

রাষ্ট্র কার?
১০ অক্টোবরের সেন্ট্রাল দিল্লিতে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর নির্দ্বিধায় দেওয়া যায়—রাষ্ট্র পুলিশের।
নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা বিক্ষোভে অংশ নিতে কাল রাতেই পৌঁছে গিয়েছিলাম দিল্লি। NEET কেলেঙ্কারির পরবর্তী আন্দোলনে হাত পুড়িয়ে নেওয়ার পর এবার আর অভ্যর্থনায় কোনও ত্রুটি রাখেনি অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা পুলিশ ছাড়াও একাধিক আর্মি ব্যাটালিয়নকে উড়িয়ে আনা হয়েছে রাজধানীকে ‘সুরক্ষিত’ করতে।
গত দুই-তিন দিন ধরে সব মিলিয়ে অন্তত ৫০-৬০ হাজার পুলিশ ঘিরে রেখেছে সেন্ট্রাল দিল্লি। যন্তর-মন্তরকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে যাতে একটা আরশোলাও (নাকি মাছি?) গলতে না পারে, তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা হয়েছে। প্রত্যেকটি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে বড় বড় ব্যারিকেড। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট তো আছেই। সব মিলিয়ে যাকে বলে, যুদ্ধ পরিস্থিতি।
এক দিন আগে থেকেই অ্যাক্টিভিস্টদের কার্যত ঘরবন্দি করে রাখার খবর আসছিল। অন্যান্য রাজ্য থেকে যাতে বিক্ষোভকারীরা এসে পৌঁছতে না পারেন, তার জন্য ভয় দেখানো থেকে শুরু করে ট্রেন থেকে জোর করে নামিয়ে আটক করা—সবই হয়েছে পূর্বপরিকল্পিতভাবে। তার উপর জনতার অংশগ্রহণ আটকাতে যেভাবে বাস, ট্রেন, মেট্রো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল, তাতে আজ সকালে বাইরে থেকে দিল্লি পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব ছিল। গোটা দিল্লিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাঁচ-ছ'টি অস্থায়ী ডিটেনশন ক্যাম্প চালু হওয়ার খবর পেয়েছিলাম। কাল রাত থেকেই আজকের বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা লোকজনকে সেসব ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল।
যাই হোক, সকাল ন'টার দিকে বেরোলাম যন্তর-মন্তরের উদ্দেশে। আধ ঘণ্টা চেষ্টার পর এক অটোচালক রাজি হলেন অন্তত কিছুটা দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে। যেখানে নামলাম, বা বলা উচিত, নামতে বাধ্য হলাম, সেখান থেকে যন্তর-মন্তর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। নামার আগের পনেরো-কুড়ি মিনিটে আমার অটো মেরেকেটে পঞ্চাশ মিটার এগিয়েছে।
নেমে হাঁটা লাগালাম। মোবাইল ইন্টারনেট ইতিমধ্যে গায়েব। ভাগ্যক্রমে, এক বন্ধুর পরামর্শ মেনে অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে রেখেছিলাম। সেটা দেখেই এগোতে থাকলাম। চারদিকে ততক্ষণে ট্রাফিক প্রায় পুরোপুরি স্তব্ধ।
প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে প্রথম বড়সড় ব্যারিকেড দেখলাম। নিউ দিল্লি স্টেশনের পাহাড়গঞ্জ দিকের মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁ দিকে সোজা হাঁটলেই সেন্ট্রাল দিল্লি। সেই রাস্তায় পৌঁছে দেখলাম, রাস্তার মাথায় বিক্ষোভকারীদের ছোটখাটো একটা ভিড়। ব্যারিকেড করে দাঁড়িয়ে অগুনতি পুলিশ, আর রাস্তার এক পাশে সার দিয়ে রাখা চারটি ‘ডিটেনশন বাস’।
কাউকেই ব্যারিকেড পেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। উল্টো দিক থেকে আসায় অবশ্য কোনও বাধা নেই। এ দিক থেকে কেউ এগোলেই তাঁর পরিচয়পত্র চাওয়া হচ্ছে। তারপর প্রশ্নের পর প্রশ্নে জেরবার করে শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদন নাকচ করা হচ্ছে।
রাস্তার এক কোণে ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম, পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয় কি না। ইতিমধ্যে বিক্ষোভকারীদের ভিড় একটু বাড়তেই দিল্লি পুলিশের তরফে দু'বার মাইকিং করে এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি থাকার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হল।
কিছুক্ষণ পর শুরু হল ধরপাকড়। একটা ডিটেনশন বাস জনা কুড়ি বিক্ষোভকারীকে নিয়ে রওনা দিল কোনও এক ডিটেনশন সেন্টারের উদ্দেশে।
পরিস্থিতি বদলানোর কোনও লক্ষণ না দেখে আবার হাঁটা লাগালাম। আশা ছিল, অন্য কোনও দিক দিয়ে দিল্লি পুলিশের এই চক্রব্যূহ ভেদ করা যাবে। আবার অনেকটা হেঁটে, কিছুটা অটোতে করে এগিয়ে পৌঁছলাম অন্য একটি ব্যারিকেডের সামনে। সেখানকার পরিস্থিতিও একই।
ইতিমধ্যে ফোনে ধ্রুব রাঠী-সহ CJP-র নেতৃত্বের আটক হওয়ার খবর জানালেন এক পরিচিত। তাঁর কাছেই জানলাম, ইন্টারনেটে যা ছিটেফোঁটা খবর আসছে, তাতেই পরিষ্কার যে সেন্ট্রাল দিল্লির পুলিশের চক্রব্যূহের ভিতরে তখন শুধুই উর্দিধারীরা। বিক্ষোভকারীদের আটকাতে তাঁরা আপাতত সফল। যে কয়েকজন ফাঁক গলে ভিতরে ঢুকতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁদেরও পত্রপাঠ আটক করে বাসে তোলা হয়েছে। এদিকে নেতৃত্বের অভাবে বিক্ষোভকারীরাও ছত্রভঙ্গ।
অগত্যা ফেরার পথ ধরলাম।
সরকার আপাতদৃষ্টিতে সফল। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা একটি যুব আন্দোলনকে আটকাতে যে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়তে হল, তা সরকারের পক্ষে মোটেও স্বস্তির বিষয় নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না।
আজকের দিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সরকার ঠিক কতটা ভীতসন্ত্রস্ত। রাষ্ট্র যতই পুলিশের হোক না কেন, দেশ জনসাধারণের। আর তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা আছেন দীপকে, নেহাদের সঙ্গেই।
তাই আমি নিশ্চিত, এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর রূপ নেবেই।
শেষের শুরু হয়ে গেছে।
সুশান্ত | ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৪৩743171