্রধান রোজগেরে। তাঁদের পাঠানো টাকাতেই এখানের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে, ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ চলে। বিলাসপুরে যেতে যেতে সেই জায়গাটা এঁদের পরিচিত হয়ে উঠেছে, সেখানকার মানুষজনের কাছেও তাঁরা পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। বছরে একবার বা দুইবার স্থানীয় থানায় তাঁদের ডাক পড়ত আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড দেখিয়ে আসার জন্য। এবারও তাঁরা ভেবেছিলেন যে তেমনই রুটিনমাফিক ডাক পড়েছে যখন ৪-ই সেপ্টেম্বর তাঁদের বিলাসপুর থানায় হাজির হতে বলা হলো। কিন্তু থানায় হাজির হতেই তাঁদের কাছে থাকা আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও মোবাইল ফোন সব কেড়ে নিয়ে তাঁদের ‘বাংলাদেশী’ বলে গ্রেফতার করা হলো। মুর্শিদাবাদ থেকে যাওয়া আরো সাতজন পরিযায়ী শ্রমিককে তাঁদের সঙ্গে গ্রেফতার করে রাখা হয়েছিলো, যাদের মধ্যে চারজন সামশেরগঞ্জের এবং তিনজন জঙ্গীপুরের। তারপর কয়েকদিনের মধ্যেই এই ২৩-জনকে রায়পুর-এর ডিটেইনশন সেন্টার-এ চালান করে দেওয়া হলো, বলে দেওয়া হলো যে তাঁদের বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ করে দেওয়া হবে। এই ২৩ জনের মধ্যে একজন কোনও এক ফাঁক-ফোকর খুঁজে কুমারপাড়ায় তার বাড়িতে খবর পাঠাতে সমর্থ হয় যে তাদের অবর্ণনীয় কষ্টকর অবস্থায় রায়পুর ডিটেইনশন সেন্টারে ধরে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে গ্রাম থেকে একজন রায়পুরে গিয়ে সেই ডিটেইনশন সেন্টারে তাদের দেখে এসেছে, যদিও তাদের সঙ্গে কোনও কথা তাকে বলতে দেওয়া হয়নি, তার নিয়ে যাওয়া ভারতীয় নাগরিকত্বের নিদর্শনস্বরূপ নানা কাগজপত্রকেও পুলিশকর্তারা কোনো আমল দেয়নি।
সাহাবাদ গ্রামের সাতজনের মা ও বিবিদের সঙ্গে এবং কুমারপাড়া গ্রামের নয়জনের বিবিদের সঙ্গে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম। এলাকার এম.পি. খলিলুর রহমান তাঁর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বন্দী-হয়ে-থাকা মানুষদের প্রত্যেকের পরিবারের জন্য কিছু আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছিলেন, তা নিতে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন। যাঁর স্বামী ও পুত্র বন্দী হয়ে আছে এমন বয়স্কা মহিলা থেকে শুরু করে বন্দী স্বামীর জন্য চিন্তায় আকুল যুবতী বিবি--- প্রত্যেকেই বলছিলেন আর্থিক সাহায্য তাঁরা চান না, তাঁরা চান তাঁদের ঘরের মানুষটি আবার ঘরে ফিরে আসুক, আর যারা জুলুমবাজি করে ধরে রেখেছে তাদের শাস্তি হোক। এঁদের মুখেই আমরা উপরোক্ত বিবরণ শুনলাম, এঁদের মুখ শোকে পাথর, অশ্রু বাঁধ মানছে না, নিঃশব্দে পাথুরে গালের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। কুমারপাড়ার নাসিকুল শেখ-এর যুবতী বিবির আর্দ্র কণ্ঠ থেকে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো বেরিয়ে আসছিলো এই কথাগুলো: ‘আমরা টাকা চাই না, আমাদের ঘরের লোককে ফিরিয়ে দাও। দশদিন হয়ে গেলো তাদের কীভাবে ধরে রেখেছে, আমাদের নিয়ে চলো সেখানে, আমরা সেখানে যেতে চাই। কেন তাদের ধরে রেখেছে, তাদের জন্ম এখানে, সব কাজ-কাম এখানে, কেন তাদের ধরে রেখেছে? আমরা আর এভাবে থাকতে পারছি না, আমাদের নিয়ে চলো সেখানে…’।

কুমারপাড়ার বন্দী-হওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের বিবিরা
এলাকার এম.এল.এ. ইমানি বিশ্বাস। তাঁর কাছে গিয়ে আমরা এই সবার কথা তুলেছিলাম। তিনি ইব্রাহিম শেখ, আবদুল জব্বার ও ডাবলু শেখ-এর কথা জানেনই না বলে কাটিয়ে গেলেন, কিন্তু স্বীকার করলেন যে বিলাসপুরে সাহাবাদ ও কুমারপাড়ার ষোলোজন বন্দী হওয়ার কথা জানেন এবং একথাও স্বীকার করলেন যে তারা কেউই বাংলাদেশী নয়, প্রত্যেকেই এই মুর্শিদাবাদের মানুষ। বিষয়টি নিয়ে তথ্য তাঁর কাছে এলেও তিনি এখনও বিধানসভায় এই অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিকার দাবি করে বক্তব্য রেখে উঠতে পারেননি, তবে অবশ্যই রাখবেন বলে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিলেন।
মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে আসার পর ১৭-ই সেপ্টেম্বর খবর পেলাম যে এই ধৃত ২৩ জনের মধ্যে ১৯ জনকে রায়গড় ডিটেইনশন সেন্টার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা মুর্শিদাবাদের বাড়িতে ফিরছেন। কিন্তু চারজনকে ছাড়া হচ্ছে না, তাঁদের এখনও ‘ডিটেইন’ করে রাখা হচ্ছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ঘটে যাওয়া বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এস.আই.আর.)-এর প্রক্রিয়ায় তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে ডিলিট করা হয়েছিলো। এই চারজন হলেন: কুমারপাড়ার লালটু শেখ এবং সামশেরগঞ্জের নাসিরুদ্দিন শেখ, শফিকুল ইসলাম, সাবির শেখ, শেখ নৌসাদ। এঁরা প্রত্যেকেই ভোটার তালিকা থেকে নাম ডিলিট হওয়ার বিরুদ্ধে এবং পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য সমস্ত প্রমাণসহ আবেদন করেছেন হাইকোর্টের গড়ে দেওয়া আপিলেট ট্রাইবুনালে। সে ট্রাইবুনাল পাঁচ মাস গড়িয়ে যাওয়ার পরও তাঁদের আবেদন বিচার করে উঠতে পারেনি, অথচ পুলিশ সেই বিচারাধীন বিষয়টিকে যুক্তি করেই তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব নাকচ করে বাংলাদেশী তকমা লাগিয়ে দেওয়ার উপক্রম করে তাঁদের ‘ডিটেইন’ করে রাখছে! কী বিচিত্র এই আইনের মতিগতি!
মাথার উপর রক্তমাখা আকাশ
১৪ ই সেপ্টেম্বর দিনটা তখন শেষ হয়ে আসছে। সারাদিন ঘুরে যা দেখলাম, শুনলাম, সেসবকিছু ভারী পাথরের মতো মনটার উপর চেপে বসেছে। বাঙলাভাষী মুসলমানদের সম্পর্কে তীব্র বিদ্বেষ সংগঠিত করে হিন্দুত্ববাদী শাসকরা গোটা রাষ্ট্রকাঠামোটাকে ব্যবহার করে যে সন্ত্রাসের শাসন এখানে কায়েম করেছে, তার আকার-অবয়ব যতো উপলব্ধি করছিলাম, ততো যেন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিলো। রাতের আস্তানায় ফেরার পথে গঙ্গার উপর লোহার সেতুতে তখন আমাদের গাড়ি। চোখ পড়লো আকাশের দিকে। ডুবতে-বসা সূর্য বিস্তীর্ণ মেঘের পাড় ধরে রক্তরঙ ছড়িয়ে দিয়েছে। মাথার উপর রক্তমাখা আকাশ। অপার্থিব ভয়ঙ্কর সেই রক্তছটায় চোখ সেঁধিয়ে মন যেন ফিরে গেলো তিনশো-চারশো বছর আগের সুতি-তে। মুর্শিদাবাদের নবাবের শাসনাধীন সেই সুতি-তে সুফি পীরদের ছিলো ব্যাপক আনোগোনা, তারা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের গোঁড়ামিকে আক্রমণ করে প্রেম, সহিষ্ণুতা ও মনবতাবোধের প্রচার করতেন। আঞ্চলিক কবি, ভাবুক ও গ্রামনেতারা সাধারণ কৃষক ও কারিগরদের জীবনধারণ ও জীবনযাপনের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে সমন্বয়বাদী ধর্মাচরণের নানা রেওয়াজ গড়ে তুলেছিলেন। সত্য পীর ও সত্য নারায়ণের পুজো হতো একইসঙ্গে, তার সিন্নি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই খেতো ভাগ করে। আলকাপের দলগুলোয় হিন্দু ও মুসলমান শিল্পীরা একইসঙ্গে পরিবেশনা করতো ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অনাচারকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে তৈরি পালা। ভ্রাম্যমান বাউল-ফকির-রা গেয়ে শোনাতেন যে মানুষের সত্তা, মানুষের হৃদয়, মানুষের দেহ--- তাতেই বাস করে ঈশ্বর বা আল্লা, মন্দির-মসজিদে বাস করে না। পীরদের মাজারে চাদর চড়াতো হিন্দুরা, আবার গাজনের মেলায় ভিড় করে আসতো মুসলমানরা--- এসবই ছিলো তখন স্বাভাবিক। তখনও দিনশেষে এমনই সূর্য ডুবতো, কিন্তু আকাশের রক্তস্নান হতো না, বরং, আবিরের আলপনা করা বলে মনে হতো হয়তো। এই চারশো-পাঁচশো বছরের যাত্রাপথে মানুষের মতো একসঙ্গে একই সমাজে বেঁধে-বেঁধে-থাকা-র সমস্ত কলাকৌশল খুইয়ে কীভাবে আমরা গড়ে তুললাম এই বিপুলদেহ রাক্ষসের মতো রাষ্ট্রকে, যা ঘৃণা-বিদ্বেষ-অবিশ্বাস-এর মন্ত্র দিয়ে আমাদের তার খেলার বোড়ে করে তুললো, আর এই সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলো! রক্তস্নাত আকাশ অতিক্রম করে আমরা কি নতুন করে আবিরের আলপনা করা আকাশে ফিরতে পারবো?